।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

বিশ্বজুড়ে নতুন মাত্রা পেয়েছে আলোদূষণ। নগরায়ণের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাত্রিকালীন এই আলোদূষণ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসছে উদ্বেগজনক তথ্য। বড় শহরগুলো তো আগেই বিপদ এনেছে, এখন অপেক্ষাকৃত বৃক্ষরাজিশোভিত নতুন বা ছোট শহরেও এই দূষণের মাত্রা বাড়ছে।

পুরনো আমলের সড়কবাতির বদলে উচ্চক্ষমতার এলইডি বাতি ব্যবহৃত হচ্ছে, যাতে বিদ্যুৎখরচ কম। কিন্তু এসব বাতি ‘ইকোফ্রেন্ডলি’ বলে দাবি করা হলেও নানা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, তীব্র সাদা আলোর এসব বাতি অধিক পরিমাণে আলোদূষণ ঘটাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ত্রুটিপূর্ণ নকশার সড়কবাতি স্থাপন, যার মধ্যে বেশিরভাগ অপ্রয়োজনীয় ঊর্ধ্বমুখি আলোকচ্ছটাযুক্ত। গেলো বছরের এক গবেষণাকে উদ্ধৃত করে বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আধুনিক সাদা আলোর এসব সড়কবাতি এতোটাই আলোদূষণ ঘটাচ্ছে যে তা থেকে প্রাকৃতিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

পতঙ্গের জীবনচক্রে ব্যাঘাত

বিজ্ঞানীদের বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দশকগুলিতে দেখা পোকামাকড়ের “উদ্বেগজনক” হ্রাসে আলোদূষণ অবদান রাখছে। যুক্তরাজ্যের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃত্রিম রাস্তার আলো নিশাচর মথের আচরণে ব্যাঘাত ঘটায়, শুঁয়োপোকার সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে দেয়। আধুনিক এলইডি স্ট্রিটলাইটগুলি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে বলে মনে হয়েছে৷

ক্রমবর্ধমান প্রমাণ রয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তন, বাসস্থানের ক্ষতি এবং কীটনাশকের কারণে কীটপতঙ্গের সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। কারণগুলি জটিল এবং বৈচিত্র্যময়, যার মধ্যে রয়েছে অরণ্য, তৃণভূমি এবং জলাভূমির ক্রমাগত ক্ষতি, কীটনাশকের অত্যধিক ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নদী ও হ্রদের দূষণ। রাতের বেলায় কৃত্রিম আলোর ব্যবহার পোকামাকড় হ্রাসের আরেকটি চালক হিসাবে উঠে এসেছে।

গবেষকরা বলছেন, সায়েন্স অ্যাডভান্সেস-এ প্রকাশিত তাদের গবেষণাটি এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ যে আলোক দূষণ স্থানীয় পোকামাকড়ের জনসংখ্যার উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে, যার পরিণতি পাখি এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য ভীষণভাবে ক্ষতিকর যারা খাদ্যের জন্য শুঁয়োপোকার উপর নির্ভর করে।

এসব পাখি ও প্রাণীর বেশিরভাগই নগরজীবনে প্রভাব বিস্তারকারী মশা, মাছি কিংবা ইঁদুর, তেলাপোকাদের মতো পতঙ্গ ও প্রাণীর সংখ্যা হ্রাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে আলোদূষণে পতঙ্গের জীবনযাত্রা প্রভাবিত ও সংখ্যা কমলে এসব প্রাণী ও পাখিদের সংখ্যাও কমবে খাবারের অভাবে। ফলে মশা-মাছির মতো পতঙ্গ ও প্রাণীর সংখ্যা বেড়ে যাবে।

ইউকে সেন্টার ফর ইকোলজি অ্যান্ড হাইড্রোলজির প্রধান গবেষক ডগলাস বয়েস বলে, “যদি পোকামাকড় সমস্যায় পড়ে – যেমনটা আমরা দেখতে পেয়েছি ও প্রমাণ করেছি – সম্ভবত আমাদের এই নেতিবাচক প্রভাবগুলি হ্রাস করার জন্য আমাদের যথাসাধ্য করা উচিত।”

তাহলে কি সড়কবাতি রাখবো না?

ইউরোপ ও অ্যামেরিকায় সাম্প্রতিককালে আলোদূষণ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা তৈরির জন্য নানা সংগঠন গড়ে উঠেছে। বিস্ময়করভাবে তাদের সবাইকেই স্থানীয় সড়কবাতি স্থাপনকারী কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রথমেই যে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো, আমরা কি তবে সড়কবাতি জ্বালবো না? আপনারা কি তাহলে শহরকে অন্ধকার রাখতে চান? স্বাভাবিকভাবেই এসব সংগঠন বিষয়গুলো নিয়ে যথাযথ গবেষণার মধ্য দিয়ে এর সমাধানও তুলে এনেছে। তারপরেও সুযোগসন্ধানী অপ্রয়োজনীয় আলোকায়নযজ্ঞের কারিগরদের সেই পুরনো প্রশ্নের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে দেখা যায়।

কানসাসের লিবেরাল ডাউন টাউনের প্রধান সড়কের আকাশের দিকে মুখ করে থাকা এই বাতিগুলোর ছবি দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ডার্কস্কাই অ্যাসোসিয়েশন দেখিয়েছে, কীভাবে অপরিকল্পিত সড়কবাতি আলোদূষণ তৈরি করে।

এসব অনাহূত প্রশ্ন এড়াতে ইন্টারন্যাশনাল ডার্কস্কাই অ্যাসোসিয়েশন তাদের নানা প্রকাশনা ও প্রচারনা অব্যাহত রেখেছে। শুরুতেই তারা বলে দিয়েছে, প্রধানত ভুল নকশা অথবা কোনোরকম দূষণপ্রতিরোধ বিবেচনা ছাড়াই ইচ্ছেমতো সড়কবাতি স্থাপন বন্ধ করা গেলেও আলোদূষণ অনেকটা করিয়ে ফেলা সম্ভব।

সংস্থাটি ‘খারাপ সড়কবাতি’ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, “কখনও কখনও রাস্তার আলোগুলি খারাপভাবে ডিজাইন করা হয় বা ভুলভাবে ইনস্টল করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত আপনার চোখের ওপর বা আপনার বাড়িতে জ্বলজ্বল করে। এটি আলোক সীমালঙ্ঘন হিসাবে পরিচিত – আলো যেখানে পড়ে যেখানে এটির উদ্দেশ্য, চাওয়া বা প্রয়োজন হয় না। দুঃখজনকভাবে, আপত্তিকর স্ট্রিটলাইটগুলি সরাতে পারা যায় না, কারণ একবার তা লাগানো হলে দীর্ঘসময় অবধি সেগুলো সরানো হয় না।” ফলে এসবক্ষেত্রে সড়কবাতি স্থাপনকারী কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনার তাগিদ দিয়েছে তারা।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, কৃত্রিম আলোর অনুপযুক্ত বা অত্যধিক ব্যবহার – যা আলোক দূষণ নামে পরিচিত – মানুষ, বন্যপ্রাণী এবং আমাদের জলবায়ুর জন্য মারাত্মক পরিবেশগত পরিণতি হতে পারে। আলো দূষণের উপাদানগুলির মধ্যে রয়েছে: একদৃষ্টি – অত্যধিক উজ্জ্বলতা যা চাক্ষুষ অস্বস্তি সৃষ্টি করে, স্কাইগ্লো – জনবসতিপূর্ণ এলাকায় রাতের আকাশের উজ্জ্বলতা, হালকা পাচার – যেখানে এটি উদ্দেশ্য বা প্রয়োজন হয় না সেখানে হালকা পতন ও বিশৃঙ্খল – উজ্জ্বল, বিভ্রান্তিকর এবং আলোর উত্সগুলির অত্যধিক গ্রুপিং।

বিশ্বের খ্যাতনামা আর্কিটেকচার বিষয়ক সংবাদপত্র আর্কডেইলির জুনিয়র এডিটর ও আরবান প্ল্যানিং বিশেষজ্ঞ আর্কিটেক্ট ভ্যালেরিয়া মন্টজয় বলেন, “ডিজাইনের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোর দূষণ কমানোর জন্য তিনটি ধাপ রয়েছে: উষ্ণ রং ব্যবহার করুন, আলো ম্লান করুন এবং এটিকে রক্ষা করুন।”

দূষণপ্রতিরোধী সড়কবাতির নকশা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “প্রথমত, নীল আলো ব্যবহার করার পরিবর্তে – যা সার্কাডিয়ান ঘুমের ছন্দে বেশি প্রভাব ফেলে – এটি কম-তাপমাত্রার এলইডি ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয় যা নরম, হলুদ বা লাল টোনে আলো জ্বলে (সাধারণত ৩০০০কে-এর বেশি নয়)। একই শক্তি দক্ষতার সাথে এবং নীল বিকল্পগুলির মতো একই দামে উত্পাদিত হওয়ার পাশাপাশি, এইগুলি কম আলো ছড়ায় এবং এইভাবে আরও রাতের আকাশ-বান্ধব। উপরন্তু, দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের দিকে নির্দেশ করার জন্য, আলোর স্তরগুলি মাঝারি, অভিন্ন হওয়া উচিত এবং ব্যবহার, অঞ্চল, সময় এবং ট্র্যাফিক অনুসারে মিলিত হওয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে, বেশিরভাগ বহিরঙ্গন আলো দৃশ্যমানতা হারানো ছাড়াই ২৫ শতাংশ কম করা যেতে পারে।”

আর্কিটেক্ট ও আরবান প্ল্যানিং বিশেষজ্ঞ ভ্যালেরিয়া মন্টজয় দেখিয়েছেন, কীভাবে আলোদূষণ কমানো যায়

তার মতে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর নিশ্চিত করা জরুরি যে আলো আকাশে আলো ছড়ানোর পরিবর্তে সড়কবাতি তার উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য কার্যকরভাবে লক্ষ্য করে কি না। কীভাবে? সমস্ত আলোর ফিক্সচার অবশ্যই সম্পূর্ণভাবে ঢালাই করা বা কেটে-অফ করা উচিত যাতে অনুভূমিক থেকে কোনও আলো বেরিয়ে না যায়। এইভাবে, এটিকে উপরের দিকে প্রজেক্ট করার পরিবর্তে, এটি নীচের দিকে পরিচালিত হয় – আদর্শভাবে একটি সংকীর্ণ কোণ যা শহরের উপরে আলোকে আরও সীমাবদ্ধ করে।