সবারই কিছু অসুখ থাকে, মা মা অসুখ। আমার সেই অসুখটা একটু বাড়াবাড়ি। বৃষ্টির দিন এলে সেই অসুখটা তীব্র হয়। আকাশের মেঘের দিকে তাকালে বলতে ইচ্ছে হয়—মায়ের আঁচলের মতো মেঘ ভেসে এলে আমিও ভিজতে চাই অবারিত স্নেহের জলে। মায়ের কথা মনে এলেই—উঠোনে পুঁইয়ের সবুজ মাচা, মাচার নিচে একদল কাদাখোঁচা হাঁস, কামিনীগাছে একলা একা দোয়েল, ধোঁয়া ওঠা রান্নাঘর আর সেখান থেকে বারবার মায়ের সাবধান বাণী—‘খবরদার, দুইডির একটাও ঘর থেকে বাইওর বোসন বাইর হস! একেবারে রক্ষা নাই। আড়কাঠ দিয়া পিটাবো। বৃষ্টির পানি যেন একটারও গায়ে লাগে না!’ আমরা সারা দিই—না মা। আমরা ঘরেই আছি। মা রান্নাঘর থেকে বৃষ্টিতে ভিজে প্রয়োজনের জিনিসগুলো নিতে বারবার বড় ঘরে আসে আর যায়, তবু আমাদের বলে না। বৃষ্টিহীন দিন হলে মা ডাকতো—অঞ্জ রলু। কাছাকাছি যে থাকতো সে সাড়া দিলেই মা তাকে বলতো—বাবা, যাও তো পেঁয়াজ আইনা দাও কিংবা বলতো, লাকড়ি শেষ হয়ে গেছে কয়টা লাকড়ি আইনা দাও। কিন্তু বৃষ্টি এলে সে ভিজবে কিন্তু আমাদের ভিজতে দেবে না। কিন্তু তাতে কি? আমরাও ফন্দি-ফিকির করতে থাকি। বৃষ্টি যতই বাড়তে থাকে ততই আমাদের বুকের ভেতর ভেজার আকাঙ্ক্ষা পুঁইয়ের সবুজ ডগার মতো লকলক করে ওঠে। হাঁসগুলোর ভাগ্যকে তখন র্ঈষা করতে শুরু করি। আমাদের খাবার ঘর লাগোয়া গোয়ালঘর। আমরা পা টিপে সেইখানে যাই। আহা আমাদের লাল রঙের লালী! আমাদের দেখে মুখ তুলে চায় আর হুম্ব হুম্ব করে একটা আদুরে আওয়াজ করে। আমরা দুজন কাছে যেতেই সে মুখ বাড়িয়ে এগিয়ে আসে। কেমন যেন মা মা একটা ভাব চেহারায়। জিভ বের করে সে আমার ভাইটার গা চেটে দিয়ে এবার আমার দিকে আগায় সঙ্গে সঙ্গে বাছুরটা এসে ঢুকে পড়ে আমার আর লালীর মধ্যিখানে। লালী বাছুরটার গা চেটে দেয় আমি লালীর গলকম্বলে হাত রাখি। এর মধ্যে আমার ভাই গাদাগাদা কঢ়ুরি এনে লালীর সামনে রাখে। লালী খুশি হয়ে আবার আদুরে আওয়াজ করে। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কঢ়ুরি খায়।  আমরা গামছা মাথায় দিয়ে রান্না ঘরে যাই। মা বলে, কী চাই এখানে?

মায়ের গা ঘেষে বসি। মায়ের শাড়ির আঁচলের খোটে হাত মুছতে মুছতে বলি, মা গরুর কঢ়ুরি শেষ হয়ে গেছে, কেটে আনি?

ওরে নাপতের দলেরা ঘরে বইসা বইসা গরুরে অতগুলা কঢ়ুরি খাওয়াইয়া শেষ করছস? কোনো ফন্দি-ফিকিরে কাজ হবে না। গরুর কঢ়ুরি লাগলে তোদের বাপ আসা কাটবেনে। এখন ঘরে যা।

আমরা খুব মিহি সুরে বলি—কিন্তু বাবা তো সেই রাতে আসবে। গরু তো ততক্ষণ না খেয়ে থাকবে!

