বুড়িমা মরে গেল নিঃসঙ্গ অমাবশ্যায়। আঙিনায় পাতা জায়নামাজের ওপর গুটিসুটি পড়ে থাকলো ভেজা কাপড়ে, নির্জীব। হাঁটুর মধ্যে মাথা, ফলে, বুকের ওপর বাঁধা ছোট শীর্ণ হাড়ের দুইহাত অদৃশ্য। যেন মানুষের মতো দেখতে গুটিয়ে থাকা সবুজ কেন্নোর কুণ্ডলী।

রঙজ্বলা পাড়বিহীন সবুজ শাড়ির ভেতরে নিশ্চল বুড়িমাকে সুবেহ সাদেকে দেখতে পায় বড় বেটার বউ। বড়বউ। দশগাঁয়ের সকল লোকের বড়বউ। বড় বেটা হাঁপানির রোগী, মরে যাবার জন্য অস্থির থাকে সারা রাত, সুবেহ সাদেকের আজান কানে গেলেই তার দুইচোখের পাতা জড় হয়ে আসে। হায় আল্লাআআ… বড়বউয়ের আর্তচিৎকারে ধড়ফড় করে জেগে ওঠার পর একসাথে সহস্র কথা তার মনে পড়ে বড় বেটার।

বসতিই তো ছিল না দশগাঁয়ে। রাস্তা নাই, ঘাট নাই, বাঁশের জঙ্গলে ভরা গাঁয়ের পত্তন হয়েছিল বলা যায় বুড়িমার হাতে। বিরিটিশরা ভারত ছাড়ার পরে এইখানে জঙ্গলের ফাঁকে বসতি হলো, আবাদ-সুবাদ হলো, সমাজ হলো। মোসলমান সমাজ। কয়েক ঘর বাদিয়ার বসতি অবশ্য ছিল আগে থেকেই, তারা দশগাঁয়ে ঢোল বাজাতে পারতো সন্ধ্যায়, মোসলমান বসতি জারি হবার পরও। তারপর দশগাঁয়ে নয়া আসা এক ঝাঁক মোসলমান সমাজের জন্য জুম্মার ঘর যখন দরকার হলো, গাঁয়ের জুম্মার ঘর বুড়িমার দানকরা জমিনে গড়ে উঠলো, বাদিয়াদের ঢাকে বোল উঠতো তারপর সন্ধ্যার ওয়াক্ত বাদে।

সে জুম্মার ঘরের বেড়া, টিন, বছর বছর মেরামতের খরচ, ইমাম সায়েবের পরিবারের ভরণপোষণ, ফজরের পরে মক্তব চালানোর হাদিয়া ইত্যাদি বাবদে দুইবিঘা ধানি জমিও বুড়িমার দান। এমনকি এই স্বাধীনের বছরেও ফজরের ওয়াক্তে জুম্মার ঘরে কমপক্ষে তিনজন মানুষ হাজির থাকতো। বুড়িমার বড় বেটা, বুড়িমার বড় ভাতিজা আর ইমাম সায়েব। স্বাধীন বাংলাদেশ হলো, বড় বেটার হাঁপানি ধরলো, জুম্মার ঘরে তারপর আর মানুষ পাওয়া যায় না। কোনোদিন ইমাম সায়েব একলা, তো কোনোদিন বুড়িমার ভাতিজা একলা! অবশ্য জুম্মাবারে জুম্মার ওয়াক্তে জুম্মার ঘর উপচে বাহিরেও কাতার সোজা করে মুসল্লিরা খাড়া হয়, এয়ছা সমাগম। তারপর স্বাধীন দ্যাশে একদিন আকাল পড়লো যখন, বুড়িমার বেটাদের ঘরে তখনও জাউভাত আর নুনের অভাব হয় নাই। কতো পড়শিই যে ভাতের মাড় নিয়ে যায় বুড়িমার বেটার বউদের হাঁড়ি থেকে, হিসেব নাই। লোকে বলে, সবই বুড়িমার নাকের উপরে বনে থাকা চিক চিক করা অস্টধাতুর নথের জন্যে।

বুড়িমার বড়বেটা মেট্রিক পাশ দিয়ে কৃষিকর্ম করে। তারবাদে সাইকেলে চড়ে ব্যাঙেরটারি মাদ্রাসায় বাংলা পড়াতে যায়। দশগাঁয়ে বিচার-আচারও করে। দশগাঁয়ে এইরূপ সহায় সম্মান নিয়েও তার হাঁপানির দোষ কাটে না। আর, বুড়িমার ছোট বেটার লেখাপড়া আরেকটু বেশি। শহরে তাই সে চাকরি করে সরকারি। জুম্মার ঘরে তাকে আশা করে না সমাজের লোকে। গাঁয়ের লোকে তাকে সায়েব বলে ডাকে।

