।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

রাজশাহীর বাজারে ভোজ্যতেল নিয়ে তেলেসমাতি কারবার চলছে। তেলের বাজার অস্থিতিশীল করতে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী উঠে-পড়ে লেগেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা সয়াবিন তেল গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন। জেলা প্রশাসন কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা বলা হচ্ছে- আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। রাজশাহীতে ভোজ্য তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল বলেছেন, বাজারে ভোজ্যতেলের কোনও ঘাটতি নেই। গত এক সপ্তাহ থেকে তেলের দাম অনেক বেশি। পণ্যের সাপ্লাই ও ডিমান্ডের ওপর বাজারের দাম নির্ধারণ করা হয়। ডিলারদের কারসাজিতে বাজারে সয়াবিন তেলের ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়বে- এই আশায় মজুত করে রাখছেন অনেক ব্যবসায়ী। আর মজুত ঠেকাতে গত কয়েকদিন ধরেই মহানগরীসহ রাজশাহী জেলার বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে রাজশাহী ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

জেলা প্রশাসক ভোক্তাদের আশ্বস্ত করছেন যে, রাজশাহীতে আগামী তিন মাসের ভোজ্যতেলের মজুত রয়েছে। ভোজ্যতেলের কোনও ঘাটতি না থাকলেও তেলের দাম বৃদ্ধি বিষয়ে তিনি আরও বলেন, সয়াবিন মিলার, আমদানিকারক কোম্পানি এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মিলে তেল মজুত করে রাখার কারণেই মূলত খুচরা পর্যায়ে তেলের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে।

রোববার (৬ মার্চ) নগরীর হাদির মোড়ের ‘শাহাবুদ্দিন স্টোর’ নামের এক দোকান মালিক জুয়েলের বাড়ি থেকে ৮০০ লিটার সয়াবিন তেল পাওয়ায় ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও সোমবার (৭ মার্চ) রাজশাহীতে বেশি দামে সয়াবিন তেল বিক্রির অপরাধে তিন ব্যবসায়ীকে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া ২২৫ বোতল এক লিটারের তেল জব্দও করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর।

জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল আরও বলেন, সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে রমজান মাসকে সামনে রেখে সরকার সারাদেশে এক কোটি মানুষকে ভর্তুকি মূল্যে তেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও পেঁয়াজ বিক্রি করবে। সেই লক্ষ্যে রাজশাহীতে মোট দুই লাখ পরিবারকে ইতোমধ্যে ফ্যামেলি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। আগামী ১৫ মার্চ থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রয় কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানান তিনি। জেলা প্রশাসক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা কামনা করেন।

এদিকে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন জানান, একটি অসাধু চক্র এমন কাজ করছে। জেলা প্রশাসকসহ আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এসব অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।

রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু বলেন, আমরা একটা পরিবার নিয়ে কাজ করি। রাজশাহীর মানুষ শান্তিপ্রিয়। তাই তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনকে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করতে হবে। সেই লক্ষ্যে ব্যবসায়ীদের গোডাউনে মজুতের ডিকলারেশন জেলা প্রশাসনকে দিতে হবে। এ বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সচেতন হওয়ার আহবান জানান তিনি।

রাজশাহীতে তেরে বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনও সিন্ডিকেট আছে কিনা, এমন কথার উত্তরে তিনি বলেন, আমার জানা মতে নেই।

রাজশাহীর ব্যবসায়ী নেতা মো. সেকেন্দার আলী বলেন, রাজশাহীতে প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে থাকে। তাই এর আগে লবণের মূল্য নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে আমরা কাজ করেছি। বাজার খুবই সেনসেটিভ জায়গা। তাই আমাদের ব্যবসায়ীদের সচেতন থাকতে হবে।  

সপ্তাহখানেক ধরে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না এমন অভিযোগ করে রাজশাহী পরিবেশক সমিতির অর্থ সম্পাদক মো. শামসুজ্জামান বলেন, যারা বিদেশ থেকে তেল আমদানি করেন তারাই সিন্ডিকেট করে দাম নিয়ন্ত্রণ করেন।

ডিলারদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে নগরীর খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মার্চ মাসের প্রথমদিন থেকেই ডিলারদের কাছ থেকে তারা তেল পাচ্ছেন না। নগরীর সাহেব বাজারের একজন খুচরা বিক্রেতা বলেন, আবার কখনও পেলেও ডিলাররা বাড়তি দাম চাইছে তাদের কাছে।

সোমবার সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ভোজ্যতেলের ‘কৃত্রিম সংকট’ নিরসনে করণীয় বিষয়ক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন- অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কল্যাণ চৌধুরী, রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাসুদুর রহমান রিংকু, পরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, রাজশাহী বেনেতি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. সেকেন্দার আলী, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর রাজশাহী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মাসুদ আলী, টিসিবির অফিস প্রধান শাহিদুল ইসলাম, কৃষি বিপণন অধিদফতরের জেলা বাজার কর্মকর্তা মো. মনোয়ারা হোসেন, রাজশাহী সিটি গ্রুপের পরিবেশক নূর মোহাম্মদ, রাজশাহী পরিবেশক সমিতির অর্থ সম্পাদক মো. শামসুজ্জামান প্রমুখ।