না খাইয়া থাকবে ক্যান? কুডা আছে ভুসি আছে। তোরা যে বৃষ্টিতে ভেজার ফন্দি করসছ সেইডা কি আমি বুঝি না? আমার পেডে তোরা হইসছ নাকি আমি তোদের পেডে হইছি। যা ঘরে যা।

এইবার চোখে জল চলে এলো। কাঁদো কাঁদো স্বরে মায়ের আঁচল ধরে আমরা কাকুতি-মিনতি করতে লাগলাম। বললাম, এই শেষ আর কখনও বৃষ্টিতে ভিজবো না। এক সময় মায়ের মন গলে। বলে, যা আর বিরক্ত করিস না। কিন্তু বেশি ভিজবি না ঠাণ্ডা লাগবে। আমাদের একলা একটা বাড়ি। চারিদিকে বরষার থৈ থৈ জল। আউশ আমনের সবুজ ধানের ক্ষেতের দিকে তাকালে মনটা কেমন সবুজ হয়ে যায়। আহ বৃষ্টি। আমরা নেমে পড়ি উঠোনে। ভাইয়ের হাতে কাচি। আমরা বড়ো কাজের লোক কঢ়ুরি কাটবো। আমরা নৌকায় চড়ে বসি। ভাই নৌকা বাইছে। নৌকা এসে ঢুকলো প্রফুল্লদার বেড়ের ভিতর। সেখানে ঠাসা কঢ়ুরির বাঁদা। আমরা কঢ়ুরি কাটছি। নৌকার দুটো খোর ভরে গেল। এবার আমরা হরকান্ত কাকুর শোলা ক্ষেতের মধ্যে নৌকা ঢোকালাম। থোকা থোকা শোলা ফুল ফুটে আছে। মাকে এই ফুল নিয়ে দিলে মা যে কী খুশি হবে! ভাবতেই আমাদের আনন্দ লাগছে। ফুলের বড়াটা মায়ের হাতে অসাধারণ। বুষ্টিতে ভিজে শোলাফুল তুলছি হঠাৎ কোথা থেকে একটা হলদে রঙের ক্ষুব্ধ বোল্লা এসে দিল হুল ফুটিয়ে। চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। সে কী ব্যথা! চোখে জল এসে গেল। আমার ভাই বলল, চুপ কর। তোর তো আমার সবটাতেই বাড়াবাড়ি। মা ট্যার পাইলে আর এজম্মে বাইরাইতে দেবে নানে। কেন? আমার বিজ্ঞ ভাই তেতে ওঠে। তুই আর বোঝস না? তোর হইছে হাতে ব্যথা এইডা মারে কইলে মার তো মাথায় ব্যথা শুরু হবেনে। দেবেনে তখন বাইরাইতে। ভাববেনে আমরা কইনা কই যাই যদি সাপে কাটে! তখন কেমন হবে? চুপ কর। আমিও দেখলাম কথায় যুক্তি আছে। আমি ব্যথা হজম করার চেষ্টা করলাম। শোলা ক্ষেত থেকে বের হয়ে নৌকা ছলাৎ ছলাৎ করে চলতে থাকে। স্বচ্ছ জলের তলে কতরকম সবুজ শ্যাওলা, সেই শ্যাওলার ফাঁক দিয়ে চেলা পুঁটির ছোটাছুটি দেখতে দেখতে আগাচ্ছি। হঠাৎ দেখি তালুকদারের জমির আইলে কারেন্ট জাল পেতেছে খোকনদা মানে খোকন তালুকদার। সেইজালে জড়িয়েছে চকচকে সব পুঁটি। ব্যস, দুজনে নৌকা থামিয়ে জাল টেনে টপাটপ তুলে নিলাম প্রায় এককুড়ি পুঁটি। আহ কী আনন্দ কী আনন্দ! বাড়ি ফিরলাম। মা পুঁটি মাছ দেখে খুশি হবে কই গেল রেগে? ওরে হারামজাদারা, পরের জালের পুঁটি আনতে কইছি আমি? ঈরের জিনিস ধরতে না কইছি না।

আমরা অপরাধ করেছি এইবার বুঝতে পেরেছি। বললাম, পরের জাল কই, ওটা তো খোকনদার জাল। ওরে শালারা খোকন কি তোদের জন্যে জাল পাতছে? আইজ আর ঘরে তোদের ভাত নাই। যা মাছগুলা ফেরত দিয়া আয়। এর মধ্যে পুকুরের পশ্চিমপাড় ধরে খোকনদা এসে হাজির। ভয়ে আমাদের গলা যতটা না শুকিয়ে আসছিল তারচেয়ে বেশি কুকড়ে দিচ্ছিল লজ্জা। ও কাককু, নির্মল কাককু বাড়ি আছ? কাকি জানায় না তোমার কাক্কু তো বাড়ি নাই। আইসো দেখো তোমার ভাইডি বুন্ডিরা কী করছে?