ছোটবউ, বড়বউ, বড়র তরফের নাতি-নাতনি সমেত বুড়িমার বিরাট সংসারে মিলেমিশে একবাড়িতেই বসবাস ছিল। একবার ছোটবউ বাম পা দিয়ে হেঁশেলে খড়ি ঠেলে দিলে সে বাড়িতে হেঁশেল আরেকটা খোড়া হয়। এক বাড়িতে তখন দুই ‘খানা’ হয়ে যায়। এক সময় ছোটবউয়ের পক্ষে বাড়ি ভিন্ন হয়ে যায়। কেননা, কিছুদিন বাদে, দুই বেটার দুই বউ বুড়িমার কথা ভিন্নভাবে ভাবে। ছোটবউয়ের গভীর বিশ্বাস এই যে, বুড়ি খালি বড়বউয়ের সাথে ফাসুরফুসুর করে! বড় বেটার সংসারের দিকে ঝোঁক তার বেশি। ওদিকে, বড়বউ প্রবলভাবে সন্দেহ করে যে, বুড়ি রাতেই কেন ছোটবউয়ের পাকঘরের হেঁশেলের ধারে বসে খায়, দুপুরে কেন নয়, অতি অবশ্যই বুড়ি ছোটবউয়ের সাথে বুদ্ধি-পরামর্শ করে! ছোটবউ বুড়িকে হাত করে কিছু একটা জিতে নিতে চায় নিশ্চয়। সন্দেহ তাদের কারোরই দূর হয় না। কিন্তু কতদিন আর সন্দেহ বহন করা যায়—ভাবে ছোটবউ। বড়বউও মনে মনে বলে—দূরে থাকাই ভালো, সম্পর্ক তো টিকে থাকে, হিংসেহিংসি আর ভালো লাগে না। তাদের মধ্যে নিত্যদিনের বুবু ডাকাডাকি কমতে কমতে বন্ধ হয়ে যায়। ছোট বেটা আর বড় বেটার আঙিনা ভিন্ন করতেই হয় অবশেষে। আলাদা করে ঘর তুলতে হয়। ছোট বেটা মাসে একবার আসে, ছোটবউকে বলে—ঠিক আছে, বড় বাড়ির হাউকাউ ভালো লাগে না। অথচ ছোটবউও বছর বছর পোয়াতি হয়। তারও সংসার বড় হতে থাকে। হাউকাউ বাড়ে। বুড়িমা দেখেশুনে বলে,—‘দ্যাশে’ তো ছাপড়া ঘরই আছিল না, এখন দুই বাড়িই তো হামার, হামি বেজায় সুখি বেটিছোল! মনের সুখে বাদিয়াদের বড়িতে গিয়ে ঢাকের বাদ্য শুনতে বুড়িমার ভালো লাগে। সন্ধ্যার ওয়াক্তের বাদে বুড়িমা বাদিয়াদের ডেরার পাশে গিয়ে বসে ঢাকের বাদ্যি শোনে আর মাথা দোলায়। বাদিয়াদের বউঝিগুলো বুড়িমার ধারে বসে নানান গপ্পগুজব করে। বুড়িমা তাদেরকে বলে— তোমরা নিশিরাইতে ঢোল বাজাও খালি, সাঞ্জের কালে বাজাইলে হামরা এনা দেখে দেখে শুনবের পাইতাম। বাদিয়াদের বউঝিরা বলে—সাঞ্জের কালে আপনাগেরে মাগরেব হয়, তারপরে এষার ওয়াক্ত হয়, তারবাদে বাদিয়ারা ঢাকে বোল তোলে, কাসর বাজায়। বুড়িমা হাসে, বলে­—ও, ঠিকই তো করে তাহাইলে। অমাবশ্যার রাইতে তোমাগেরে বাড়িতে নিশিরাতে আসিমো, পান খাওয়াইও কইলাম। বাদিয়াদের সাথে এক বাটায় বুড়িমার পান খাওয়া দশগাঁয়ের লোকেরা বাড়াবাড়ি মনে করে। যদিও বুড়িমাকে তারা কিছু বলে না। বুড়িমার নাকের উপরে চিক চিক করতে থাকা অষ্টধাতুর নথ দেখে তাদের মনে সমিহ জাগে। তবু আড়ালে আবডালে নানান বলে বুড়িমাকে নিয়ে। সে কথা বুড়িমা জানে কি না তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। জানলেও বাছবিচার করে চলার মতো মানুষ বুড়িমা কোনোদিন হতে পারে নাই।

