ছেলেবেলা শরতের আকাশে শাদা মেঘের ভেলা দেখে কত যে মনে মনে রবীন্দ্রনাথকে খুঁজে পেয়েছি, তার শেষ নেই। অমন মেঘ দেখে বারবার বলে উঠেছি, ওই তো ও-ই তো আকাশে রবি ঠাকুরে ভেসে যাচ্ছেন। তাঁর লম্বা দাঁড়ি ও লম্বা জোব্বা যেন বাতাসে একদিকে উড়ছে। আজকাল সেভাবে তাঁকে পাই না। হয়তো খুঁজি না, তাই পাই না। কিন্তু একজনকে খুব পেয়ে যাই, আকাশে চোখ রাখলেই পাই। মেঘমালার দেশে শাড়ির উড়াল বিছিয়ে তিনি ভেসে যান। যেতে যেতে হয়ে আসেন, আমাদের বাড়ির আঙিনা থেকে এই দূর উত্তরের দেশ পর্যন্ত। সঙ্গে করে নিয়ে আসেন তার আজন্মের পরিচিত সেই গন্ধ। চমক দিয়ে যেতে যেতে রঙের মাধুরী মেশানো রঙগুলো ঢেলে দেন আমার কোচরে। বলেন, মেখে নাও সমুদ্র, আকাশ, আর তাদের অসীমতা। ভুলে যেও না এসব, এসবই তো তুমি…

তাকে দেখি কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে টরেন্টো, টরেন্টো থেকে ক্যালগেরি হয়ে পৃথিবীর আকাশে। মাকে। মায়ের চোখে মাটির রূপকথা, আঁচলে মাখানো সবুজ দ্বীপের ঘ্রাণ। উড়াল আয়োজনে চলে যান দিগন্তের রেখা ধরে। আকাশ থেকে ঝরে পড়ে বৃষ্টি ফোঁটা। ঠিক ঠিক অনুভব করি এই জলধারা তারই পাঠানো। মায়ের শাড়ির আঁচল দিয়ে যেন ঢেকে রাখা এই পৃথিবী।

আমার মায়েরও শাড়ি-প্রীতি ছিল আর দশজনের শাড়িপ্রিয় বাঙালি নারীর মতোই। তবে রুচিটা ছিল আভিজাত্যে মোড়ানো, চমৎকার ভাবময়। স্বাধীনতা পূর্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী তিনি। তাদের সময়, প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অবস্থা সবকিছু থেকে তারা শিখেছে, কী করে একজন মানুষকে আত্মপরিচয়ের উজ্জ্বলতায় ব্যক্তিত্বময় হয়ে উঠতে হয়। তাদের কাছে পোশাক তো শুধু পোশাক নয়, এটা ছিল সংস্কৃতির প্রতীক। তাই, মায়ের আলমারি খুললে ন্যাপথলিনের নস্টালজিক গন্ধে ডুবে থাকা শাড়িগুলো আজও আমাকে বসিয়ে রাখে তার রুচি ও স্নিগ্ধতার কাছে। সে হোক না সুতি কিংবা সিল্কের বোনা। হোক না বাটিক কিংবা হাতে নকশা করা। চোখে ভাসে, মা একে একে ভাঁজ খুলে দেখছেন, আবার হ্যাঙ্গার কিংবা আলমারির তাকে সাজিয়ে রাখছেন। সুতির পাশাপাশি জর্জেট, রাজশাহী সিল্ক, ঢাকাই তাঁত আর জামদানী, টাঙ্গাইল, মিরপুর-কাতান, আরও আরও কত রকমের, এই সবগুলো ছবি দেখেছি যেমন, এখনও চাইলে অনেক পরিষ্কার দেখতে পাই, অনেক স্পষ্ট করে।

আমি তার পরনে শাড়িটি দেখতে পাই, খুব চেনা সেইসব স্নিগ্ধ রঙের শাড়ি। যা মা ভালোবাসতেন। প্রিয় রঙ কী ছিল! কোনো দিন জিজ্ঞেস না করলেও, দেখেছি ঘরে-বাইরে সবখানেই তিনি হালকা আদরমাখা স্নিগ্ধ; কোমল রঙের শাড়িই পরতেন। তবে ঘরে অবধারিত সুতির শাড়ি। তাঁতে বোনা চওড়া পাড়ের ঢাকাই শাড়ি। 

