রাত ঠিক একটা একচল্লিশ মিনিটে সুবিন্যস্ত ব্যালকনির স্বচ্ছ কাচের স্লাইডিং ডোরটা টেনে খুলে দিলেন শেখ হাসানুজ্জামান। সুইচবোর্ড চেপে দেওয়াল বাতি জ্বালিয়ে বসে পড়লেন নরম কুশনে গা ঢেকে রাখা বেতের চেয়ারটায়। বাম হাতের কনুই দিয়ে আলতো চাপ দিলেন চেয়ারের বাকা হাতলে, নিজের ডান হাতের তর্জনি এবং মধ্যমার ফাঁকে ধরে রাখা গনগনে সিগারেট থেকে কুণ্ডলী পাকানো যে ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন তা বাতাস পেয়ে এদিক-সেদিক নাচানাচি করতে করতে বারান্দার টবে ঘুমিয়ে থাকা গাছগুলোর ইন্দ্রিয়তে নাড়া দিতে শুরু করলো। ঠিক সেই মুহূর্তে হাসানুজ্জামানের হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে, সিগারেটের ধোঁয়ার নিকোটিন কি মানুষের মতো গাছেরও ক্ষতি করে?—বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু বেঁচে থাকলে তাকে এই প্রশ্নটা করা যেত।

ব্যালকনির লোহার গ্রিলের বাইরে তখন নীরব অন্ধকার, হাসানুজ্জামানের চোখ দুটো ইতিউতি ব্যর্থ ঘোরাঘুরি শেষে আবার ফিরে আসে ভেতরের এক চিলতে আলোয়, টবে সযত্নে লালিত নয়নতারা গাছের ওপর। তার স্ত্রী শেলীর নানা প্রজাতির গাছ সংগ্রহ করার নেশা। এক নয়নতারাই লাল, বেগুনি, সাদা, গোলাপি রঙের, অথচ প্রায় চুয়ান্ন বছর অব্দি হাসানুজ্জামান নয়নতারাকে শুধু গোলাপি রঙেই চিনতেন। শেলীর পড়াশোনা উদ্ভিদবিজ্ঞানে, শুধু একাডেমিক পড়াশোনাই নয়, ব্যবহারিক অর্থেও গাছ নিয়ে প্রতিনিয়ত ঘাটাঘাটি করে শেলী, তার মুখেই শুনেছেন এগুলো নাকি হাইব্রিড নয়নতারা, একটু বেশি জল পড়লেই মরে যায়। কিন্তু আমাদের বসত ভিটার আশেপাশে অযত্ন-অবহেলায় জন্মানো দেশি গাছ হাজার ঝড়-ঝাপ্টাতেও অভিযোজনে সক্ষম। রাত বাড়ে, নয়নতারার ভাবনা আরো গভীর হয়, যখন হাসানুজ্জামানের মনে পড়ে এই সামান্য একটি গাছ নিয়ে শহীদুল জহির কী চমৎকার একটি গল্প লিখেছেন।

গত তিন সপ্তাহ ধরে একটি বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে ঘুরে চলেছেন হাসান। একটা নতুন গল্প লেখার জন্য কোনো বিষয় তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। এদিকে ‘দৈনিক আলোর কথা’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক সাহেব হাত কচলে ঈদ সংখ্যায় গল্প দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। অনুরোধ উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু জনপ্রিয় লেখক হাসানুজ্জামানের একটি গল্পের বিনিময়ে যে টাকা পাঠানো হবে, অবহেলায় তা তিনি মাড়িয়ে যেতে পারেন না। সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে শুধু লেখালেখিই করবেন বছর দুই আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হাসান, শুনে শেলীর গলায় ঝরে পড়ে আক্ষেপ, তোমার এ সিদ্ধান্ত বোধকরি ঠিক হচ্ছে না।

শেলী, আমাদের নিজেদের ফ্ল্যাট, ছেলেমেয়ে বিদেশের মাটিতে শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে গেছে, বারবার মানা করার পরেও মাসে মাসে টাকা পাঠায়, এছাড়া ব্যাংকে যা ব্যালেন্স আছে তার মুনাফায় বেশ চলে যাবে দুজনের। এত চিন্তা করার কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। 

কিন্তু নিজের একটা আইডেন্টিটি তো লাগে।

তুমি তাহলে মনে করো একজন চাকরিজীবীর আইডেন্টিটি লেখকসত্তার চেয়ে বড়ো!

এ কথার পর শেলী আর কথা বাড়ান না। হাসান লেখালেখিতেই তার সবটুকু সময় এবং মনোযোগ ঢেলে দেন। সাহিত্য জগতে নিজের আসন বেশ শক্তপোক্ত করে ফেলেছেন, বইমেলায় তিন-চারটি বই আসে, জনপ্রিয়তা ঘুরে বেড়ায় অফলাইন-অনলাইন, বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকেরাও তাকে বেশ সমীহ করে চলেন। অথচ সেই হাসানুজ্জামান কিছুদিন ধরে লেখার বিষয় খুঁজে পাচ্ছেন না, অন্যের কাছে এ কথা হতে পারে হাস্যকর, তাই খোলাশা করে কাউকে তা বলতেও পারছেন না। শুধুমাত্র শেলীর কাছেই নিজেকে মেলে ধরেছেন, বলেছেন কিছুদিন বাবার বাড়ি থেকে তাকে বেড়িয়ে আসতে। একাকিত্ব এলে যদি লেখা আসে এমন একটি পরীক্ষায় বসতে চেয়েছেন তিনি। স্ত্রী একথা শুনে চোখ গোল গোল করে তাকিয়েছিলেন আধা মিনিট, পরে অবশ্য মেনে নিয়ে সুযোগ দিয়েছেন তাকে, ডিপ ফ্রিজ ভর্তি করে রান্না মাছ-মাংস আলাদা আলাদা বাক্সে থরে থরে সাজিয়ে চলে গেছেন উত্তরা।

ইচ্ছে করলে হাসানুজ্জামান ঘরের ভেতরে বসেই সিগারেট ধরাতে পারেন, এ বাসায় অন্য আর কেউ এখন নেই সিগারেটের ধোঁয়ায় যার ক্ষতি হতে পারে কিন্তু কেমন যেন অস্বস্তি লাগে তার, তাই অভ্যাসবশত বারান্দাতেই বসেছেন। শেষ ধোঁয়াটা বাতাসে মিলিয়ে দিয়ে লেখার ঘরে ঢুকে চালু রাখা কম্পিউটারের সামনে বসে পড়লেন তিনি। লেখার বিষয় না পেলেও কম্পিউটারটি প্রায় সারাক্ষণ চালু রাখেন, মাঝে মাঝে পুরনো ফাইল ঘেটে নিজের বিভিন্ন লেখা পড়েন, স্ক্রিনে সবসময় একটি নতুন ওয়ার্ড ফাইল খুলে রাখেন, এটাতেই প্রতিদিন কিবোর্ড চালাতে চান কিন্তু ধরা দিচ্ছে না অক্ষর। ঘুম না আসায় আজ ভদকাতেও টান পড়েছে বেশি। সবসময় পান করেন না তিনি কিন্তু অস্থিরতা কাটাতে ফাঁকা বাসার একাকী সন্ধ্যায় মাঝে মাঝে বোতল নিয়েও বসে পড়ছেন। রাত ঠিক দুইটা বারোয় কলিংবেলের আওয়াজে চমকে ওঠেন হাসানুজ্জামান। টলায়মান পা মেপে মেপে দরজা খুলে দেন। 

আপনি?

আগন্তুকের পোশাক অতি উজ্জ্বল সাদা ধুতি-ফতুয়া। ঢাকা শহরের রাস্তায় কারো গায়ে এমন পোশাক দেখেছেন বলে মনে পড়ে না হাসানুজ্জামানের। বহু বছর আগে বন্ধু শ্যামলের দাদুকে দেখতেন এমন ধুতি পরতে, কিন্তু তিনি তো ঘর থেকেও বের হতেন না। আগন্তুক বোধহয় বুঝতে পারলেন, তিনি স্থির চোখে হাসানের দিকে তাকালেন, ভেতরে এসে বলি?

