।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

সত্তরের দশক থেকে রাজশাহীতে ঠিকাদারি ও ট্রেডিং ব্যবসা থেকে যাত্রা শুরু হয় আমান গ্রুপের। গ্রুপটি বড় পরিসরে ব্যবসা শুরু করার সুযোগ পায় ১৯৮৪ সালে ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে। কয়েক দশকের মধ্যে গ্রুপটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসায়িক গ্রুপে পরিণত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক ঘটনায় দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে আমান গ্রুপ। পাশাপাশি পুঁজিবাজারেও চাতুরির অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সূত্রে জানা যায়, দেশের পুঁজিবাজারে আমান গ্রুপের তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত। এগুলো হলো আমান কটন ফাইব্রার্স লিমিটেড, আমান ফিড লিমিটেড ও আমান সিমেন্ট। দেশে ৪২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে আমান গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা।

পুঁজিবাজারে আমান গ্রুপের নিবন্ধিত বিবিধ খাতের প্রতিষ্ঠান আমান ফিড লিমিটেড নিয়ে কারসাজির অভিযোগ প্রথম আলোচনায় আসে ২০১৯ সালে। এর আগে ২০১৫ সালে আমান ফিড আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে ৭০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। আইপিওতে  ২৬ টাকা প্রিমিয়ামসহ ৩৬ টাকা দরে শেয়ার বিক্রি করা হয় বিনিয়োগকারীদের কাছে। অভিযোগ রয়েছে, উচ্চ প্রিমিয়াম আওয়ার জন্য আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানির মুনাফা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতি শেয়ারের আয় (ইপিএস) দেখানো হয় ৪ টাকা ৯৭ পয়সা। আইপিওর পর থেকেই মুনাফার বুদ্বুদ ফেটে যায়। মাত্র ৪ বছরের মধ্যে ইপিএস কমে ১ টাকা ৬০ পয়সায় নেমে আসে।

উচ্চ প্রিমিয়ামে শেয়ার বিক্রির পরও প্রতারণা থেমে থাকেনি আমান গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আমান ফিড মিলের উদ্যোক্তাদের। তারা বিনিয়োগকারী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার আস্থার কোনো প্রতিদান তো দেয়-ই-নি, বরং আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারে নয়-ছয় করেছে। এ কারণে ২০১৯ সালে কোম্পানির পরিচালকদের কোটি টাকা জরিমানাও করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

শুধু তা-ই নয়, তালিকাভুক্তির পর কোম্পানির শেয়ারের মূল্য নিয়েও কারসাজির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোম্পানির উদ্দেশ্য ছিল-বুকবিল্ডিং পদ্ধতির আইপিওর প্রক্রিয়ায় থাকা গ্রুপের দ্বিতীয় কোম্পানি আমান কটন ফাইব্রাসের ভাল মূল্য প্রাপ্তির বিষয়টিকে প্রভাবিত করা। ২০১৮ সালে এই কোম্পানিটি বাজারে আসে। নিলামে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের কাট-অফ প্রইস হয় ৪০ টাকা। আর আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে এই শেয়ার বিক্রি করা হয় ৩৬ টাকা দরে। আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি বাজার থেকে ৮০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। কিন্তু এই কোম্পানিটিও নির্ধারিত সময়ে আইপিওর টাকা ব্যবহার করতে পারেনি। এরই মধ্যে আমান গ্রুপ তাদের তৃতীয় কোম্পানি হিসেবে আমান সিমেন্টকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসে।

পুঁজিবাজারের এইসব চাতুরির মধ্যেই আমান গ্রুপের আর্থিক সংকট সামনে আসে ২০২০ সালে। সে বছরের সেপ্টেম্বরে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিবিধ খাতের কোম্পানি আমান ফিড লিমিটেডের জমি ও কারখানা বিক্রির জন্য নিলামে তোলে ঋণদাতা এবি ব্যাংক। আমান ফিড মূলত ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও কাঁচামাল ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়।একই বছর দেশের কৃষি ও ডেইরি খাতের জন্য পোল্ট্রি, মাছ, চিংড়ি, গোখাদ্যসহ বিভিন্ন খাবারের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে আমান ফিড। এরপর আর ঋণ পরিশোধ না করায় ২০২০ সালের ৭ আগস্ট এবি ব্যাংক লিমিটেড আমান ফিডের জমি নিলামে তোলার বিষয়ে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ওই বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, আমান ফিডের কাছে ওই বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ঋণ ও সুদসহ মোট ২৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা পাওনা ছিলো এবি ব্যাংকের। ২০২১ সালের জুনে উচ্চ আদালত থেকে ওই বন্ধকী সম্পত্তি নিলামে তোলার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে।

তবে গ্রুপটির সর্বোচ্চ ভাবমূর্তি সংকট তৈরি হয়েছে সোমবার যমুনা ব্যাংকের একটি মামলায় গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল ইসলাম, দুই পরিচালক শফিকুল ইসলাম ও তৌফিকুল ইসলামকে রাজশাহীর একটি আদালত জেলহাজতে পাঠানোর পর।

যমুনা ব্যাংকের মামলাটির বিস্তারিত পড়ুন এখান থেকে

যমুনা ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আমান গ্রুপের পরিচালকদের বিরুদ্ধে তাদের ব্যাংকের আরও ৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এগুলোর মধ্যে তিনটি নেগোসিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্টে। তিন মামলায় ব্যাংকের মোট পাওনা অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭৭ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর বাইরে ঋণ নিতে বন্ধক রাখা আরও একটি সম্পত্তি অন্যত্র হস্তান্তরের মাধ্যমে জালিয়াতির অভিযোগে আরেকটি মামলা রয়েছে।