।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

আয় ও ব্যয় সমপরিমাণ ধরে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের (রাসিক) ২০২২-২৩ অর্থবছরের ১ হাজার ৭ কোটি ১৯ লক্ষ ৬৯ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় নগর ভবনের সিটি হলরুমে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাজেট ঘোষণা দেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের অর্থ ও সংস্থাপন স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন। এরআগে সকালে সিটি কর্পোরেশনের বিশেষ সাধারণ সভায় ২০২১-২০২২ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ও ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন হয়।

সংবাদ সম্মেনের শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের শহীদ সদস্যবৃন্দ, জাতীয় চার নেতা শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ, শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও শহীদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন রাসিক মেয়র।

সংবাদ সম্মেলনে রাসিক মেয়র লিটন বলেন, ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০৮০ কোটি ২২ লক্ষ ৮৯ হাজার ৫৩৬ টাকা ১৭ পয়সা মাত্র। সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়িয়েছে ৭৬৯ কোটি ০২ লক্ষ ৯৪ হাজার ৭৪৪ টাকা ৩৬ পয়সা মাত্র। বাজেট বাস্তবায়নের হার ৭১% এর বেশি। যা ইতোপূর্বে কখনও হয়নি। এদিকে আয় ও ব্যয় সমপরিমাণ ধরে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭ কোটি ১৯ লক্ষ ৬৯ হাজার ৩২৩ টাকা ১০ পয়সা মাত্র।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও রাসিক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে আমি ও আমার পরিষদ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিসমূহ বাস্তবায়ন এবং রাজশাহীকে সবুজ, পরিচ্ছন্ন, আধুনিক, উন্নত, বাসযোগ্য ও মডেল মহানগরী হিসেবে গড়ে তুলতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। বিগত চার বছর নিরলস পরিশ্রম করে রাজশাহী মহানগরীকে পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য নগরীরূপে গড়ে তোলার স্বীকৃতিস্বরূপ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনকে পরিবেশ পদক-২০২১ প্রদান করে পুরস্কৃত করেছেন। এ গৌরব সমগ্র মহানগরবাসীর। আমি ইতোমধ্যে পদকটি প্রিয় রাজশাহীবাসীকে উৎসর্গ করেছি।

নগরীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে মেয়র বলেন, ১৬৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে আলুপট্টি মোড় হতে তালাইমারী মোড় পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার সড়ক চারলেন সড়কে উন্নীত, ১৮৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বিমান চত্বর হতে বিহাস পর্যন্ত ৬.৭৯৩ কিলোমিটার ফোরলেন সংযোগ সড়ক, ১২৬ কোটি ৩৯ লাখ ব্যয়ে উপশহর মোড় হতে মালোপাড়া, রাণীবাজার মোড় হয়ে সাগরপাড়া বটতলা মোড় পর্যন্ত সড়ক, নগরীর বিলসিমলা থেকে কাশিয়াডাঙ্গা সড়ক ফোরলেনে উন্নীত করা হয়েছে। সড়কটির উভয় পাশে দৃষ্টিনন্দন ফুটপাথ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। দৃষ্টিনন্দন সড়ক বাতি স্থাপন করা হয়েছে। সড়কের আইল্যান্ডে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে সৌন্দর্য্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্থ বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর সরণি সড়কটির রক্ষণাবেক্ষণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়াও প্রকল্পের আওতায় ৩৬.৮১ কিলোমিটার নতুন সড়ক, রাস্তা সংস্কার ৫৮.৬৯ কি.মি. ড্রেন ৩৩.৬০ কি.মি এবং ফুটপাত ১২.৪৩ কি.মি কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়াও সড়কসমূহে দৃষ্টিনন্দন সড়ক বাতি স্থাপন করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পের ব্যাপারে রাসিক মেয়র লিটন বলেন, ৩০ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে শহীদ এ.এইচ.এম কামারুজ্জামান এঁর সমাধিসৌধ নির্মাণ প্রকল্প, ১২০৯ কোটি ১৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নগরীর ২২টি জলাশয়সমূহকে সম্ভাব্য ভরাট রোধকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ উন্নয়ন ও ১৪৬৫ কোটি ১৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ‘রাজশাহী মহানগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্প সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। প্রকল্পটি তিনটি অনুমোদনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

