।। কামরুল বাহার আরিফ ।।

ধরে নিই, এ পৃথিবীতে যাবতীয় প্রাণিকুলে পুংপ্রজাতি ছাড়া আর কোনো প্রাণী নেই। ভাবতে পারছেন? ভেবে কী পেলেন? আরও চিন্তা করুন। এবার বলুন, আপনি নিজে কি আছেন সেই কুলে? আছে কোনো সৃষ্টি, আছে কোনো স্রষ্টা? উপলব্ধি করুন নারী-পুরুষ সকলেই। আপনার বিশ্বাস বদলে যাবে। সকল আধ্যাত্মিক চিন্তা, শক্তি, ত্বত্ত্ব, দর্শন মুহূর্তে বদলে যাবে। দেশ, সমাজ, সাম্রাজ্য সভ্যতা নিমিষেই ফুঁস মন্তর ফুঁস হয়ে যাবে। সমস্ত সাহিত্য, আখ্যান শূন্য হয়ে যাবে এ পৃথিবীর। কোনো বৃক্ষ জন্মায়নি পৃথিবীতে—ধু ধু মরুময় তপ্ত এ পৃথিবী। অথবা সেই আগুনের লেলিহান অশান্ত পৃথিবী। প্রেম নেই, প্রণয় নেই, আকর্ষণ নেই, বিকর্ষণ নেই, জল নেই, আহার নেই। যদি এমন হতো তাহলে কেমন হতো মায়াময় এ পৃথিবী? এই মায়ার আধার তাহলে কী? কোথায় আপনার সাধনা? কার জন্য সাধনা? কে আপনার স্রষ্টা? আপনি কিসের সৃষ্টি। কোন স্রষ্টার আরাধনা? আপনার ধর্মই বা কী? আপনার জাতই বা কী? ধরে নিলাম আপনি পুরুষ প্রজাতি। আপনি শ্রেষ্ঠ। আপনি তো একক প্রজাতি। তাহলে কিসের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ? এক ও একের জন্য তো শ্রেষ্ঠত্বের প্রয়োজনও পড়ে না।

সকল সৃষ্টির একটা উপলক্ষ বা মাধ্যম থাকে। কী সে মাধ্যম? কেন সে মাধ্যম? সহজভাবে যদি ভাবি, সহজভাবে যদি স্বীকার করি, নিশ্চয়ই সে মাধ্যম প্রকৃতিগতভাবে নারী। সৃষ্টির এ এক অপার রহস্য! কেন সকল প্রাণীকুলে এই সৃষ্টি বা সৃষ্টির উদর থাকলো না, জন্মের দ্বার থাকলো না! এবার একটি তথ্য আপনাদের জানাচ্ছি। কত ভয়ঙ্কর সেটা একবার অনুভব করতে পারেন—‘পেইন বা ব্যথা পরিমাপের যন্ত্রের নাম ‘ডলরিমিটার’। আর পেইন পরিমাপের একক হলো ‘ডেল’। বিজ্ঞান বলছে, একজন স্বাভাবিক মানুষ সর্বোচ্চ ৪৫ ডেল পর্যন্ত ব্যথা সহ্য করতে পারে। তার বেশি ব্যথা উঠলে মারা যায় মানুষ। এবার জানুন, সন্তান প্রসবের সময় মায়ের ব্যথা ওঠে ৫৭ ডেল পর্যন্ত! আমি কিন্তু ভাবতে পারছি না। অন্তত এ থেকে সামান্য হলেও বুঝতে পারছি যে, প্রসব যন্ত্রণা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। আর এ ব্যথার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে শুধু তারাই বলতে পারবেন যেসব নারী মা হয়েছেন।’ সম্ভবত অন্য প্রাণীকুলের ক্ষেত্রেও তেমনই। তাছাড়া একটি শিশুকে ১০ মাস ১০ দিন গর্ভে রেখে তাকে জন্ম দেওয়ার যে কী কষ্ট, এবং প্রসব পরবর্তী কত জটিলতা থাকে তা উপলব্ধি করার সুযোগ পুরুষদের নেই।’ (সূত্র: ডেইলি হান্ট)

