ছোট্ট থানা শহর। যে নামে আগে পরিচিত ছিল তা এখন নিকট অতীত। শহরের মাঝ বরাবর বিধবা নারীর মতন নদী। সন্তান হারা, ঘরছাড়া, যৌন সম্ভোগ বিহীন এক নিস্তেজ নারী সে নদী। দু’হাতে খোপা বাঁধার মতই অবিন্যাস্ত চুলের আকার যেমন গোল আকৃতি পায় তেমনি মনুষ্যসৃষ্ট বাঁধে নদীটির বিপুল জলরাশি নালার মুঠিতে তরঙ্গহারা।

বছর দশেক আগে শহরটির মানুষ তুমুল আগ্রহে অপেক্ষা করেছিল বাঁধের সবকটি মুখ খুলে দেয়া হবে। কিন্তু সেসমস্ত আশা, সম্ভাবনা মৃত শস্যদানার মতো অঙ্কুরহীন হয়ে পড়ে এক সময়। মথুরানগরের নাম পাল্টে গেলেও শহরটির মানুষগুলো আজও শিং মাছ কিনে বাড়ি ফেরে। কর্মকার পাড়ায় সোনা রুপার নতুন গহনা ঝকমক করে। ফি বছর ইদ হয়, পুজো হয়। বিয়ে হয়, জন্ম হয়, মৃত্যুও হয়। কারো মনে এই নাম বদল নিয়ে ভাবনা নেই। এদিকে প্রায় তিনদিন তিনরাত বিদ্যুৎ ছিল না, ঝড়ে-বৃষ্টিতে নাকাল পাড়ার পর পাড়া। আচমকা যে খবর মানুষকে ব্যস্ত করে তুলতো সেই খবরই দেরিতে এলে জলে ডোবা ঘটিবাটি হয়ে যায়। রোজকার মতো ভাদ্র মাসের তালপাকা বিশ্রি গরম সেদিন। তার ওপর মাথার ওপরে পাখাও চলছে না। বাড়ির সকলেই কোনো না কোনো কাজে নিজেদের নিবিষ্ট রেখেছে। হাতে হাতে ফোনের উজ্জ্বল আলো নেই। টিভির সিরিয়াল বন্ধ, খবর বন্ধ তবুও তিনটে দিন এসব ছাড়াই দিব্যি কেটে গেল। মণ্ডলপাড়ার একতলা বাড়ির ছাদগুলোয় গৃহিণীরা ব্যস্ত হলুদ, মরিচ গুঁড়োতে রোদ লাগাতে। কোনো কোনো বাড়িতে দূর-দূরান্ত হতে আত্মীয় পরিজন এসেছে। সেই কলরব, এক বাড়ির দেয়াল টপকে অন্য বাড়ির উঠোন ভরিয়ে তুলছে। কারো কারো বাড়ির বালিশ রোদে ফুলে ফেঁপে একসা। সদ্য ভেজা চুল পিঠের পর মেলে আলস্য ঘিরে থাকা সরলার মুখটা কী আদুরে মাগো! সেই মুখের সামনেই কিনা এমন মৃত্যু সংবাদ! যেনো বজ্রপাত!

শুনেছিস, কৈলাস মারা গেছে!

কোন কৈলাস?

বেদীতলার কৈলাস।

বলেই উধাও স্বপ্না। মুহূর্তে সরলার মন অথৈজলে ডুবন্ত নাও তখন। স্তম্ভিত পা জোড়া তার পাথর হয়ে আসছে। বিকেল নাগাদ খবরটি মণ্ডলপাড়া ছাড়িয়ে নদীপাড়ার সীমায় আছড়ে পড়ছে। গাছের পাতা স্থির, অচল। মরা নদীর জলও অচঞ্চল। কৈলাস যেন অমর কেউ। মরতে জানে না। মৃত্যু তাকে সোনার মুকুট পড়িয়েছে এই সত্য কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না। ঘরে ঘরে চেনা, অচেনা সকলের আলাপে মৃত কৈলাস হয়ে উঠছে জীবন্ত, প্রাণচঞ্চল।