দেখতে দেখতে বড় বেটার ঘরের যারা নাতি নাতনি, সাবালক সগলেই তারা হয়ে ওঠে। নানান দেশে চলে যায় বেশি সুখি জীবনের জন্য—কেউ দিনাজপুর, কেউ মহিমাগঞ্জ, কেউ ইটাকুমারী, কেউ খালিশপুর, কেউবা চট্টগ্রাম। একবার দ্যাশান্তরি হবার বাদে গাঁও-গেরামে আর আসেই না বলা চলে। বুড়িমার তাতে দুনিয়া ফাঁকা ফাঁকা লাগে—মাঝেমধ্যে বলে সে কথা বড় বেটার ধারে বসে, ক্যামনে পারে গো, বুকে পাষাণ না বান্ধলে ক্যামনে থাকে এতখানি ভিনদ্যাশে! যেইখানে চেনা জনমানব নাই, যেইখানে নাকি অমাবশ্যার রাইতও উজালা থাকে কারেন্টের আলোয়। আন্ধার যারা দেখে না,তারা বোঝে নাকি দিনের আলোর মর্ম!

বুড়মা মরে পড়ে আছে আঙিনায়। বড়বউয়ের বিলাপে পড়শিদের ঘুম ভেঙে যায়। বড় বেটা থম মেরে ঘরে বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে থাকে। তার মাও, মানে বুড়িমা, ‘দ্যাশ’ কামলা খাটতো গেরস্থ লোকের বাড়ি। পাকিস্তান আমল আরম্ভ হবার পরেই ‘দ্যাশ’ ত্যাগ করে। দ্যাশের কামলা-জীবন ছেড়েছুঁড়ে দশগাঁয়ে বসত গড়ে। রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিন দিনের ঘাটাপথ পাড়ি দিয়ে যার যার বকনা বাছুর সাথে নিয়ে মহিমাগঞ্জ, বোনারপাড়ার উপর দিয়ে বুড়িমার সাথে দশগাঁয়ে এসেছিল সাত ঘর মানুষ। পয়লা পয়লা বছরে একবার দ্যাশে যাওয়া পড়তো রেলগড়িতে চড়ে। তারপর আস্তে আস্তে দশগাঁওয়ে কাজকাম থুয়ে দ্যাশে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। একবার দ্যাশান্তরি হবার বাদে আর ফেরা যায়ই না বলা চলে।

কিন্তু এই যে দশগাঁও হতে তিন মাইল দূরে ছেচাকান্দির হাট, সাড়ে তিনমাইল হাঁটাপথ পাড়ি দিলে যে ল্যাংড়াটানার হাট, আর পাঁচ মাইল পূবে বন্দনা নগর হাট—তামান হাটের নাড়ি-নক্ষত্র যৌবনকালে বুড়িমার হাতের তালুতে থাকতো। এক হাট থেকে শুকনো ধান কেনা, গুরুর গাড়িতে কিম্বা নাওয়ে করে বিল পাড়ি দিয়ে আনা, ঢেকিতে ভানা, ঝাড়াঝাড়ি করা; তারপরে গরুর গাড়ি কিংবা নাওয়ে চাউলের বস্তা তুলে নিয়ে বিলের ওপারে আরেক হাটে বেচে আসা পরের হাটবারে।

দেখতে দেখতে এমন হলো যে বুড়িমাকে আর হাটে হাটে যাওয়াও লাগে না। পাইকেররা ধান দিয়ে যায়। বুড়িমা সেগুলো জাত করে চাউল বানায়। পাইকেররা দশগাঁয়ে এসে চাউল নিয়ে যায়। বুড়িমার ঘর বড় হয়। বুড়িমার সংসার বড় হয়ে যায়। লোকে বলে—অষ্টধাতুর নথ তার কপাল খুলে দেয়। তবে বুড়িমার মরদ মানুষের মতো ঘাম ঝরানো এক সময় আর দরকার হয় না। কারণ বেটারা তদ্দিনে কামাই করা শেখে। বুড়িমাকে তারা আর মরদ মানুষের কাজ করতে দিতে রাজি হয় না।

