।। নুসরাত নুসিন ।।

লুকিয়ে মায়ের শাড়ি পরেনি এমন মেয়ে নেই। ছোট্ট মেয়েটি বা কিশোরীটিও মায়ের শাড়ি পরে সুন্দর হয়ে উঠতে চায়। তখন মুখে দারুণ একটা ভঙ্গি ফুটে ওঠে। সে ভঙ্গিতে থাকে একটু লজ্জা। আয়নার সামনে এমনিই মিটিমিটি হাসা।

শাড়িকে বাঙালির রোমান্টিক পোশাকও বলা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী সায়মা আলম নাজ বলেন, পোশাক হিসেবে শাড়িকে আমার খুব অদ্ভূত মনে হয়। একটা লম্বা কাপড় শরীরে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে পরছি। আবার এটার নানারকমভাবে পরার ব্যাকরণও আছে। খুব অদ্ভূত! আর কোনও পোশাকের ক্ষেত্রে কিন্তু এরকমটা হয় না। যাকে আমরা শাড়িতে দেখে অভ্যস্ত তাকে অন্য কোনো পোশাকে ততোটা ভালো লাগে না। কিন্তু যাদের আমরা অন্য কোনও পোশাকে দেখি, তারা শাড়িতে আরও স্নিগ্ধ হয়ে ওঠেন। মানে শাড়ি এমন একটা পোশাক যা নিজেই নিজের সৌন্দর্য বহন করে চলে।

নাজ বলেন, প্রথম কবে শাড়ি পড়েছিলাম সেটা মনেই করতে পারছি না। কারণ খুব ছোটবেলা থেকেই মায়ের বাতিল করা দুইটা শাড়ি নিয়ে খেলতাম। তবে শাড়ি পরার জন্য একটা অপেক্ষা থাকতো, যা এখনও আছে। এখন যখন শাড়ি পরি, তখন নিজের কাছে নিজেকেই বেশ আত্মবিশ্বাসী ও আধুনিক লাগে। আমার দৃষ্টিতে শাড়িতে সবাইকেই খুব স্মার্ট দেখায়। আর হাঁটার সময় পায়ের ধাক্কা খেয়ে যখন কুচিগুলো ছলকে ওঠে তখন দারুণ এক অনুভূতি হয়। শাড়ি পরার এই অনুভূতিটাই আমি সবচেয়ে বেশি অনুভব করি।

সময়ের বিবর্তনে শাড়ি পরার ভঙ্গিতে এসেছে পরিবর্তন। শাড়ি পোশাক হিসেবে স্টাইল ও ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। কখনও হয়েছে অভিজাত পোশাক। বেশিরভাগ মেয়েই উৎসব-অনুষ্ঠানে শাড়ি পরতে বেশি পছন্দ করেন।

প্রথম শাড়ি পরা নিয়ে আবৃত্তিশিল্পী মনিরা রহমান মিঠি বলেন, রাজশাহী সিল্কের ঘিয়ে রঙা লালপাড় শাড়িকে আমরা জানতাম গরদের শাড়ি বলে। মায়ের সেই শাড়ি অনুষ্ঠানে পরে যাওয়া ছিল আমার শাড়ি পরার শুভসূচনা স্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। তারপর থেকে এই পোশাকের প্রতি টান না কমে বেড়েছে। যদিও ওয়ারড্রোব বোঝাই করিনি কখনো। মায়ের তাঁতের শাড়ি দেখে আমারও তাতেই ঝোঁক। খুব দামি পোশাকের প্রতি বরাবরই অনাগ্রহ। শাড়িও তাই। শাড়ির সাথে বাটিকের ব্লাউজ পরতে পছন্দ করি। সুতি শাড়ির বাইরে ভালো শাড়ি বললে রাজশাহী সিল্ক সবার আগে মনে আসে। শাড়ির সাথে মিলিয়ে কাঠ, বাঁশ, পূতি, সূতা, চামড়া, পাথর, ঝিনুক এসবের গয়না ভালো লাগে। কাচের চুড়ির রিনিঝিনি এখনও ভালোবাসি। সাথে একটি টিপ। আমার সম্পূর্ণ সাজ।

নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক কানিজ ফাতেমা কানন বলেন, প্রতিটা মানুষের জীবনে ছোট ছোট কিছু অনুভূতি থাকে। সময় পেরিয়ে গেলেও সেই অনুভূতি কখনো পুরাতন হয় না। আমার জীবনেও সেইরকম কিছু অনুভূতি রয়েছে। যার মধ্যে একটি হলো প্রথম শাড়ি পরার অনুভূতি। কুষ্টিয়া সরকারি গার্লস স্কুলে পড়ার সময় ২৬ মার্চ জীবনে প্রথমবারের মত শাড়ি পরি। বছরের বিশেষ দিন যেমন ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বরে কুষ্টিয়া স্টেডিয়ামে শহরের সকল স্কুল তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রদর্শন করত। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের স্কুলও একটি নাট্যাংশের অংশবিশেষ প্রদর্শন করে। ওই নাট্যাংশের গ্রামের একজন কৃষকের স্ত্রীর ছোট একটি চরিত্র ছিল যাতে আমাকে শাড়ি পরে করতে হয়েছিল। তিনি আরো বলেন, শাড়িটা আম্মার ছিল এবং তিনি তা পরিয়ে দিয়েছিলেন আমাকে। ভাবতেই খুব ভাল লাগে। এরপর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি তখন মাঝে মাঝেই নানা উপলক্ষে সহকর্মীসহ সবাইকে শাড়ি পরতে হয়। খুব ভালো লাগে এবং মনে হয় শাড়ির চেয়ে সুন্দর পোশাক বুঝি আর হয় না। এখন আমার দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ওরা বেশ ছোট। খুব ইচ্ছে করে নানা উৎসবে মা-মেয়ে একইরকম শাড়ি পরি।

মেয়েদের কাছে শাড়ি ভীষণ আবেগের পোশাকও। স্মৃতির কোলাজ। তাছাড়া মায়ের শাড়ি যেন একটি প্রজন্মের থেকে আরেকটি প্রজন্মের উত্তরণের গল্প বলে। কবি রিমঝিম আহমেদ এরকমটাই মনে করেন। তিনি বলেন, জীবনে একটা অপচয়ই সচেতনভাবে করি। আর সেটা হচ্ছে উপর্যুপরি শাড়ি কেনা। কেন কিনি? এত শাড়ি কেনার মতো আমার সামর্থ্য নেই ভালো করে জানি। কেনার আগে হিসেব করা উচিত। তাও, এই শাড়িগুলো আমাকে ভালো রাখে। বিষণ্ণতার ওষুধ হিসেবে কাজ করে। অনেকের আছে মায়ের শাড়ি, দাদি-নানি কিংবা শ্বাশুড়ি-ননদের শাড়ি। দুয়েকটা উপহার পাওয়া শাড়ি বাদ দিলে আর সব আমার কষ্টার্জিত টাকায় কেনা। একদিন এইসব শাড়ি আমার মেয়ের হবে। আমার মেয়ে বলবে—এগুলো আমার মায়ের শাড়ি!

আলোকচিত্র সংগৃহীত