সুতির শাড়ি, তার উপরে হাতে করা নকশা শাড়িগুলো, মায়ের তালিকায় শীর্ষ আদরের স্থান নিয়ে ছিল। বারবার জানা হয়েছে, মা আমাদের ঐতিহ্যের দিকেই যেন বেশি করে ঝুঁকে থাকা। ঢাকার বেইলি রোডের টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির ছিল আমার মায়ের অনেক প্রিয় ও পছন্দের শাড়ি-বিতান। আজও যখন বেইলি রোড ধরে যাই, বারবার চোখ চলে যায় নির্দিষ্ট ওই দোকানটির দিকে। যেখানে মায়ের কত স্মৃতি, উপহার, ঈদের সংগ্রহ, আরও কত কী! ওদিকে তাকালে কী যেন ছিল, কী যেন নেই অনুভব এসে ধাক্কা দিয়ে যায়। 

এ-সবই তো মায়ের শাড়ির সংগ্রহ ও রুচি-রঙের কথা। কিন্তু তাঁর সন্তানদের কাছে তাঁর সেই শাড়িরা কী ভূমিকায় ফিরে ফিরে আসে, আজ ভাবতে বসে চোখের ভেজা পাতায় এঁকে যাই অসংখ্য ছবি, চশমার কাচে কুয়াশা জমে ওঠে, মুছে নিয়ে মনে করি, মায়ের শাড়ি আর তার গন্ধ। সেই গন্ধ কেমন ছিল! পাখির ডানা নাকি বৃক্ষের ছায়া! অথবা ভুবন ভরে নিশ্বাস নেবার বিশ্বস্ত আশ্রয়! সব সব সব। সে-ছিল আমাদের শৈশব। জড়িয়ে থাকা চন্দনকাঠের ঘ্রাণে মোড়া ভুবন।

প্রথমেই মনে পড়ে আঁচলের কলা-সৌকর্য। চোখে ভাসে বাতাসে উড়ন্ত আঁচলের ছবি। মায়ের শাড়ির প্রথম সিঁড়ি সেই আঁচল, যা কিনা পৃথিবীর যাবতীয় বিপদ থেকে আমাদেরকে আড়াল করে রাখার রক্ষা-পতাকা। আর শাড়িজুড়ে লেগে থাকা মায়ের গায়ের গন্ধ চিনিয়েছে স্নেহ মায়ার শাশ্বত অনুভব, চিনিয়েছে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়টি। যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাখা আছে কেমন এক মন কেমন করা ঘ্রাণ। এখনও তার আভাস নাকে এসে লাগে…।

সে-ই আঁচল, ছেলেবেলা গোসলের পর আমাদের মাথা মুছিয়ে দেয়া স্নানান্তের আদর, মুখ মুছিয়ে দেয়া যত্ন রূপের নির্ভরতা, অথবা রোদ বা তীব্র সবকিছু থেকে আড়াল দেয়া পরম ছায়ামায়া ভালোবাসা।

তাঁতের বুননে বুনোট করা শাড়ির সবুজ পরিপাটি, রান্নায় হাত চালাতে চালাতে সহসা কোনো সন্তানের ডাকে ফিরে তাকানো!  আমিই হয়তো ‘মা’ বলে কারণে অকারণে ডেকে উঠেছি…। কাজে ব্যাঘাত করেছি, তাও মা শাড়ির আঁচলে ঘাম মুছে জিজ্ঞেস করেছেন, কী বলবি বল…!

অবহেলা নয়, বিরক্ত নয়, এ-ছিল সন্তানের বিষয়ে শুধুই নিশ্চিন্ত হতে চাওয়া। কেন মা বলে ডাক দিলো! যদিও আমার বেলায় বেশিটা সময়ই ছিল অকারণের ডাক। ‘শিশু যেমন মাকে নামের নেশায় ডাকে’ আমারও সেরকম একটা স্বভাব ছিল। 

মায়ের শাড়ি নিয়ে এজীবনে অনেক গল্প আছে। মনে পড়ছে—এখন যে দেশে থাকি, মাল্টিকালচার ডাইভারসিটির দেশ, কানাডা। এখানে অসংখ্য দেশের অজস্র বেশ-ভুষার মানুষ। কাজেই শাড়ি পরা মানুষেরও অভাব নেই। দেশ থেকে আসার পর প্রথম প্রথম শাড়ি পরা কাউকে দেখলে তাকিয়ে থাকতাম। তেমনই এক গ্রীষ্মে পথে হাঁটছি, হঠাৎ পিছন থেকে দেখি, কে একজন ঠিক যেন মায়ের পছন্দের মতন একটি শাড়ি পরে হেঁটে যাচ্ছেন। চমকে উঠলাম! মায়ের গড়ন যেন। এত মিল! এত মিল! তাকে সামনে থেকে দেখবো বলে জোরে পা চালিয়ে এগিয়ে গেলাম। শুনেছি, পৃথিবীতে নাকি একই চেহারার তিনজন করে মানুষ আছে। তারা কে যে কোথায় আমরা জানতে পারি না। কিন্তু আছে নাকি। তো তেমনই এক আশা নিয়ে দেখার জন্য সেই ভদ্রমহিলাকে পার হয়ে কিছুটা এগিয়ে গেলাম। যদি ইনি মায়ের প্রতিচ্ছায়া হন!  