সে ক্ষেত্রে আপনি মানে পুংপ্রজাতি—বা আপনার অবদান তো শুধু জৈবিক ক্রিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তার বেশি কি? অথচ আপনি পৃথিবীর সকল সৃষ্টিকে শক্তিকে পূজা করেন, আরাধনা করেন। অবনত হন নির্দ্বিধায়। পাহাড়-পর্বত, সাগর-নদী, আগুন-সূর্য, বৃক্ষ-ফুল এমন কি মনসা পূজাও বাদ যায় না। প্রসঙ্গক্রমে হিন্দু পুরাণ মতে, ‘ব্রহ্মই আদ্যাশক্তি জগজ্জননী দেবী দুর্গা। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অত্যাচারিত জীবের দুর্গতি হরণ করার জন্য দেবী দুর্গার আবির্ভাব হয়। দেবতাদের সম্মিলিত তপস্যা ও জ্যোতি থেকে সৃষ্ট আদ্যাশক্তি মহামায়া দুর্গা নামধারণ করে মর্ত্যলোকে আগমন করেন। তান্ত্রিক সাধকরা দেবী দুর্গাকে মাতৃজাতির প্রতীক করুণাময়ী বলে তাকে নারী মূর্তিতে কল্পনা করেছেন। আদ্যাশক্তি মহামায়া জগজ্জননী দেবী দুর্গা কখনও ত্রিভূজা, কখনও অষ্টভূজা, আবার কখনও দশভূজা হিসেবে আবির্ভূত হন। সনাতন ধর্ম মতে, বস্তুত যিনি ব্রহ্ম তিনিই শক্তি। তিনিই দেবী দুর্গা। দুর্গাপূজা মূলত শক্তির আরাধনা। এর দর্শনটি হলো, দুর্বলের কোনো আত্মজ্ঞান হয় না, জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য চাই শক্তির সাধনা। আর ব্রহ্ম পরিপূর্ণতা লাভ করেন শক্তিতে। শক্তির পরিপূর্ণতার রূপায়ণ ঘটে জগৎসৃষ্টিতে।’ (অসিত রঞ্জন মজুমদার, রাইজিংবিডি, ৩১.০৮.২০২০)

তাহলে বলতে হয় শুধু শক্তি আপনাকে তাদের কাছে অবনত করে নেয়। এমনকি পুরুষের শক্তিও নারীর কাছে পূজনীয়। সৃষ্টির আদি থেকে পুরুষ তাদের প্রকৃতি প্রদত্ত শক্তিকে ব্যবহার করে জয় করেছে গোষ্ঠি, সমাজ, অঞ্চল এমনকি নারীকেও। এই জয়ের পিছনের ইতিহাস রক্তের ইতিহাস, হিংস্রতার ইতিহাস, জিঘাংসার ইতিহাস। এক একটি জয়ের শেষে, শক্তির উপহার হিসেবে নারী হয়েছে অবলা, নিরূপায় আর ভোগের সামগ্রী। ধীরে ধীরে সভ্যতার দিকে সমাজ এগিয়েছে। সৃষ্টিও আধুনিকতার দিকে এগিয়েছে। দীর্ঘ কোটি বছর ধরে মানুষের এই যাত্রায় প্রায় পুরোটা শাসন করেছে পুরুষেরাই। এই শাসনের পেছনে রয়েছে তাদের শক্তি বা শক্তির ক্ষমতা। প্রকৃতি প্রদত্ত এই শক্তিও তাদের ক্ষমতাকে একচ্ছত্র করতে পারেনি। সেই ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে যুগে যুগে ধর্ম এনেছে নানারূপে, নানা বিধি-বিধানে। ঐশ্বরিক অবয়ব দিয়েছে। সেখানে ভয় আর প্রলোভন যুক্ত করে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে ক্ষমতাবানরা বা শাসকেরা। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে সকল বিধি-বিধান সৃষ্টি হলো ঐশ্বরিক নামে তা পুরুষেরই হাত ধরে। সেখানেও কোথাও নারীকে স্বীকৃতি তো দেয়া হয়নি, সম্মানও দেয়া হয়নি। নারীও সেই অবলা জীব, যে ‘ঐশ্বরিক বিধান’ মেনে নিয়েছে নিঃশঙ্কচিত্তে। এই না দেখা ভয় আর অলৌকিক অভিশাপ নারীর মনের ভেতরে নিরন্তরভাবে গ্রোথিত করা হয়েছে নানা কৌশলে। এই কৌশলে গ্রোথিত মন ও মননে নারী নিজেই আর জানে না তার শক্তি কতটুকু, তার প্রভাবিত ক্ষমতাইবা কতটুকু। এমনকি একজন নারী তার অবয়ব থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে দেখা যায়, নারীরাই প্রথমে ঘর থেকে সেই নারীকে পেছন থেকে টেনে ধরে। আর পুরুষ তো পথে ওৎ পেতে বসে থাকেই। নারী তখন আর বোন নয়, মাতা নয়, কন্যা নয়, জায়া নয়। সৃষ্টিশীলা তো অনেক পরের কথা।

প্রকৃতির কথা বাদ দিলাম, যদি ঐশ্বরিক কথাই বলি, তাহলেও বলবো এই নারীকেই জরায়ু দিয়েছে, মায়া-মমতা-কোমলতা দিয়েছে, প্রসব বেদনা দিয়েছে, জন্মের অধিকার দিয়েছে, সন্তানের জন্য এই নারীর শরীরেই দিয়েছে খাদ্যের সম্ভার, সন্তানের জন্য প্রয়োজনীয় ওম। নারীর গর্ভে সৃষ্টির বিন্দু থেকে পরিপূর্ণ প্রাণ ও শরীর হওয়ার জায়গা দিয়েছে। সেখানেই মায়ের রস থেকে খাদ্য গ্রহণ করছে, অক্সিজেন গ্রহণ করছে। পৃথিবীর আলো বাতাসে বেরিয়ে আসার জন্য জরায়ু দিয়েছে। দিয়েছে মন, সুর ও সৃষ্টির দ্যোতনা। এই যে নারীর ভেতরের এত শক্তি থাকা সত্বেও কেন সে দুর্বল? সে কি আসলেই দুর্বল? নাকি তাকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে তার শক্তি আর শ্রেষ্ঠত্বকে চাপা রাখতে? সেটাকে কী বৈষম্য বলবো, না কৌশল বলবো? নারীকে ঘায়েল করার মূলে নারীর দুর্বলতাটা কী? সেটা কি শারীরিক না মানসিক? নাকি তার কোমল হৃদয় আর মাতৃত্ব বহন? যখন সে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে তখন তার মধ্যে এক কোমলতা, সাবধানতা প্রকৃতিগতভাবেই জন্ম নেয়। সেটাকেও পুরুষ সমাজ সহযোগিতা দূরে থাক বরং দুর্বলতা মনে করে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে তার মানসিক অবস্থাকে হেয় করে দেয়। জন্ম দেয়ার শর্ত তো জীবন-মৃত্যুর সাথে চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জটা শুধু নারীরই। এই চ্যালেঞ্জের চাপটাতে যখন নারী জন্মদাতাকে কিংবা পরিজনকে পাশে না পায় তখন সে স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দুর্বলতাও তার ভেতরে গ্রোথিত হয়ে যায়। সেই দুর্বলতাকে ঢাকতে, ভেতরের অবর্ণনীয় কষ্টকে বুকের মধ্যে একাকী চেপে রেখে নারী হাসতে পারে, সন্তানকে ভালোবাসা দিয়ে বুকের মধ্যে চেপে রেখে ওম দিয়ে বিরুদ্ধ প্রকৃতির থেকে রক্ষা করে। এই হাসিটাই পৃথিবীর সব আনন্দকে কাছে টানে। এই আনন্দই পৃথিবীর ভালোবাসা। এই ভালোবাসাই পৃথিবীকে সৃষ্টিশীল করে চলেছে সৃষ্টির কাল থেকে। মাতৃত্বের এই দায়বোধ যদি নারীর মধ্যে না থাকতো তবে আজ যে সভ্যতার অহংকার এ পৃথিবী করে আসছে, নব নব সৃষ্টির যে উল্লাস পৃথিবীতে আলোকিত করছে তা কি কখনো সম্ভব হতো? তাহলে কি ধরে নিতে পারি না সব সৃষ্টির উৎসভূমি নারী, তার ভালোবাসা এবং তার গর্ভ?