কী করছে কাকি? 

ছাতাটা বন্ধ করে খোকনদা বারান্দায় দাঁড়ালো।

এা মাছগুলো সামনে রেখে বলল, তোমার জাল থেকে এইগুলা নিয়া আইছে। যাওয়ার কালে নিয়া যাইয়ো।

খোকনদা বললেন, ওরা ভালো করছে। খোকনদা বাবার কাছে জমির নকশার জন্য এসেছিল। খোকনদার জন্য সেই যাত্রা বেঁচে গেলাম। মা শাড়ির আঁচল দিয়ে আমাদের মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে বলেন, আজ যা করছোস করছোস আর কোনো দিন যেন শুনি না অন্যেও কোনো জিনিস হাত দিয়া ধরছোস। হাত এক্কেরে কাইট্যা ফেলাবো। দুষ্টু গরুর চাইতে আমার শূন্য গোয়াল ভালো। এক্কেবারে জবাই দিয়া দেবো। আমাদের মা যে সেই কাজটা করতে পারে সেই বিশ্বাস আমাদের ছিল। মায়ের বদমেজাজকে ভয় পায় না এমন লোক গ্রামে কেউ ছিল না। মা অন্যায় সহ্য করতে পারতো না। আমরা ভেজা বেড়ালের মতো মায়ের আরো কাছে সরে আসি। দুহাতে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরে বলি—‘না মা আর করবো না।’ মা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়া জল মুছিয়ে দেন। আমরা আশ্বস্ত হই। বিকেলে শোলা ফুলের বড়া খেয়ে মায়ের আঁচলে হাত মুছি, মুখ মুছে পড়তে বসি। আমরা খাওয়ার পরে মায়ের আঁচলে মুখ মুছতাম। মা বলতো—ভালো করে হাত মুখ ধুইছিলি তো? মায়ের যখন বিয়ে হয় তখন মাকে পাঁচ টাকা দিয়ে শাড়ি কিনে দিয়েছিল দাদু। সেই শাড়ি দেখতে কলাবাড়ি, দেবগ্রাম, ছিকটি বাড়ি তেকে মহিলারা এসেছিল। না মায়ের সেই শাড়ি আমাদের সংরক্ষণে নেই। আমার মা অত বড় বাড়ির বউ কিন্তু কোনো অহংকার তাকে ছুঁতে পারেনি। আর পাঁচজন সাধারণ মায়ের মতোই ছিল আমার মায়ের সাজ পোশাক। গায়ের গরিব মানুষের ঘরে ছিল আমার মায়ের ওঠা-বসা। মাতামের মা আমাদের বাড়ির চিড়েটা পিঠেটা করে দিত। হরবিলাস, জুরান, কেষ্ট ঘরজা, আদিত্য ঘরজা এদের পরিবারের সঙ্গে ছিল তার ওঠা-বসা। আমাদের কাকিমা জেঠি মারা এখনও দূরত্ব বজায় রাখে তাদের পোশাকে, চলন-বলনে। আমার মা তেমনটা ছিল না। সন্ধ্যায় মা ধুপ জ্বেলে দেন। আমাদের পায়ের কাছে মা সেই ধুপদানিটা রাখেন যাতে মশায় না কামড়ায়। তবু মা পাশে বসে নিরলসভাবে শাড়ির আঁচল দিয়ে আমাদের শরীরের মশা তাড়াতে থাকেন। মাকে কোনোদিন রাবীন্দ্রিক স্টাইলে শাড়ি পরতে দেখিনি যেমনটা আমার শাশুড়ি পরেন। আটপৌঢ়ে ঢঙেই শাড়ি পরতেন মা। রাতে যখন ঘুমিয়ে যেতাম মা সারারাত তালপাখার বাতাস করতেন আর শাড়ির আঁচল দিয়ে আমাদের গলার ঘাম মুছে দিতেন। মায়ের শাড়ির আঁচল থেকে কেমন মিষ্টি একটা গন্ধ বের হতো—মায়ের গায়ের গন্ধ সেটা। দুই ভাইবোনের ছোটাছুটিতে যখন শরীরে ঘাম চিকচিক করতো মা বলতেন—থাম। এদিকে আয়। কাছে যেতেই মা শাড়ির খোটটা কোমর থেকে খুলে কপালের আর গলার ঘাম মুছিয়ে দিতেন। এই সময় স্নায়ুতে এক অনির্বচনীয় শান্তির অনুভূতি ছড়িয়ে যেত। দিদি দাদা বাবু মাকে দামি দামি শাড়ি দিত। এ সবের একটা শাড়িও মা পরতেন না। সব উঠিয়ে রাখতেন যত্নে। মাকে সাধারণ শাড়িতেই অসাধারণ লাগতো। কাচা হলুদের মতো গায়ের রঙে সেই সব শাড়িই বরং বহুমূল্য বলে মনে হতো। মায়ের পরিধেয় শাড়ি আমার কাছে কেবলমাত্র পোশাক নয় এর চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটা আমার কাছে আশ্রয়, নিরাপত্তা আর স্নেহের প্রতীক। আমার মনে হয় মায়েরা দশ হাত শাড়ি এজন্য পরে না যে তাদের সুন্দর লাগবে বরং এজন্য পরে যাতে সহজে সেই শাড়ির আঁচলের নিচে তারা তাদের সন্তানদের দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, গ্লানি এমনকি অপরাধ লুকিয়ে ফেলতে পারেন। এই শাড়ির আঁচল তাই আমার কাছে অতিমূল্যবান জিনিস বলে মনে হয়।

