বাইরে ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি নামলে পানির ছিটা বিছানায় এসে পড়ে। জানালার গ্লাসটা বন্ধ করতে ইচ্ছে করে না। সন্ধ্যা থেকে ভীষণ অস্বস্তিকর গরমে নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। এই বৃষ্টি আর ভেজা বাতাস শীতল করে দিল ভেতরটা। যাক কাল অন্তত এই মরুভূমির মতো শহরটায় কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইবে। বলতে বলতে জানালাটা অর্ধেক লাগাতেই আবার খুলে বসলাম। বৃষ্টির এই ঝাপটা আসলে ভীষণ কাঙ্ক্ষিত। জানালা বন্ধ করে এমন কাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিরুদ্ধচারণ করা যায় না।

ঝড়ের মতো বাতাস বইতে শুরু করে হঠাৎ। বাতাসে দূরের বড় গাছগুলো যেন মুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে। অথচ কত নির্মল সৌন্দর্যে ভরে আছে জানালার ওপাশের প্রকৃতিতে। স্ট্রিট লাইটের আলোয় চকচক করছে সামনের বকুল গাছের প্রতিটি পাতা। আর সেইসঙ্গে তার কী নাচুনি! যেন বাতাসের ফিসফিস করা কথায় হাসিতে ফেটে পড়ছে সে। এতোবড় শহরে আর অগণিত মানুষের ভেতরে সামান্য কিছু গাছ টিকে আছে। গাছের বদলে হেথায় সেথায় জেগে উঠেছে বিল্ডিং। গাছবিহীন এসব বিল্ডিং দেখতেই পানসে লাগে। মনে হয় অলংকারহীন বিধবা শহর। কিন্তু এই বাড়িটার সামনে একটা বড় বকুলগাছ সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে। মূলত এই গাছটাই আমার এই বাড়িতে ওঠার মূল আকর্ষণ। গ্রাম ছেড়ে যখন প্রথম এই শহরে আসি তখন রাতদিন মনটা পড়ে থাকতো গ্রামের বাড়িতে। খুব কষ্টে আমার সে ভুবনকে ছেড়ে আসতে হয়েছিল। আর এজন্যই হয়তো এমন একটা বড় গাছে ঘেরা বাড়িটা দেখেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল আর তখনই সিদ্ধান্ত করেছিলাম ওঠার। জানালার ওপাশের এমন প্রাকৃতিক কাঠামো যে আমার হাজার বছরের চেনা!

এমন ঝড়ের মতো বৃষ্টির দিনে আমার মায়ের জলে ভেজা চুপসানো শাড়ির কথা মনে পড়ে, আমার বাবার নবান্নের ধান ঘরে তোলার কথা মনে পড়ে কিংবা আমার ঝড় বৃষ্টির দুপুরে হৈ হৈ করে আম কুড়ানোর কথা মনে পড়ে। আম হয়তো সারা বছর জুড়ে থাকতো না কিন্তু বৃষ্টি সারাবছর টুকটাক হতো। আর বৃষ্টি হওয়া মানেই সারা গ্রামের মানুষের হৈ হুল্লোড় শুরু। এমনকি এই অর্ধেক রাতেও যদি বিরক্তিকর বৃষ্টি আমার গ্রামে হানা দেয় তারপরেও মানুষ ঘুম থেকে চোখ মুছতে মুছতে উঠে হৈ-হুল্লোড় করবে। যদিও সেটা আনন্দের জন্য নয়। উঠানভরতি হয়তো শুকনা কাঠ, দড়িতে ঝুলানো কাপড়, উঠানে থাকা কোনো শস্য ভিজে যাওয়ার ভয়ের জন্য। আর আমার মতো বাচ্চারা ঘুমের মধ্যে বজ্রপাতের শব্দে দাদির বুকের মধ্যে ছোট্ট হয়ে কুঁকড়ে থাকবে। হয়তো খুব শীত লাগবে কিন্তু মেঘের গর্জনের ভয়ে চোখ মেলে কাঁথা টেনে নিতে পারবে না। চোখটা মেললেই যদি শব্দ করা রাক্ষসটা তাঁর ছোট্ট দেহে আছড়ে পড়ে! তাই ভয়ে দাদির শাড়িটাকেই পেঁচিয়ে নেবে শরীরটা জুড়ে।

বৈশাখ মাসের দিনের বেলা ধানের সময় যদি ভুল করে বৃষ্টি হানা দিতো তাহলে এ দৃশ্য গ্রামের প্রতিটি বাড়ির। এলোমেলো ধানে সারা উঠোন ভরে থাকতো আর বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ জলে ভিজে ভিজে উর্ধ্বশ্বাসে ধান ওঠাতো। এমন ধান ওঠানোর পালা চলতো সারা গ্রামে। আমার মতো ডানপিটের কাছে সেটাও ছিল একটা উৎসবের মতো। আর বর্ষাকালে যখন সারাদিন বৃষ্টি হতো তখন সেই বৃষ্টিতে ভিজে কত নাম না জানা জংলী ফল খুটে যে খেয়েছি, কত জংলী ফুল ফুটতে দেখেছি তার কী ইয়ত্তা আছে! বৃষ্টি থামলে দেখেছি সেসব ফুলের সে কি মন মাতানো সুগন্ধ! এখনো যেন নাকে এসে ধাক্কা দেয়।

মনে পড়ে একবার পাহাড়ে ঘুরতে গিয়ে বৃষ্টি দেখেছিলাম। আহা সে কি মনোরম বৃষ্টির দৃশ্য! আদিম পৃথিবীর সে সৌন্দর্য সবকিছুকে হার মানায়। পাহাড়ের উপরটা যেন কুয়াশার চাদরে আগলে রেখেছে। নির্মল সবুজ জঙ্গল চারিদিকে। ঝুপ করে হঠাৎ বৃষ্টিতে আরো নির্মল, শান্ত করে দিয়েছিল প্রকৃতিকে। ঘণ্টাখানেক শুধু মনোমুগ্ধ হয়ে চেয়ে ছিলাম বৃষ্টি আর প্রকৃতির একাকার মাধুর্যের দিকে।

যেদিন বৃষ্টির সময় মায়ের বকুনিতে শান্ত হয়ে ঘরে বসে থাকতে হতো সেদিন ঘরের দাওয়ায় বৃষ্টির লীলাখেলা দেখতে দেখতে কত মুরগিকে বাচ্চা নিয়ে উঠানের এক কোণায় দাঁড়িয়ে ভিজে চুপসে থাকতে দেখতাম। সে স্নেহময়ী দৃশ্যের কোনো তুলনা হয় না। বড় মা মুরগিটা হয়তো ভিজে একাকার হয়ে যাবে কিন্তু বৃষ্টি থেমে যখন এক এক করে বাচ্চাগুলো বুকের নিচের পাখনার ভেতর থেকে গুটি গুটি পায়ে বের হবে তখন দেখা যাবে তারা দিব্যি শুকনো। অথচ আট-দশটা বাচ্চা পাখনার নিচে নিয়ে সব ঝড়-জল মাথার উপর দিয়ে সয়ে নিয়ে গেছে মা মুরগি। জলে ভেজার জন্য হয়তো কিছুদিন পর কিছু মুরগি অসুখে পড়ে মারা যেতো। তখন সেটা দেখে কষ্ট পেতাম। আর ভাবতাম কেন মুরগিগুলো অমন কষ্ট করে বাচ্চাগুলো বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে গেলো! বরং যে যার মতো ছুটে পালালেই তো পারতো। এখন হয়তো বুঝি কেন অতো কষ্ট সহ্য করেও মা ঝড়ের মধ্যে অটল হয়ে বাচ্চা আগলে দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের মাকেও তো অসংখ্যবার দেখেছি এই চরিত্রে। কিন্তু মায়ের বুকের নিচের পাখনার ভেতর থেকে বেরিয়ে যখন বুঝতে শিখলাম তখনই পেছন থেকে মা-দেখি আর নেই।

গাড়ির একটানা বিশ্রী হর্নের শব্দ কানে এসে আমার পাহাড়, জঙ্গল আর গ্রামের বৃষ্টির কল্পনার পর্দাটাকে এক মুহূর্তে ছিঁড়ে দিল। সকালের রক্তিম আভা ফুটে উঠেছে চারিদিকে। প্রতিদিনের মতো মানুষ আর যানবাহনের চিৎকারে কংক্রিটের জঙ্গলটা ব্যস্ত হয়ে উঠছে। তখন মনে পড়লো আমার সে চিরচেনা জংলী ফলে-ফুলে ভরা জঙ্গলটা আজ আর নেই। যেমন আমিও নেই। সেই জঙ্গলটা ছেড়ে অনেক আগেই চলে এসেছি এই নিষ্প্রাণ শহরে। আমার কাছে এটাও জঙ্গল তবে গাছ আর পশু পাখির নয় মানুষ আর বিল্ডিংয়ের জঙ্গল।

এখন বকুল গাছটাও শান্ত দর্শকের ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে। এ যেন আমার দাওয়ায় বসে স্নেহময়ী মুরগির লড়াই দেখার মতো। বকুলগাছটা আগলে রেখেছে তার ছোট ছোট মানব সন্তানকে এই ছোট্ট বাড়িটার মধ্যে। আর ইট কংক্রিটের অনবরত ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার দেহের উপর দিয়ে। তবুও সে অটলভাবে সুরক্ষা দিচ্ছে তাদের সন্তানদের। যতদিনে আমরা বুঝবো এই মা-সম গাছের কষ্টের কথা ততদিনে সে-ও হয়তো হেরে যাবে।