বেটাদের বাপ মরে যায় পঁয়ষট্টি সালে। যখন বাদিয়াদের দুরা (কাছিম) আর খরা (খরগোশ) খাওয়া নিয়ে নাক সিটকাতে শুরু করে ভিনদ্যাশ থেকে উঠে এসে দশগাঁয়ে বসতি তৈরি করা মোসলমান সমাজ। বেটাদের বাপ মানুষটা কবিরাজি করতো। তার জন্য দশগাঁয়ের মানুষের বিশেষ ভক্তি ছিল মানুষটার প্রতি। মরণের হাত থেকে বেচে ওঠা মানুষেরা কবিরাজের নামে এক-দুই বিঘা জমি লিখে দিয়ে মনে শান্তিলাভ করতো। বলতো—উপরে আল্লাহুতালা, আর নিচে কবিরাজ। বুড়িমার ঘর আস্তে আস্তে গেরস্থ ঘরে পরিণত হয়, যদিও বিলের পানিতে ডুবেই থাকে মরণের হাত থেকে ফিরে আসা মানুষদের নজরানা দেওয়া সেইসব জমিজমা। তবে মাছুয়ারা মাছটাছ ধরে ডুবে থাকা সেইসব জমিনে, বুড়িমার বাড়িতে মাছের ভাগ বয়ে নিয়ে এসে দিয়ে যায়। একবার আচানক মরে গেল কবিরাজ, সাপের বিষ পানি করার ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য নিজেই নমুনা হতে গিয়ে নীল রঙ ধারণ করে মরে গেল বুড়িমার বেটাদের বাপ। ছোট বেটা বিশ মাইল দূরের লালবাগ টাউনে যখন বিএ কেলাসে, লজিং থাকে লালবাগ হাটের পশ্চিম ধারের এক বুজুর্গ লোকের বাড়িতে। মরার সময় বাপের সাথে ছোট বেটার দেখা হয় না। তাতে বুড়িমা দুঃখ পায়। কিন্তু কান্দে না। ধান-চাউলের কারবারে মরদের মতো লেগে যায়। বেটাদের বাপ মরে যাবার পরে বুড়িমা ধান কেনে, চাউল বানায়, হাটে হাটে বেচে. বেটাদের শিক্ষিত বানায়। সেই নিয়ে দশগাঁয়ের ভাটিয়া, উত্তুরিয়া সগলের কতো যে তিশকারি-তামাশা। উত্তুরিয়াদের মধ্যে বাদিয়ারা, মাছুয়ারা অবশ্য তিশকারি করে না। ভাটিয়ারা, মানে সেই সাত ঘর থেকে বিশ ঘর হয়ে ওঠা দ্যাশের লোকেরাই বুড়িমার মর্দাঙ্গি নিয়ে হাসাহাসি করে। তারা বলে যে, বুড়িমা মরদগুলোর চাইতেও বেশি মরদ। আরও বলে যে, পরকালের জন্য সুবিধাজনক স্বভাব বুড়িমার মধ্যে নাই। আবার দেখ, বেটাগুলাকে বাংলা পড়াইলো, ইংরেজি পড়াইলো, মোসলমান হবার বাদেও। শুনে বুড়িমা বলে, জাউরোগুলো কুকথা কয়া শান্তি পায় যদি সিডাওবা কম কি। তারা কি হামার বেটাগুলোর খোরাকি দেয়, হামার পিন্ধনের কাপড় দেয়! অতো শুনে হামার কাম কি! অবশ্য বুড়িমার সামনে এসে কেউ কোনদিন কটুকথা বলার সাহস করে নাই। বুড়িমার নাকের উপর চিক চিক করতে থাকা অষ্টধাতুর নথ দেখে তারা ভয় পায়।

তো, বেটাদের বাপ মরে যাবার পর থেকে আল্লার নাম নেওয়াই বুড়িমার একমাত্র কাজ হলো। তখন একটা জুম্মার ঘর করার চিন্তা বুড়িমার মাথায় খেলে যায়। বুড়িমার চাল-চলন নিয়ে দশগাঁয়ের মানুষ নাখোশ ছিল যারা, জুম্মার ঘর গাঁয়ে হবে জেনে তারাও খুশি হয়। বাড়ির বউরাও খুশি তাতে। সারাজীবন হিসাবকিতাব করে গায়ের ঘাম ঝরায়ে মরদের মতোন বেটাদের মানুষ করলেও লায়েক বেটাদের সংসারে বুড়িমা নাক গলায় না। বউঝিদের কোনো কাজেকামে খবরদারি করে না।

দিনকাল বয়ে যেতে থাকে। দেখতে দেখতে বিলের পানি তখন ভাটির দিকে নামতে থাকে। দশগাঁয়ের মানুষ হাটের লোকদের কাছে শোনে যে, অনেক উত্তরের দিকে ইন্ডিয়ার সরকার নদীর পানি আটকায়ে রাখার ফলে বিলের পানি উপচে উঠে আসে না আর বাড়ির ধারে। জমিগুলো তাই ঝরির মৌসুম পার হয়ে গেলে ভেসে ওঠে। তখন ধান হয় খুব। বুড়িমার সংসার আরও বড় হয়।

