grand river view

।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে এক প্রতিকূল সময়ে সেবা প্রকাশনী থেকে শুরু হয় ‘কিশোর পত্রিকা’র প্রকাশনা। সেবা প্রকাশনীর কর্নধার কাজী আনোয়ার হোসেন সম্পাদক হিসেবে পত্রিকাটি বের করেন। এমনিতেই দেশে আধুনিক লেখক ও প্রকাশক হিসেবে তিনি কিংবদন্তি। সেবা প্রকাশনী যেমন ঐতিহ্যবাহী, কাজী আনোয়ার হোসেনের পারিবারিক ঐতিহ্যও তেমনই। বাবা ছিলেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও লেখক কাজী মোতাহার হোসেন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনে যার ভূমিকা ছিলো উল্লেখযোগ্য। মাসুদ রানার স্রষ্টার বোন রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী সন্‌জীদা খাতুন দেশের প্রগতিশীল কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠা ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা।

প্রথম সংখ্যায় শামসুর রাহমান, লুৎফর রহমান রিটনের মতো প্রগতিশীল লেখকদের লেখা দিয়েই শুরু হয় কিশোর পত্রিকার যাত্রা। অথচ সেই কিশোর পত্রিকাকেই কি না জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা হিসেবে দাবি করা হয়েছে এক জাল নথিতে! বিস্ময়কর এই কাণ্ড ঘটেছে রাজশাহীতে। মহানগর যুবলীগের এক নেতার বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে দলেরই একাংশ প্রমাণপত্র হিসেবে যেসব কাগজ উপস্থাপন করেছে সেখানেই ‘কিশোর পত্রিকা’কে ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে গঠিত সাংগঠনিক তদন্ত কমিটি জালিয়াতির মাধ্যমে এই নথি তৈরির প্রমাণ পেয়েছে। সম্প্রতি কমিটি তাদের প্রতিবেদনও মহানগর যুবলীগের কাছে দাখিল করেছে।

জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও নগর আওয়ামী যুবলীগের সহসভাপতি আমিনুর রহমান খান রুবেল বলেন, “আমরা পুরো বিষয়টি তদন্ত করে ২৫ পৃষ্ঠার একটি বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সেখানে আমাদের ফাইন্ডিংস জানানো হয়েছে।” এর বাইরে তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। উপস্থাপিত নথিগুলোর সত্যতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা আমাদের এখতিয়ারের মধ্যে নয়। আমাদের কাজ ছিলো তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করা। আমরা সেটা করেছি। নিয়ম অনুযায়ী আমরা কমিটির কাছে তা জমা দিয়েছি। সেখানে আমরা কী পেয়েছি এবং এ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, এ বিষয়ে সংগঠন সিদ্ধান্ত নেবে।”

কমিটির আহ্বায়ক বিষয়টি নিয়ে মুখ না খুললেও তদন্ত কমিটির একটি সূত্রের মাধ্যমে তাদের তথ্যানুসন্ধানের ফলাফল বিস্তারিত জানতে পেরেছে উত্তরকাল। সেখানে যুবলীগ নেতাকে ছাত্রশিবির সম্পৃক্ত বলে অভিযুক্ত করে তা প্রমাণে যেসব নথিপত্র উপস্থাপন করা হয়েছে, তার সবগুলোই জাল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করা বলে প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

প্রসঙ্গত, গেলো মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে রাজশাহী মহানগর যুবলীগের দফতর সম্পাদক মাহামুদ হাসান খান ইতুর বিরুদ্ধে ছাত্রশিবিরকে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চাঁদা দেওয়ার অভিযোগ আছে বলে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়, বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের অবহিত করার পাশাপাশি কয়েকটি চাঁদার রশিদের অনুলিপি সংবাদমাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযুক্ত নেতা ইতু অভিযোগ অস্বীকার করে এসব রশিদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিষয়টি নিয়ে ১২ আগস্ট নগর যুবলীগের সহসভাপতি আমিনুর রহমান খান রুবেলকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে নগর যুবলীগ। প্রায় একমাস তদন্তের পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়।

