।। ইশরাত হুসেন ।।

ভাষান্তর: জিয়া আরেফিন আজাদ


মূল লেখক ড. ইশরাত হুসেন একজন পাকিস্তানি ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ। সিভিল সার্ভিস দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু। অধ্যাপনা করেছেন, বিশ্ব ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন (১৯৯৯-২০০৬)। সে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব নিশান-ই-ইমতিয়াজ এ ভূষিত হয়েছেন। সর্বশেষ (২০১৮ সাল পর্যন্ত) কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ছিলেন। আশি বছর বয়সী ইশরাত হুসেনের জন্ম অভিভক্ত ভারতের যুক্ত প্রদেশের এলাহাবাদে। চাকুরিসূত্রে তিনি বাংলাদেশের পটুয়াখালি, চট্টগ্রাম ও ঢাকায় থেকেছেন এবং বাংলা বলতে পারেন। উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্র সম্পর্কেই তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের বিজয়ের ৫০ তম বার্ষিকীতে তিনি ‘ডন’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লিখেছেন। নিবন্ধটিতে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা নৈর্বক্তিকভাবে বিবৃত হয়েছে। নানা দিক থেকে তাঁর এই মূল্যায়ন গুরুত্ব বহন করে।


বাংলাদেশ তার অভ্যুদয়ের পঞ্চাশতম বার্ষিকী পালন করছে। যে দেশটিকে এক সময়ে হেনরি কিসিঞ্জার ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন সেটি এখন আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় আয় পঞ্চাশগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২৫ গুণ (ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি), খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে চার গুণ। জনসংখ্যার বৃদ্ধিকে তারা ২.৫ গুণে আটকে রাখতে পেরেছে যার ফলে মাথাপিছু খাদ্যগ্রহণের হার উর্ধ্বমুখি হয়েছে। রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে ১০০ গুণ আর দারিদ্র্যের হার ১৯৯০ সালে ৬০ ভাগ থেকে বর্তমানে ২০ ভাগে হ্রাস পেয়েছে। জীবন প্রত্যাশা বৃদ্ধি পেয়ে ৭২ বছরে উন্নীত হয়েছে। অধিকাংশ সামাজিক সূচকে তারা শ্রীলংকা বাদে অন্য সকল প্রতিবেশিদের চেয়ে অগ্রগামী। মানব উন্নয়ন সূচতে তারা ৬০ শতাংশ উন্নতি করেছে।

উন্নয়নের বৃহদাংশ অর্জিত হয়েছে গত তিন শতকে কারণ প্রথম দুইটি শতক ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং রুগ্ণ প্রবৃদ্ধির। পাকিস্তানের অবস্থান থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ১৯৯০ সালে পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ ছিল বাংলাদেশের দ্বিগুণ যা এখন দশ ভাগের সাত ভাগে অবনমন ঘটেছে। কোভিড সংক্রমণের পূর্বে ২০১১ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ হতে ৮ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে যা পাকিস্তানের জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।

বাংলাদেশের উন্নতির গল্পটা বেশ চিত্তাকর্ষক। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে ভঙ্গুর একটি দেশ কীভাবে তার বৃহৎ ও সম্পদশালী দুই প্রতিবেশী, ভারত ও পাকিস্তানকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পেছনে ফেলে দিল? বাংলাদেশকে একটি কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। নতুন রাষ্ট্রের জন্য প্রশাসন নির্মাণ করা, বাস্তুচ্যূত জনসাধারণকে পূনর্বাসন করার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের স্থপতি এবং শীর্ষ নেতৃত্বদের হত্যা এবং অসংখ্য অসফল ও সফল সামরিক অভ্যুত্থানকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। ১৯৯১ সালে জেনারেল এরশাদ সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তার আগে পর্যন্ত সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় ছিল। (২০০৭ সালে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন সংসদীয় ব্যবস্থায় একটি স্বল্পকালীন ছেদ ঘটে)

১৯৯১ থেকে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়ার বিএনপি পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অবস্থান করছে। ২০০৯ সাল থেকে পর পর তিনটি সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করছে। তাদের এই দ্বন্দ্ব ছিল তীব্র ও সংঘাতময়। খালেদা জিয়া নির্বাচন বয়কট করেছেন এবং বেশ কিছুদিন ধরে তার দলের আরও কিছু মহারথীদের সঙ্গে জেল খেটেছেন। এই পরিস্থিতিতে, তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অস্থিতিশীলতার ঝুঁকির মধ্যে কীভাবে বাংলাদেশ তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করল সেটা পরখ করে দেখা চিত্তাকর্ষক হবে নিঃসন্দেহে।

প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মত নয়। এটি এক ভাষা, অভিন্ন নৃতাত্বিক বৈশিষ্ট্য এবং ইতিহাসের অংশিদার একটি জনগোষ্ঠীর দেশ। বস্তুত এখানে ধর্মীয়, গোষ্ঠীগত, নৃতাত্বিক বা সামন্ত উপজাত কোনো বিভাজন ক্রিয়াশীল নেই। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য আছে তবে ত্বরিৎ উন্নতির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ কিছুটা কম। উন্নতির আকাঙ্ক্ষা একটি বড় সামাজিক নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সামনে খুব বড় কোনো বহিস্থ নিরাপত্তা হুমকি নেই।

দ্বিতীয়ত, এখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত। প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, আইন ও অর্থ সংক্রান্ত কোনো বিষয়েই রাজ্য বা প্রদেশের হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকেই কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে সক্ষম। বহু স্তরবিশিষ্ট সরকারে গঠনগতভাবে যে সকল বাধা-বিঘ্ন থাকে সেগুলো না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় শ্লথতা দেখা যায় না। নীতি গ্রহণ ও তার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি সুসংজ্ঞায়িত পদসোপানের অস্তিত্ব দেখা যায়। দুর্বল বিরোধীদলের বিপরীতে একটি শক্ত নেতৃত্ব (যাকে কখনও কখনও ছদ্ম বা আধা কর্তৃত্বপরায়ন বলা হয়ে থাকে) থাকার ফলে, বিজয়ী দলই পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে যা কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বেগবান করে এবং আমলাতন্ত্রকে জবাবদিহিতার মধ্যে রাখে।

তৃতীয়ত, নারীর ক্ষমতায়ন যা ১৯৭১ এর আগে থেকেই অস্তিত্বশীল ছিল সেটি আরও বেগবান হয়েছে। এনজিওগুলোর সক্রিয় সমর্থনে প্রতিটি সরকার সমাজের সর্বস্তরে পরিবার পরিকল্পনা, নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার ব্যাপক ও বিরতিহীন প্রচারণা চালিয়েছে। ব্র্যাক, গ্রামীণ ব্যাংক, আশা ইত্যাদি সংস্থাগুলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে এবং নারীদের জন্য ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে সরকার সিভিল সমাজভুক্ত সংগঠনগুলোকে পূর্ণ সহায়তা করেছে এবং এনজিওগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। শিক্ষিত ও স্বাস্থ্যবান নারীরা কম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এবং তাদের সন্তান জন্মদানকালের মধ্যে ভাল ব্যবধান রয়েছে। এর সঙ্গে আর্থিক সম্পদের সংযোগ ঘটার ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমে নারী অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস পেয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়ে শিশু ভর্তির অনুপাত ১০৫ শতাংশ।

চতুর্থত, তিক্ত রাজনৈতিক বৈরিতা সত্ত্বেও সরকারগুলো অর্থনৈতিক নীতি, কর্মসূচি ও প্রকল্পের বিষয়ে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, কৌশলী অর্থ ব্যবস্থাপনা (fiscal prudence), উদার বাণিজ্যনীতি, বেসরকারি খাতে প্রণোদনা এবং সামাজিক অগ্রগতির প্রতি অঙ্গীকার—রাজনৈতিক দলগুলো এসব মৌলিক ভিত্তি হতে বিচ্যুত হয়নি। নীতির প্রশ্নে দৃঢ়তা দেখা যায় যেমন সরকারের পরিবর্তনের ফলে আকস্মিক রদবদল দেখা যায় না যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এবং বাজার ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর ফলে বিনিয়োগকারীগণ তাদের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে পারে এবং নির্দিষ্ট সময়ান্তরে অর্থনীতির শ্রীবৃদ্ধি করে।

