তামিম শিরাজী

।। তামিম শিরাজী ।।

গণপরিবহনে ধর্ষণের ঘটনা প্রথম নয়, তবে সাম্প্রতিক দুই বড় ঘটনা গণপরিবহণে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ভিন্নমাত্রায় উদ্বেগ তৈরি করেছে। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী ঈগল পরিবহণে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনার মাত্র দুদিন পর গাজীপুরে বাসে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নারী। খবরে বলা হচ্ছে, বাসের হেল্পার-সুপারভাইজার মিলে ওই নারীর স্বামীকে বাস থেকে ফেলে দিয়ে তাকে ধর্ষণ করে।তার আগে তাদের কাছে থাকা টাকা-গয়না-মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় তারা। ঘটনাটি গাজীপুরের ভোগরা এলাকার আর পরিবহনের নাম তাকওয়া। পুলিশ দুটি ঘটনাতেই আসামি গ্রেফতার করেছে।

পুলিশের আসামি ধরা কিংবা বিচার আমাদের খুব একটা স্বস্তি দিতে পারছে না। গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কে এমনই এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। ঘটনার শিকার তরুণী ছিলেন বাসের শেষ যাত্রী , হেল্পার সুপারভাইজাররা বাসের দরজা জানালা বন্ধ করে যখন ঘটনা ঘটায় তখন ঊচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে পাশবিক নির্যাতনে যোগ দেয় ড্রাইভারও। গত বছরের ২৬ জুন চট্টগ্রামের মীরসরাই, ২০১৭ সালের ৩ জানুয়ারি ময়মনসিংহের নান্দাইলে এবং একই বছরের ২৫ আগস্ট টাঙ্গাইলের মধুপুর, ২০১৬ সালের ২৩ জানুয়ারি বরিশালে সেবা পরিবহনে, একই বছরের ১ এপ্রিল টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি থেকে ঢাকাগামী বিনিময় পরিবহনে, ২০১৫ সালের ১২মে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় পোশাককর্মী, ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জে শুভেচ্ছা পরিবহন, ২০১৩ সালের ২৫ জানুয়ারি মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া, ঢাকায় মাইক্রোবাসে এক গারো তরুণীকে ধর্ষণের অভিযোগসহ বেশ কয়েকটি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা গণপরিবহণে ঘটেছে।এসকল ঘটনার শিকার নারীকে অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। মধুপুরের ঘটনা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৭ সালে টাঙ্গাইলের মধুপুরে তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর তার ঘাড় মটকে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এসব ঘটনা গণপরিবহণে নারীর নিরাপত্তা বিষয়ে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ।

ধর্ষন বাদেও গণপরিবহন এবং জনবহুল স্থানে যৌনহয়রানির ঘটনা অহরহ ঘটেই চলেছে,যার প্রতিনিয়ত শিকার হচ্ছেন আপনার আমার মা বোন মেয়েরা। ব্রাকের গবেষণা প্রতিবেদন “নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক”সহ নানা গবেষণায় দেখা গেছে, গণপরিবহন ব্যবহারকারী ৯৪ শতাংশ নারী মৌখিক, শারীরিক অথবা অন্য কোনোভাবে যৌন হেনস্তার শিকার হয়েছেন। হয়রানির শিকার নারীদের অভিমত বয়স্কদের দ্বারাই বেশি আক্রান্ত হন তারা। গবেষণা বলছে, ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষের দ্বারাই যৌন হয়রানির শিকার হন বেশিরভাগ নারী, যার হার প্রায় শতকরা ৬৬ ভাগ। এমন অবস্থায় নারীবান্ধব গণপরিবহন এখন সময়ের দাবি।

পাশের দেশ ভারতে “নির্ভয়া কাণ্ড” নামে পরিচিতি পাওয়া গণপরিবহণে নির্মম দলবদ্ধ ধর্ষণ সমগ্র সভ্য মানুষকে শঙ্কিত করেছিল। দিল্লির মেডিকেল ছাত্রী নির্ভয়া (মিডিয়া তাকে নির্ভয়া উপাধি দেয়) ২০১২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রাতে তার পুরুষ বন্ধুর সাথে বাসায় ফেরার পথে বাসে আক্রান্ত হন। দল বেঁধে ধর্ষণ, তাকে ও তার পুরুষবন্ধুকে অমানবিক নির্যাতন করে উলঙ্গ করে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। ১৩ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নির্ভয়া নামের সেই নারী। এঘটনার পর ভারতের জনবিক্ষোভে পাল্টে যায় ধর্ষণের বিচার আইন এবং ২০২০ সালের ২০ মার্চ কার্যকর হয় নির্ভয়া ধর্ষণে জড়িত ৪ আসামির ফাঁসি। আমরাও আমাদের দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির আইন আন্দোলন করে পরিবর্তন করেছি। ২০২০ সালের অক্টোবরে ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনের কথা আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, সে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির আইন করে সরকার। তবে কিছু ঘটনাতে বিচার করা গেলেও খুব একটা কার্যকর বিচারব্যবস্থা আমরা এখনো প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি কি না, সে প্রশ্ন উঠে আসে প্রায়ই। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ধর্ষণগুলোর প্রধান কারণ বলেই অনেকে মনে করেন।

নারীর নিরাপত্তা প্রসঙ্গে আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, নারীর নিরাপত্তার দায়ভার তার একার নয়।পুরুষকেও নারী নিরাপত্তার বিষয়ে সম্যক ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের সমাজের দিকে তাকালে দেখতে পাই, কাগজে-কলমে আমরা লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণে এবং নারীর ক্ষমতায়ণ প্রতিষ্ঠায় উদাহরণ সৃষ্টি করেছি। অথচ নারীর পূর্ন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। তাহলে আমাদের ভেবে দেখা উচিৎ সমস্যাটা আসলে কোথায়? নারীবিদ্বেষী সামাজিক এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। পুরুষতান্ত্রিকতার ‘গৌরবচিহ্ন’ হিসেবে নারীর প্রতি একধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমাজ আজও বহন করে চলেছে। আমরা যারা নারী অধিকার কিংবা নারী পুরুষ সমতাভিত্তিক সমাজের কথা বলি, তারাও নিজেদের ডিএনএতে নারী বিদ্বেষের সুপ্ত বীজ বহন করে চলেছি। যা হয়ত কোনদিন ফুঁড়ে বেরোতে পারে।

“জাহান্নামের অধিকাংশই নারী” এমন হাদিসকে ফোকাস করে চরমোনাই পীর কিংবা রাজ্জাক বিন ইউসুফের মতো কথিত ইসলাম প্রচারকরা পাড়া মহল্লায় নারীবিদ্বেষের যে বিষ বাস্প ছড়াচ্ছে তার বহিঃপ্রকাশ দেখতে পাই ধর্ষণ এবং যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলোতে। নারীর পোশাক নিয়ে হরহামেশা গলা ফাটিয়ে চলেছেন ধর্মীয় বক্তারা। পোশাক এবং চরিত্রকে দায়ী করে ধর্ষণকে জায়েজ করার কৌশল অনেক আগের। নারীর প্রতি পুরুষকে বিষিয়ে তোলা হচ্ছে। কাম প্রবৃত্তি যদি ধর্ষণের ঘটনার মুখ্য নিয়ামক হয়, তাহলে অমানবিক শারীরিক নির্যাতন এবং সহিংসতার কারণ কী? একথা স্পষ্ট যে, নারীর প্রতি একধরনের বিদ্বেষ ঘটনাগুলোতে বড় ভূমিকা রাখে। গণপরিবহণে নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন মহাসড়কে নিয়মিত চেকিং এবং ড্রাইভার হেল্পারদের উপর নজরদারি বাড়াতে পারে। ড্রাইভার হেল্পারদের যৌনজীবন এবং তাদের মানসিক উন্নয়নে গবেষণা হওয়া উচিৎ। বাস মালিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তারাও যৌন সহিংসতা ধর্ষণ বন্ধে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখতে পারে। ধর্ষকের মনস্তত্ব কিংবা ধর্ষণের যৌনতা নিয়ে এপযর্ন্ত আমাদের দেশে কোন গবেষণা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। হওয়াটা খুব প্রয়োজন। সুস্থ যৌন সংস্কৃতি গড়ে তোলাটা খুব দরকার। এসব নিয়ে খোলাখুলি কথা বলার সময় এসেছে।পরিশেষে বলতে চাই, গণপরিবহনসহ আমাদের সমাজে ঘটতে থাকা ধর্ষণ কিংবা যৌন হেনস্তাগুলোকে শুধুমাত্র আইন বিচার ধর্ম দিয়ে বন্ধ করা যায়নি, যাবেও না। এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তিপেতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সাথে আমাদের প্রয়োজন সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক লড়াই। সমাজের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তন না করা গেলে নারীর জন্য নিরাপদ গণপরিবহন কিংবা সমাজ কোনটিই প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

তামিম শিরাজী ২০২০ সালে সংগঠিত ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনে রাজশাহীর একজন সংগঠক