ষড়যন্ত্র দেখছে তদন্ত কমিটি

তদন্ত কমিটির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে অভিযুক্ত নেতার বিরুদ্ধে যেসব নথিপত্র কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার সব কটিই জাল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। সূত্র জানায়, অভিযোগের সপক্ষে যে তিনটি নথি জমা দেয়া হয় এবং যার ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, সব কটিতে ভুল, অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্য রয়েছে। পাশাপাশি কমিটি ওই নেতার ছাত্রজীবন থেকে সংশ্লিষ্ট সেসব নেতাকর্মীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে, তাদের সবাই জানিয়েছেন, তিনি শিবির না, ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। সে কারণে ইতুকে শিবির সংশ্লিষ্ট বানানোর এই ‘অপচেষ্টা’ ‘ষড়যন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ বলে উল্লেখ করেছে কমিটি।

পুরো ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ভিন্ন একটি পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কাও দেখছেন তদন্ত কমিটি। সে কারণে তারা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, “অতি সম্প্রতি নগরীর লিচুবাগান মসজিদ থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা মসজিদে হামলা ও ভাঙচুরের মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে উস্কানি দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির অপচেষ্টা এবং যুবলীগ নেতা ইতুকে শিবির সংশ্লিষ্ট এবং শিবিরের এজেন্ট আখ্যায়িত করে যুবলীগের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যুবলীগকে বিতর্কিত করার অপচেষ্টা একই সূত্রে গাঁথা এবং একই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই মনে করে তদন্ত কমিটি।”

‘এসব অপকর্মের সঙ্গে যদি রাজশাহী মহানগর যুবলীগের কেউ জড়িত থাকে তাকে খুঁজে বের করে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ’ করাকে জরুরি বলে প্রতিবেদনে মত দিয়েছে এই তদন্ত কমিটি।

‘কিশোর পত্রিকা’কে বানানো হলো শিবিরের মুখপাত্র!

তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা যায়, ইতুর ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের জন্য নগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও তদন্ত কমিটির সদস্য মুকুল শেখ কমিটির কাছে ‘সমর্থক বায়োডাটা’ বলে একটি নথি উপস্থাপন করেন। তিনি দাবি করেন, কাগজটি ইতুর ছাত্রশিবিরের সমর্থক হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রমাণ। এক পৃষ্ঠার ওই নথিতে ডজনখানেক অসঙ্গতি পেয়েছে কমিটি। প্রতিবেদনে এর সবগুলো বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি এটিকে জাল ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি বলে মত দেয়া হয়।

প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত কথিত সেই সমর্থক বায়োডাটা নামের কাগজের ১৩ নম্বর সারিতে প্রশ্ন করা হয়েছে- ‘আপনি কিশোর পত্রিকা পড়েন?’ সেই ঘরে হাতে লেখা হয়েছে ‘হ্যাঁ’। অর্থ্যাৎ কিশোর পত্রিকাকে এখানে ছাত্রশিবিরের প্রকাশনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ১২ নম্বর কলামে দুটি পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানোর কাজের হিসাব জানতে চাওয়া হয়েছে। সেখানেও কিশোর পত্রিকার সংক্ষিপ্ত রূপ ‘কি. প.’ উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। কিশোর পত্রিকা নামে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কোনো প্রকাশনা কখনওই ছিলো না। বরং ১৯৮৪ সাল থেকে তাদের সংগঠনের প্রকাশনা হিসেবে নিয়মিত যে পত্রিকাটি অন্যতম, তার নাম ‘কিশোর কণ্ঠ’। বরং সেবা প্রকাশনীর কিশোর পত্রিকা প্রকাশনা শুরুর পর থেকেই তাতে প্রগতিশীল ধারা চর্চার বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিলো। কাজেই ছাত্রশিবিরের কোনো নথিতে তাদের প্রকাশনা পাঠের তথ্য গ্রহণের ঘরে কোনোভাবেই ‘কিশোর পত্রিকা’র নাম থাকতে পারে না বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোর পত্রিকায় শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে লেখালেখি ছিলো।

উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী কথিত এই ‘সমর্থক বায়োডাটা’ পূরণ করা হয়েছে ২০০২ সালে। অথচ ২০০০ সালের আগে লোকসানের মুখে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয় সেবা প্রকাশনী। যদিও সাংগঠনিকভাবে ভর্তুকি দিয়ে কিশোর কণ্ঠ নতুন চেহারায় এখনও প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। কাজেই ২০০২ সালের কোনো নথিতে দুবছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া পত্রিকার নাম থাকা কোনোমতেই সম্ভব নয়।

প্রতিবেদনে তদন্ত কমিটি আরও গুরুতর অসঙ্গতি পেয়েছে। সূত্র জানায়, কথিত নথির তৃতীয় সারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের নাম লেখা আছে। অথচ ২০০২ সালে ইতু নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। নথির চতুর্থ সারিতে শ্রেণি/বর্ষ ও রোল নম্বরের জায়গায় রহস্যজনকভাবে শিক্ষাবোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন এসএসসি পরীক্ষার রোল নম্বর ও শিক্ষাবর্ষ লিখে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও একাদশ শ্রেণির একজন ছাত্র তার প্রতিষ্ঠানের নাম, বছর ও রোল নম্বর লিখবে এটাই স্বাভাবিক। আবার অষ্টম কলামে শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশের সালের জায়গায় বিস্ময়করভাবে শিক্ষাবোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন এসএসসি পরীক্ষার শিক্ষাবর্ষ লেখা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সন্দেহ, শিক্ষাবোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন পরীক্ষার নথিপত্রে থাকা ইতুর তথ্যকে কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করে এই নথি তৈরি করেছে।

শিবির বানাতে’ যত আয়োজন!

তদন্ত কমিটির সূত্র জানায়, ইতুকে ছাত্রশিবির সংশ্লিষ্ট বানাতে আরও দুটি নথি তাদের উপস্থাপন করা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি এয়ানত (চাঁদা) আদায়ের রশিদ ও শিবিরের লিচুবাগান শাখার আয়ের হিসাব বলে একটি ব্যালান্স শিট রয়েছে। সবগুলো নথিতেই অসঙ্গতি ও ভুল রয়েছে। আরও নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সবগুলোই জাল বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ছাত্রশিবিরের কর্মপদ্ধতি ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের ‘জনবল’ ৪টি স্তরে সাজানো। এগুলোর একেকটির শর্ত পূরণ করে অন্য স্তরে যেতে হয়। এতে শুরুর স্তর সমর্থক। সেই স্তরের শর্ত পূরণ করলে পরের স্তর ‘কর্মী’ হিসেবে উন্নীত হওয়া যায় সেখানে। এরপর ক্রমানুসারে গঠনতান্ত্রিক দুই স্তর ‘সাথী’ ও ‘সদস্য’ হয়ে থাকেন শিবির ক্যাডাররা। কথিত সমর্থক বায়োডাটার নবম সারিতে ইতুর সমর্থক হওয়ার দিন উল্লেখ আছে ২০০২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। আর ফরমের আবেদনের তারিখ একই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি। সেখানে ১৫ নম্বর সারিতে বলা হয়েছে- ‘আপনি কেন কর্মী হতে চান?’ অর্থ্যাৎ ২০০২ সালের ওই তারিখে সমর্থক বায়োডাটা পূরণ করে ইতু কর্মী হবার জন্য আবেদন করেছেন বলে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় নথিতে। অথচ এয়ানত দেয়ার রশিদের আয়ের হিসাবের নথিতে ২০০০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইতুকে সংগঠনের ‘কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দুটি নথিই জাল ও সাজানো বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত কমিটি।

অসামঞ্জস্য রয়েছে আয়ের হিসাবে বর্ণিত রশিদের ধারাবাহিকতায়ও। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৮৮ থেকে ৩০৬ সিরিয়ালের রশিদগুলো ৬ নম্বর রশিদ বইয়ের অন্তর্গত বলে নথিতে বোঝানো হয়েছে। প্রতিটি বইয়ে ৫০টি করে রশিদ ছিলো বলে ধরে নিলেও ওই বইয়ে ২৫১ থেকে ৩০০ সিরিয়ালের রশিদ থাকার কথা। কোনোভাবেই ৩০১ থেকে ৩০৬ নম্বর রশিদ থাকার সুযোগ নেই। আবার প্রতিটি বইয়ে ১০০ করে রশিদ ধরলে ২৯৫, ২৯৬ ও ৩০৬ সিরিয়ালের রশিদ একই বইয়ে থাকার সুযোগ নেই। সে কারণে এগুলোকে ‘আরোপিত’ ও ‘বানানো’ প্রমাণপত্র বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।

ইতুর এয়ানত ও দানের রশিদগুলোতেও অসামঞ্জস্য রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ৪০ নম্বর রশিদে ইতু ২০ টাকা এয়ানত দিয়েছে বলে প্রমাণের চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ এর ৫ মাস পর একই ব্যক্তির ৩০ টাকা আদায় করা হয়েছে ২৯৫ নম্বর রশিদে। এই সময়ে রশিদের ক্রমপার্থক্য ২৫৫টি। আবার দীর্ঘ ২১ বছর পর ৩০ টাকা আদায় দেখানো হয়েছে ৩৪৩ নম্বর রশিদে। এখানে ক্রমপার্থক্য মাত্র ৪৬টি। তদন্ত কমিটির অভিমত, শুধুমাত্র যদি ইতুই একমাত্র এয়ানতদানকারী হয়ে থাকে, তাহলেও ২০২১ সালে ইতুর রশিদটির ক্রম ৫৪৯ নম্বর হওয়ার কথা। এছাড়াও ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন সময়ের আদায়ের রশিদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে কমিটি নিশ্চিত হয়েছে যে, এই সিরিয়ালের প্রক্রিয়া ও দীর্ঘ সময় ধরে হুবহু একই রকম ছাপা রশিদ ছাত্রশিবিরের নয়। সে কারণে এই রশিদগুলোকে জাল বলে মত দিয়েছে কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তথ্যানুসন্ধানে তারা দেশ-বিদেশে অবস্থানরত জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করা ব্যক্তি, ব্লগার ও দীর্ঘদিন ধরে জামায়াত-শিবিরের সংবাদ সংগ্রহকারী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের মতামতেও একই বিষয়ের প্রতিফলন ঘটেছে।

নেপথ্যে তবে কী?

তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে উত্তরকালকে জানান, বিষয়টি নিবিড়ভাবে তথ্যানুসন্ধানের পর তারা নিশ্চিত হয়েছেন, যুবলীগের অভ্যন্তরীণ সংকট তৈরি করে আগামীতে সম্ভাব্য সম্মেলন এই ‘শিবির বানানো’র মিশনের মূল লক্ষ্য। তিনি বলেন, “সংগঠন হিসেবে নানা সীমাবদ্ধতার পরেও রাজশাহীতে বিরোধীদলে থাকা অবস্থা থেকেই যুবলীগের বড় শক্তি ছিলো। কমিটির বয়স বা সময়সীমা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও দলীয় সরকারের আমলেও যুবলীগ একই ধারায় রয়েছে। এখন এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সংগঠনে বড় ধরনের বিভাজনের আশঙ্কা রয়েছে।”

তিনি খানিকটা ব্যাখ্যা করে বলেন, “মাহামুদ হাসান খান ইতু নগর যুবলীগের বর্তমান কমিটির এক প্রভাবশালী নেতার আস্থাভাজন বলে পরিচিত। আবার ওই প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে অতি সম্প্রতি আরেকটি গ্রুপ তৎপর হয়েছে। মূলত সম্মেলন হবে এমন সম্ভাবনা থেকেই এই তৎপরতা। এখন এই পাল্টাপাল্টির বলি হলো ইতু, যাকে তার সঙ্গে রাজনীতি করে আসা সবাই একবাক্যে ছাত্রলীগ থেকে উঠে আসা বলে জানিয়েছেন।”

অন্যদিকে নগর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও তদন্ত কমিটির সদস্য মুকুল শেখকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কমিটির কাছে সাক্ষাৎকারদাতারা। তাদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের সাবেক কমিটির নেতাদের প্রশ্নবিদ্ধ করতেই ইতুর বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার ভুয়া অভিযোগ তলেছেন তিনি। আবার তদন্ত কমিটিও প্রশ্ন তুলেছে তার ভূমিকা নিয়ে। কমিটির ৫ সদস্যের মধ্যে মুকুল শেখ তদন্তকাজে অংশ নেননি এবং সহযোগিতা করেননি বলে লিখিতভাবে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। এমনকি তিনি প্রতিবেদনে সইও করেননি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মুকুল শেখ অসঙ্গতিপূর্ণ একটি ডকুমেন্টসহ অভিযোগ দাখিল করেছেন আবার দলীয় ফোরামে অভিযোগ বা আলোচনা না করেই ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় ইতুর শিবির সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনেছেন। তদন্ত কমিটির মতে, তিনি সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন।

এ ব্যাপারে জানতে একাধিকবার মুকুল শেখের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। একজন সংবাদকর্মী তাকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য মোবাইলে এসএমএস পাঠালেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে নগর যুবলীগের সভাপতি রমজান আলী বলেন, “আমরা রিপোর্ট পেয়েছি। দেখি কী করা যায়।” প্রতিবেদনে কী আছে এবং এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা তো সাংগঠনিক ব্যাপার। আমি এখনই এভাবে বলতে পারি না। আর তাছাড়া আমরা সবাই এখন বর্ধিত সভার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত আছি। এই আয়োজনটা পার করি। তারপর কথা বলবো।”