দশগাঁয়ের মধ্যে বুড়িমার দুই বেটার দুই বাড়িতেই বড় বড় ঘর। ছনের চালের বদলে চক চক করে নয়া টিনের চাল। কাচারি ঘর। গোয়াল ঘর। ভর-ভরন্ত সংসার। দুই বাড়িতেই বুড়িমা ঘোরে। স্থির থাকে না। গাঁয়ের সব লোকেরা পান খেতে আসে তার কাছে। পান মুখে দিয়ে তারা বলে, বুড়িমাগো, অমাবশ্যার রাতে গাঁয়ের কোণাকাঞ্চি দিয়ে হাঁটার সময় কি কি দ্যাখেন? বুড়িমা বলে—আন্ধার রাইতের চায়া ভালো ঘটনা দুনিয়ায় আর নাই! শুনে তারা মনে করে, বুড়িমার নাকের নথে বুজরুকি শক্তি আছে। তা না হলে অমাবশ্যার রাতে বেটিছোল হয়া একলা হাঁটতে পারা সোজা কথা নয়। ফলে, গাঁয়ের লোকেরা প্রসঙ্গ বদল করে। ফস করে জানতে চায়—ছোটবউ ভিন্ন হয়া গেল, বুড়িমা, কেমন কথা? বুড়িমা বলে—মানুষ কদ্দিন আর একসাথে থাকে, বাহে? আস্তে আস্তে একজনের কাছ থেকে আরেকজন ভিন্ন হতে হতে এক সময় মানুষ মরে যায়, বুজিছো তো? ধরো, হামিও তো আলাম এই বিল-জঙ্গলের দ্যাশে, দ্যাশত্যাগ করে। আর তো পাল্লাম না ফিরতে। আর তোমরা কও একবাড়ি ভাঙে দুই বাড়ি হবার কথা! শুনে নিন্দুকদের মুখে কথা ফুটতে পারে না। তবু কেউ উসকে দিত চায়, বলে— তাহলে নাতিদের কথা কয়া আফসোস করেন ক্যানে? বুড়িমা বলে—করি, কত কি মনে হয়! ফাঁপর লাগে। শুনে তারা দূরে গিয়ে বলে, ‘শালার কি বুড়ি! দশটা বেটাছোলের সমান! আজকালকার বউ-বেটিগুলো পারবিনে। কি কও? মরদগুলোরও এতখানি বল নাই। কিন্তু যাই কও, বেটিছোলোর পক্ষে এইসব কারবার ভালো লয়।’ কেন যে ভালো ‘লয়’ সে কথা কেউ অবশ্য ঠিক করে বলতে পারে না। তারা বলে—হামরা কি আর ধানের ভাত খাইনে! হো। হামরা জানি, ভালো লয়, যা-ই কও তোমরা!

কিন্তু বুড়িমার দানের জুম্মার ঘরে বেটারা যে যায় না, সেইটা গাঁয়ের মোসলমান সমাজের কাছে সমস্যাজনক ব্যাপার মনে হয়। এক বেটা শহরে চাকরি করে। গাঁয়ে সে কুটুম হয়েই আসে এক প্রকার। আরেক বেটার হাঁপানি, ঘরের মধ্যে শুয়ে শুয়ে নিশিরাইতে থিরি ব্যান্ডের রেডিওতে নাটক শোনে, সোনাভানের কিতাব পড়ে হারিকেন জ্বালায়া, আর কাশে। তারপর, দেখ, ফজরের ওয়াক্তে ঘুমায়। দীনের এলেম নাই! পরকালের চিন্তা নাই। যাত্রাদলের পেলেয়ারদের মতোন তাদের স্বভাব। আর তার ফল দেখো, তাদের মাও গায়ে পোকা ধরা কুত্তার মতো একলা মরে পড়ে থাকলো অমাবশ্যার রাতে। মরার সময় মুখে এক ফোঁটা পানি পায় নাই পর্যন্ত। তারপর অমাবশ্যার রাত পোহালো। হাজার পাখির কিচিরমিচিরে ভরে উঠলো বুড়িমার বাঁশের থোপ, আমের গাছ, বড়ই গাছ, গুয়ার বাগিচা, জুম্মার ঘরের টিনের চাল। সারাটা জীবন পাখির ডাকের আগেই বুড়িমা জেগে উঠতো। পাখিদের ডাকাডাকির মধ্যেও বুড়িমা আর জাগলো না। দশগাঁয়ের মানুষ জড় হলো। বিপন্ন, ব্যাকুল ভাব নিয়ে। আকুলি-বিকুলি করে মাটিতে লুটায়ে ছোটবউ বুড়িমার কতো কথা, ঘটনা, বিবরণ প্রচার করতে লাগলো, বুকভাঙা প্রলম্বিত সুরে, বড়বউয়ের হাত ধরে! গাঁয়ের বুবুরা ধমক দিলো, ‘মুর্দার কানের কাছে কান্দা না যায়। দোয়া করেন। কোরান তেলাওয়াতে বসেন।’ তাতে ছোটবউয়ের বিলাপ আরও বড় হলো। গাঁয়ের বুবুরাও কান্দতে কান্দতে চোখ লাল করে ফেললো। বাদিয়ারাও এসে দূরে খাড়া হয়ে চোখের জল ফেলতে লাগলো। পুবদিকে বেলা উঠলো বুড়িমার বড় লাল মাটির সানকির সমান। বুড়িমাকে তুলে কলের পাড়ে নিয়ে যাওয়া হলো। গোসল করানো হলো। বড় বেটার রঙচটা বেরেকভাঙা সাইকেল নিয়ে বুড়িমার জুম্মার ঘরের ইমাম গেল বন্দনা নগর হাটে। কাফনের বাপড় আনলো। সাদা। অথচ বেটাদের বাপ মরে যাবার পরও বুড়িমা যে সাদা শাড়ি পরতো না, তা নিয়ে নানান ফাসুর-ফুসুর আছে মোসলমান সমাজে। নাকের নথটাও একদিনের জন্যও খোলে নাই বুড়িমা। দেখ, তারও কাফনের কাপড় সাদা।

ছোটবউয়ের তখন মনে হলো, প্রত্যেক অমাবশ্যার আগে, সবাই বুড়িমাকে বলতো, ‘ঘরেই থাকিয়েন। অমাবশ্যার রাইতে কতকিছু হয়! বয়স হইছে তো! বাড়ায়েন না বাইরে।’ সবাই জানতো, বুড়িমার নাকে যে নথ ছিল অষ্টধাতুতে গড়া, তার জন্যই অমাবশ্যার অপচ্ছায়া তার ধারেকাছে ঘেঁষতে পারতো না। তারপরও বুড়িমা যে মরে গেল, তাতে গাঁয়ের লোকেরা ভয় পেলো। অসুখ-বিসুখ কিছু তার ছিল না। অপঘাত ছাড়া এ আর অন্য কিছু নয়।

বেলা ওঠার পরে দেখা গেল বাঁশের পাতা, জামের পাতা, খোকসার পাতা, আমের পাতা চতুর্দিকে পড়ে আছে মাটিতে। চৈতালি হাওয়া বইলো বিহানের রোদের নিচ দিয়ে। পড়ে থাকা ঝরাপাতাগুলো মাটির ওপরে সামান্য ওলোটপালট করে নড়ে উঠলো। অন্যদিন হলে পাতা ঝাট দিয়ে ঘরে ঘরে তুলতো গাঁয়ের বউঝিরা, চুলায় পুড়িয়ে ছাই করার জন্য। কিন্তু সেই বিহানে ঝাটা হাতে কেউ নামে নাই পাতার পালা পাকঘরে নিয়ে যাবার জন্য। বুড়িমার গোয়াল ঘরের উপরে উঠে যাওয়া জামগাছে, কদম গাছে, নিমগাছে, বড়ই গাছে, আতা গাছে, গাব গাছে ছোট ছোট পাখি হৈ হৈ করতে করতে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছিল। তারা নানান দিকে ওড়ে, ডালে বসে, পাতার আড়ালে যায়, আবার ওড়ে। বিহানের তাজা বেলা উপরের আকাশের দিকে উঠতে উঠতে কড়া রোদ ছড়ায়। ছোটবউ আস্তে আস্তে উঠে বড়বউয়ের কানের কাছে গিয়ে বলে, নথটা খুলে নিছিলেন তো? বড়বউ জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলে, হায় হায় আল্লাহু, মনে তো নাই! তারপর তারা দুই বউ একসাথে কেঁদে উঠলো। তারা তখন আরেকবার বুড়িমার মুখটা দেখতে চাইলো। কুয়ার পাড়ে গিয়ে কাফনের কাপড় একটু খুলে দেখে নিলো। নাহ! নথ তো নাই! মুর্দা গোসল করানোর সময় কেউ কি খুলে নিল! মুর্দার অঙ্গ থেকে অলঙ্কার চুরি করে নেওয়ার এরকম সাহস তো কারো পাবার কথা নয়। কুয়ার পাড় ভরে আছে আতর, লোবান, আগরবাতির সুবাসে। পশ্চিমের বাঁশ বাগানে গোর খনন সম্পন্ন হলো। ছোটবেটা পৌঁছালে জানাজা হবে। ইমাম সায়েব বললো—গরম দেখিছ তোমরা? মুর্দা বেশিক্ষণ মাটির ওপরে শোয়ায়ে রাখা ঠিক হবিনে। বুড়িমার বড়বেটা কাশতে কাশতে বললো—ছোট এই আইলো বলে। আল্লাহু মাফ করবে ইটুকু। ছোটবউ ভাবতে লাগলো—তাহলে কি বড়বউ তার কাছে আসল ঘটনা গোপন করে রাখলো!