সেই চাউনিতে তন্ময় হয়ে দরজাটা ছেড়ে লেখার টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লেন হাসানুজ্জামান। আগন্তুক তার সামনে রাখা একটি সোফায় ধীর পায়ে এসে বসলেন।

হাসান, আমার একটি গল্প আছে। আমি তোমাকে তা বলতে চাই কিন্তু বারবার প্রশ্ন করে আমাকে বিব্রত করা যাবে না।

হাসানুজ্জামান কয়েক সেকেন্ড ভাবেন, তার দরকার গল্পের প্লট। আগন্তুক কে অথবা তার পোশাক কেমন এসব নিয়ে অযথা কৌতূহলী হয়ে লাভ নেই। তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। 

শান্ত স্বরে আগন্তুক শুরু করেন, ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের বাড়ির সিঁড়ির ওপর সকালের মিঠে রোদে ঘুমিয়ে আছে পোষা বিড়ালটি, তার লেজের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে একটি রক্তবর্ণের কেন্নো। লেজে সুরসুড়ি লাগায় গা ঝাড়া দেয় বিড়াল, কেন্নোটি আত্মরক্ষার জন্য নিজেকে গুটিয়ে ছিটকে পড়ে একটি আমগাছের শিকড়ের গায়ে। গাছের ডাল থেকে তখন নেমে আসে একটি শালিক, টুপ করে গিলে ফেলে আস্ত প্রাণীটির শরীর। বারান্দায় একটি কালো পাথরের থালায় ভাত খেতে বসেছেন কালীনারায়ণ। খাওয়া শেষে থালাটি ধুয়ে তিনি ভাত বেড়ে দেন উঠানে অপেক্ষারত বাড়ির মেথরটিকে। দাদুবাড়ি বেড়াতে এসেছে অতুল। কালীনারায়ণের সঙ্গেই সারাক্ষণ সময় কাটে তার। দাদু তাকে শেখান মানুষ শুধুই মানুষ, প্রতিটি মানুষের ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতিও এক। নিজের লেখা গান আদরের নাতির রক্তে মিশিয়ে দেন। কালীনারায়ণের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা এবং গান কিশোর অতুলের শিরা-উপশিরায় প্রবাহিত হতে থাকে।  

আমার মনে হচ্ছে আপনাকে আমি চিনতে পারছি, কিন্তু… 

অযথা কৌতূহল না দেখাতে বলেছিলাম হাসান। তোমার দরকার গল্প।

বিরক্তি ঝরে পড়ে আগন্তুকের গলায়।

হাসানের সুরে অনুনয়, আর এমন হবে না।

বিরক্তি কাটিয়ে আগন্তক শুরু করেন।

কিশোর বয়সের এই সুখী জীবন বেশি দিন টেনে নিতে পারলো না অতুল, অপ্রত্যাশিতভাবে মারা গেলেন বাবা। বাবা না থাকায় মায়ের সঙ্গে বন্ধন যেন আরো দৃঢ় হলো অতুলের। নিজের সমস্ত শ্রদ্ধা-ভালোবাসা মা ছাড়া আর কাউকেই যেন তখন দেওয়ার রইলো না।

স্বামী মারা যাওয়ার পর ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবার কাছেই চলে এলেন অতুলের মা। নিজের জীবনের আইডল মা এবং দাদুকে একসঙ্গে কাছে পেয়ে আবার আনন্দে ভরে গেল অতুলের মন। কিন্তু সুখ যেন কিছুতেই স্থায়ী হয়ে ধরা দেয় না অতুলের জীবনে।

আচ্ছা, হাসান, বলতে পারো, প্রাণপ্রিয় মা যখন বাবাহারা ছোট-ছোট সন্তান রেখে অন্য একজনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই সন্তানদের মানসিক অবস্থা কেমন হয়?

হাসান উত্তর দেন না, যদিও তিনি নিজে কোনো প্রশ্ন করেননি। কিন্তু আগন্তুকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আবার যদি কোনো ভুল হয়ে যায়, তাই চুপ করেই থাকেন তিনি।

কিছুদিনের জন্য দাদার বাড়িতে বেড়াতে যান অতুলের মা। সেখানেই তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ের পিঁড়িতে বসার সিদ্ধান্ত নেন। সিগারেটের ধোঁয়া গাছের ক্ষতি করে কি না যার কাছে জানতে চাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলে হাসান, সেই জগদীশচন্দ্র বসুর শ্বশুরমশাইকে বিয়ে করেন তিনি।

হাসান চমকে ওঠেন। বারান্দায় বসে যে ভাবনা ভেবেছিলেন তিনি, তা আগন্তুক কীভাবে বুঝতে পারলেন, মাথায় আসছে না। আগন্তুক অবশ্য হাসানের কুচকে থাকা কপালের দিকে তাকিয়ে সেই কৌতূহলে পাত্তা দিলেন না।

শোনো হাসান, মায়ের এমন আকস্মিক বিয়ে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না অতুল। ভেতরে ভেতরে ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে থাকে। মনে মনে সংকল্প করে ব্যারিস্টার হওয়ার। কলেজে পড়ার জন্য চলে যায় মামার কাছে। কিন্তু মন যেন কিছুতেই শান্ত হয় না। ঘরে রাখা বইয়ের স্তূপের ওপর সারাক্ষণ মাথা গুঁজে রাখে, কোনো ঘটনা আর ছোঁয় না তাকে, মুখে নেই এক ফোটা হাসি। এমন মানসিক অবসাদের দিনে, এক পশলা বৃষ্টির মতো তার জীবনে আসে মামাতো বোন হেমকুসুম। ‘সারাক্ষণ তো মুখ ভার করে থাকো, এভাবে থাকলে মারা পড়বে। তুমি না ব্যারিস্টার হতে চাও। এসব দুখ কষ্টকে ছাইচাপা দিয়ে জীবনের গান গাও। বেহালা শুনবে?’

হেমকুসুম বেহালায় সুর তোলে, মুগ্ধ হয়ে শোনে অতুল। তার ব্যক্তিত্ব-রূপ অতুলকে তিরতির কাঁপায়। ধর্ম-আইনের বেড়াজাল পেরিয়ে মামাতো বোনের প্রেমের আগুনে ঝাঁপ দেয় সে।

হেমকুসুমের সঙ্গ তাকে নতুন করে বাঁচতে শেখায়, এই প্রেম বুকপকেটে নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়তে ইংল্যান্ডে পাড়ি দেয় অতুল। লন্ডনে মিডল টেম্পলে পড়ে, অবসরে অবাক চোখে দেখে ব্রিটিশ মিউজিয়াম। পড়ার সমান্তরালে চলে অপেরা, পাশ্চাত্য সংগীত, বিশ্বসাহিত্যের পাঠ। 

এক সময় কঠিন পড়ালেখার পাঠও চুকে যায়, ব্যারিস্টার অতুল ফেরে কলকাতায়। নাম লেখায় হাইকোর্টে। শুরু হয় কর্মজীবন। 

কী হে হাসানুজ্জামান, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?

এক সেকেন্ড দেরি না করেই তড়াক করে মাথা তোলেন হাসান।

বুঝলে হাসান, অতুল এবার মামাতো বোন হেমকুসুমকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। হিন্দু ধর্মে মামাতো-পিসতুতো ভাই-বোন বিয়ে করতে চাইলে কি হতে পারে তা বুঝতে পারছো তুমি?

