প্রত্যেকবার মনে হয়, যেন মরে যাচ্ছে। প্রত্যেকবার মারিয়ার চোখ ফুঁড়ে কান্না বের হয়ে আসে। আর প্রত্যেকবার তাকে একজন বলেন, জগতের সকল মানুষ এই অবস্থায় আছে। মানুষেরা বেঁচে আছে আগুনের কবরের ভেতর।

রাত সাড়ে বারোটা বাজে আর এখন ঠিক ঘুমোবার সময়। কিন্তু মারিয়া জেগে উঠল যেন মাত্রই। না ঘুমিয়েই। অন্ধকারের ঠাণ্ডা নীরবতার ভেতর থেকে জেগে উঠল। যেমন করে বিস্তৃত চরাচর না ঘুমিয়েই জেগে থাকে আর তার বুকে ঠাণ্ডা বাতাস ভাসে। তেমন করে তার বুকেও দীর্ঘশ্বাস বইছে এখন। সেই বাতাস আগ্নেয়গিরির গনগনে লাভা থেকে উৎপন্ন হয়তবা। তারপর সেই আগুন ক্রমে মৃদু ফুলকি হয়ে শীতলতায় নেমে আসলেও ক্ষণে ক্ষণে উত্তপ্ত শ্বাস হয়ে মনের উপরে ছড়িয়ে পড়ছে। ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র হয়ে, মন ও দেহের গোটা জমিনজুড়ে। আসলে সন্ধ্যা থেকেই বইছে। কিংবা সন্ধ্যা থেকে নয়, এক সুদীর্ঘ সময় ধরেই বইছে। নিশ্বাস এভাবে দীর্ঘ হলেই বুঝি তাকে মহাকালীন বলে। কিন্তু রাতের এই শান্ত সমাধিতে শুয়েও মারিয়ার সবকিছু কেমন আগুন আগুন মনে হচ্ছে। আগুন সবখানে। মনের গলিপথ আর বাইরের জীবনপথ সবখানে। এই যেমন গোলাপের হোটেলের ছেলেগুলো সকাল-সন্ধ্যা দাউদাউ আগুন ঝরিয়ে গেল। দেহ গলিয়ে গেল। দিন শুরু হলেই আরো অনেকে শরীর আর মাথা গলিয়ে উদয়াস্ত বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করবে। আর রাত হলেই গা এলিয়ে ঘামের ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে। রাতকে কি বেঁচে থাকা বলে? রাত একটা মরণময় মুহূর্ত। জগৎ তখন নিস্তব্ধ কবরখানা। এই যেমন এখনো তার মনে হচ্ছে সে মরে যাচ্ছে। জীবনের ওপারে জীবন নাই, মরণের এপারেও জীবন নাই। শুধু নিশ্বাস আছে আর আছে তার সুদীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস।

মারিয়া না ঘুমিয়ে বসে থাকছে আর মাঝে মাঝে শুয়ে পড়ছে। সেই শুয়ে থাকার ভঙ্গিতে না আছে শব্দ না আছে হাত-পায়ের নড়নচড়ন। শরীর যেন নিঃসাড়। ডানাকাটা পাখির মত পরাজয়ে পাখা গুটিয়ে নিয়েছে। তার মনে হচ্ছে, লম্বা সাড়ে তিন হাত সমাধির ভেতর শুয়ে আছে যেন। অথচ ঘরটি কিন্তু বেশ লম্বাটে ও বড়। মনের ক্ষুদ্রতা ও অন্ধকারের স্তব্ধতায় ঘরটিকে হয়ত সমাধি-তুল্য লাগছে। ছোটবেলায় বনের মধ্যে সাঁওতাল কবরের নির্জন সারি দেখতে মারিয়ার খুব ভালো লাগত। ফটফটে সাদা ছিল সেসব। এখন যে সমাধিতে শুয়ে আছে তা সুন্দর ও সাদা নয়। যদি এটা আগুনের কবরই হয়ে থাকে, তাহলে এর রঙ হালকা নীলচে ও কমলা। সে এখন এই আগুনের সমাধির ভেতরেই আছে। অথবা সে ওই সন্ধ্যার ভেতরেই আছে। এরকম সন্ধ্যা যে আগে আসেনি তা নয়। বহুবার এসেছে। আর প্রত্যেকবার তার মনে হয়েছে, সে মরে যাচ্ছে।

ফোন হাতে ধরে সে অনেকক্ষণ বসে থাকল। ভাবল, সফলতা একটা নির্মম পরিহাস। কখনো কখনো পরাজয় আর পরিশ্রম এক অর্থ বহন করে। সব পরিশ্রম সফলতা আনে না। একজন দিনমজুর সারাদিন পরিশ্রম করে যা পায় তা সফলতা নয়। সফলতা জিনিসটা হলো বড় পরিবর্তন। পরিশ্রম করার পরও যে দীনতা মানুষের মনে ও শরীরে বিমর্ষ ভঙ্গিমায় লেগে থাকে তা পরাজয়। পৃথিবীতে যদি মানুষ এলো, তাহলে পরাজয় এলো কেন? পরাজয় যদিবা এলো, লজ্জা না থাকত। পরাজয়ের জন্য খারাপ লাগা যদি না থাকত। কিন্তু পরাজয় তো মুচড়ে দেয় মুহূর্ত আর হৃৎপিণ্ডকে। পরাজিত মানুষের নিশ্বাসের ভেতরে আগুন জ্বলে উঠে আর মুহূর্তেই আগুনময় হয়ে যায় সব। কানের কাছ দিয়ে আগুন হাওয়া বয়ে যায় আর হৃৎপিণ্ড পুড়ে যায়। জন্ম থেকেই জ্বলছি একথা কারো কারো জন্য চরম সত্য। অথবা জন্মের পর বেঁচে থাকতে গিয়ে বাববার মরে যাচ্ছি এ কথাও তীব্র সত্য। জীবনের ওপারে যাকে মরণ বলছি, সেই মরণের পরে সুখ-তৃষ্ণা, হাসি-দুঃখ আছে কিনা কে জানে। কিন্তু জীবনের এপারে যে মরণ, সেই মরণ সত্য। সেই মরণ সুখ-তৃষ্ণার আকুল করবী, পরাজয়ের পরিহাস্যে মোড়ানো। 

ফোন হাতে নিয়ে মারিয়ার এইসব মনে হয়। অথবা ফোন হাতে নিয়ে শুরুতে কিছুই মনে হয় না। শুধু মনে হয়, সে মরে যাবে। কিছুতেই সে ফোনে এ কথা বলতে পারবে না। যদিবা বলেও লজ্জা আর অপমানে মরে যাবে সে তখুনিই। আর এই ভাবনার সঙ্গেই মুহূর্তে অসহায় হয়ে ওঠে তার চোখের চারপাশ। একটু পরে সে অসহায়ত্ব চোখের ভেতরে আগুন হয়ে জ্বলে ওঠে। তীব্র আগুনে চোখের মণি জ্বলে ওঠে। চোখের মণি জ্বলে উঠলে কান্নারা তখন বেদম গতিতে আছড়ে পড়ে। সে কিছুক্ষণ বেহুশ কেঁদে নেয়। তারপর ফোনটা ধরে সে তার বন্ধুর কাছে কল দেয়, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে কিছু টাকা চায় সে।

এরকম আগেও চেয়েছে। আর প্রত্যেকবার মারিয়ার মনে হয়েছে, সে মরে যাচ্ছে। নিজের ভেতরে নিজের অসম্মানের হাতুড়িতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। সে ভাবল, এই অনন্ত লজ্জা ও কালিমা থেকে কোনোদিন মুক্তি পাবে না। তার রক্তে-মজ্জায় লজ্জা পরাজয়বৃক্ষ হয়ে গেছে। তার মন সেই বিষবৃক্ষের শিকড়ে অনন্তকালের জন্য ছেয়ে গেছে। এইসব ভাবলে মারিয়ার চোখ ফুঁড়ে স্রোতের মত কান্না বের হয়ে আসে। কান্না কিছুটা ধীর হয়ে এলে, এরকম মুহূর্তে সে একজনকে ফোন করে। আর প্রত্যেকবার তিনি মারিয়াকে সান্ত্বনা দেন এই বলে, জগতের সকল মানুষ এই অবস্থায় আছে। মানুষেরা বেঁচে আছে আগুনের কবরের ভেতর।

মারিয়া এই কথায় কিছুটা সান্ত্বনা পায় বটে কিন্তু মন তার নিয়তির কথা ভেবে ফেনিল হয়ে ওঠে। বড় দুঃখের সত্যি কোনো সান্ত্বনা হয় না। আর নিয়তি জিনিসটাও তো সত্য নয়। সত্য নয় বলেই এ নিয়তি সে মেনে নেবে না। তখন সে নিজের ভেতরে আছড়ে পড়ে আরও আশ্চর্য ক্রোধে, অপমানে, অভিমানে।

কেন সে টাকা চাইবে? টাকা তার নেই কেন?

মারিয়ার চোখ জ্বলে ওঠে। নিশ্বাস জ্বলে উঠলে উঠে বসে। বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। একটা ছটফট ছুটন্ত রাত যেন ফস্কা পড়া ঘায়ের ওপর নুন দিচ্ছে আরো। ক্রমেই ভাবনারা করুণ ডালপালা মেলছে। মারিয়া ভাবল, গলির ভাঁজে বারো-তের বছরের উদীয়মান যে কিশোরীটি ভিক্ষা করছে সে কী নিয়তির শিকার? তাহলে কোন সেই নিয়তি? ইশ্বরের? কিশোরীটি কেন পুরুষ লোকেদের গায়ে পড়ে হেসে বুক এগিয়ে দিয়ে দশ টাকা চাইবে। টাকা তার নেই কেন? তবে কি অদ্ভূত! মেয়েটির বুকের দাম আছে। যেহেতু বুকের দাম আছে, ফলে সে বুক বিকোচ্ছে। তার বুকের দাম দশ টাকা। কিন্তু বুকের দাম দশ হাজার বা দশ লক্ষ টাকাও হয়।

নিস্তব্ধ অন্ধকারে মারিয়া হেসে উঠল। ভাবল, কিশোরীটি কি ভাবছে সে নিয়তির শিকার? হায়! কি অজ্ঞ ও ছোট সে।

মারিয়া আরো হেসে উঠল। জোরে-ধীরে-সকরুণ বেগে। শ্লেষভরা সেই হাসি অন্ধকারের নিঃশব্দ দরিয়ায় কিছুটা তীর্যক ভঙ্গিতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছড়াল। তারপর আবার সে ফোঁপাতে লাগল। চোখ দিয়ে অশ্রুর ফোঁটা দমাদম ঝরল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বিড় বিড় করল ক্ষাণিক, হায়! তের বছরের মেয়েটির বুকের বয়স আটাশ পেরিয়েছে। হয়ত মনের বয়স তার মৃত্যুকে ছুঁয়ে ফেলেছে। আমিও কী বারবার মৃত্যুকে ছুঁয়ে যাচ্ছি না?

মারিয়ার টাকা থাকলে আজ প্রেম চাইতে পারত। কিছুটা অহংকারী ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারত। প্রেম, সুখ, শরীর—কতরকম চাওয়ার জিনিস আছে পৃথিবীতে। তার হৃদয় ভরে আছে তিরতির কামনায়। এই মুহূর্তে প্রেমের পারিজাতময় একটি বিছানা সে কামনা করতে পারত। কিংবা ফোন করে এমনিই দুটো কথা সে বন্ধুর সঙ্গে বলতে পারত। সেই কথা সুখের কথা হতে পারে। শরীরের অশরীরী নানা ভাষা হতে পারে। মৌনমিশ্রিত নীরব কথাও হতে পারে। ফোন দিয়ে এমন অনেক মুহূর্তই সে জন্ম দিতে পারত। কিন্তু হায়! তার হৃদয় বাধা পড়ে গেছে জগতের সীমাবদ্ধতার কাছে। ক্ষুদ্রতার বন্ধনে জড়িয়ে গেছে সে। প্রেমের মত, সুখের মত, শরীরের মত মহৎ কিছু চাওয়ার পথ তার বন্ধ। সে বুঝে গেছে, একইসঙ্গে একটির অধিক চাওয়া কখনো যায় না। টাকা চাইলে টাকা, প্রেম চাইলে প্রেম। টাকা চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে দৈন্যতার আবেগ তৈরি হয়, সেখানে একইসঙ্গে প্রেমের ঔদার্য সৃষ্টি সম্ভব নয়। প্রেমে দয়া-দক্ষিণা নয়, পরস্পরের অহংকারই তীব্র লীলা তৈরি করে। আকর্ষণ ও রস উপভোগে সাহায্য করে। ফলে প্রেমে যার যত অহম, সে তত আকর্ষণীয়।

মারিয়ার মনে হলো, এবার বন্ধুর কাছ থেকে একটি বড় আয়না চাইবে। যে আয়নায় সমস্ত শরীরটা দেখা যাবে। ত্বকের উজ্জ্বলতা, স্তন, নাভি আর সমস্ত মনটাও দেখা যাবে। কোথায় দাগ পড়েছে, ক্ষত কতদূর বাড়ল—এরকম বড় একটি ড্রেসিং টেবিল সে চাইবে।

অলংকরণ শিবলী নোমান