দেখতে দেখতে জোহরের ওয়াক্ত হলো। বুড়িমার সায়েব বেটা আসতেই ইমাম সায়েব বললো, প্যাটের ছাওয়ালেরা উপস্থিত আছে, আর দেরি করা না যায়। যারা আসে নাই, তারা তিনদিন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে উপস্থিত হয়ে গোরে মাটি দিলে আল্লাহু কবুল করি নিবে। বুড়িমার জুম্মার ঘরে বড় জামাতে জোহরের নামাজ হলো। তারবাদে জানাজায় খাড়া হলো একশ একজন মানুষ। বুড়িমাকে জুম্মার ঘরের দক্ষিণের বিরাট বাঁশঝারের নিচে কব্বরে শোয়ায়ে দেওয়া হলো। বিসমিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসুলিল্লাহ। আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়া ছাব্বাতহু। কব্বরের ওপরের মাটি গোছায়ে দিয়ে সেইখানে খেজুরের ডাল পুঁতে দেওয়া শেষ হলো। বুড়িমার বড় বেটা কাশতে কাশতে বললো, নেও, ইমাম সায়েব, হামার মায়ের জন্য মোনাজাত ধরো। ইমাম সায়েব চুপ করে থাকে। বড় বেটা আবার কেশে বলে, সন্তান হিসেবে হামিই কি মোনাজাত ধরিমো? কি কন আপনেরা সগলে? ইমামের শুকনো চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, বলে, আচায্য কথা কইলেন আপনে, ভাই। উত্তুরিয়াদের সাথে মেলামেশা কত্তে কত্তে আপনে দেখি হানাফি হয়া গেছেন। হামাকে দিয়ে বিদআত কাম করায়ে নিতে চান। জানেন না, হামাদের মোহাম্মদি জামাতে মোনাজাত নাই! তা জানবেন কুনখান থিকে, আপনে তো পড়েন সোনাভানের পুঁথি, সহি হাদিসে মন নাই! মায়ের বানানো জুম্মার ঘরে ফজরের ওয়াক্তে হাজিরানা দেন না পয্যন্ত। সে কথা শুনে বড় বেটার কাশি বন্ধ হয়ে গেল। বললো সে—হামারই মায়ের বানানি জুম্মার ঘরের ইমাম হয়া তুমি মুর্দার নাজাতের মোনাজাতকে বিদআত কইলা! ইমাম সায়েব খানিক ক্ষণ চুপ করেই রইলেন। তারপর দশগাঁওবাসীর উদ্দেশে ফরমাইলেন, ‘হাজেরানে মুসল্লি ভাইসব, হামি একঝন ইমাম মানুষ। আপনাদের খেদমতের উসিলায় হামার জীবনের যাবতীয় নিবেদন। এতকাল ধুম মারি থাকিছি। আজ এই পবিত্র কব্বরের নিকটে খাড়া হয়া এইরূপ জবান শোনার বাদে আপনাদের জুম্মার ঘরের খাদেমি হামার পক্ষে সম্ভব লয়। ইমামের কথার উপর যে সমাজ কথা কয়, সেই সমাজের জুম্মার ঘরে হামি আর কোন মুখে থাকিমো!’ তখন বাঁশঝারের শেষ মাথায় অবস্থিত আকাশের সমান উঁচু শিমুল গাছের উপর থেকে কোকিলের ডাক ছড়ায়ে পড়ে। বুড়িমার বড় বেটা বলে, এই আকালের বছরে হামাদের ভাতের মাড় দশগাঁয়ের কতো লোকই তো খাইলেন, আর আপনাগেরে বুড়িমার জন্যে মোনাজাত না করিবেন! দশগাঁয়ের মানুষেরা মাথা নিচু করে বুড়িমার কব্বর পেছনে রেখে বুড়িমার ভাতিজার বহিরাঙ্গনে খাড়া হয়ে ইমাম সায়েবকে ঘিরে জটলা তৈরি করলো। একজন বললো—বেটিছোলের দান করা জুম্মার ঘরে নামাজ হয় কি না হামাদের সন্দেহ আছে। আরেকজন বললো—হামরা তো একই দ্যাশে আছিলাম, জানি, বুড়িমার বিবাহের পরে তার বেটার বাপে হিন্দু থাকি মোসলমান হইছিলেন। অন্য একজন বললো—বুড়িমার চালচলনে হিন্দুয়ানির ছাপ আছিল। বাদিয়া বাড়িতে যায়া তাদের সাথে এক বাটায় পান খাইতেন। ঢোলের বোলের সাথে নাচতেও তার বাধে নাই। বাদিয়া বউঝিরা বুড়িমার পাকঘরে বসে তরকারি কুটে দিতো। দেখেন নাই, বেটিছোল হয়া হাটে-ঘাটে যাইতেন? ছতরের হেফাজতে মন আছিল না বুড়িমার। তার প্যাটের বেটাগুলো তো জুম্মার ঘরের সম্মান করে না। আর তার ছোট বেটা বউ-বাচ্চা বাড়িতে থুয়ে শহরে একেলা থাকে। শহরের মানুষের স্বভাব চরিত্র শুনছি বিধর্মীদের মতো। মাটিতে ধপাস ধপাস করে পাও ফেলেয়া হাটে। বুড়িমার বেটার বাপে কবিরাজি না জানলে তার কি এমন দাম আছিল হামাদের কাছে! তার বাপেরা-দাদারা চণ্ডাল আছিল বাবা হে! দ্যাশের লোকেরা সে কথা সগলেই জানেন। বুড়িমার দানের জুম্মার ঘরে হামরা আর যাব না! হামরা আরেক জুম্মার ঘর বানাবো। সহি মোহাম্মদি যারা আছেন, হাত বাড়ায়া দিবেন। বড় বেটা হাতের মুঠো শক্ত করে থর থর করে কেঁপে ওঠে। বুড়িমার ছোট বেটা বড় ভাইকে বলে, ভাই, একটা কথারও দরকার নাই। চলেন, বাড়ির ভেতরে চলেন।

বড় বেটার দুই হাতের মৃদু কম্পন থামতে চায় না, চোখ তুলে ছোট ভাইয়ের দিকে একবার তাকায় না পর্যন্ত। তখন ছোটবউ স্বামীর হাত ধরে কিছুটা সরিয়ে নিয়ে ফিস ফিস বলে, শুনছেন নাকি, মায়ের অষ্টধাতুর নথটা তো হারায়া গেছে, হামার মনে হয় বড়বউ খুলে নিয়ে গোপন করিয়্যা রাখছে! ছোট বেটার মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে। তখন চৈত্রের দুপুরের উত্তাপ কিছুটা নরম হয়ে আসে। বড়বউ ফোলা ফোলা চোখ নিয়ে এগিয়ে এসে ছোটবউকে বলে, তুমি মনে কয় হামাকে সন্দেহ করতিছ, তাই লয়? অথচ হামি কিন্তুক একবারও কই নাই যে রাইতে তো তোমার পাকঘরেই তিনি খাইতেন। হামি একবারও কই নাই তো যে তুমিই তাকে ফুসলায়া অষ্টধাতুর নথকোনা চায়া নিছেন। শুনে ছোটবউ ডুকরে কেঁদে ওঠে, বলে, কইতে পাল্লেন, বড় বু, এই কথা কইতে পাল্লেন!

বুড়িমার হারিয়ে যাওয়া নথের খবর দশগাঁয়ে ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগে না। বউঝিরা বলাবলি করতে শুরু করে, শুনিছেন তোমরা? তাই তো কই, কথা নাই বারতা নাই বুড়িমা মরে গেল অমাবশ্যার রাতে! হায় গো আল্লাহুতালা। তখন চৈত্রের বেলা লাল হয়ে ক্রমে নিভে আসে। ছোট বেটা মাথা নিচু করে বড় ভাইয়ের ধারে বসে বলে, ভাই, মায়ের কব্বরটা দেখেশুনে রাখিয়েন। কালকেই হামি তাদের শহরে নিয়ে যাবার চাই। দশগাঁয়ে আর হামার বউছোল থুয়ে যাইতে চাই না। বড় বেটা মাটির দিকে তাকায়ে থেকে বলে—যা। আর কিন্তু ফিরিসনে। একবার দ্যাশান্তরি হবার বাদে আর ফেরা যায়ই না বলা চলে।

দশগাঁয়ের গাছপালা, বাঁশঝারের উপরে হাজারও পাখি কিচির মিচির করে। সন্ধ্যা নামে। তালগাছ আর আর খেজুর গাছের মাথায় বাবুইয়ের বাসাগুলোর ভেতরে ছানাপোনা নিয়ে বাবুইগুলোকে ফুরুৎ করে ঢুকে পড়ে। ভ্যাপসা গরম ওঠে মাটি থেকে ভাপের মতো। বুড়িমার বড় বেটা উঠে বুড়িমার জুম্মার ঘরের সামনে গিয়ে চিৎকার করে আজান দেয়। একবারও কাশে না।

অলংকরণ রাজিব রায়