আমি যখন ইন্টার পাশ করে ঢাকায় আসি তখন দুটো টিউশনি করতাম। সেই টাকা যেত বাস ভাড়ায়, চন্দ্রা পরিবহনে। সপ্তায় একবার যাওয়া চাইই চাই। মাকে না দেখলে ভালো লাগতো না। একবার টিউশনির টাকা পেয়ে মনে হলো মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনি। শাড়ি কেনার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। এক বান্ধবীকে নিয়ে গেলাম মিরপুর এক এর হকার্স মার্কেটে। মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের পাশেই ছিল সেটা। উপরে টিনের ছাপরা, ঘুপচি এক মার্কেট। সেখান থেকে অনেকক্ষণ ঘুরে ঘুরে একটা শাড়ি কিনে ছিলাম মায়ের জন্য। জাম রঙের সেই শাড়িটা পেয়ে মা বললেন, তোর বাপ কি আমারে শাড়ি দেয় না? এত টাকা খরচ করার কি দরকার ছিল? কত টাকা আর মোটে সাড়ে চারশ। মা বললেন—এই টাকা দিয়া একটু ফলমূল কিনা খাইলে শরীলডা ভালো থাকতো, এই সবের কোনো দরকার ছিল না। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কোথায় মা খুশি হবে তা না! তাকে বেশি উত্ত্যক্ত করা যেত না। একবার যদি বলে ফেলে যা, এইটা করবো না, কিংবা পরবো না তোর শাড়ি তাইলেই শেষ। পরে জেনেছিলাম মা সেই শাড়িটা পরে গায়ের সবাইকে বলতো, আমার অঞ্জু শাড়িটা দিয়েছে, সুন্দর না! শুনে খুশি ধরে রাখতে পারিনি। তারপর ভেবেছি আরো একটা শাড়ি দেবো। কিন্তু সেই সুযোগ আর হয়নি মা স্বর্গত হলেন। মারা যাওয়ার আগে বললেন, আমাকে শাদাপাড়ের লরা শাড়ি দিবি। মেজো কাকার বড় ছেলে বাবুদা মাকে সেই শাড়িটা কিনে দিলেন। মাকে শেষ গোসল করিয়ে শাদাপাড় লাল শাড়িটা পরানো হলো। ভীষণ অপরিচিত মনে হলো এই মাকে আমার। আমি আজও মায়ের পুরানো শাড়ির আঁচল খুঁজি যখন আমার খুব হতাশ লাগে, যখন আমার নিজেকে বড় অসহায় মনে হয় তখন বলি—মা তোমার শাড়ির আঁচল যতোই ছেঁড়া হোক/ঐ আঁচলে লেখা জানি আমার স্বর্গলোক।

অলংকরণ শিবলী নোমান