হ্যাঁ এই শহরের নদী নিয়ে কথা বলতো সে। নাম বদলের ঘেঁয়োখেলা নিয়ে মাথা ঘামাতো। ওর একটা পরিচয় ছিল। নামের আগে শিল্পী বলে কদর ছিল। নিমগ্ন, সদালাপী শিল্পী কৈলাসের বয়স সবে বাইশ বছর। এই মৌলি মাসে, জোড়া পূর্ণিমার মাসে বড় নির্জনে চলে গেল সে। বেদীতলার পোড়াইটের বাড়ির উঠোনে কৈলাসের শেষযাত্রার আয়োজনে ব্যস্ত জ্যাঠামশাই। বেলি ফুলের মালায় দেবলোক হতে আসা কোনো দেবতার মতো লাগছে যেন। ওর কী যাবার সময়! এই কী যাওয়া! এখনো যে কূলদেবীর কাজ শেষ হয়নি রে কৈলাস! বৃদ্ধ জ্যাঠামশাইয়ের বুকের ভেতরে সহস্র-বিলাপ ডুকরে ডুকরে উঠছে। এই হাতেই তো পৈতা পড়িয়েছিলেন আর আজ কিনা সেই হাতেই চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দিচ্ছেন কত না চুমুতে মাখা কপাল।

নিজ হাতে বিদ্যে দিয়েছেন মায়েদের মুখ গড়ার। শহরের প্রায় সব মন্দিরের ঠাকুর কৈলাসের হাতের ছোঁয়া পেত। সে কী রূপ, সে কী তেজ ছিল মায়ের এক একটি চোখে! দিনের পর দিন ধ্যানমগ্ন থেকে কাদা মাটি নিয়ে পড়ে থাকতো ও। নাওয়া খাওয়ার হিসেব থাকতো না মোটে। পোড়ামাটিতে যত্ন করে নকশা তুলতে জুড়ি ছিল না ওর। আজ সেই শিল্পী হাতজোড়া কর্মহীন, মাটির দেহে কে আর প্রাণ দেবে? কে দেবে শ্রী? কে তুলবে তবলায় ঝড়! জ্যাঠামশাইয়ের শীর্ণ হাত কাঁপছে, তবু শেষকৃত্যে তার নিষ্ঠার বিরাম নেই। কান্নার উত্তাল তরঙ্গে পাড়া তখন বেসামাল। ছোট্ট গলিপথে কৈলাস চলে যাচ্ছে বড় শান্ত, নিথর, চুপটি করে। যেন অভিমান, একটু পরেই হেসে বলবে এই নামা, আমারে নামা! না বলে না। অস্বস্তিকর যন্ত্রণায় ফেলে দিয়ে চলে যাচ্ছে ও। মৃত্যুর এই এক মহিমা। যে মরে সে জানে না এই যন্ত্রণার খবর। সে দেখেও না কার ভেতরটা কত ক্ষতবিক্ষত হলো। তার কেবল যাবার পালা। শেষ দৃশ্যের দায়।

ভাদ্রমাস বিদায় নিয়েছে। আগামী সপ্তাহে মহালয়া। শরতের মেঘদল আপনমনে আকাশে তার রথ ছুটিয়েছে দিকবিদিক। শিউলিতলায় সরলা আর চুল শুকায় না। বাড়ি বাড়ি জীবনের সেই আদি কোলাহল। পথে পথে পুরোনো ঘাম, ঘৃণা, টগবগে কৌতূহল। ঐ পাড়াতে যে কেউ আর দুপুরে খায় না, রাত্রিরে ডঃ মরুৎ দেবের বই খুলে ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে তাকায় না তাতে কিছুই যায় আসে না এ শহরের। কৈলাসের ঠাকুরের টানা চোখের মায়াবী মুখ নিয়ে কার অতো কি। পোড়াইটের মতন সবাই জড়ো বোধে স্থির। কেবল একটি মহলে উসখুস। অসাবধানতা। কোনোভাবেই তারা এই মৃত্যুকে নিয়ে কথা বলতে দিতে চায় না। তাদের ছকে নিখুঁত ম্যাপ। বৃদ্ধ পুরুতের অতো জোড় কোথায়? খুঁটি তো ভেঙেই গেছে। এই হাড় নড়বড়ে শরীরে বছর ঘোরে কিনা সন্দেহ। মহলে মৃদু হাসি কম্পমান হয়। না, আমাদের কৈলাস আচমকা মরেনি। তার প্রাণ একটা অগ্নিগোলক। কিন্তু মহলের দমকল সে অগ্নিকুণ্ডে এত জল, এত জল ঢেলে দিল সেদিন! কৈলাসের বড় ইচ্ছে ছিল মায়ের চোখ নিয়ে এবার একটা দারুণ কিছু করবে। বায়নাও পেয়েছিল ভালো। কিন্তু হঠাৎ মরা নদীর কোলে ইটের পাহাড়! দুইশো বছরের পুরোনো শ্মশানের পাশেই কিনা নকশা করা হয়েছে মস্ত ইমারতের! জায়গা তো ছিল বিস্তর।

