কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে উঠে দুমুঠো গুড়মুড়ি খেয়ে বেরিয়ে পড়ে নিতাই। ওর গন্তব্য এখন সেইসব বাড়িতে যেখান থেকে সে রোজ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খাঁটি দুধ সংগ্রহ করে। এই কাজে ওকে সাহায্য করে বারো বছরের ছেলে সবুর। সব বাড়ি থেকে দুধ সংগ্রহ হয়ে গেলে সাতটা নাগাদ বাজারে ফিরে নিজের ছোটো মিষ্টির দোকানটা খোলে নিতাই। দোকান খুলে দোকানের সবজায়গায় জলের ঝাপটা দিয়ে একটি ধুপকাঠি জ্বালিয়ে দেয়। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে খাঁটি দুধ সংগ্রহ করার এই অভ্যাসটা নিতাই শিখেছিল ওর স্বর্গীয় বাবার কাছ থেকে।

‘তুমি মানুষরে যা খাওয়াবা সেইটে সবসময় নিজে দাঁড়ায়ে থেকে যাচাই করে নিবা না হলি যে অন্যায় হয়ে যাবে বাপধন’—নিতাইয়ের পরলোকগত পিতার এই উপদেশ সবসময় মনেপ্রাণে মেনে চলে নিতাই। দুধ সংগ্রহ হয়ে গেলে নিতাইয়ের বাবার আমল থেকে কাজ করে আসা বুড়ো একজন ময়রা ওগুলো দিয়ে মিষ্টি বানানোর কাজ শুরু করে। নিতাইয়ের এই ময়রা জেঠু কথা একদম বলেন না বললেই চলে, একমনে কাজ করে যান শুধু। নিতাইয়ের মাঝেমধ্যে মনে হয় ময়রা জেঠু এই কাজের মধ্যেই জীবনের সব ধ্যান-জ্ঞান ঢুকিয়ে রেখেছেন, মিষ্টি বানাতে না পারলে হয়তো তিনি মরেই যাবেন! নিতাইয়ের দোকানের একমাত্র কর্মচারী হলো সবুর। নিতাইয়ের দোকানে রোজ অল্প কয়েক পদের মিষ্টি তৈরি হয়। এগুলোর মধ্যে ক্ষীর, চমচম, রসগোল্লা আর দই। নিতাইয়ের দোকানে আজপর্যন্ত কেউ কখনো বাসি মিষ্টির অস্তিত্ব টের পায়নি। দোকান বন্ধের আগেই ওর সব মিষ্টি বিক্রি হয়ে যায়। যদি-বা দু’একটা মিষ্টি থেকে যায় সেটা রাতে সবুরকে দিয়ে দেয় নিতাই। নিতাইয়ের দোকানের এই মিষ্টিগুলোর মধ্যে ক্ষীরের সুখ্যাতি মানুষের মুখে ফেরে। মিষ্টির দোকান দিয়ে অনেকের ভাগ্য ফিরলেও নিতাইয়ের ফেরেনি। আর এমনটা হওয়ার নেপথ্যের কারণও ওর মৃত বাবা। নিতাইয়ের বাবা যখন দোকানটা শুরু করেন তখন থেকেই খুব সামান্য লাভ করতেন তিনি এবং ছেলেকে মরার আগে আদেশ দিয়ে গেছেন মানুষকে খাওয়াতে হবে ভালো কিন্তু লাভ করতে হবে খুব অল্প। নিতাইয়ের বাবা এলাকার একজন সরল ও পরোপকারী মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন গ্রামের মানুষদের মাঝে। নিতাইয়ের বাবা আরো বলতেন, ‘সেই পুড়ায়ে ছাই করে ফেলবেনে রে বাপ, বিষয়সম্পদের লোভ কইরে পাপ কুড়োনোর কাজ খবরদার করবি নে।’ বাবার উপদেশ মান্য করতে যেয়ে জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বদাম আর সংসারের নিত্যনতুন চাহিদার কাছে নিতাইকে মাঝেমধ্যেই অসহায় হয়ে পড়তে হয়। যে ক্ষীর নিতাইয়ের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় সেই ক্ষীরে ওর এক পয়সাও লাভ করা মানা। বাবার আদেশ মানতে গিয়ে খরচের দামেই নিতাইকে ক্ষীরটা বিক্রি করতে হয়। নিতাইয়ের বাবার ভাষ্য অনুযায়ী এই ক্ষীরটা ভগবানের সৃষ্টি মানুষদের জন্য ওদের পক্ষ থেকে একমাত্র সেবা এবং তিনি আরো বলতেন সবজায়গায় লাভ করলে ঠাকুর নারাজ হন। অগত্যা নিতাইয়ের বাবার বেঁধে দেওয়া সীমিত লাভে অন্য মিষ্টিগুলো বিক্রি করে নিতাই। পিতার আদর্শে চলতে চলতে কদাচিত নিতাই ক্লান্তবোধ করে। নিতাইয়ের স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েটি একটি টিভির জন্য বায়না করছে আজ অনেকদিন হলো কিন্তু ওর সামর্থ্য নেই এই দোকান করে এরকম একটি জিনিস সে কিনবে। বাজারে মিষ্টির কিছু দোকানদার ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে নিতাইয়ের দোকানের মিষ্টির কাঁচামাল ও তৈরি করার প্রণালী সম্বন্ধে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয় না। কারণ যে ওর মিষ্টি একবার খায় তাকে আবার এখানেই খেতে আসতে হয়। একই সাথে মান ভালো এবং টাকারও সাশ্রয় হচ্ছে এমন সুযোগ সচরাচর হাতছাড়া করে না কেউ। অন্য গ্রাম থেকেও মানুষ ওর মিষ্টি খেতে এই গ্রামে আসে। জীবনের টানাপড়েনে ক্লান্ত হলেও নিতাইয়ের পরক্ষণেই মনে পড়ে যায় ওর বাবাকে ঘিরে ভালো কিছু স্মৃতির কথা। ছোটবেলায় ওর বন্ধুরা যখন একটু পান থেকে চুন খসালেই ওদের বাবাদের হাতে বেদম মার খেতো তখন নিতাই পেয়েছিল পুরোদস্তুর এক স্বাধীন জীবন। নিতাই কোনো ভুল করলে ওর বাবা ওকে আদর করে বোঝাতেন, গল্পের ছলে জীবনের নানা শিক্ষা দিতেন। সংসারের দারিদ্র্যতার সত্ত্বেও বাবাকে মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর অনেক ঘটনা নিতাই যেন চোখ বুজলেই চোখের সামনে দেখতে পায়। মানুষের জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখার এমন স্মৃতিগুলোই তাই আজো নিতাইকে অন্ধ পিতৃভক্ত করে রেখেছে। শৈশব থেকেই নিতাই দেখেছে কোনো ফকির বা গরিব লোককে দোকানের সামনে দিয়ে যেতে দেখলেই নিতাইয়ের বাবা ডেকে এনে দোকানের মিষ্টি খাওয়াতেন। কাজের অবসরে এমন অসংখ্য মধুর স্মৃতির কথা রোমন্থন করে নিতাইয়ের জীবনের রুটিন কাজগুলো চলতে থাকে। সেখানে কোনো গোলযোগ নেই, বৈচিত্র্য নেই। এমনই এক দিনে দোকান বন্ধ করে রাতে বাড়িতে ফিরছিল নিতাই। কিছুদূর এগোনোর পরে নিতাই বুঝতে পারে তাকে পেছন থেকে কেউ একজন ডাকছে। পরে দেখা গেল যে ডাকছে সে বছর বাইশের ছেলে, নাম ইব্রাহিম, বাজারে ওর একটা ফটোকপি ও কম্পিউটারের দোকান রয়েছে। ইব্রাহিম হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, ‘নিতাইকা, তুমার তো ভাগ্য খুইলে গেছে, তুমার তো ডিবিলটারি বাইধে গেছে।’ নিতাই পরিস্থিতির আকস্মিকতায় প্রথমটায় ঠিক বুঝে উঠতে পারে না ইব্রাহিমের কথা। পরে ধীরে ধীরে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে ওঠে তার কাছে। গত বছর আমেরিকা সরকারের ছাড়া ডিভি লটারির ফর্মফিলাপের জন্য তখন বাজারে একটা সাজসাজ রব পড়ে গিয়েছিল। অনেকেই চায়ের দোকানে এই আশ্চর্য লটারি নিয়ে গাল-গল্প করছিল এবং কল্পনায় আমেরিকার চলে গেলে সবার জীবনটা কীভাবে পাল্টো যাবে এসব নিয়ে চলছিল তুমুল আড্ডা। ‘মানুষ লটারিতে আগে বিল্ডিং পাতো, টাহা পাতো আর এহন পাচ্ছে মেমসাহেবগের দ্যাশ’—নির্মল মেকানিকের বলা এই কথাটি চায়ের দোকানে সেদিন হাসির রোল তুলেছিল। নিতাইয়ের প্রথম থেকেই এসব ব্যাপার নিয়ে কোনো আগ্রহ ছিল না। ফর্ম পূরণের শেষদিন নিতাইয়ের দোকানে মিষ্টি নিতে এসেছিল সম্পর্কে নিতাইয়ের খুড়তুতো দাদা রাধাচরণ। কথা প্রসঙ্গে রাধা জানতে পারে নিতাই এখনো ডিভি লটারির ফর্মটা পূরণ করেনি। রাধা যারপরনাই বিস্মিত হয় নিতাইয়ের এমন গোঁয়ার্তুমি দেখে। ভাগ্যবদলের আশায় যেখানে গাঁয়ের প্রায় সবাই এই তেলেসমাতি লটারি পূরণ করে ফেলেছে সেখানে নিতাই এমন নিশ্চিন্ত হয়ে কাজটা না করে বসে আছে কীভাবে এটা ওর মাথায় ঢোকে না। একপ্রকার রাধার জোরাজুরিতে বাধ্য