নাহ, তিনি মায়ের মতন দেখতে নন, তিনি তার মতোই। তবে শাড়িটা বড্ড চেনা রঙের, চেনা রুচির লেগেছিল। সেজন্যে হয়তো পিছন থেকে দেখে তার সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। যদিও তিনি এর কিছুই জানলেন না, আমাকে অতিক্রম করে আরও সামনে চলে গেলেন। দাঁড়িয়ে থাকলাম পথের ধারে, তাকে যতদূর পর্যন্ত দেখা যায়, ততক্ষণ।

পৃথিবীর তিনভাগ জল। তাই নানা দেশের জলজগতের পারে চলে যাই বারবার। এই তো দুবছর আগের শরতে গিয়েছিলাম ভূমধ্যসাগরে, যাকে মেডিটেরেনিয়ান সি বললে সঙ্গে সঙ্গে চিনে নেয় সবাই। সেখানে বসে থেকেছি পাথর দিয়ে বাঁধানো জলপথের পাশে, বাতিঘরের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেটে গেছে সন্ধ্যা থেকে রাত। দিন-রাত পুড়ে পুড়ে ঘুরেছি জলবৈদিক অন্বেষণে, ডুবে যাওয়ার আলিঙ্গনে। আর কী আশ্চর্য গ্রিক দেশের পৌরাণিক কাহিনি কিংবা হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী এই সমুদ্রের পাশে বসে মায়ের কথা মনে পড়লো। কারণ, মা খুব বেড়াতে ভালোবাসতেন, ভালোবাসতেন ঐতিহাসিক স্থানগুলো দেখতে। প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়ার সাধ ছিল খুব। আরব সাগর, ইংলিশ চ্যানেল, বঙ্গোপসাগর দেখেছেন, কিন্তু এই মেডিটেরেনিয়ান সমুদ্র কোনো দিনও দেখা হবে না তার। কথাটা ভাবতেই, একটা ভেজা হাওয়ায় ঢেউ মিলিত কোরাস হয়ে এগিয়ে এলো। ফিস ফিস করে কিছু যেন বলছে! ঠিক ঠিক! স্পষ্ট শুনতে পেলাম, মা-কে। সেই কণ্ঠস্বর! জিজ্ঞেস করছেন, এভাবে বসে আছিস কেন? আয় তোর চোখের জল মুছিয়ে দিই।

আরও জোরে কান্না এলো। জল-বাতাস মায়ের মিহিন শাড়ির আঁচল উড়িয়ে মুছে দিলো চোখের জল। এ তো মুছিয়ে দেয়া নয়, ভিজিয়েই দেয়া, যেন লুকিয়ে ফেললো আমার চোখের একরাশ জলের চিহ্ন। 

পৃথিবী অনেক দিক থেকেই যেমন বদলে গেছে, তেমনই বদলেছে তার বেশবাস পোশাক-পরিচ্ছদ। কিন্তু আমার চোখে মা বলতে ওই শাড়ি পরা একজন পরম মমতাময়ী অবয়বকেই মনে পড়ে। যদিও আজকের মায়েরা জীবনের প্রয়োজনে, প্রতিদিনে ছুটে চলা ব্যস্ত প্রবাহে সুবিধা মতো পোশাক নির্বাচন করে নিচ্ছে। সব মিলিয়ে শাড়ির বাইরেও এখন নানা রকমের পোশাক এসেছে।

আমাদের সময়ের মায়েদের শাড়ির বাইরে আর কোনো পোশাক পরতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তখনও বিশ্বায়নের যুগে প্রবেশ করিনি আমরা। তাই তখনকার মায়েদের পোশাক ভাবনাও বোধহয় বাঙালিয়ানার বাইরে যাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেনি। কদাচিৎ যাওবা দু’একজনকে অন্য পোশাকে দেখেছি, তাদের বেশির ভাগই আসতেন প্রবাস থেকে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার আমার মা কিন্তু প্রবাসে গিয়েও শাড়িতেই আবদ্ধ ছিলেন। বিলেতের তুষারপাত অথবা ফরাসি দেশের আনন্দ ভ্রমণেও সারাক্ষণ তিনি শাড়িতে। আমরা জানতামই না শাড়ি ছাড়া মায়ের আলাদা কোনো বেশবাস!

