পদ্মা সেতুতে প্রধানমন্ত্রী

।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিলো ‘দিনবদলের সনদ’। সেখানেই প্রতিশ্রুতি ছিলো দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে এগিয়ে নিতে পদ্মা সেতু নির্মাণের। সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজও শুরু হয়। কিন্তু হোঁচট খেতে হয় বিশ্বব্যাংকের তোলা দুর্নীতির অভিযোগের কারণে। পরবর্তীতে কানাডার আদালতে বিশ্বব্যাংকের এই অভিযোগ ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। ততদিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্তে এগিয়ে যেতে শুরু করেছেন। দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র আর প্রকৌশলগত নানা চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করলেন স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

পদ্ম সেতু নির্মাণে বাধা-বিপত্তির জন্য সরকারের তরফ থেকে আগাগোড়াই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকে দায়ী করা হয়। এক্ষেত্রে বেশি দোষারোপ করা হয়েছে দাতাসংস্থা বিশ্বব্যাংক ও একে ঘিরে থাকা পশ্চিমা বিশ্বকে।

এছাড়া দেশীয় একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগ আসে। বিশেষ করে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূসকে এ জন্য দায়ী করা হয়।

অভিযোগ করা হয়, অবৈধভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের পদে থাকতে না পেরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি খোলাসাও করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রথম মেয়াদে ১৯৯৮ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই হয়। ২০০১ সালে জাপানিদের সহায়তায় পুনরায় সম্ভাবত্য যাচাই হয়।

স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া পয়েন্টে পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন শেখ হাসিনা।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার শপথ নিয়েই নতুন করে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ হাতে নেয়। ২০০৯ সালের ১৯ জুন সেতুর নকশা প্রণয়নের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয়। ২৯ জুন পরামর্শকের সঙ্গে চুক্তি হয়।

সেতুর কাজ ২০১৩ সালের মধ্যে শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয় তখন। ২০১০ সালে প্রিকোয়ালিফিকেশন দরপত্র আহ্বান করা হয়। তখন অর্থায়নে আগ্রহ দেখায় বিশ্বব্যাংক। সেইসঙ্গে সহযোগী হতে চায় এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও জাইকা।

২৯০ কোটি ডলার ব্যয়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই করে সরকার। এরপর ওই বছরের ১৮ মে জাইকা (৪০ কোটি ডলার), ২৪ মে আইডিবি (১৪ কোটি ডলার) এবং ৬ জুন এডিবির (৬২ কোটি ডলার) সঙ্গে ঋণচুক্তি সই হয়।

এরই মধ্যে শুরু হয় ষড়যন্ত্র। কোনও ধরনের অর্থ ছাড়ের আগেই বিশ্ব ব্যাংক থেকে আনা হয় কথিত দুর্নীতির অভিযোগ। ওই বছরের (২০১১) সেপ্টেম্বরে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন স্থগিত করে। সেই পথ অনুসরণ করে অন্য দাতা সংস্থাও।

ঋণ পুনর্বিবেচনার জন্য দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াসহ চারটি শর্ত জুড়ে দেয় এই উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানটি। এ সময় দুই দফায় বিশ্বব্যাংক তাদের কথিত দুর্নীতির কিছু ‘তথ্য-প্রমাণ’ও বাংলাদেশকে দেয়।

সরকারের তরফ থেকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে দেন-দরবার চলতে থাকে। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও যোগাযোগ সচিবকে সরিয়ে দেওয়াসহ কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপও সরকার এ সময় নেয়।

কিন্তু বিশ্বব্যাংকের দৃষ্টিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে এ পদক্ষেপ ‘সন্তোষজনক’ ছিল না। তারা প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়াসহ নতুন নতুন চাপ দিতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাংক ২০১২ সালের ২৯ জুন ঋণচুক্তি বাতিল করে।

এর তিন দিনের মাথায় ২ জুলাই সংসদে ৩০০ বিধিতে বক্তব্য দিয়ে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল নিয়ে সংসদে কথা বলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী প্রয়াত আবুল মাল আবদুল মুহিত। ঋণচুক্তি বাতিল করে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া বক্তব্য বাংলাদেশকে অপমান করেছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি তখন বলেন, ‘আমি জোর গলায় বলতে পারি, পদ্মা সেতু প্রকল্পে কোথাও কোনও অপচয় বা দুর্নীতি হয়নি।’ এ সময় বিশ্বব্যাংক বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন মুহিত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সংসদে দেওয়া বক্তব্যে পদ্মা সেতুর দুর্নীতির অভিযোগ নাকচ করে দেন এবং নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। এসময় তিনি বাংলাদেশি ও প্রবাসীদের সেতু নির্মাণে সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকে এগিয়েও আসেন। শুরু হয় অর্থ সংগ্রহ। জুলাইয়ের শেষ দিকে মন্ত্রিসভার বৈঠকে পদ্মা সেতুর অর্থ সংগ্রহে প্রতিটি তফসিলি ব্যাংকে দুটি করে ব্যাংক হিসাব খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মন্ত্রিসভার বৈঠকে সকল মন্ত্রী তাদের এক মাসের সম্মানি পদ্মা সেতু ফান্ডে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অর্ধ শতাধিক সচিবও তাদের একটি উৎসব ভাতার সমপরিমাণ অর্থ ফান্ডে জমা দেন।

