রোজ বিকেলে দিনের শেষ বেলার মায়াবী নরম নিরীহ আলোর দিকে চোখ রেখে আগরপাড়া ইস্টিশানের চার নম্বর প্লাটফরমে অলস বসে থাকে চার বুড়ো। কংক্রিটের প্লাটফরমের সামনে দিয়ে বয়ে গেছে দুই সারি রেললাইন, কারও কারও নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাবার পথ, তারাও বুড়োদের মতো অলস। ট্রেন এসে চলে যাওয়ার পর থেকে তাদের আর কোনো কাজ থাকে না পড়ে থাকা ছাড়া। কেউ যদি রেললাইনের ওপর দিয়ে পায়ে হেঁটেও যায় তবু তাতে সদ্ব্যবহার বলা যায় না, রেললাইন পায়ে হাঁটার জন্য মোটেই নয়, ওটা শুধু ট্রেন ছোটার জন্য। চার বুড়ো যাত্রী প্লাটফরমে বসে অপেক্ষায় থাকে ট্রেনের, রেললাইনও বুক পেতে একই অপেক্ষায় থাকে।

পাশাপাশি থাকা রেলের স্লিপারগুলো বরং কিছুটা হতভাগাও, পাশাপাশি থাকে, কাছে আসা হয় না কখনও! অলস সময়টা তাদের কাছে তাই আরও অলস হয়ে যায়! চার বুড়ো তাদের অলস সময়টা ভালোই কাটিয়ে দেয় গল্প করে। একদিন যখন তাদের বয়স কম ছিল, শরীর এবং মন—দুটোতেই অনেক জোর ছিল, ছিল কাজের দম আটকানো ব্যস্ততা—তখনকার গল্প করে তারা, গল্পে গল্পে ঘুরে আসে ফেলে আসা জীবনের বিন্দু বিন্দু ঘামে জমানো স্মৃতির গুদাম থেকে।

এদিকে নিয়ম করে ট্রেন আসে, হাজার মানুষ বুকে নিয়ে ভিড় ঠাসা ট্রেন আবার চলে যায় রাণাঘাট, শান্তিপুর, নৈহাটি কিংবা কৃষ্ণনগর। চার বুড়ো নিঃসঙ্গ রেললাইনের সঙ্গে আবার অপেক্ষায় থাকে। বিকেলের আলো নিভে আসতে থাকে। আর চলতে থাকে চার বুড়োর গল্প, গল্পের সাথে স্মৃতির রেললাইনে চলতে থাকে তাদের জীবনের প্রায় ভেঙেচুরে ক্ষয়ে যাওয়া ট্রেন।

প্রথম বুড়ো তার বয়সকালের স্মৃতির ভেতর থেকে তুলে আনে টুকরো কিছু পাতা, ‘তখন বয়স ছিল, রোজ সকালে ধরতাম আটটা বিয়াল্লিশ। চোখ থেকে ঘুম তাড়ানোর যুদ্ধ শেষে পেটে কোনোমতে কিছু পুরে কী যে তড়িঘড়ি করে ছুটতাম ট্রেন ধরার জন্য! টিফিন বাটিটা বগলে পুরে সকাল থেকে ঘাম ছুটিয়ে সময়মতো তা রেডি করে রাখা হাড় জিরজিরে মেয়েলোকটার দিকে পর্যন্ত ঠিকমতো তাকানোর সুযোগ হতো না! আটটা বিয়াল্লিশ মিস মানে কাজে যাওয়া লেট, বসের ধামকি-ধুমকির পর পথের ঝক্কি সেখানে তখন নস্যি! আটটা বিয়াল্লিশ তখন আমাদের আরেক ঠিকানা, ট্রেনের কামরা আমাদের আরেক ঘর। ট্রেনের কামরায় ডেইলি প্যাসেঞ্জারির তুমুল আড্ডা—তাস, রাজনীতি—ঠিক যেন নিজের ঘরের মতো চলত সব। ওই তো, মাঝে মধ্যে আবার সদলবলে কোনো বিয়ে বাড়ি কিংবা পিকনিকেও ছুটতাম আটটা বিয়াল্লিশ পরিবারের সঙ্গে। তখন আটটা বিয়াল্লিশ মানেই ছিলাম আমি, ওটাই ছিল জীবন!’

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বুকের ভেতরে দানাবাঁধা দীর্ঘশ্বাসের বহর মুক্ত করে বুড়ো, ‘আজও আটটা বিয়াল্লিশ আগের মতোই আসে যায়, কত আমি কিংবা আমার মতো কত জীবন এখন সে সময়টার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যে সময়টায় একদিন আমিও ছিলাম—এখন সেখানে আমার আর নাম নেই!’