বিভিন্ন উন্নয়ন ও জনকল্যানমুখী কার্যক্রম তুলে ধরে রাসিক মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, রাজশাহীতে সিআরপি প্রতিষ্ঠায় ১৫ বিঘা জমিদান, পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, সিটি হাসপাতাল চালু, প্রশস্তকৃত সড়ক আলোকায়ন, যানজট কমাতে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল কার্যক্রম, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে উন্নয়ন,  পিপিপির মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ, বিরতিহীন বনলতা ট্রেন চালু করা হয়েছে। এছাড়া ড্রেজিংও মাধ্যমে ভারতের মুর্শিবাদের ধূলিয়ান থেকে রাজশাহী হয়ে পাবনার ঈশ্বরদী পর্যন্ত নৌরুট চালু ও নৌবন্দর প্রতিষ্ঠা, রাজশাহী-আব্দুলপুর রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত এবং শাহ মখদুম বিমানবন্দর সম্প্রসারণ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে রাসিক মেয়র বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাজশাহীতে তিনটি শিল্পাঞ্চল অনুমোদন দিয়েছেন। এরমধ্যে বিসিক কর্তৃক বিসিক শিল্পনগরী-২ বাস্তবায়ন শেষ পর্যায়ে। এখানে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের প্লট বরাদ্দ দেয়া হবে। প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে সেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক জোন ও চামড়া শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠা করতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দেশের বড় বড় শিল্প গ্রুপকে রাজশাহীতে বিনিয়োগে তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা চলছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হাইটেক পার্ক পুরোপুরি চালু হলে সেখানে ১৪ হাজারের অধিক তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান হবে। এছাড়া রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বিকেএসপি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং প্রকল্পের পাশ্র্ববর্তী এলাকাসমূহে নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে শহর আরো বিকশিত ও কর্মমুখর হবে।

শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়নের ব্যাপারে মেয়র বলেন, শিক্ষানগরী রাজশাহীতে নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ১৮৬৭ কোটি টাকার রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদিত হয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হবে বাংলাদেশের মধ্যে ১ম পুর্নাঙ্গ পরিকল্পিত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহীস্থ বড়বনগ্রাম, বাজে সিলিন্দা ও বাড়ইপাড়া মৌজায় ৬৮ একর জায়গার উপর রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষানগরী রাজশাহী আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

প্রস্তাবিত বাজেটের বৈশিষ্টগুলো উল্লেখ্য করে রাসিক মেয়র বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট সম্পূর্ণ উন্নয়নমুখী। আগামী অর্থবছরে প্রায় আটশত কোটি টাকা উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন হবে। এ বাজেটে নতুন কোন বর্ধিত কর আরোপ করা হয়নি। বকেয়া পৌরকর আদায়, নবনির্মিত সকল স্থাপনার উপর প্রচলিত নিয়মে কর ধার্য্য এবং নিজস্ব আয়ের উৎস সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্পোরেশনের আয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। শহরের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়নে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। শহরের সড়ক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বাজেটে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের উপর এ বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ বাজেটে নাগরিক সেবা সম্প্রসারণ ও সেবার মান উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, পার্ক, ধর্মীয় উপাসনালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন এবং আরসিসি’র বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তির আওতায় আনা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করার উপর গুরুত্ব  দেয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন অর্থ ও সংস্থাপন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ২২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল হামিদ সরকার টেকন, প্যানেল মেয়র-২ রজব আলী, প্যানেল মেয়র-৩ তাহেরা খাতুন মিলি, সচিব মশিউর রহমান, বাজেট কাম হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম খান, প্রধান প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম।