এই যে ঝোড়ো হাওয়ার সওয়ারী আজান; ভোর রাতের তুমুল বৃষ্টির উৎপাত উপেক্ষা করে, কংক্রিটের দানবীয় ল্যাবিরিন্থে হারিয়ে না গিয়ে ঠিকঠাক নাঈমুদ্দিনের কানে পৌঁছে গেলেও তার মধ্যে কোনো চাঞ্চল্য দেখা যায় না; এমনকি ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ বলে মুয়াজ্জিন ঘুমের দরজা ঠেলে ঢুকতে চাইলেও; প্রায় ৫০ বছরের পুরনো অভ্যাসের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নাঈমুদ্দিন প্রতিউত্তরে ‘সাদাকতা ওয়া বারারতা’ উচ্চারণ না করলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকে না; কারণ সম্প্রতি সে সব রকম বিশ্বাস থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। অথচ তার কপালে জেগে থাকা ধূসর গোল দাগ, নাভিমূল ছুঁতে চাওয়া সফেদ দাড়ি আর তর্জনি পেঁচিয়ে থাকা তসবির স্রোতের স্থায়ী চিহ্ন নির্দেশ করে উপাসনালয়েই কেটে গেছে তার জীবনের একটা সময়। নাঈমুদ্দিন অভ্যাস মতো বিছানা ছেড়ে উঠতে গিয়ে একটু টলে যায়, তার মনে হয় অন্যকোনো এক সময়ে অন্য এক জীবনে জেগে উঠেছে সে। আলো অন্ধকারের মোলায়েম স্রোতে ঘরটা যেন শ্রান্ত এক নৌকা; যেন ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌছে তীরে ভেড়ার কথা ভুলে গেছে বেমালুম। রেনু ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট হাসে; বাবু, অপু, কাজল আর নিরুকে ডাকে; দুধ ভাতের লোকমার ওমে মেশানো অপ্রাকৃত স্বাদ পালিয়ে যাবে বলে ভয় দেখায়। নাঈমুদ্দিনও কান পেতে থাকে, যদি শোনা যায় ছোট ছোট পায়ের হুটোপুটি। রেনু ফুপিয়ে কাঁদে; আধো ঘুম আর জাগরণে কান্নাটা ঠিকঠাক বিস্ফোরিত হতে না পারলেও তার বৃদ্ধ শরীরে কাঁপনি দিয়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। নাঈমুদ্দিন রেনুর কাঁপতে থাকা শরীর পেরিয়ে ঘরের মেঝেতে পা রাখতে গিয়ে দেখে; সে এক জন্মের দূরত্ব! খোলা দরজা পেরিয়ে মেঝের খানিকটা দখল নিয়েছে বৃষ্টি; নাঈমুদ্দিনের পায়ের নিচে মৃদু আর্দ্রতা। ধুলো-বালির কুচি আর উড়ে আসা দলছুট পাতাদের নরম শরীর পেরিয়ে সে বারান্দায় যায়। চারপাশের উঁচু দালান পেরিয়ে খুব বেশি দূরে চোখ যায় না। শুধু বারান্দার বাঁ দিকে এক চিলতে শূন্যতা; সেখানে রঙ হারানো আকাশ আর একটা দুটো পাখির চকিত উড়ে যাওয়াই শুধু দেখা যায়। এখন ঐ চিলতে শূন্যতায় বৃষ্টির নিদারুণ মাতম। বারান্দার এক কোণে জমে ওঠা কার্টন আর বাতিল জিনিসপত্রের স্তূপ; সেখানে মাঝে মাঝে এক বুড়ো বেড়াল ঘুমুতে আসে। নিরু প্রায় কিছু না কিছু রেখে যেত বেড়ালটার জন্য; ছোট্ট একটা প্লেটে আধখানা মাছ নয়তো একটু দুধের সর; গভীর রাতে ক্ষুধা নিয়ে কেউ ঘুমুতে যায়? বেড়ালটা আজ আসেনি ঘুমাতে। নিরুও তো ওকে খাবার দেয়নি আজ চল্লিশ দিন হলো। বারান্দার আরেক কোণে হেলান দিয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে লাল এক সাইকেল। প্রাচীন, পরিত্যক্ত প্রায়। বাবু, অপু, কাজল; তিন ভাইয়েরই প্রথম সাইকেল। নাঈমুদ্দিন সাইকেলের হ্যান্ডেলটা আলতো করে ধরলে মনে হয়; বাবুর বা অপুর বা কাজলের হাতটাই ধরলো; ছোট্ট একরত্তি হাতের মুঠো নাঈমুদ্দিনের শক্ত হাতের মুঠোই নিশ্চিন্তে ধরে আছে বেয়াড়া হ্যান্ডেল। বাবার হাতের ভরসায় বুনো সাইকেলটাও পোষ মেনে যেত অনায়েসে। ওরা বড়ো হলো আর সাইকেলটাও বুড়ো হলো নাঈমুদ্দিনের মতোই। এখন এই তুমুল বৃষ্টি যেন ধুয়ে দিচ্ছে সময়ের দাগ। সাইকেলটা যেন ফিরে পাচ্ছে সেই তীব্র লাল রঙ; এক নিশ্বাসে ফুলিয়ে নিচ্ছে চুপসানো টায়ার, গজিয়ে উঠছে দ্যুতিময় স্পোক আর স্প্রিং বেরিয়ে আসা শক্ত সিটটাও যেন হয়ে উঠলো মোলায়েম! এই অলৌকিক দ্বিচক্রযান; বৃষ্টিবিদ্ধ নাঈমুদ্দিন ভাবে; আর কখনই সওয়ারীদের নিয়ে কোনো রাস্তায় দাগ রেখে যাবে না তার চাকার; যেমন নাঈমুদ্দিনও আর পাবে তার শক্ত হাতের মুঠোই একরত্তি ছোট্ট হাতের ওম।      

রাস্তায় বৃষ্টির জমে থাকা পানি ঠেলে খুব সাবধানী এক রিকশা সরে যাচ্ছে দৃষ্টি সীমা থেকে; একটা কুকুর শাসাচ্ছে খুব আরেকটা কুকুরকে। এইসব নিয়ে নাঈমুদ্দিন দেখে আরেকটা বৃষ্টি বিঘ্নিত সকাল আড়মোড়া ভাঙছে আলস্যে। রেনু কখন যেন ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। রেনুর শীর্ণ হাতটা নাঈমুদ্দিনের কাঁধ আলতো ছুঁলে ও একটু কেঁপে ওঠে। রেনু বলে, এমন বৃষ্টির দিনেই তো ওদের প্রথম সন্তান বাবু এসেছিল। ক’দিনের টানা বৃষ্টিতে থৈ থৈ মফস্বল, নাঈমুদ্দিন অনেক খুঁজে গভীর রাতে নিয়ে এলো এক ধাত্রী। ভোর রাতে বৃষ্টি কেবল একটু ধরে এসেছে, এমন সময় চিৎকার দিয়ে সে পৃথিবীতে এলো। আবার এমন বৃষ্টির দিনেই তো সে চলেও গেল; নাঈমুদ্দিন ঐএক চিলতে শূন্যতায় ঝুলে থাকা ঘন ধূসর আবছা আকাশে নির্লিপ্ত তাকিয়ে বলে। রেনু ঘন হয়ে আসে। বৃষ্টির দলছুট কণাগুলো বারান্দার গ্রিলে জমে উঠতে না উঠতেই বড়ো ফোঁটা হয়ে ঝরে পড়ছে বেড়ালটার খাবারের প্লেটে আর এক অপ্রাকৃত শব্দে বধির করে দিতে চাইছে ওদের। আর ক’টা দিন গেলেই তো পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারতো ছেলেটা, রেনু বলে; এমন করে মারলো আমার ছেলেটাকে, চেহারাটাও চিনতে পারিনি! নাঈমুদ্দিন কিছু বলে না; সে তো অনেক আগেই নিজেকে ফিরিয়ে নিয়েছে এইসব কথা বলা থেকে। বৃষ্টি কি একটু ধরে এলো? ঐ এক চিলতে আকাশের ধূসরতায় একটু হলদে আভার ছোঁয়া দেখে ভাবলো নাঈমুদ্দিন। ক্যাম্পাসের রাস্তায় প্রায় মিশে ছিল বাবু। একটা তেজদিপ্ত মনুমেন্টের পাদদেশে; ইট, লাঠি ও বিবিধ অস্ত্রের মাঝে ধ্বস্ত থ্যাঁতলানো ফুলের মতোই পড়ে ছিল বাবু; বৃষ্টি ধুয়ে নিয়েছিল প্রায় সবটুকু রক্ত। নাঈমুদ্দিন তার মেজ ছেলে অপুর কথা ভাবে। অপুটার ভাগ্য বরং একটু ভালোই ছিল বাবুর চেয়ে। অন্তত চেহারাটা অটুট ছিল; রেনু আর নাঈমুদ্দিনের চিনতে একদমই কষ্ট হয়নি। অপু রেনুর চেহারার ধাঁচ পেয়েছিল, হাসলে টোল পড়তো বাম গালে। ৭ টা গুলির মধ্যে একটা ঐ বাম গালের টোলটাকে অক্ষত রেখেই ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। তো অপুকে বাবুর চে একটু ভাগ্যবান ভাবা যেতেই পারে, রেনু-নাঈমুদ্দিনের চুমু পেয়েছিল গালের টোলটাতে। খুব বেশি দিন তো নয়; বাবুর পরে অপুর চলে যাওয়া। ওরা বলেছিল বন্দুকযুদ্ধে ভয়ংকর কয়েকজন মরে পড়ে আছে বাঁধের নিচে, ময়লার ভাগাড়ে। নাঈমুদ্দিন যখন মরচ্যুয়ারিতে অপুকে পেল; তখনও অবিশ্বাসে বিস্ফারিত ওর চোখ; বন্ধই হতে চাইছে না।

সহসাই থামলো বৃষ্টি; আরো গভীর বর্ষণের শংকা নিয়ে। নাঈমুদ্দিন রেনুকে বলল সে একটু বেরুবে; শেষ ক’টা কাজ সেরে আসবে। ছাতাটা নিলো না সে; রেনুও মনে করিয়ে দিল না; কারণ সে জানে ছাতার প্রয়োজন ফুরিয়েছে ওদের। নাঈমুদ্দিন পাশের ঘরে ভেজানো দরজা ঠেলে ঢোকে। কাজল ঘুমুচ্ছে। ছেলেটা সেই ছোটবেলার মতোই কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমুচ্ছে বেড়াল ছানার মতো। চারিদিকে ছড়ানো ছিটানো বই। সার্ত্রে, নিৎশে অথবা কামুর মাঝে ঘুমন্ত কাজলকে খুব উজ্জ্বল দেখায়। ওর কোঁচকানো ভ্রূ, তীক্ষ্ণ নাক, মৃদু-নরম দাড়িগোঁফ; কোনো এক সন্তের কথাই মনে করিয়ে দেয়; যে কিনা সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছে। নাঈমুদ্দিন কাজলের ঘুম না ভাঙিয়ে বেরিয়ে আসে। কয়েক মাস হলো ঘরেই থাকে কাজল; ঘাড়ে চাপাতির ছায়া নিয়ে। যদিও এখন আর কিছু লিখতে পারে না ও; ডান হাতের তিনটে আঙুল কেটে দিয়েছে ওরা।

সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে একটু থমকায় ও, সামনের বাসার দরজার সামনে মেয়েদের একজোড়া স্যান্ডেলের একটি উল্টে পড়ে আছে কয়েক ধাপ সিঁড়ির নিচে। নাঈমুদ্দিন দলছুট স্যান্ডেলটা কুড়িয়ে আরেকটির পাশে রাখে। নিরুরও এমন হতো। এত ছটফটে ছিল মেয়েটা; প্রায় দেখা যেত একটা জুতো নিখোঁজ, সিঁড়ির নিচে পড়ে অপেক্ষা করছে; কখন নাঈমুদ্দিন কুড়িয়ে নেবে তাকে। আজকে সিঁড়িটা বেশ দীর্ঘ মনে হয়; মনে হয় এই সিঁড়ি বেয়ে অতলে নেমে যাওয়া যাবে। রাস্তায় হাঁটু পানিতে চেনা খানা-খন্দগুলো মুখ লুকালেও নাঈমুদ্দিন সহজেই পেরিয়ে যেতে পারে তাদের। রাস্তার শেষে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ালে পাশ ঘেঁষে একটা সিএনজি চলে যায় আর খুচরো কিছু ঢেউ আচমকা গাড়ি বারান্দায় উঠে পড়ে নাঈমুদ্দিনকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে। কেয়ারটেকার কল বেলের শব্দে বিরক্ত হলেও নাঈমুদ্দিনকে দেখে অপ্রস্তুত হাসে একটু; বলে বাশার সাহেব ফজর ওয়াক্ত শেষে খানিক আগেই বাসায় এসেছে; তাকে খানিক অপেক্ষা করতে বলে সে আবুল বাশারকে ডাকতে চলে যায়। বাবু-অপু চলে গেলে নাঈমুদ্দিনের বেশিরভাগ সময় মসজিদেই কাটতো। নামাজ শেষ হলেও সে অনেকটা সময় মসজিদেই থাকতো; অন্তত এখানে অভিযোগ জানাতে বা বিচার চাইতে কোনো বাধা পেতো না সে। কিছুদিন বাদে আবুল বাশারও যোগ হয়েছিল তার সাথে। তার ছোট ছেলেটাকে কারা যেন ধরে নিয়ে গিয়েছিল একদিন; আর পাওয়া গেলো না তাকে। অনেক খুঁজলো যদিও আবুল বাশার। সাদা বা কালো সব পোশাকের মানুষই জানালো তারা ঐ দিন ঐ এলাকা থেকে কাউকে নিয়ে আসেনি। ফলে আবুল বাশারের নামাজ শেষেও মসজিদে পড়ে না থেকে আর উপায় থাকে না। একটা সময় নাঈমুদ্দিন ও আবুল বাশার দেখে; এই পড়ে থাকাদের দল ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে আর তাদের নিঃশব্দ ফরিয়াদ আর কান্নায় মসজিদটা বেশির ভাগ সময় ভারাক্রান্ত হয়ে থাকছে। আবুল বাশারকে খুব বিপন্ন দেখায়; সে নাঈমুদ্দিনকে বাড়ির ভেতরে ডাকে; বলে, চা খেতে খেতে তারা কথা বলতে পারে। সে আরও জানায়, অনেকদিন নাঈমুদ্দিনকে মসজিদে দেখে না সে; তার মেয়ের ঘটনার পর থেকেই হয়তো। নাঈমুদ্দিন অল্প একটু হাসে, বলে; চা সে খাবে না। তারপর পকেট থেকে একটা কলম বের করে দেয় আবুল বাশারকে। বলে, অনেক আগে সে কলমটা নিয়েছিল আবুল বাশারের কাছ থেকে কোনো একটা কাজে; এখন যদিও মনে নেই কি কাজে কলমটা নিয়েছিল সে। ধারে নেয়া কলম ফেরত পেয়ে আবুল বাশার হয়তো অবাক হয় কিছুটা। সে নাঈমুদ্দিনকে জানায়; মসজিদে নামাজের ওয়াক্তের পরেও এখন এত মানুষ থাকে যে; তাকে কোনো কোনো দিন সমস্তটা দিন মসজিদেই কাটিয়ে দিতে হয় জায়গা দখলে রাখার জন্য। আবুল বাশার নাঈমুদ্দিনকে আলিঙ্গন করে আর তার গুম হওয়া ছোট ছেলে, নাঈমুদ্দিনের মৃত ছেলে-মেয়ে আর মসজিদে বেড়ে যাওয়া ফরিয়াদি মানুষদের কথা ভেবে ফুঁপিয়ে কাঁদে খানিক। নাঈমুদ্দিন একটু হাসে। আবুল বাশারের চোখে কান্নার জন্য পানি আছে এখনো!

নাঈমুদ্দিন আবুল বাশারকে রেখে আবার পানিতে নামে। একটা ইঁদুর সাঁতরাতে সাঁতরাতে ওকে সঙ্গ দেয় খানিক; এমনকী একবার চোখ ঘুরিয়ে নাঈমুদ্দিনকে দেখেও নেয়, তারপর প্রাচীর ঘেঁষে ভাসতে থাকা শোলার বাক্সে উঠে গা ঝেড়ে নেয়। মেইন রাস্তার ধারে ফুটপাথে অস্থায়ী দোকানগুলো টানা বৃষ্টিতে ভিজে ক্লান্ত; এখনো চোখ মুদেই আছে; নিজেদের খুলে ধরার খুব একটা তাড়া নেয় ওদের। শুধু একটা চায়ের দোকানে চুলো জ্বলে উঠলো কেবল। নাঈমুদ্দিনকে দেখে দোকানি অলস হাসে; বলে; পানি-লিকার গরম হতে আরো মিনিট পাঁচেক লাগবে; ততক্ষণ চাইলে সে একটা টোস্ট এ কামড় দিতে পারে। নাঈমুদ্দিন জানায় সে চা খাবে না; তবে; অনেক দিন আগে বেখালে সম্ভবত চায়ের দাম দিতে ভুলে গেছিল সে; ভিড়ের মধ্যে দোকানিও হয়তো খেয়াল করেনি; আজ সে চায়ের দামটা দিতে চায়। দোকানি আবার হাসে; বলে, চায়ের দাম দিতে হবে না; বরং সে আরেক কাপ চা খেতে পারে এখন। নাঈমুদ্দিন থম ধরে থাকা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে কালো কালো মেঘেরা জোট বাঁধছে আবার; দীর্ঘকাল ধরে ঝরবে বলে। নাঈমুদ্দিনের হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে দোকানি বলে; এ বছর দুনিয়া ডুবে যাবে বৃষ্টিতে; নূহের নৌকাও থৈ পাবে না। পলিথিনের পর্দা মোড়া এক রিকশা এসে থামে চা দোকানের পাশে; একটা মেয়ে পর্দা সরিয়ে জানতে চায় ১০০ টাকার নোট ভাঙতি হবে কিনা। নাঈমুদ্দিন ভাবে মেয়েটার সাথে নিরুর কতো মিল! অবশ্য এখন সব মেয়েকে ওর নিরুর মতোই মনে হয়। চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র মেয়ে বলে নিরু কি একটু বেশিই আদরের ছিল ওদের? চল্লিশ দিন আগে; যেদিন নিরুর দোমড়ানো মোচড়ানো শরীরে কিছু অংশ পাওয়া গেল অনেকটা না পাওয়ার মতোই; ছড়ানো ছিটানো; মেইন রাস্তার ধারে একটু জঙ্গল মতো এলাকায়; সেদিনের কথা নাঈমুদ্দিন ঠিকঠাক মনে করতে পারে না। অনেকেই বলছিল; এখানে প্রায়ই রেপড মেয়েদের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। কোনো কোনো বাবা-মার কপাল নাঈমুদ্দিন-রেনুর মতো ভালো; তারা অন্তত শনাক্ত করতে পারে তাদের মেয়েদের।

প্রথমে বৃষ্টির বড়ো কয়েকটা ফোঁটা নাঈমুদ্দিনকে সশব্দে বিদ্ধ করে; অনেকটা পরখ করে দেখার মতো; তারপর তুমুল আক্রশে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নাঈমুদ্দিন বৃষ্টির ঝাপসা পর্দা ঠেলেই রাস্তায় নামে দোকানির বিহ্বল চোখ উপেক্ষা করে। ও যখন বাড়ির রাস্তায় উঠলো; পানি হাঁটু ছাড়িয়ে উঠতে চাইছে কোমরে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় অল্প অল্প হাঁপায়। খোলা দরজায় রেনু দাঁড়িয়ে আছে; ঠিক যেমন থাকতো আগে। রেনু নাঈমুদ্দিনের হাত ধরে ঘরে ঢোকে; শুকিয়ে নিতে বলে নিজেকে; আরও বলে; ওর সব প্রস্তুতি নেয়া হয়ে গেছে। ঘরটা গুছিয়ে রেখেছে রেনু। বাবুর খুব প্রিয় একটা টি-শার্ট ছিল; বুকে আসাদের পোর্ট্রেট; সেটা ঝুলছে আলনায়। অপুর ব্যাডমিন্টন ব্যাট; সার্ভ করার জন্য মুখিয়ে আছে দেয়ালে। আর নিরু তো সবখানেই; দরজায় বড়ো বড়ো অক্ষরে নিরুর নাম, গত জন্মদিনে মায়ের দেয়া প্রথম শাড়ি, আরো কত কী!

রেনু বুড়ো বেড়ালটার জন্য একটু খাবার রেখে আসে বারান্দায়, বৃষ্টির ছাঁট বাঁচিয়ে। ওরা অনেকদিন পরে একসাথে খেতে বসে; ঠিক আগের মতো। কাজল চশমা ছাড়াই বসেছে, রেনু মাছের কাঁটা বেছে দেয় ওকে। নাঈমুদ্দিন তার ছোটবেলার গল্প বলে হাসায় ওদের। খাওয়া শেষে ওরা একসাথে খানিক ক্ষণ বৃষ্টি দেখে। কী অবিরাম বর্ষণ, যেন কয়েক জন্ম ধরে ঝরে চলেছে! নাঈমুদ্দিন সেই চা দোকানির কথা বলে অস্ফুটে; এবারের বৃষ্টিতে পৃথিবী তলিয়ে যাবে নাকি। অতিকায় দানবীয় বাড়িগুলো আর বড়ো হতে না পেরে ডুবে যাবে হয়তো! ওদের ক্রমশ ভারী হয়ে আসা চোখের সামনে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বড় হতে হতে খুব ধীরে গড়িয়ে পড়ে আর ওরা নিজেদের প্রতিবিম্ব দেখতে পায় ফোঁটাগুলোর মধ্যে। তখন ওরা ধীর পায়ে ঘরে ফেরে; পরিপাটি বিছানায় সমর্পিত হয়। কাজল মাকে জড়িয়ে ধরে শোয়; ঠিক ছোটবেলার মতো। রেনু প্রগাঢ় ঘুমে জড়িয়ে যাওয়ার আগে দেখে; বাবু-অপু-নিরুও উঠে আসছে বিছানায়। কতো ছোট ছোট, তুলতুলে হাত-পা ওদের! আর কী অলৌকিক গন্ধ ওদের চুলে! রেনু বুক ভরে শ্বাস নেয়। অনন্ত ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার আগে নাঈমুদ্দিন ওদের সবাইকে জড়িয়ে রাখে শক্ত করে; যেন কেউ আর বিচ্ছিন্ন হতে না পারে।

অলংকরণ শিবলী নোমান