শৈশব আর কৈশোরের সন্ধিক্ষণে যাপিত জীবনের উন্মুখতায় কেমন জানি এক ধরনের হাহাকার মিশে থাকে। অজান্তেই। এটা সবার জীবনে হয়তো ঘটে না। কারো কারো ক্ষেত্রে ঘটে। কৌতূহলপ্রবণ মন কেবলি নিঃশব্দ বেদনার মন্থনকেই নিবিড় করে তোলে। কারণ সান্নিধ্য যাপনের উৎসে তখন শুধুই সুতোছেঁড়া গান। নৈঃসঙ্গিক চেতনার জমিনে কেবলই অস্থিরতার মৃদু হাঁসফাঁস। এ রকমই এক চেতনাগত অবস্থায় আমি আমার মাকে হারাই। সেই কবে! মা বিহীন ধুলোওড়া শৈশবের গল্পে তখন নিস্তব্ধতা, চলন্ত ঘূর্ণির পাশে নেভে আর জ্বলে বেখেয়ালি গোপন শূন্যতা। আমি ডুবে যাই, ডুবে যেতে থাকি তার নির্বিরোধ অতল গহ্বরে।

মায়ের শাড়ি নিয়ে লিখতে বলেছেন কবি শামীম হোসেন। বলার আগের কদিন থেকেই মাকে মনে পড়ছিল থেকে থেকে। কতো শত স্মৃতিদৃশ্যের ভেতর দিয়ে মন ভেসে যাচ্ছিল। শামীমের বলার পর থেকে মন যেন সওয়ার হলো বুলেট ট্রেনে। দৃশ্য থেকে দৃশ্যের স্থানান্তর এতো দ্রুত ঘটছিল যে সবকিছুই হয়ে যাচ্ছিল ঝাপসা জমিন। যেখানে বেদনার ছোপ ছোপ কালো ও ছাইরঙা তেরসা দাড়ি কমাগুলো লেপ্টে যাচ্ছিল, হারিয়ে যাচ্ছিল অবয়বহীন হয়ে।

মাঝারি গড়নের আমার মায়ের গায়ের রঙ ছিল ফর্সা। গাঢ় বেগুনি জমিনের পর তেরছা হালকা বেগুনি, কালো ও শাদা দাগ টানা মিহি বুননের সুতি শাড়ি পড়ে মা আমার হাঁটছেন ঘরের আনাচে কানাচে। কখনও কাজ করছেন নিমগ্ন হয়ে। উজ্জ্বল স্বাস্থ্যের সঙ্গে শাড়ির রঙের আভায় মাকে আমার বড়ো সুন্দর লাগছিল। পড়ার টেবিল থেকে জানালা গলিয়ে দেখছিলাম আমি। সকালের কোমল রোদ্দুরে বিছানো সবুজ পাতার হাসিমাখা মুখ যেন আমার মা। শাড়িটার কথা আমার ভীষণভাবে মনে আছে। কারণ এর পেছনে রয়েছে মনে সেঁটে থাকার মতো কিছু কথাগল্প।

আমার একমাত্র খালা বেড়াতে এসেছেন আমাদের বাড়ি। সঙ্গে বেশ কিছু শাড়ি এনেছেন। মাকে বললেন এখান থেকে শাড়ি পছন্দ করতে। মা কেবল উজ্জ্বল বেগুনি রঙের শাড়িটিকেই পছন্দ করলেন। অন্যরা ভেবেছিল বয়স হয়ে যাচ্ছে। এখন কি আর এসব রঙ মানায়? একটু হালকা রঙের শাড়ি হাতে তুললেই বোধ হয় আশেপাশের কেউ কেউ খুশি হতেন। কিন্তু মা বললেন, এটিই আমার পছন্দের।

সেই পছন্দের শাড়ি পরা মায়ের চলাফেরার দৃশ্যগুলো এখন আমার চোখে কষ্টের হাজার কাঁটা ফোটায়। উজ্জ্বল রোদের দুপুর ঢেকে যায় কালো মেঘের উজানে। ঝড় ওঠে। ঝড়ের পাটাতনে শক্ত হয়ে বসে দেখি সাদা অরগ্যান্ডি শাড়ি পরা মায়ের বিবর্ণ, কংকালসার মুখ। মা বসে আছেন বিষণ্ন, মৃত্যুর প্রতীক্ষা গোলক হাতে নিয়ে।

উজ্জ্বল বেগুনি শাড়িটি মা আমার বেশিদিন পরতে পারেন নি। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি হয়ে গেলেন কর্কট রোগী। ডাক্তার বলল, আর মাত্র ছয় মাস আয়ু। ঠিক ঠিক তিনি ছয় মাসের মধ্যেই দৃশ্যান্তরে চলে গেলেন। এক লহমায় আমাদের আট ভাই বোনের জীবন হয়ে গেলো ধু-ধু এক বিরান মাঠ।

আমার বয়স পাঁচ কি ছয়। সে সময় থেকেই মায়ের যেকোনো নতুন শাড়ি আমার পরা চাই-ই চাই। বারো হাতের সুতি শাড়ি কোনো রকম শরীরে পেঁচিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ার আশংকা নিয়ে উঠোনে হাঁটাহাঁটি করতে খুব ভালো লাগত। কেমন একটা মা মা মনে হতো নিজেকে। আর মা তার নতুন শাড়ি পরতে কখনও না করেছেন বলে মনে পড়ছে না। বরং আমার আগ্রহের সীমানায় বাজতো তার সীমাহীন প্রশ্রয়ের দ্যোতনা। শৈশবের শেষ প্রান্ত পৌঁছা পর্যন্ত মায়ের শাড়ি শরীরে জড়িয়ে কী যে উল্লসিত হতাম, মনে হলে আজও মন ঝাঁকি খায় খুব।