প্রথম বুড়োর দীর্ঘশ্বাসের ভেতর দিয়ে দ্বিতীয় বুড়োও ভাবনায় ডুব মেরে স্মৃতির বুদবুদ তোলে, ‘কত যে বেড়াতাম তখন! বাদ যেত না কোনো বছর! প্রতিবছর পুজো এলেই তখন চলে যেতাম পুরী, জয়পুর কিংবা আগ্রা নয়তো মথুরা। বউ-বাচ্চা নিয়ে সে কী যে হইচই! কত কত জায়গায় গিয়েছি, ঘুরেছি, ছুঁয়েছি কত মাটি-পানি-ঘাস-ফুল-ফল! একেক জায়গায় একেক রকম বাতাস, সে বাতাসে আবার কত কত রকম ঘ্রাণ! কত ধরনের মানুষ, মানুষের ছুটে চলার ধরন, খাওয়া, কথা বলা, হাসি—কী বিচিত্র জীবন ছিল তা! অথচ কতকাল হয় আর যাই না কিংবা যাওয়া হয় না কোথাও! নতুন কোনো বাতাসের ঘ্রাণ আর প্রবেশ করে না শ্বাসনালী দিয়ে, এখানে এই ইস্টিশানের পুরনো ঘ্রাণ ছাড়া এখন আর কিছু নেই কোথাও!’

দ্বিতীয় বুড়োর দীর্ঘশ্বাসের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে ইস্টিশানের বাতাসে। এ ঘ্রাণ কেবল চার বুড়োর নাক স্পর্শ করতে পারে, বাকি লোকগুলোর কাছে পৌঁছানোর আগেই নিঃসঙ্গ রেললাইন টেনে নেয় বুকে, আর ট্রেনের চাকায় পিষে গিয়ে দূর ইস্টিশানে পাড়ি দেয় তা!

‘ভালোই তো আছি—’ইস্টিশানের বাতাসে নতুন দীর্ঘশ্বাস ছড়াবার আগে একটু প্রশান্তি ছড়াতে উদ্যোগ নেয় তৃতীয় বুড়ো, ‘এই বয়সে যা চাওয়া থাকে সবার, ছেলে আর ছেলের বউয়ের যত্ন-আত্তি, আমার বেলায় তা একশতে একশ।’ একটু দম নিয়ে বড় করে শ্বাস ছাড়ে বুড়ো, ‘তবু ছেলের মায়ের ছবির সামনে দাঁড়ালেই মনে পড়ে জীবন্ত দিনগুলোর কথা! বড়দিনের সময় বেশ কবার ওকে নিয়ে গিয়েছিলাম কলকাতার সাহেবপাড়ায়। তারপর ট্যাক্সি করে ঘুরিয়েছিলাম পার্ক স্ট্রিট, চৌরঙ্গী—আরো কত কত পথ। চারপাশে দেখতে দেখতে তার চোখ-মুখ দিয়ে ফুটে বের হতো কত উচ্ছ্বাস, খাঁচার পাখির মুক্ত আকাশ ছোঁয়ার মতো উচ্ছ্বাস যেন দেখা যেত তার চোখে-মুখে! কোনো আওয়াজ থাকত না তার মুখে, অথচ উচ্ছ্বাসে ভাসতাম আমিও। চার দেয়ালের বাইরে তো আর সেভাবে বের হওয়া হতো না ছেলের মায়ের, ওই কবারই মনে হয় দেখেছিল বাইরের ভুবন।’

আবার একটু দম নিল বুড়ো, তাকিয়ে রইল বিকেলের ডুবে আসা আলোর দিকে, যেন চোখের সামনে ভেসে আছে উচ্ছ্বাসমাখা ছেলের মায়ের মুখ! আবার বড় করে শ্বাস ছাড়ে বুড়ো, ‘ছেলের মা চলে গেল, আমিও কলকাতা দেখি না কতকাল! বাতের ব্যথাটা ইদানীং বেড়েছে বড্ড!’

তৃতীয় বুড়োর বাতের ব্যথার মতো কিছু ব্যথা টের পায় বাকি তিন বুড়োও, ব্যথার উৎসের খোঁজে তারা হাতাতে থাকে বুকে, পেটে কিংবা মাথায়। আজকাল কোনো কারণ ছাড়াই ব্যথা করে শরীরের এখানে ওখানে। কখনও কখনও ব্যথা টের পাওয়া গেলেও খুঁজে পাওয়া যায় না ব্যথার উৎস! মনের ব্যথা শরীরে কেউ কি খুঁজে পেয়েছে কখনও!