মাথা নেড়ে বুঝতে পারার সম্মতি জানান দেন হাসান।

এই বিয়ে না সমাজ মেনে নেয়, না হয় আইনসিদ্ধ। কিন্তু অতুলের গভীর প্রেম তখন, বলতে পারো এক রকম জিদও, মায়ের বিয়ের পাল্টা প্রতিশোধও ফুটে ওঠে তার এই বিয়ের সিদ্ধান্তে। মা যেমন ভেবে দেখেননি কিশোর অতুল এবং তার তিন বোনের ভবিষ্যৎ, অতুলও তেমন ভাবে না মায়ের নিষেধ অথবা সমাজের ভ্রুকুটি। সিদ্ধান্তে অটল, হেমকুসুমের সঙ্গেই তার বিয়ে হবে। কিন্তু আইন অনুশীলনরত মানুষ হিসেবে বিয়েকে আইনসিদ্ধ করেই তবে বিয়ে করার কথা ভাবে সে। বুদ্ধি দেন অতুলের সিনিয়র আইনজীবী, ‘স্কটল্যান্ডে গিয়ে বিয়ে করো অতুল, সে দেশে এমন বিয়ে হয়।’

আত্মীয়-স্বজন শিউরে ওঠেন। পরিবারের পক্ষে ওঠে প্রবল আপত্তি। সবার মতের বিরুদ্ধে গিয়ে স্কটল্যান্ডের গির্জায় মামাতো বোন হেমকুসুমকে বিয়ে করে অতুল। ইংল্যান্ডেই শুরু করে আইন অনুশীলন, কিন্তু জমে না প্রসার। হেমকুসুমের কোলজুড়ে আসে দুই জমজ সন্তান, সেই সঙ্গে শুরু হয় মারাত্মক অর্থকষ্টের দিন। শেষ সম্বল গয়না বিক্রির জন্য স্বামীর হাতে তুলে দেয় হেমকুসুম, কিন্তু তাতে আর কতদিন! এক সন্তানের হলো অকাল মৃত্যু। স্ত্রী এবং বেঁচে থাকা সন্তানসহ অতুল আবার ফিরে আসে কলকাতায়, কিন্তু কোনো আত্মীয় এই দুর্দিনে বাড়ায় না সহযোগিতার হাত। অতুল আবার ছুটে চলে লখনৌ। সেখানে অবশ্য আইনের প্রসার জমে ওঠে, গানের খ্যাতিও হয়।   

মন দিয়ে শুনছো তো হাসান?

হাসানের ভেতরে কেন জানি একটা দমবন্ধ কষ্ট দলা পাকিয়ে উঠে গলার কাছে কাঁটার মতো বিঁধে থাকে। কথা না বলে শুধুই মাথা নেড়ে যায়।

জানো হাসান, রাতের অন্ধকারে লখনৌয়ের রাস্তায় ঘুমিয়ে থাকা ছিন্নমূল মানুষ পেলেই তার পাশে চুপিসারে টাকা রেখে আসে অতুল। নিজের জীবনের দরিদ্রতা দিয়ে এর হাহাকার অনুভব করতে পারে অতুল। তাই এসব হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ায় সে, বিনিময়ে চায় না কিছুই। ভালোবাসার কাঙাল একটা মানুষ জীবনের আনাচ-কানাচে শুধু খুঁজে বেড়ায় ভালোবাসা।

লখনৌতে যশ-খ্যাতি-অর্থ-বিত্ত সব এলো, তবু সুখ এলো না জীবনে। স্বামী মারা যাওয়ার পর অতুলের মা সিদ্ধান্ত নিলেন ছেলের কাছে এসে থাকবেন। হেমকুসুম অসম্মতি জানায়, আমি চাই না তোমার মা আমাদের সঙ্গে থাকুক।

কিন্তু বিধবা মা একা এই বয়সে কোথায় যাবেন?

তুমি কি ভুলে গেলে এই মা তোমাদের চার ভাইবোনকে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়ে নিজের সুখ খুঁজে নিয়েছিলেন, আমাদের বিয়ে নিয়েও তার ছিল প্রবল আপত্তি—ঝাঁঝালো গলায় বলে চলে হেমকুসুম। 

এই বিয়ে সহজে মানার মতো ছিল না হেম। ভুলে যেও না তিনি তোমার পিসিমা। এমন নির্দয়ের মতো কথা বলো না।

যে নিজেই নির্দয় তাকে দয়া দেখানোর কিছু নেই, তোমার মা যদি এই বাড়িতে থাকতে আসেন, তাহলে আমি এখানে থাকবো না।

হেমকুসুমের এই কথার পরেও মা আসেন অতুলের বাড়িতে, শাশুড়ি-বউয়ের ঝগড়া ওঠে চরমে। বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় হেমকুসুম। কাছের মানুষেরা অনেক চেষ্টা করে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর কিন্তু নিস্ফল চেষ্টা। অতুল নিজের গানের মধ্যেই ডুবে থাকে। কী গভীর ভালোবাসে সে হেমকে কিন্তু নিজের অবয়ব নিয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে বড় সংকোচ হয়, ব্যক্তিত্বে বাধে।

মারা যান অতুলের মা, স্বামীর ঘরেও ফিরে আসে হেমকুসুম কিন্তু বাকযুদ্ধ তবু থেমে যায় না। 

এই ছবি এখানে টানিয়ে রেখেছো কেন?—অতুলের ঘরের দেওয়ালে টানানো শাশুড়ির ছবির দিকে তাকিয়ে বলে হেমকুসুম। 

এমন করে বলছো কেন হেম? মায়ের ছবি!

ছবিটা নামিয়ে ফেলতে হবে।

একজন মৃত মানুষের সঙ্গে রেষারেষি চলে না হেম। 

ছবিটা তাহলে তুমি এভাবেই রাখবে?

হ্যাঁ। 

মনে রেখো এবার গেলে আর আমি ফিরবো না।

অতুল বাধা দেয় না। চলে যায় হেমকুসুম। প্রতিটি দিন শুরু হয় নতুন আশায়, অতুলের মন বলে আজই ফিরে আসবে হেম, কোর্ট থেকে এসে দেখবে খাবার বেড়ে অপেক্ষায় আছে সে।

ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে খসে যায় এক একটা দিন। কিন্তু ফেরে না হেমকুসুম। মন পুড়ে যেতে যেতে শরীর ছোয়। কঠিন অসুখে পড়ে অতুল। বিছানার সঙ্গে লেগে যায় শরীর, স্ত্রীর অপেক্ষায় অনির্মেশ তাকিয়ে থাকে দুচোখ। তাকে নিয়ে বাঁচতে বড় সাধ জাগে অতুলের। অপেক্ষা দীর্ঘ হয়, সেই সঙ্গে বেদনাও। হেমকুসুমের পথপানে চেয়ে চেয়ে চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে যায় এক অতৃপ্ত প্রেমিক অতুলপ্রসাদ সেন। 

আপনি! অতুলপ্রসাদ সেন!

গুলশানের আভিজাত্য ছাপিয়ে কোথায় যেন ডেকে ওঠে মোরগ। বারান্দা থেকে ভেসে আসতে থাকে চড়ুই দম্পতির ঝগড়ার আওয়াজ। ভোরের মৃদু আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ে লেখার টেবিলে। ভদকার নেশা কেটে যায় হাসানুজ্জামানের, ঘাড় উঁচু করে ঘরের চারপাশে তাকান। কিন্তু ঘরের কোথাও কেউ নেই, সদর দরজা ঠিকঠাক আটকানো। হাসানুজ্জামানের চোখ পড়ে কম্পিউটার স্ক্রিনে, দুই হাজার শব্দের কালো কালো অক্ষরগুলো ভেসে বেড়াতে থাকে সাদা ওয়ার্ড ফাইলের ওপর।  

‘সংসারে যদি নাহি পাই সাড়া,
তুমি তো আমার রহিবে।
বহিবারে যদি না পারি এ ভার,
তুমি তো বন্ধু, বহিবে।’

ভেসে আসা গানের উৎস খুঁজে পান না হাসানুজ্জামান, তবে কি এ গান তার মগজের কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়েছে, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেন না হাসানুজ্জামান।

অলংকরণ শিবলী নোমান