হায়, কই গেল সেসব নিরাভরণ দিন! শংকাহীন আনন্দের রেনুগুলো সে সময়ে জলে ভাসা হিজল ফুলের মতো মনের স্রোতে গড়িয়ে গড়িয়ে চলতো বিরামহীন।

মৃত্যুও যখন বেদনাকে ছাপিয়ে উর্ধ্বাকাশে হাত তুলে উড়িয়ে দিতে পারে যতোসব শূন্যতার ভার, তাহলে জীবন কেন পুবাকাশের ঊষার আলোয় হামাগুড়ি দিয়ে রক্তিম জোছনাকে ভয় পাবে? মাকে হারানোর পরও জীবন থামেনি। চলেছে ছন্দময়-ছন্দপতনের মধ্য দিয়ে। আজ বহুপথ হেঁটে বহুপথ এসে পেছনে তাকিয়ে মায়ের স্মৃতি-শাড়িতে কেবলই দুটি রঙের ছায়ার দুলুনি মনকে ভারাক্রান্ত করে। একটি বেগুনি, অন্যটি গোলাপি। বেগুনি শাড়ির কথা আগেই বলেছি।

এবার বলছি গোলাপি শাড়ির কথা। ক্যান্সারে আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসা চলছে পুরোদমে। তবু অবস্থা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। জুলাইয়ে মৃত্যুর দেড়মাস আগে হঠাৎ মায়ের ইচ্ছে হলো, তিনি নতুন গোলাপি শাড়ি পরবেন। শুনেই গোলাপি শাড়ি কিনতে ছুটলেন আমার ভাই বোনেরা। তখনও শাড়ি কেনার বয়সে পৌছুনি বলে ছোটাছুটিটা আমার করতে হয়নি ঠিক। কিন্তু করতে পারলে মনে হয় খুশিই হতাম।

মায়ের বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকটি গোলাপি শাড়ি। এ দৃশ্য আজও আমার রক্তে গনগনে কষ্টের ফুলকি ছড়ায়। তবে মাঝে মাঝে মনে হয় রুগ্ণ শরীর ঘিরে পড়ে থাকা গোলাপি শাড়িগুলো সম্ভবত কিছুটা আনন্দের আভা ছড়িয়ে রোগীকে পরিতৃপ্ত করারও চেষ্টা করছিল যেন। কিন্তু হায় মা যে পরিতৃপ্ত হতে পারেন নি সেদিন। একটি শাড়িও পছন্দ হলো না তার, রঙের কারণে। তিনি যে গোলাপি রঙ চাচ্ছিলেন তার ছেলেমেয়েরা ঠিক ঠিক সে রঙ মেলাতে পারেনি, অনেক চেষ্টা করেও।

মাকে নিয়েই ব্যস্ত থাকা আমার বাবার হুঁশ হলো তখন। আসলে মা হয়তো চাচ্ছিলেন চিরটাকাল যার কাছ থেকে তিনি শাড়ি পেয়ে এসেছেন জীবন ফুরিয়ে আসার এ সময়েও তার কাছ থেকেই পাবেন গোলাপি আদরে মাখানো অন্তিম একখানা শাড়ি। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। কারো শাড়িই যেখানে তিনি পছন্দ করতে পারলেন না, পছন্দ হলো বাবার কেনা গোলাপি শাড়িটিই। আমরা তখন কিছুটা অবাক। অবুঝ থাকার কারণে বুঝতে পারিনি তখন তার মর্মার্থ।

সেই থেকে গত ৩৩ বছর ধরে আমাদের পরিবার থেকে প্রতি বছর গোলাপি শাড়ি উপহার দেয়া হয় গরিবদের মধ্যে। আজও তার ব্যত্যয় হয়নি। আশা করি ভবিষ্যতেও হয়তো হবে না।

সময়ের শত ছিদ্র বুজে বুজে জীবন ক্রমে এগিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে। কোনোটা তাড়াতাড়ি আবার কোনোটা কিছুটা দেরিতে। তবে সে যাবেই অনিবার্য স্রোতের টানে। মায়ের জীবন যেমন তলিয়ে গেছে খরস্রোতা পাথুরে প্রবাহের অতল গভীরে। পৃথিবীর কোথাও তার কোনো ছায়া পর্যন্ত নেই, কেবল কিছু মায়ার আধুলি জীবন সৈকতের শুকনো বালিতে গেঁথে আছে। প্রতিদৃশ্য হয়ে সেগুলো যেন শাড়ির জমিনের বাহারী ফুল হয়ে ফুটে আছে বেগুনি, গোলাপি তারার মতো হিমেল অন্ধকারে।

সেই অন্ধকার ফুঁড়ে দিগন্তে ছড়িয়ে থাকা হাত হয়তো একদিন আমাকে ডেকে বলবে, আয় বুড়ি, আয়, পরিয়ে দিই তোকে আমার সেই বেগুনি শাড়ি! আয়, সাজিয়ে দিই সুন্দর করে। পরি হয়ে যাবি তুই। উড়ালপঙ্খী হয়ে আকাশে উড়বি কেবল হাওয়ায় হাওয়ায় ভেসে…

অলংকরণ শিবলী নোমান