ব্যথার উৎস হাতিয়ে ব্যর্থ সময় পার করে একটু উঠে দাঁড়ায় চতুর্থ বুড়ো, অন্য তিন বুড়োর মতো নিজের ভাবনায় ডুব দিয়ে দীর্ঘশ্বাস উৎপাদনের আগে এক রাউন্ড পায়চারি করে তিন বুড়োর সামনে দিয়ে, তারপর স্থির হয়ে তাকায় শেষ বিকেলের রঙিন আলোর দিকে, সে আলোর ভেতর থেকে ঝিকঝিক আওয়াজ তুলে ছুটে আসে চতুর্থ বুড়োর স্মৃতির ট্রেন, ‘তখন ট্রেনের ইঞ্জিন ছিল কয়লার। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে চোখ রাখলে কয়লার গুঁড়ো বাতাসে উড়ে এসে পড়ত চোখে। চোখের ভেতরে খচখচ করত কতক্ষণ! প্রায় বুজে আসা চোখ নিয়ে তারপরও বাইরে তাকাতে ভালো লাগত! চুল উড়ত বাতাসে, কয়লার গুঁড়োর সাথে ভেসে আসত কয়লার পোড়া ঘ্রাণ—’বুড়ো চোখ বুজে একবার নাক টানে, যেন পোড়া কয়লার সে ঘ্রাণ ভেসে আসছে এখানে!

ঘ্রাণ নেয়া হলে বুড়ো আবার ফিরে যায় কয়লার ট্রেনের কামরায়, ‘আর ট্রেনের সে আওয়াজ—ঝিকঝিক ঝিকঝিক—ভারি সুন্দর ছিল! এখনও চোখ বুজলেই কানে বাজে সেই ঝিকঝিক ঝিকঝিক—’নিজেই মুখে একবার আওয়াজটা করল বুড়ো, তাতে মৃদু হাসি ফুটল বাকি তিন বুড়োর মুখে, চোখে ফুটে উঠল কৌতুক, চতুর্থ বুড়ো বাচ্চাদের মতো মুখে ট্রেনের ‘ঝিকঝিক ঝিকঝিক’ আওয়াজ তুলছে প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে! আশেপাশের দু-একজন লোক শুনতে পেয়ে অবশ্য আড়চোখে তাকাল, কিন্তু বিশেষ মনোযোগ দিলো না! বুড়োদের অবশ্য সেটুকুও নজরে পড়ল না!

‘কোথায় যে গেল সেই সব দিন! কীভাবে যে হারাল সময়গুলো! আর কখনও কি ফিরে পাওয়া যাবে!’ একসাথে চার বুড়ো তাকিয়ে থাকে শেষ বিকেলের ঝলসানো আলোর দিকে, কোন ফাঁকে তাদের বুক থেকে নির্গত দীর্ঘশ্বাস মিশে যায় বাতাসে, টের পায় না কেউ!

বিকেলের নিভে আসা আলোর নিচে আগরপাড়া ইস্টিশানের চার নম্বর প্লাটফরমের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে এভাবেই প্রতিদিন নিজের ভাবনায় ডুব দিয়ে স্মৃতি জাগায় চার বুড়ো। বয়সকালের জীবনে প্রতিদিন তারা ভ্রমণ করে, কিংবা সে সময়ে ভ্রমণের যে স্মৃতি তার ভেতরে ফেলে আসা রঙিন জীবন খোঁজে, যেন অপেক্ষমাণ অলস এ জীবনের দীর্ঘশ্বাস মুছে দেয়া যায়। অথচ তারা তা পারে না, দিনে দিনে দীর্ঘশ্বাসগুলো আরও ঘনীভূত হতে থাকে! পড়ে থাকা রেললাইনে কতবার আসা-যাওয়া, কত কত ইস্টিশান ছুঁয়ে আসা, এ লাইনের উপর দিয়ে তাদের আর কোনো ইস্টিশান ছোঁয়া হয় না! অথচ প্রতিদিন ট্রেন যায়, ট্রেন আসে। প্রতিদিন কত মানুষ এ লাইনের ওপর দিয়ে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ইস্টিশানের দিকে চলে যায়। আর চার বুড়ো বিকেলের এই মরা আলোয় অপেক্ষায় থাকে তাদের কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের। সে ট্রেন কখন আসবে কেউ জানে না, কোন ইস্টিশানে নিয়ে যাবে তাও কেউ বলতে পারে না! অচেনা ইস্টিশানগামী সে ট্রেনের খবর কেউ রাখে না!

কাল দেখা গেল তিন বুড়ো, প্লাটফরমে অপেক্ষা করছে আগের মতোই! কাঙ্ক্ষিত ট্রেন এক বুড়োকে নিয়ে গেছে অচেনা সে ইস্টিশানের দিকে! বাকি তিন বুড়ো জীবনের তল্পিতল্পা গুটিয়ে রোজ প্লাটফরমে বসে কান পেতে রাখে অচেনা ইস্টিশানগামী সে ট্রেনের আওয়াজ শোনার জন্য! তিন বুড়োর কানে বাজে ঝিকঝিক ঝিকঝিক…

(কবি শুভ দাশগুপ্ত’র ‘ট্রেন’ কবিতা অবলম্বনে)

অলংকরণ শিবলী নোমান