মা তো মা-ই, যার উপরে আমাদের নিঃশর্ত অধিকার। সকল চাওয়ার একমাত্র স্থান। মা, এটা দাও! মা, ওটা দাও! বলে বলে কত না অস্থির করেছি। আচ্ছা মা কি বিরক্ত হতেন? কোনো দিনও ভাবিনি সেকথা। শাড়ির আঁচলে বাঁধা থাকতো সংসারের চাবির গোছা, আর তার প্রান্তে গিঁঠ দিয়ে বাঁধা থাকতো কিছু খুচরো পয়সার ঝাঁপি। আমরা দৌড়ে এসে সেই গিঁঠ খুলে পয়সা নিয়ে যাই, কিনি আইসক্রিম, আচার আর লজেন্স। যেন জানতাম ওগুলো আমাদেরই অধিকারের অপেক্ষায়, মাকেও কখনো না বলতে শুনিনি। ছেলেবেলার সিকি আধুলি আর নানান চেহারার পয়সা চিনেছি মায়ের শাড়ির আঁচলের গিঁঠ খুলে।

কৈশোরে ঘর থেকে কাঠের চৌকি নিয়ে এসে মঞ্চ বানিয়ে, নিজেদের পাড়ায় প্রায় প্রায় ফাংশন করতাম। বন্ধুদের সকলকে দিয়ে নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি, অভিনয়ের মাহফিল বসিয়ে ছাড়তাম। এইসব ফাংশনের মঞ্চ, নাচ ও অভিনয়ের শিল্পীদের সাজাতে মায়েদের শাড়িই তখন একমাত্র ভরসা। আমরা বন্ধুরা প্রায় লুট করে নিয়ে আসতাম মায়েদের শাড়ি। তারপর নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠান করে চমকে দিতাম আমন্ত্রিত অতিথি এবং মায়েদের। আহা সেই সব প্রশ্রয়ের দিন কী এখনও আছে! এখনও কি আছে পাড়ায় পাড়ায় গান, নাচ কবিতার ভূতে পাওয়া কিছু স্বপ্নতাড়িত কিশোরী-কিশোর! যাদের আনন্দই ছিল কেবল নির্মল, নিঃস্বার্থ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করায়। আর সেসব আয়োজনের পেছনে সাজ-সজ্জার জন্য এখনও কি তারা নিয়ে আসে ঘরের আসবাব, মায়ের শাড়ি!

খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সেই দিনগুলো, ফাংশন চলছে। রবি ঠাকুরের গানের সঙ্গে নেচে চলছে একগুচ্ছ মেয়ে—

মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি। আহা, হাহা, হা।
আজ আমাদের ছুটি ও ভাই, আজ আমাদের ছুটি। আহা, হাহা, হা।
কী করি আজ ভেবে না পাই, পথ হারিয়ে কোন্ বনে যাই,
কোন্ মাঠে যে ছুটে বেড়াই সকল ছেলে জুটি। আহা, হাহা, হা।

কবি লিখেছেন বটে ‘সকল ছেলে জুটি’, কিন্তু ওরা সকলে মায়ের শাড়ি পরে নাচতে চায়। তাই সকল ছেলের পরিবর্তে সকল মেয়েরাই নেচে যায়, ওদের প্রত্যেকের পরনে মায়ের শাড়ি। ওরা দুহাত ধরে যখন ঘুরে ঘুরে নাচে, হেলে দুলে জানান দেয়—

কেয়া-পাতার নৌকো গড়ে সাজিয়ে দেব ফুলে—
তাল দিঘিতে ভাসিয়ে দেব, চলবে দুলে দুলে।
রাখাল ছেলের সঙ্গে ধেনু চরাব আজ বাজিয়ে বেণু,
মাখব গায়ে ফুলের রেণু চাঁপার বনে লুটি। আহা, হাহা, হা।

তখন আমার শৈশব-কৈশোর-মায়ের শাড়ি, সবকিছু একত্রে মিলেমিশে বিশাল এক ক্যানভাসে পরিণত হয়। সেলুলয়েডের ফিতে হয়ে ঘুরে চলে স্মৃতিচিত্রের ছবিগুলো।

বিশেষ দিনে আমরা মাকে শাড়ি উপহার দিতাম। মনে আছে, মাদার্স’ডের বাতাসটা নব্বই দশকে বাংলাদেশে এসে লাগলো। বেশ কেমন একটা মা মা গন্ধ জাগানিয়া দিন। তো মায়ের জন্য বেইলি রোড থেকে শাড়ি ও কেক আনা হলো।

মা খুশি হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এটা কি প্রতিবছর হয়?

হ্যাঁ মা প্রতিবছর মা-দিবস হয়। কিন্তু এখন এই দিনটি আমার খুউব বিষণ্ন কাটে। মা চলে গেছেন ঠিক এই মা-দিবসের আগের দিনটিতে। সেই থেকে প্রতিবছর মাদার্স-ডে আমার মতো মা-হারা সন্তানের কাছে গভীর এক মর্মব্যথার প্রতীক। কত বছর কেটে গেছে। মায়ের জন্য আর কোনো শাড়ি কেনা হয় না। কানে ভাসে সেই জিজ্ঞেসা—এটা কি প্রতিবছর হয়! 

মাকে দেখি না প্রায় দেড় যুগ। কতগুলো বছর, মাস, দিন, ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড পেরিয়ে গেছে! মাকে দেখিনি দেড় যুগ! একটা দমকা হাওয়ার স্পর্শ নিয়ে বনের রাস্তায় পথ হারানোর মতো লাগে, কতগুলো ঝিঁঝির শব্দ একত্রে কানে ধাঁধা লাগায়। অনেক দিন পর বারবার মা মা উচ্চারণে বুকের পাটাতন সরে সরে যেতে থাকে। আমি হেঁটে যাই দূর কোনো মন্দ্রিত সকাল অথবা বিকেলের পথ ধরে। যেখানে সারি সারি ফুল, লতা বা কিছু পরিচিত ফলের গাছ। কেমন আপনা থেকেই বুনেলা রোদ আড়াল করে ছায়াময় স্বপ্নজগত তৈরি করেছে। চেয়ে দেখি—বাগান বিলাসি মা আমার সেই লতানো আঙ্গিনায় আরও কিছু গাছের সবুজ ঢেলে দিতে ব্যস্ত, মাটির বুকে এঁকে দিচ্ছেন মাধবীলতা, গোলাপ বা চন্দ্রমল্লিকার শিকড়। মায়ের হাতে মাটিরঙ মানচিত্র, সেই বিশাল প্রান্তরে তিনি এক মনে এঁকে যাচ্ছেন পৃথিবীর বন-বনান্তরে ঘুরে বেড়ানো পথহারা সন্তানের ঠিকানা, বাতাসে পাঠাচ্ছেন দুরালাপ সম্ভাষণ—

—কীরে ভালো আছিস তো! ঘরে ফিরে আসবি না!

উত্তর খুঁজে পাই না। কী বলে ব্যক্ত করবো—মা আমি হারিয়ে গেছি। তোমার মানচিত্রের পথ ধরে পুরোপুরি ফিরে আসা হয় না আমার…

কুয়াশা নদীর ওপারে মাকে হাঁটতে দেখি। খুব ছোট্ট একটা মেয়ে যেন তিনি, যেন কাবুলিওয়ালার মিনি। পরনে শাড়ি, হাতে ক্রিসেন্থিমাম রোদ। তিনি একা, কেউ নেই সঙ্গে। খেলার সাথিরাও নেই। মাকে এভাবে একা দেখে ভয় হয়। বারবার বলতে থাকি:

—আরে মা তো হারিয়ে যাবে! হারিয়ে যাবে মা! 

ধক করে ঘুমটা ভেঙে যায়! খুব শূন্য লাগে। মনে হয় আজও মাকে প্রাণভরে ভালোবাসা হয়নি। খুব ইচ্ছে করে মায়ের নিজস্ব গন্ধটা পেতে। না-পেয়ে অভিমান জাগে। কোনোদিন ভাবিনি, মাও এভাবে কষ্ট দিতে পারেন! অজান্তে চোখের জল গড়িয়ে পড়ে, মায়ের শাড়ি দিয়ে তৈরি কাঁথাটাকে আরও গভীর করে জড়িয়ে ধরি। ডুবে যাই!

অলংকরণ শিবলী নোমান