ফ্রেম ১২: পেয়ারাবাগানের নির্জনতা

আনাম হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢুকেই প্রায় কড়া স্বরেই জিজ্ঞেস করল, ‘তানভির ভাই কোথায়?’ 

‘কোথায় আবার স্টুডিওতে, কাল রাত থেকে ওখানেই পড়ে আছে’ প্রায় নির্লিপ্ত কণ্ঠে জানালাম আমি।

‘হাহ্… আজব কারবার যার এক্সিবিশন তারই কোনো খবর নেই… আর এদিকে আমি ফোন দিয়ে দিয়ে মার্ডার হলাম’ বলেই আনাম স্টুডিওর দিকে গেল। আর আমি যে তাকে চায়ের অফার করলাম তার কোনো পাত্তাই দিল না।

একটু পরেই সে ফিরে আসল। এবার রাগে গড়গড় ‘নাহ্, তানভির ভাই স্টুডিওতে নেই।’

‘নেই মানে, তাকে তো এখন পর্যন্ত বের হতে দেখলাম না’ বলতে বলতে আমি স্টুডিওর দিকে গেলাম।

সত্যিই তানভির সেখানে নেই! নেই মানে বাড়ির কোথাও নেই! ফোনটাও সঙ্গে নেয়নি। আরে একটা মানুষ বের হয়ে যাবে, কখন যাবে, জানব না… আমি বিড়বিড় করছিলাম।

‘তোমাদের সাথেপাছে আমি আর নাই। এবারেই শেষ। এমন জরুরি একটা দিনে একটা মানুষ লাপাত্তা… ভাবা যায়’ এইসব হুমকি ধামকি দিয়ে তানভিরের বাদবাকি পেন্টিংস নিয়ে আনাম চলে গেল।

সন্ধ্যা সন্ধ্যা সময়ে তানভিরের এক্সিবিশনে যখন গেলাম… অনেক ভিড়, চিফ গেস্ট পর্যন্ত চলে এসেছেন। কিছুক্ষণ আগে সিকিউরিটি গার্ড ফোনে জানিয়েছে, সিসিটিভির ফুটেজে তানভিরকে বাড়ি বের হতে দেখা যায়নি। আমার ঠিক মাথা কাজ করছে না। তারপরও পেন্টিংস দেখছিলাম, জম্বির মত! এবং একটা পেন্টিং… ১২ নাম্বার ফ্রেম ‘পেয়ারাবাগানের নির্জনতা’ আমি ঘামছিলাম। এই পেন্টিং আমি আগেও দেখেছি… এখন কিছুটা চেঞ্জ যেন! পাহাড়ের পাশ দিয়ে চিকন ওই পথটা আগে ছিল না… আর ওই যে দূরবর্তী ছোট ঘরটা… জানালা দিয়ে খানিক হলদে টিমটিমে আলো বের হচ্ছে, আলোটা আগে দেখিনি… জানালাটা কি আগে বন্ধ ছিল? ওখানে কেউ আছে?

হঠাৎ আমার এত ক্লান্ত লাগছে কেন! মনে হচ্ছে চোখেমুখে, কণ্ঠস্বরে একটা গোটা সন্ধ্যার ক্লান্তি ভর করে আছে!

সেলাইহীন মুহূর্তরা

আজ সন্ধ্যায় একটা শোরুমে পারফিউম কিনছিলাম, তখন একটা মেয়ে ঢুকল। আমার মনে হল, মেয়েটার গায়ে সন্ধ্যার আলো-আঁধার মিশে আছে…ছুঁয়ে দিলেই আঙুলে উঠে আসবে! মেয়েটা মনে হয় কিছু কিনবে, আর আমারও কিছু কেনার কথা, সেদিকে খেয়াল হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার কেমন ‘বোকা বোকা’ লাগছিল। আমার কেমন হাহাকার লাগছিল।

মনে পড়ে গেল অনেককাল আগের কথা—আমাদের বাড়ির ছেলেপুলেরা যখন মনীষা কৈরালার জন্য ‘পাগল পাগল’ তখন ভিতরে ভিতরে আমিও তাঁর জন্য বিভোর। কিন্তু কাউকে তো আর এ কথা বলা যায় না। যখন কেউ মনীষার গল্প শুরু করত, আমার কেমন জানি ঘোর লাগত…আহা ছোট ছোট চোখ, চাপা নাক, ভাঁটফুলের মত কী অদ্ভুত এক মেয়ে সে! মনে হত, এই রহস্যময়ী মেয়েটার জন্য প্লাটফর্মে আতুতুতু ভালবাসায় এক জীবন কাটিয়ে দিতে পারব। আর কখনও কখনও অঘ্রানে শীতরাতে তাঁর জন্য গাইতে ইচ্ছা হত…

‘তুই যদি আমার হইতি রে ও বন্ধু
আমি হইতাম তোর
কোলেতে বসাইয়া তোরে করিতাম আদর’

ছোট ছোট চোখ, চাপা নাক, ভাঁটফুলের মত আশ্চর্য মেয়েরা এই প্রকাণ্ড শহরের বুকে গুম হয়ে থাকে, আর কখনও সখনও মন চাইলে সন্ধ্যায় পাপড়ি মেলে।

তার ঘরমুখো রাস্তা… এইসব বিশ্বাসঘাতক এলাকায়, অদ্ভুত অন্ধত্বে মনীষা কৈরালা একবারও আমার চোখের দিলে তাকাল না! অথচ আজ সারা রাত আমার অগ্রহায়ণের শীত, হৃৎপিণ্ডে শুদ্ধ স্তব্ধতা। যদিও এখন আবহাওয়ায় ভাদ্রকালীন গুজব। সেইসব বিবিধ গুজব উপেক্ষা করে আমিও বাড়ি ফিরে এলাম আর তক্ষুনি একটা কাকতাল ঘটে গেল। যূথী ফোন দিয়েছে। একবার, দুইবার, তিনবার… রিংটোন বেজেই যাচ্ছে, বেজেই যাচ্ছে। নাছোড়বান্দা যূথী যেনবা ‘কবর থেকে তুলে এনে হলেও আমার সাথে আজ কথা বলবেই এই পণ করে বসে আছে। ফোন ধরব কি ধরব না ভাবতে ভাবতে ধরেই ফেললাম। ওপাশ থেকে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে যূথী বলে উঠল—‘ফোন ধরছ না দেখে ভেবেছিলাম, যা বাবা মরেই গেছ বুঝি। বাথরুমে লাশ পড়ে আছে তোমার, পচা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। হা করা মুখে মাছি ভনভন করেছে… এইসব কল্পনা করছিলাম’ বলেই হাহা করে হাসতে থাকল। 

ওর হাসির সাথে সাথে আমিও হেসে ফেললাম। আমাদের মাঝে যে, সাত মাস ধরে কোনো যোগাযোগ নেই এই হাসি যেন এক মূহুর্তেই সেটা মিথ্যা করে দিল!

শেষবার যখন যূথী ফোন দিয়েছিল শুধু এটুকু বলেছিল, ‘আগামীকাল বিয়ে করছি। ফোন-টোন দিও না। আমি পরে তোমার সাথে যোগাযোগ করব।’ তারও অনেক পরে আমাদের এক মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের কাছে শুনেছিলাম, যূথী তার পার্টনারের সাথে বাইরে যাচ্ছে, বোধহয় নরওয়ে। ততদিনে আমি নিজের ভিতর এত নির্জীব হয়ে গিয়েছিলাম যে, আর কোনো আগ্রহ অবশিষ্ট ছিল না কারুর জন্য। আর আজ একটা ফোনকলে সব এলোমেলো হয়ে গেল। মনে হল, এতদিন অভিমান করেছিলাম তাহলে! নিজের স্বরূপ বুঝতে পেরে আরও অসাড়তা পেয়ে বসল যেন! 

যূথী একনাগাড়ে বলেই যাচ্ছে, বলেই যাচ্ছে… এই সাত মাসে কী হয়েছে না হয়েছে সব। আর থেকে থেকে হেসে উঠছে। ফোন রাখার আগে আগে শুধু খানিক নিচু গলায় বলল, ‘কাল তো ছুটির দিন, বাড়ি থাকবে? সন্ধ্যায় তোমার ওখানে যাব।’

আমি পুরোটা সময় প্রায় কিছুই বললাম না। অথচ, কত কিছু বলার ছিল। তাকে বলতে চেয়েছিলাম—Escape the day এর Days গানটা শুনেছ? শুনে থাকবে হয়তো।

প্রথম যখন গানটা শুনি তখন খুব অদ্ভুত একটা ফিলিংস হয়েছিল আমার… হাহাকার মেশানো, যদিও গানটা আহামরি কিছু না। মেবি গানটার সাথে যে ছবিটা দেয়া ওটাও প্রভাব ফেলেছে। একটা বড় পেঁচার পিঠে দুইজন নাক বড় বড় উইচ উড়ে যাচ্ছে, উইচ দুজনের চোখেমুখে কী এক বিষণ্ণতা ভর করে আছে… যেনবা তাদের কোন বন্ধু দূর কোনো শহরে চলে গেছে, ওখানেই স্কুলে ভর্তি হয়ে যাবে… এ রকম কিছু ভাবছিলাম আমি। আর ওই ঘুমঘুম উল্টানো চাঁদটা কিসে কাতর? জানি না! আমি বরং লাইট হাউজটার কথা বলি… ডানদিকে একদম দূরে ভরাট বৃত্তের মত লাগছে, ওটা যতটা দূরে মনে হচ্ছে তার চেয়ে কিন্তু অনেক অনেক দূরে… মেবি পৃথিবীর বাইরে, সুতো দিয়ে কেউ ঝুলিয়ে রাখছে… গণেশ হালুই হবে হয়তো। উনি লাইট হাউজটা ওভাবে ঝুলিয়ে রেখে ছাদবাগানে পানি দিতে গেছেন। আর ওই ফার্ন গাছের মত পেঁচিয়ে ওঠা জিনিসটার ব্যাপারে কোনো আলাপ নেই আপাতত। মেবি ওই ছবিটার ভিতর আমিও আছি, আড়ালে… তাই আমাকে দেখা যাচ্ছে না। যখন pale wall, your steps still echo through it all বলে উঠে তখন ছবির অংশ হয়ে থাকা আমার ভিতরেও বিষণ্ণতা কাজ করে।

খুব বলতে ইচ্ছা করছিল—অনেকদিন থেকে কাউকে আমি চুমু খাই না, খায় না কেউ আর। ভাবি, আমার বিষাদে সামিল হওয়ার মত করে কেউ খুব গভীরভাবে চুমু খাক।

অথচ এ সবের কিছুই বলা হল না। শুধু কাল সন্ধ্যার যূথীকে ভেবে যাচ্ছিলাম। পুরোনো ঠিকানায় আমাকে না পেয়ে ফিরে যাওয়ার সময় কি তার চোখে-মুখে, কণ্ঠস্বরে বিষণ্ণতা ভর করবে? কিংবা তৌহিদুলের দোকান পেরিয়ে সেই আবছায়া রাস্তাটা আগের মতই কি যূথীর চুলের ঘ্রাণ নিয়ে পড়ে থাকবে?

অলংকরণ রাজিব রায়