আজ যদি লেখক, কবিদের তাদের সমস্ত লেখনি থেকে নারীকে বাদ দিতে বলি তবে তার কয়টি লেখা থাকবে? তাদের লেখার ঔজ্জ্বল্য কতটুকু থাকবে? আমার অভিজ্ঞতা বলে, যে ধর্মসকল নারীকে অবদমন করে রেখেছে ভয় আর শাসনে, সেই ধর্মকে বুকের মধ্যে যতটুকু লালন ও পালন তা ঐ নারী যত মন-মনন, শ্রদ্ধা-বিশ্বাস ও সরলতা নিয়ে করে থাকে বেশিরভাগ পুরুষ তা করে না। এখনেও দেখা যায় নারীই সেরা ও শ্রেষ্ঠ। আমরা কেউ কেউ বলে থাকি, নারী গণ্ডিতে আবদ্ধ। সে তার গণ্ডি থেকে বের হতে পারে না। এই গণ্ডিটা কে তৈরি করেছে? আমরা কি সেই যুগ-যুগের গণ্ডি ভাঙতে নারীকে এগিয়ে দিয়েছি? কিংবা কোনো নারী এগিয়ে এলে তার পাশে সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বুক টান করে দাঁড়িয়েছি। প্রকৃতিগত টানকে অস্বীকার করা যায় না। সেটা নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই সত্য। কিন্তু সেটা জোরপূর্বক বা বিকৃত হতে হবে? যদি তা বিকৃত হয় তবে তুমিই বা শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করো কেন? বিশেষ করে মানুষ হিসেবে নিজেকে দাবি করতে পারো না। পশুদেরও ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য আছে। আছে স্বজাতের প্রতি পক্ষপাত। মানুষের মধ্যেই যত জটিলতা। নানা পথ, মত, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ে যেমন বৈষম্য তেমনই নারী-পুরুষে বৈষম্য করে রেখেছে এই মানুষ নামক প্রাণিই। আমিও জানি না এ বৈষম্য শেষ হবে কিনা। তবে যে কৌশল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে প্রয়োগ করা হয়েছে তা কোনো সভ্যতা নয়। বিশেষ করে নারীর স্বাধীনতা ও শিক্ষার জন্য শুধু একটি সমাজ, একটি রাষ্ট্র নয় বরং গোটা পৃথিবীকে এক ও অভিন্ন চিন্তায় এগিয়ে আসতে হবে। সেটা খুব সহজ নয়। গ্রোথিত বিশ্বাস ভাঙা এবং প্রচলিত রীতি বদলে দেয়া মুখে বলা যত সহজ তার চেয়ে সহস্রাধিক কঠিন বাস্তবায়নে। নারীর শিক্ষা পারে সমাজের অন্ধত্ব কাটাতে। সেখানেও নারীকে নিজ সত্তার ওপরে দাঁড়াতে হবে। হতে হবে নিরপেক্ষ। সকল হীনম্মন্যতাকে দূরে ঠেলে মানবশ্রেষ্ঠ হয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আর মা হিসেবে তাকে তার সন্তানকে শেখাতে হবে মানবে মানবে শ্রদ্ধাবোধ ও মানবিকতার আলো। আমি আমরা সবাই এমনকি নারীসকলও—নারীর এই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বকে যেদিন স্বীকৃতি নয়, মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিতে পারবো সেদিন এ পৃথিবী এক আশ্চর্য সুন্দর স্বর্গসম হয়ে উঠবে। জেগে উঠুক, জেগে উঠুক মানুষের সুন্দর পৃথিবী।

কামরুল বাহার আরিফ: কবি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত