শাড়ি কে না ভালোবাসে! সে নারী হোক বা পুরুষ। পার্থক্য হয়তো আছে কিছু। নারী পরতে ভালোবাসে, পুরুষ শাড়ি পরা নারীকে। তবু ভালোবাসায় কমতি তো নেই।

আমার শাড়ির প্রতি ভালোবাসা শুরুই হয়েছিল আম্মার জন্য। তখন বাড়িতে শাড়ি বিক্রি করতে আসতো নারীরা। গোদাগাড়ী দিয়ে ইন্ডিয়া থেকে শাড়ি আনতো তারা। এতে ঝুঁকিও কম ছিল না। শাড়ি এনে ফেলতো পাটি পাতা বারান্দায়। চোখের সামনে নানা রঙের নানা ঢংয়ের শাড়ি। শাড়ি কেনা সে এক উৎসব, সে এক আনন্দ ভীষণ। গায়ে জড়িয়ে জড়িয়ে দেখা, আম্মা শাড়িতে হাত দিয়ে গম্ভীর মুখে দু-আঙুল তুলে জমিন দেখতো। তারপর হয়তো বললো, এর সুতা ভালো না, এর সুতা ভালো। আমার এ এক বিস্ময় লাগতো। মায়েরা কী সব বোঝে!

এক মহিলাকে মনে আছে। শাড়ি বেচতো। অনেক বড় হয়ে টাইফয়েড হয়েছিল, মাথায় চুল ছিল না বলে সবাই তাকে নাঢ়ি নামে ডাকতো। শাড়ি বিক্রির জগতে সে খুবই জনপ্রিয়। তার পছন্দ করে আনা একেকটা শাড়ি একটার চেয়ে অন্যটা সুন্দর। সেই কবে থেকেই আম্মা নতুন শাড়ি কিনবে আর সেটা প্রথমে আমাকে পরতে বলবে না এমন তখনো হয়নি—এখনো হয় না। সেই ছোট্টবেলা থেকেই। তখন হয়তো ক্লাস ফাইভ কি সিক্স! মায়েদের বোধহয় পুতুল খেলার শখ কখনো যায় না। সন্তানই তার কাছে পুতুলের মতো। শাড়িটা একটু পরো না দেখি। একটু সাজো না। একটু এই গয়নাটা পরো না। চুল কেন এভাবে আঁচড়ালে, এভাবে আঁচড়াও। ভীষণ বায়নাক্কা আম্মার।

খুব দ্রুতই আমি পরিপাটি করে শাড়ি পরা শিখে যাই এসব অত্যাচারে। মনে আছে ক্লাস সেভেনে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে আম্মা আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন শাড়ি পরিয়ে। শাড়িটা নাঢ়ির কাছে নতুন কেনা। সেটা তো আম্মারই পরবার কথা ছিল! আম্মা কেন যে আমাকে অতিদ্রুত বড় করে ফেলেছিলেন জানি না।

আম্মার গায়ে রান্নার সময় নানা রকম মশলার গন্ধ, সেতো দৌড়ে এসে আঁচলে মোছা মুখের মতো মিষ্টি। আর কোথাও এমন মেলে না। শাড়ি সুন্দর। শাড়ি জড়িয়ে থাকা আম্মাও। এখনো কত কত শাড়ি না পরে তুলে রাখা, অথচ আম্মার শাড়ির মতো সুন্দর নয় সেসব, পরাও হয় না আর সেভাবে। কখনো আম্মা এলে বলেন, এই শাড়িটা পরো। আমি তো জানি আম্মার কাছে আমি সারাজীবন পুতুলই রয়ে যাবো!

অলংকরণ শিবলী নোমান