তবে, এসবের মধ্যেও বিশ্বব্যাংককে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালাতে থাকেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী। যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের পদত্যাগ, দুর্নীতির অভিযোগ দুদকের মাধ্যমে অধিকতর তদন্তসহ বিশ্বব্যাংকের শর্তপূরণের চেষ্টা করা হয়। বিশ্বব্যাংকের ফিরে আসার পথে আটকে থাকে অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে ছুটিতে পাঠানোর বিষয়টি। শেষ পর্যন্ত তাকে ছুটিতে পাঠানোর শর্তে সরকার রাজি হলে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাংক আবারও ফিরে আসার ঘোষণা দেয়।

তবে বাধ সাধেন অর্থ উপদেষ্টা ড. মসিউর। দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে তিনি ছুটিতে যেতে অস্বীকার করেন। নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন। তাকে রেখেই সমঝোতার চেষ্টা হয়।

বিশ্বব্যাংকের দেওয়া শর্তানুসারে সেতুর পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করে দুদক। ওই সময় বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদলও একাধিকবার ঢাকায় এসে দুদকের সঙ্গে বৈঠক করে। নতুন নতুন শর্তারোপ হতে থাকে এসব বৈঠকে।

বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে দেন-দরবারের পাশাপাশি সরকার বিকল্প অর্থায়নের প্রচেষ্টা শুরু করে। নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের উদ্যোগের কথাও এ সময় জোরেসোরে আলোচনা হতে থাকে।

বিশ্বব্যাংকের এই টালবাহানায় ক্ষুব্ধ হয়ে ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি বিশ্বব্যাংককে এক সপ্তাহের আলটিমেটাম দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ওই মাসের মধ্যে বিশ্বব্যাংক তাদের অবস্থান স্পষ্ট না করলে সরকার তাদের কাছ থেকে কোনও ঋণ নেবে না। পরে ৩১ জানুয়ারি অর্থায়নের অনুরোধ প্রত্যাহার করে বিশ্বব্যাংককে চিঠি দেয় সরকার।

পরে মালয়েশিয়া, চীনসহ কয়েকটি দেশ অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়। তবে তাদের প্রস্তাব দেশের জন্য সাশ্রয়ী না হওয়ায় সরকার নিজস্ব অর্থায়নেই অটল থাকে।

পরবর্তী অর্থবছরের (২০১৩-১৪) বাজেটে পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য ছয় হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্য দিয়ে সেতু নির্মাণের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।

এদিকে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন বাতিল হওয়ার পেছনে ড. ইউনূসের হাত ছিল বলে সরকারের পক্ষ থেকে বার বার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার ড. ইউনূসের নাম উল্লেখ করে বলেছেন, পদ্মা সেতু ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আমাদের দেশের একজন নোবেলজয়ী জড়িত। ব্যাংকের এমডি পদে থাকতে না পেরে তিনি এই ষড়যন্ত্র করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনসহ কয়েকটি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোনও করেছিলেন বলে তিনি জানান।

পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন না করতে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিও নানা অপতৎপরতা চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তারা বিশ্বব্যাংকের এ দেশীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঋণচুক্তি পুনর্বিবেচনা না করার তদবির করেছে বলে সরকারি দলের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দেশের কিছু বিশেষজ্ঞও নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগকে অলীক-কল্পনা বলেন।

পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ করলেও কানাডার আদালতে কোনও প্রমাণ দিতে পারেনি বিশ্বব্যাংক। ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে কানাডার আদালত জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের যে অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ঋণ বাতিল করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কানাডার আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, সততার শক্তি ছিল বলেই বিশ্বব্যাংকের ওই অভিযোগকে তিনি চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এতকাল পরে আজ তারা স্বীকার করেছে, কোর্ট বলে দিয়েছে; এখানে তো কোনও দুর্নীতি হয়নি, বরং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যে অভিযোগ করেছে, তা ভুয়া, মিথ্যা ও আষাঢ়ে গল্প।’

এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদা অনেক বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।