হয়েই নিতাই ফর্মটা পূরণ করেছিল। এই নিয়ে পরবর্তীতে চিন্তাভাবনা করার বা খোঁজ-খবর রাখার কথা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি নিতাই। উল্টো কিছু টাকা যে কম্পিউটারের ছোকরাকে দেওয়া লেগেছিল সেই কথা ভেবে রাধার ওপর তখন কিছুটা রাগও ছিল নিতাইয়ের। ধীরে ধীরে গ্রামের সবাই জানতে পারে নিতাইয়ের ডিভি লটারি জেতার খবরটা। গ্রামে রাতারাতি নিতাইয়ের নামের সাথে আমেরিকা নামটিও পাশাপাশি উচ্চারিত হতে লাগলো। গ্রামে নিতাই বনে গেলো দর্শনীয় বস্তু। এদিকে নিতাইয়ের স্ত্রী ভীষণ খুশি হয় নিতাইয়ের এই ভাগ্যবদলের সংবাদ পেয়ে। পরেরদিনই মেয়েকে সাথে নিয়ে মন্দিরে পুজো দিয়ে আসে নিতাইয়ের বউ। এবার সংসারের দারিদ্র্য চিরতরে অবসান হবে ভেবে মনে খুশির জোয়ার বয়ে যায় ওর বউয়ের। চোখের সামনে ইতোমধ্যেই সবাই স্বপ্নের আমেরিকায় ওকে দেখে ফেলেছে ব্যাপারটায় নিতাইয়েরও প্রথমটায় বেশ আনন্দ হলো। সবার মধ্যে থেকে গাঁয়ের একমাত্র মানুষ হিসেবে কল্পনার সুখরাজ্যে নিতাইয়ের যাওয়ার সুযোগ হয়েছে এটা ভাবলে ওর বেশ আনন্দ হয়েছে প্রথমদিকে। কিছুদিন পরে সে চলে গেলে মিষ্টির দোকানটার কি পরিণতি হবে এই ভাবনাও বিচ্ছিন্নভাবে মাথায় আসছে ওর। নিতাইয়ের সাথে দেখা করতে আসা মানুষ এবং তাকে ঘিরে থাকা মানুষদের সবাই খুব দ্রুত বিস্মৃত হয় নিতাইয়ের দোকানটার কথা। বড়ো সুযোগ হাতে পেলে ছোট কিছুকে মানুষ হাসতে হাসতে পদদলিত করবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম হিসেবে জেনেছে সবাই। নিতাই বুঝতে পারে একবার আমেরিকা নামক দেশটায় যেতে পারলে ওর টাকা-পয়সা, বাড়ি-গাড়ির কোনো অভাব থাকবে না, জীবনটা পাল্টে যাবে খোলনলচে। আবার দৃশ্যপটে হাজির হন নিতাইয়ের স্বর্গীয় বাবা, যিনি মিষ্টির দোকানকে ব্যবসায়ের জায়গা থেকে সরিয়ে মানুষের সেবার ঘর বানিয়েছিলেন সচেতনভাবে। নিতাইয়ের বাবা বলতো—‘খায়ে পরে থাকতি মানুষির খুব বেশি কিছু লাগে না রে বাপ কিন্তু তুমার লোভ যদি বেশি হয় তয় অনেক কিছু থাকলিও তুমার মন ভরবার চাইবে না।’ ওই সাহেবদের দেশে গেলে জীবনে সুখ-সমৃদ্ধি আসবে ঠিকই কিন্তু ওর বাবার পর্বতসমান আদর্শকে কীভাবে ভুলে থাকা যায় সেটাই যেন সারাক্ষণ ভেবে চলছে নিতাই। ডিবি লটারি পাওয়ার পর থেকে নিতাইয়ের স্বাভাবিক কাজে ও চিন্তা-ভাবনায় একটু যেন ছেদ ঘটলো। নিতাইয়ের দোকানের ময়রা জেঠু একদিন সকালে নিতাইয়ের বাড়িতে এসে কোনো ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি বলে ফেললো, ‘তুমি চলে গেলে দোকানডা চালাবেনে কিডা কও দিনি? কর্তার আত্মায় কষ্ট পাইবো না?’ নিতাইয়ের পরিবারে যখন এমন খুশিতে উৎসব বয়ে যাচ্ছে তখন নিতাইয়ের ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক অচেনা স্রোত। দোকান ভালোভাবে শুরু করার পর বিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম নিতাই পরপর পাঁচদিন দোকান কামাই দিলো। সবাই এটাকে আসন্ন বিদেশ যাত্রার চিহ্ন বলেই ধরে নেয়। নিতাইয়ের মন খারাপ দেখে তার বউ ভেবেছে তাদের ছেড়ে চলে যেতে হবে একারণেই হয়তো তার স্বামীর মনটা খারাপ হয়ে আছে। এদিকে পাসপোর্টের কিছু কাজ করতে নিতাইকে জেলাশহরে যেতে হবে কিছুদিনের মধ্যেই। অবশেষে নিতাই কুলের দেখা পেলো। নিতাইকে পরদিন ভোরে দুধ সংগ্রহ করতে বাড়ি-বাড়ি যেতে দেখা গেল।

অলংকরণ শিবলী নোমান