।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

বেসরকারি চাকরিজীবী আনোয়ার হোসেনের ১১ বছর বয়সী ছেলের বেশ কয়েক দিন ধরেই জ্বর ছিল। জ্বরের মাত্রা ১০২ থেকে ১০৩ ফারেনহাইট পর্যন্ত ছিল। এরপর তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে টেস্ট করে জানা যায় তার টাইফয়েড। অন্যদিকে মেহেনাজ আকতারের ১৪ বছর বয়সী শিশুর জ্বর আসে আবার যায়। জ্বর কখনও ১০২ কিংবা ১০৩ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে। সঙ্গে ছিল গলা ব্যথা ও কাশি। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানালেন তার গলায় ইনফেকশন।

এ রকম নানা কারণে কয়েক ধরনের জ্বরে ভুগছেন অনেকেই। এ ধরনের রোগী বর্তমানে প্রায় সব ঘরেই পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি আছে করোনা, ডেঙ্গু এবং মৌসুমি ফ্লু। জ্বরের কারণে অনেকেরই মুখের রুচি চলে যাচ্ছে এবং তা স্বাভাবিক হতেও অনেক দিন সময় লাগছে।

দেশে করোনা আর ডেঙ্গুর প্রকোপ সমান তালে চলছে। কয়েক দিন ধরে আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও সংক্রমণের হার বেশি। অর্থাৎ কম সংখ্যক নমুনা পরীক্ষাতেও বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া অনেকেই করোনা নেগেটিভ হচ্ছেন, তবে জ্বর, ঠান্ডা, কাশি পিছুই ছাড়ছে না। করোনা, ডেঙ্গু এবং মৌসুমি জ্বরের লক্ষণ কাছাকাছি হওয়ায় অনেকেই দ্বিধার মধ্যে থাকেন।

ধানমন্ডির বাসিন্দা কাওসার জানান, ১০২-১০৩ ডিগ্রি জ্বর নিয়ে প্রায় ১৮ ঘণ্টার মতো কাবু হয়েছিলেন তিনি। ওষুধ নিয়েও তা কমার লক্ষণ নেই। চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক নেওয়া শুরু করেন তিনি। তারপর কিছুটা সুস্থ হওয়া শুরু করেন তিনি। জানান, এ রকম জ্বর তার কখনোই আসেনি।

আবদুল্লাহ জানান, ঈদের দিন দুপুর থেকে প্রচণ্ড জ্বর। তার সঙ্গে মাথা ব্যথা। এরপর তার গায়ে জলবসন্তের মতো ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তিনি বর্তমানে বাসায় চিকিৎসাধীন আছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, করোনার লক্ষণ তিন ধরনের উপসর্গের ওপর নির্ভর করে। সবচেয়ে সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে আছে জ্বর, সর্দি, ক্লান্তি, স্বাদ বা গন্ধ হারানো। কম সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে আছে গলা ব্যথা, মাথা ব্যথা, ব্যথা এবং যন্ত্রণা, ডায়রিয়া, ত্বকে ফুসকুড়ি, আঙুল বা পায়ের পাতার বিবর্ণতা, চোখ লাল হওয়া বা চোখ জ্বলা। গুরুতর উপসর্গগুলোর মধ্যে আছে নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হওয়া বা শ্বাসকষ্ট, কথা বলার বা চলাফেরার ইচ্ছা হারানো, বিভ্রান্তি, বুক ব্যথা।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেয়া তথ্যমতে, ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর ও সেই সঙ্গে শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। জ্বর ১০৫ ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। শরীরে, বিশেষ করে হাড়, কোমর, পিঠসহ অস্থিসন্ধি ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা হয়। এ ছাড়া মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা হয়। অনেক সময় ব্যথা এত তীব্র হয় যে মনে হয় হাড় ভেঙে যাচ্ছে। তাই এই জ্বরের আরেক নাম ‘ব্রেক বোন ফিভার’। জ্বর হওয়ার চার বা পাঁচ দিনের সময় শরীরজুড়ে লালচে দানা দেখা যায়। যাকে বলা হয় স্কিন র‍্যাশ, অনেকটা অ্যালার্জি বা ঘামাচির মতো। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব এমনকি বমি হতে পারে। রোগী অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করে এবং রুচি কমে যায়।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, চার ধরনের জ্বরে মানুষকে বেশি ভোগাচ্ছে বর্তমানে। প্রথমটি করোনা, দ্বিতীয়ত ডেঙ্গু, তৃতীয়ত মৌসুমি জ্বর এবং চতুর্থত হচ্ছে শ্বাসতন্ত্রীয় ইনফেকশন। এই চারটা আমরা বেশি দেখতে পাচ্ছি। এরমধ্যে করোনার তীব্রতা কম, যদি দীর্ঘমেয়াদি কোনও রোগ শরীরে না থেকে থাকে অথবা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো কোনও কারণ ঘটে না থাকে। আবার ডেঙ্গুর কারণে অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হচ্ছে। আবার বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগ বিশেষ করে টাইফয়েড, পেটের অসুখও হচ্ছে। যার কারণে জ্বর হচ্ছে। তবে যেটাই হোক, আমাদের করোনা প্রতিরোধী ব্যবস্থা যেটা আছে, সেটা মানতে হবে। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্য মশা মারার একটা সমন্বিত যৌথ কর্মসূচি নেয়া উচিত।

তিনি আরও বলেন, বন্যায় কবলিত অঞ্চলে সুপেয় নিরাপদ খাবার পানির ব্যবস্থা করতে হবে।

অনেকেই সাধারণ ফ্লু মনে করে করোনা টেস্ট করায় না, সে ক্ষেত্রে করণীয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যখন কোনও মহামারি চলমান থাকে, সেই মহামারির প্রধান লক্ষণ যদি কারও শরীরে দেখা দেয়, তাহলে তার অবশ্যই টেস্ট করা উচিত। এখন করোনা চলমান আছে, কারও যদি জ্বর, ঠান্ডা, কাশি লেগে থাকে তাহলে টেস্ট করানো উচিত। এতে যিনি আক্রান্ত হচ্ছে তার থেকে অনেক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করা যাবে। টেস্ট না করলে জানা যাবে না তিনি আক্রান্ত কিনা। ফলে তার চারপাশে অনেকেই আক্রান্ত হবে।