শিল্পীর প্রাণে শাবল চলে, দিনরাত। সুপরির নিস্প্রাণ বেঞ্চে চায়ে চুমুক তুলে বলেছিল শুধু! তাতেই লঙ্কাকাণ্ড! অদ্ভুত কোন এক খবরে কৈলাসের তলব জারি সন্ধ্যের পরই। ভদ্র জনাকয়েক এসেছিল তারা। কৈলাসের হাতে রাজ্যের কাজ। দু’হাত মাটি কাদায় মাখা। তবু যেতে হয় সেদিন। হ্যাঁ কৈলাস অতোটা নিতে পারেনি। নাজুক কোমল প্রাণে তখনো মায়ের মুখ কি করে করবে সেই ভাবনা। কিন্তু ওদের সন্ধ্যের ভদ্র চেহারা মধ্যরাতে পশুতে রূপান্তরিত।

দে শালার মালাউনের পাছায় আছেলা বাঁশ দে। দে, ভরে দে।

হারামজাদা মূর্তি বানাস! আজ দেখ তোরে মূর্তি করি। আমরা কোথায় মসজিদ বানাবো সে নিয়ে তুই কথা বলার কে? শালা বির্ধমীর বাচ্চা!

ক্রমাগত গালি ছুটে আসছিল, ফালা ফালা হচ্ছিল মগজের ভেতরটা। কিন্তু এরা বাড়ি যেতে দেবে তো! কৈলাস মার খেতে খেতে ভাবছিল।

না প্রাণ থাকতে বাড়ি ফিরে যেতে দেয়নি। প্রত্যেকটা আঙুল ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দিয়েছে। এমনকি নিম্নাঙ্গের মাংসপিণ্ড থেতলে দিয়েছে ওরা। এর কোনোকিছুই লেখা হয়নি পোস্টমর্টেম রিপোর্টে। কোনো শব্দ বের হতে দেয়নি কোথাও। কিন্তু কেন? তা নিয়ে কথা বলার এত সময় কারো আছে কী? 

কেউ তো একদিন আওয়াজ তুলবেই।

জড়ো হবে মরা নদীর ঘাটে।

কৈলাস তখন জেগে উঠবেই।

এক মহালয়া থেকে আরেক মহালয়ার সকাল ফুরাবে কিন্তু জ্বলবেই আগুন একদিন।

সত্যকাল আসবেই।

শহরের কোণে কোণে লোকে জানবে তাদের একজন শিল্পী ছিল।

মাটির দেহে শ্রী দিতে জানতো।

মথুরানগরের নাম বদলের ইতিহাস যেমন জানবে।

মায়ের বির্সজনে নির্জনে বুক ফুলিয়ে কাঁদতো যে কৈলাস সে মরে না।

মরতে জানে না।

আজ বিজয়া দশমী।

মরা নদীর জলে সন্ধ্যের মরা আলোয় একে একে সব দেবী চলে যাচ্ছে।

শেষ দূর্গা প্রতিমা ডুবলো যখন সকলের চোখ চড়কগাছ।

কোন মায়ের শরীর ডুবছে না।

সারা নদীজুড়ে তারা ভেসে চলছে।

হাজার চেষ্টা করেও ডোবানো যাচ্ছে না।

যেন বাতাসের শরীর।

তাদের প্রতিটি হাত মিছিলের মতো উত্তলিত।

হতবাক শহরের মানুষ।

মাটির তৈরি মূর্তির এ কেমন সাহস!

অলংকরণ আইয়ুব আল আমিন