ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সি ‘র’, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই– এই দুয়ের মধ্যে স্পাই লড়াইয়ের কথা সবারই জানা। সেই র-এর সাবেক প্রধান অমরজিত সিং দুলাত বা এ এস দুলাত আর আইএসআই-এর সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আসাদ দুররানি মুখোমুখি আড্ডায় তুলে এনেছেন দুই দেশের নানা নীতি–কৌশল আর দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু। আড্ডায় সূত্রধর ছিলেন সাংবাদিক আদিত্য সিনহা। ২০১৮ সালে এসব আলাপ নিয়েই প্রকাশিত হয় সাড়া জাগানো বই ‘দ্যা স্পাই ক্রনিকলস: র আইএসআই অ্যান্ড দ্য ইলিউশন অব পিচ’। আফগানিস্তান নিয়ে সাবেক দুই স্পাই মাস্টারের দুর্দান্ত সব কথা আছে এতে। মূল অধ্যায়টির শিরোনাম ‘আফগানিস্তানে স্বার্থপর স্বার্থ’। উত্তরকালের পাঠকদের জন্য সমসাময়িক বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব বিবেচনায় অধ্যায়টি তিন পর্বে পৃথক শিরোনাম দিয়ে অনুবাদ করা হলো।

এ.এস. দুলাত: তাহলে কি এখন আমরা স্বীকার করে নেবো যে, আশরাফ গনি যুক্তরাষ্ট্রের লোক?

আসাদ দুররানি: সে তো সেটাই।

দুলাত: আর তাই তিনি নির্বাচিত হলেন?

দুররানি: হ্যাঁ। কিন্তু এর থেকেও খারাপ ব্যাপার আছে। তিনি সরাসরি জালমে খলিলজাদের গ্রুপের একজন। (পশতুন জাতিসত্তার জালমে খলিলজাদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন কূটনীতিক। ইরাক ও জাতিসংঘে দায়িত্ব পালনের আগে তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। আফগানিস্তানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কথা নানাভাবেই আলোচিত হয়।) খলিলজাদের প্রতিনিধিত্বকারী একজন আফগান, মার্কিন সামরিক-রাজনৈতিক ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ও তো আমাদের জন্য বটেই, আফগানিস্তানের জন্যও একটা বড় বিপর্যয়।

দুলাত: ও যদি এতোটাই মার্কিন হবে, তাহলে আবার পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরিতা রাখবে কেন?

দুররানি: কারণ, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের আফগান নীতি নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। দেখবেন যে, বছরের পর বছর ধরে তাদের রিপোর্ট তাদের বাহিনীর সক্ষমতার এই ঘাটতি ওই ঘাটতি এসব দিয়ে শুরু করা হয়েছে। আর শেষটা করবে এমনভাবে, যাতে লেখা হবে যে, তাদের এই সক্ষমতার ঘাটতি থাকতোই না যদি পাকিস্তান তালিকানদের সঙ্গে মৈত্রী না রাখতো, দ্বৈতখেলা না খেলতো ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরা বহুবার প্রস্তাব দিয়েছি, কিন্তু তারা নাছোড়। অনেকবার বলা হয়েছে যে, ঠিক আছে, চলেন এবার একটা যৌথ পরিকল্পনা বের করি কীভাবে আপনারা এখান থেকে বেরিয়ে যাবেন। নাহয় আপনারা যাকিছু লণ্ডভণ্ড করে যাবেন, তার দায় পাকিস্তানের ওপরই দেন! কিন্তু তারপরেও আপনারা এখান থেকে যান। কারণ আপনাদের উপস্থিতির মানেটাই হলো: যুদ্ধ চলছে!

দুলাত: ওরা সন্তুষ্ট নাও হতে পারে। কিন্তু মার্কিনরা আশরাফ গনিকে কেন ব্যবহার করবে? ওরা তো সরাসরিই আপনাদের সঙ্গে ডিল করতে পারতো।

দুররানি: আশরাফ গনি সম্ভবত ওদেরকে ‘ব্যাড কপ’ (একটি বিষয়ের উদার দিকের বিপরীতে কঠোর দিক) হিসেবে ব্যবহার করতে চান। (ব্যাপারটা এমন যে, ওরা যত কঠোর হবে মানে ‘ব্যাড কপ’ হবে, তালেবানরা ততো উদার জায়গা মানে ‘গুড কপ’ খুঁজবে।) এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাহিল শরীফের (তৎকালীন পাকিস্তানের সেনা প্রধান। পরবর্তীতে তিনি সৌদি নেতৃত্বাধীন ৩৯ জাতির সামরিক জোটের কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে যোগ দেন) সঙ্গে সাক্ষাতের পরেই ছুটে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে গিয়ে তিনি তাদেরকে বলেন, প্লিজ ২০১৪ নাগাদ সেনা প্রত্যাহার করবেন না! অথচ তালেবানদের শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার প্রধান শর্তই ছিলো সেনা প্রত্যাহারে স্পষ্ট মার্কিন অঙ্গীকার। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার, তিনি বলেছিলেন যে তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকান সামরিক বাহিনীর আত্মত্যাগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চান। এমনকি তালেবানবিরোধী আফগানরাও এতে বিচলিত হয়েছিল, এবং আমিও ছিলাম সেদলে। আফগানরা গত দশ বছরে মার্কিন বোমা হামলায় তিন লক্ষাধিক লোককে হারিয়েছে, যার তুলনায় দুই থেকে তিন হাজার মার্কিন ‘আত্মদান’ করেছে। আশরাফ গনি আফগানিস্তানের জন্য বিব্রতকর। তাকে পাকিস্তানের বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করা কঠিন। ছয় মাস পর সে আমাদের যথাযথ ভূমিকা রাখিনি উল্লেখ করে দায়ী করে বসলো। বললো: ‘তোমাদের কাছে এসে আমি আমার রাজনৈতিক ছাড় দিয়েছি। আফগানরা তোমাদের (পাকিস্তানী) পছন্দ করে না।’ ছয় মাসেই! এমনকি আফগানরা তখন ঠিকমত নড়েচড়েও বসেনি। তাদের সময় আর সবরেরও কমতি নেই। আর যারা তালিবানদের চেনে তারা জানে যে আপনাকে মাপতেই ওরা ছয় মাস কাটিয়ে দেবে। আশরাফ গনি যদি মনে করে থাকে যে পাকিস্তানে এক সফরেই সে পুরো অঞ্চলের মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারবে, তাহলে সেটা বড়জোড় জড়বুদ্ধি হতে পারে। ওকে আমাদের খুশি খুশি বন্ধুবৎসল চরিত্র হিসেবে মনে করার কোনো কারণ নেই।

দুলাত: আফগানিস্তানকে এখন কেমন দেখছেন? কী করছে?

আদিত্য সিনহা: ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো সাক্ষাৎ?

দুররানি: গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে ওরা পুনর্গঠন করছে। সেই সঙ্গে জড়িত বিষয়গুলোও পুনর্গঠিত হচ্ছে। একটা উদাহরণ দিই, ২০১১ সালের কথা। যেখান থেকে একটা নতুন অক্ষ তৈরির সম্ভাবনা দেখা যেতে পারে: পাকিস্তান, ইরান, রাশিয়া এবং চীন। ২০১২ সালে আমার মস্কো সফরের সময়, আমি এই দেশগুলিকে আফগানিস্তান সমন্বয় নীতিতে অবস্থান থেকে সরে আসতে দেখেছি। ইরানি এবং রাশিয়ানরা উভয়ই তালেবানদের সাথে কথা বলছে। চীনারা মূলত বলেছে, আপনি পথ দেখান, এবং যদি এটি আঞ্চলিক দেশগুলিকে একত্রিত করে, তাহলে আমরা সম্ভবত ভূমিকা পালন করতে পারি। ২০১৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে আমি মাইকেল ফ্লিনের (সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা) সাথে আল জাজিরার আয়োজনে আফগানিস্তান বিষয়ক আলোচনায় ছিলাম। এটা ওঁর ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হওয়ার আগে। যখন তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘স্বার্থপর স্বার্থ’-এর পিছনে ছুটে চলেছে — একটি ডবল নেতিবাচক অবশ্যই মার্কিন পদ্ধতি, ‘ইউ নো নাথিং’ টাইপের আর কী — আমি তখন ভেবেছিলাম, যাক বাবা, অন্তত একজন সৎ মানুষ পেলাম বুঝি! তিনি সাঙ্ঘাতিকভাবে মুসলিম বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু রাশানরাও নিশ্চয়ই তাকে মিস করেছে, যখন তাকে বরখাস্ত করা হয়।

দুলাত: সুস্পষ্ট বিষয় হলো, ভারতীয় দল এই গ্যাং অফ ফোরের (পাকিস্তান, ইরান, রাশিয়া, চীন) বিরুদ্ধে ট্রাম্পকে সহযোগিতা করছে, যা ওবামার সময়ও যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের বিশেষ সম্পর্ক ছিল। ভারত-মার্কিন সম্পর্ক হয়তো আরও নিবিড় হবে। কিন্তু আমরা এর থেকে বিশেষ কিছু লাভ করতে পারবো কি না, আমি ঠিক জানি না। কারণ পারমাণবিক চুক্তি ছাড়া সবখানে আমরা হেরে যাচ্ছি। আফগানিস্তান নিয়ে আমাদের এখনও একই নীতি আছে। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছি। আশরাফ গনির মতো, আমেরিকানরা চলে গেলে ভারতীয়রা খুশি হয় না কারণ আমরা মনে করি আমেরিকা সেখানে আমাদের জন্য ত্রাণ বা সহায়তা প্রদান করে। চীনারা যখন ঘোষণা করেছিল যে তারা তালেবানদের সাথে কথা বলার জন্য প্রস্তুত ছিল, আমি ভাবছিলাম যে আমরা এখানে কোথায়! এত বছর এবং সুযোগ ছিলো তালেবানের সাথে সম্পর্ক তৈরির। আমরা তা করিনি। অথচ আমরা কিন্তু বিশ্বাস করি না যে, আমেরিকানরা যা করে তা সঠিক এবং অন্যরা ভুল।

সিনহা: তাহলে কি ভারত স্বার্থপর নয়?

দুলাত: না, আমরাও এই ‘স্বার্থপর স্বার্থ’ নিয়ে বিভ্রান্ত। এর কোনো মানে হয় না, এমনকি স্বার্থপর হওয়াও হয় না। কে আমাদের বন্ধু, সেই লম্বা লোকটা, যাকে আবু গারিবে (গুয়ানতানামো) পাঠানো হয়? মোল্লা জাইফ। আজিজ (পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারতাজ আজিজ) বলতেন, জাইফ তৃতীয় শ্রেণির! কিন্তু সে এখন কোথায়? কাবুলে?

দুররানি: জাইফ কাবুলে আছেন।

দুলাত: বার্লিনের পগওয়াশে আমাদের দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল এবং এমনকি তিনি বলেছিলেন যে, ভারত আগ্রহ দেখায় না, মাথা ঘামায় না। তখন সেখানে ওই বৃটিশ ছিলেন, কী যেন নাম, ওই যে যাকে পরে অবাঞ্ছিত করা হলো, মুখে দাড়ি ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ (প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আরব গেরিলা হিসেবে লড়া ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অফিসার) টাইপ? পাকিস্তানিকে বিয়ে করেছেন যিনি?

দুররানি: হ্যাঁ, হ্যাঁ, মাইকেল সেম্পল। তিনি একজন আইরিশম্যান।

দুলাত: সে এই এলাকা সম্পর্কে ভালভাবে অবগত। আমি বার্লিনের সেই বৈঠকে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, জাইফের সাথে কথা বলা যায় কি না? তিনি বললেন, হ্যাঁ, জাইফ কাবুলে রিপোর্ট করার জন্য আছেন।

দুররানি: আরেকজন মানুষ আছেন যিনি এ অঞ্চল নিয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞ, কিন্তু ভারতের আফগান নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন, তিনি ভদ্রকুমার (পুরো নাম এক. কে. ভদ্রকুমার। ভারতের সাবেক কূটনীতিক)। এটা আসলে আমাদের দ্বিপাক্ষিক ক্ষোভের একটা ফল। যদি আফগানিস্তান স্থায়ী হয়, পাকিস্তান অবশ্যই একটি বিশাল সুবিধাভোগী হবে। যখনই কোনো ট্র্যাক টু আয়োজনে ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিকদের পাই, আমি একটু খোঁচা দিই এই বলে যে, তারা এখনও কৌটিল্য-ভাবেই আছেন। তাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয় যে ব্যাপারটা তারা ভালোভাবে নিচ্ছেন না। পাকিস্তানকে খোঁচানোর জন্য আফগানিস্তানকে ব্যবহার করা একেবারে ‘প্রতিবেশীর প্রতিবেশী’ ধারণার সঙ্গে যায়, যা চানক্য প্রথম এনেছিলেন। তারা আফগানদের বলার কোনো সুযোগ হারায় না যে তাদের সমস্যা পাকিস্তান ছাড়া অন্য কেউ নয়: ‘তারা (পাকিস্তান) আফগানিস্তানকে তাদের পঞ্চম প্রদেশ হিসেবে চায়’। আমি গত ২৫ বছর ধরে আফগানিস্তানের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করছি এবং তাদেরকে কেউ কখনোই এই পঞ্চম প্রদেশ সম্পর্কে কোনো কথাও বলেনি। যে চারটা আছে আমাদের, সেগুলো নিয়েই তো সমস্যার অন্ত নেই! আপনাদের একজন প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব প্রকৃতপক্ষে নৈপুণ্যের মাস্টার। তিনি বারবার আফগানদের বলেছিলেন: ‘আপনারা আমাদের (ভারতবর্ষ) ওপর ২০০ বছর ধরে শাসন করেছেন (নাকি ৪০০ ছিল?), তাই আমাদের সঙ্গে আপনাদের কোনো সমস্যা নেই; শুধুমাত্র এই পাকিস্তানিরা অযথা বিশ্বাস করে যে তারা ভারতের ওপর মুসলিম শাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী। বাস্তবতা যাই হোক না কেন, এই পদ্ধতিটা আবার আফগানদের ওপর ঠিকঠাক কাজও করে।

আমরা হয়তো লাখ লাখ আফগান শরণার্থীদের জায়গা দিয়ে সহায়তা করেছি। অথবা হতে পারে সেটা ভালো প্রতিবেশীর দায়িত্ব পালন করেছি। কিন্তু তাদের কাছ থেকে কৃতজ্ঞতার প্রত্যাশা করলেই তখন আমাদের সমস্ত বিনিয়োগ বিফলে চলে যায়। আমি আসলে মেজবান হিসেবে আমাদের আগের ঘাটতি পূরণের জন্য আরেকটি আফগান শরণার্থী ঢলের অপেক্ষা করছি- তা তালেবান, দায়েশ বা ক্ষুধাতাড়িত যে কেউ হতে পারে।

পরের পর্ব: কেন কাবুলে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি চায় না যুক্তরাষ্ট্র?