আমিরুল ইসলাম কনক

।। আমিরুল ইসলাম কনক ।।

১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স মাঠে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ অধীর অপেক্ষায় ছিলেন কখন বঙ্গবন্ধুর মুখ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা আসবে। কেবল বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণই নয়, বিশ্ববাসীও যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন এই ঘোষণার জন্য। ইতোমধ্যে লন্ডনের গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস, দি অবজারভার, ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় লিড নিউজ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সম্ভাব্য স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। পুরো বিশ্বের নানা প্রান্তে অপরাপর শীর্ষ সংবাদ মাধ্যমগুলোও সেদিন অধীর অপেক্ষায় ছিল এই ভাষণের জন্য। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে সেদিন স্বাধীনতার ডাক দিলেন, তবে পাকিস্তান জান্তা সরকারের সাথে আলোচনার পথও খোলা রাখলেন। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো ৭ মার্চের ভাষণকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ (বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য) হিসেবে স্বীকৃতি দেন। শাবিপ্রবির শিক্ষক জাফর ইকবাল এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, ‘বরং ইউনেস্কোই এই ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মানিত হয়েছে। কারণ, এখন তাদের কাছে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণটি আছে, এমনটা তারা বলতে পারবে’।

আন্তর্জাতিক বিশ্বের জনগণও বাংলাদেশের জনকের ভাষণের অপেক্ষায় ছিলেন। উৎকণ্ঠিত বহির্বিশ্ব ইতোমধ্যেই বুঝে গিয়েছিল, পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো আপস নয়। এবার বঙ্গবন্ধুর মুখ দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা আসবেই। তিনি দেশবাসীকে এতদিন যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়ে আসছিলেন, এবার দেশের স্বাধীনতার লক্ষে সেই পথেই এগিয়ে চলেছেন যেন। বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে প্রকারান্তরে স্বাধীতার ঘোষণাই দিলেন। তিনি বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ মার্চের ভাষণে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আজ পর্যন্ত সফলভাবে তুলে ধরতে পারেননি। তিনি ৭ মার্চের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, তারা বাঁচতে চায়। তারা অধিকার পেতে চায়। নির্বাচনে আপনারা সম্পূর্ণভাবে আমাকে এবং আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করেছেন শাসনতন্ত্র রচনার জন্য। আশা ছিল জাতীয় পরিষদ বসবে, আমরা শাসনতন্ত্র তৈরী করবো এবং এই শাসনতন্ত্রে মানুষ তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি লাভ করবে। কিন্তু ২৩ বছরের ইতিহাস বাংলার মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ২৩ বছরের ইতিহাস, বাংলার মানুষের মুমূর্ষু আর্তনাদের ইতিহাস, রক্তদানের করুণ ইতিহাস। নির্যাতিত মানুষের কান্নার ইতিহাস’। বলা হয়ে থাকে, সমবেত সমাবেশে লাখো জনতা পেয়ে গেলেন স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণা নিয়ে রয়েছে, নানামুখী বিচার-বিশ্লেষণ। রয়েছে নানামুখী পর্যালোচনা। পরোক্ষভাবে তিনি স্বাধীনতার দাবিতে যুদ্ধের ঘোষণাই দিলেন, আবার আলোচনার পথও খোলা রাখলেন। তিনি কেবল ঘোষণাই দিলেন না, কীভাবে লড়াই হবে, কোন প্রক্রিয়ায় জনগণ প্রস্তুতি নেবেন, তার নির্দেশনাও দিলেন।

এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর নিজ কথা থেকেই জানা যায় তিনি কোন কৌশলে অগ্রসর হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ’৭১-এর ৭ মার্চ সরাসরি কেন স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, তার ব্যাখ্যা পরবর্তীকালে নিজেই দিয়েছিলেন। ১০ জানুয়ারি স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পরে ১৯৭২ -এর ১৮ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট এনডব্লিউ টিভির জন্য এক সাক্ষাৎকারে জানতে চান, ‘আপনার কি ইচ্ছা ছিল যে, তখন ৭ মার্চ রেসকোর্স মাঠে আপনি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা দেবেন?’ জবাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি জানতাম এর পরিণতি কী হবে এবং সভায় আমি ঘোষণা করি যে এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ফ্রস্ট পুনর্বার প্রশ্ন করেন, ‘আপনি যদি বলতেন, আজ আমি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঘোষণা করছি, তো কী ঘটত?’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উত্তর দেন, ‘বিশেষ করে ঐ দিনটিতে আমি এটা করতে চাইনি। কেননা, বিশ্বকে আমি এটা বলার সুযোগ দিতে চাইনি যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এবং আঘাত হানা ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। আমি চাইছিলাম তারাই আগে আঘাত হানুক এবং জনগণ তা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।’ আওয়ামী লীগ নেতা এবং পরবর্তীকালে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সচিবালয়ে এক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ওই ভাষণ দিয়েছিলেন। একদিকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, অন্যদিকে তাকে যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিহিত করা না হয়, সেদিকেও তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তিনি পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নেননি। তার এই সতর্ক কৌশলের কারণেই ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এই জনসভার ওপর হামলা করার প্রস্তুতি নিলেও তা করতে পারেনি।

গবেষকগণের ইতিহাসের নানা তথ্য বিশ্লেষণে পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়েছে যে, ৭ই মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শতভাগ সঠিক সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেছিলেন। এতদ সম্পর্কে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সামরিক সরকারের তথ্য কর্মকর্তা মেজর সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ (Witness to Surrender) গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া তার দীর্ঘ টেলিফোন আলাপে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বলার চেষ্টা করেন, ‘তিনি (বঙ্গবন্ধু) যেন এমন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করেন যেখান থেকে ফিরে আসার উপায় থাকবে না।’ সময়টি ছিল বাংলার জনগণের জন্য এক চরম টালমাটাল, এমন এক কঠিন ও সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ই মার্চ রেসকোর্স মাঠে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করলেন। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষকে চারটি শর্ত দিয়ে ভাষণের  শেষাংশে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার এই চার মূলনীতি বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠে। ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথাই বলেছেন। তিনি বাংলার মানুষের অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির কথা বলেছেন। তার বক্তৃতায় বাঙালি জাতির উপর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি শাষকশ্রেণির নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন। একই সাথে বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে বাঙালি জাতির গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি তুলেছেন।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণে শোষণমুক্ত সমাজতন্ত্রের প্রতিফলনও আমরা দেখতে পাই। তিনি তার বক্তব্যে একদিকে যেমন বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির দাবি জানিয়েছেন, তেমনি অসহযোগ আন্দোলনে শ্রমজীবী গরিব মানুষের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। সবশেষে বঙ্গবন্ধু তার ৭ মার্চের ভাষণে ধর্মনিরপেক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি তার বাঙালি জাতীয়তাবাদ চেতনার প্রতিষ্ঠায় হিন্দু, মুসলমান, বাঙালি, অ-বাঙালি সবার কথাই বলেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের কিছু অংশ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেদিন তিনি পরোক্ষভাবে যুদ্ধের ঘোষণা, পাশাপাশি কীভাবে জয়ী হতে হবে, সে ব্যাপারেও বক্তব্য রাখেন। সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত, বৈধ সরকার প্রধানের মতোই একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন। এরপর যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার  লোকেদের হত্যা করা হয়, তোমাদের ওপর আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু, আমি যদি হুকুম দিবার না-ও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’

১৯৭১ -এর মার্চের শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন ছিল যে, বিশ্বের বেশকিছু নেতৃত্বস্থানীয় পত্রিকা আগাম সংবাদ ছাপিয়ে জানিয়েছিল, ৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়তো স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ’৭১-এর ৫ মার্চ লন্ডনের গার্ডিয়ান, সানডে টাইমস, দি অবজারভার এবং ৬ মার্চ ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ৭ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। ৬ মার্চ ’৭১ লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ছাপা হয়, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগামীকাল (৭ই মার্চ) পূর্ব পাকিস্তানের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারেন।’

আমিরুল ইসলাম কনক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শিক্ষক