পঞ্চমত, বাণিজ্য উদারীকরণ, অর্থনীতি উন্মুক্তকরণ, বিদেশি কারিগরি জ্ঞান সংযোজন, রফতানিকারকদের আর্থিক ও অন্যান্য প্রণোদনা প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের প্রচেষ্টা সুফল দিয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্পের দর্শনীয় সাফল্য বাংলাদেশি ফ্যাক্টরিগুলোকে ক্রেতার আগ্রহের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বিক্রেতা হিসেবে শীর্ষে অবস্থানকারী চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর অধিকাংশই বাংলাদেশি রফতানি হাউজগুলোর মাধ্যমে তাদের পোশাক সংগ্রহ করছে। এই শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণের ফলে তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পরিবারে তাদের অবস্থান উচ্চ হয়েছে। উচ্চাভিলাষী তরুণদের নিত্যব্যবহার্য ভাষার মধ্যে ‘উদ্যোক্তা’ শব্দটি একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযোগের ফলে তাদের কর্ম পরিবেশের উন্নতি ঘটেছে। উচ্চ শিক্ষা ও দক্ষতার চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ষষ্ঠত, টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধি তখনই সম্ভব যখন অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় এবং বিনিয়োগ হার ১৫% থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৩০% এ উন্নীত হয়। ব্যক্তি পুঁজির বিরাট একটি চালান উৎপাদন খাতে প্রবাহিত হওয়ায় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের বড় একটি অংশ অবকাঠামো খাতে ব্যয় হওয়ায়, সেই সঙ্গে শ্রমশক্তির উচ্চতর প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হওয়ায় উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুফল অনেক বিস্তৃত প্রভাব সৃষ্টি করে। সামষ্টিক আমদানি চাহিদার উর্ধ্বগতি সত্ত্বেও ক্রমবর্ধমান রফতানি আয় ও রেমিটেন্স প্রবাহ বিদ্যমান ঘাটতিকে সামাল দিতে সক্ষম।

এর থেকে আমরা বহু ধরণের শিক্ষা নিতে পারি। বৃহৎ দু’টি দলের নেতৃত্ব এটা বুঝতে সক্ষম হয়েছে যে, ক্ষুদ্র একটি অভিজাত শ্রেণিকে তোষণ করার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির হারকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে পারলে বৃহত্তর রাজনৈতিক ফায়দা হবে। নির্বাচনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত কৃতিত্বের চেয়ে দলের সাফল্য, জনপ্রিয়তা ও রেকর্ড অধিক ভূমিকা রেখে থাকে। ব্যক্তি খাত, রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে একটি আদান-প্রদানের সম্পর্ক একটি ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে, এর ফলে স্থিতিশীলতা অর্জিত হয়েছে। রাজনীতিবিদগণ নির্বাচনে প্রচারের জন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান হতে অর্থ সহায়তা পেয়েছেন, আমলারা নিম্ন বেতনের ঘাটতি পুষিয়ে নিয়েছেন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উপহার ও উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে। এর বিনিময়ে ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটিয়েছেন যাতে শ্রমিকের স্বার্থ ও পরিবেশের ক্ষতিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু তারা এই অর্থ বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে না।

কর-জিডিপি অনুপাত ৮% হতে ৯% এর মধ্যে ওঠানামা করেছে। এর অন্তর্নিহিত অর্থ দর্শনটি হল একজন স্বাধীন ব্যবসায়ীর হাতে একটি প্রান্তিক ডলারের জ্যামিতিক বৃদ্ধির প্রভাব রাষ্ট্রীয় খাতের অনুরূপ হতে বেশি। যার ফলে সরকারকে সরকারকে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। ঘাটতি থাকে সামান্যই, বড়জোর ৫% এবং এর ফলে রাষ্ট্রীয় ঋণের হার নিম্নমুখি থাকে যেহেতু সার্বিক উদ্বৃত্ত রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, রফতানি উদ্বুদ্ধকরণ, মানবসম্পদ বিনিয়োগ (বিশেষত নারী শ্রম) এবং রাষ্ট্রীয় খাত ও বেসরকারি খাতের একযোগে কাজ করাটাই এই সাফল্যের কাহিনির মূল অনুঘটক।

অনুবাদক জিয়া আরেফিন আজাদ হবিগঞ্জের বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান।