grand river view

[দ্য নিউ ইয়র্কার সাময়িকীতে হারুকি মুরাকামির সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন দ্য নিউ ইয়র্কার সাময়িকীর ফিকশন এডিটর দেবরাহ ট্রেইসম্যান। দ্য নিউ ইয়র্কার সাময়িকীর অনলাইন ভার্সন থেকে নিয়ে অনুবাদ করেছেন মুহসীন মোসাদ্দেক]

হারুকি মুরাকামি: সর্বশেষ দশ বছর আগে আমরা একবার সাক্ষাৎকারে বসেছিলাম, এবং এই দশ বছরে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই ঘটেছে। এই যেমন, আমি আরও দশ বছরের বুড়ো হয়ে গেছি। এটা সবচেয়ে বড় বিষয়—অন্তত আমার ক্ষেত্রে। আমি দিন দিন বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজেকে আমার তরুণ বয়সের তুলনায় ভিন্নরকমভাবে আবিষ্কার করছি। আজকাল আমি সজ্জন ব্যক্তি (জেন্টলম্যান) হওয়ার চেষ্টা করছি। আপনি নিশ্চয় জানেন, একাধারে একজন সজ্জন ব্যক্তি এবং একজন ঔপন্যাসিক হওয়া সহজ ব্যাপার নয়। এটা অনেকটা এমন, একজন রাজনীতিবিদ একাধারে ওবামা এবং ট্রাম্প হতে চেষ্টা করছে। তবে আমার কাছে একজন সজ্জন ঔপন্যাসিকের (জেন্টলম্যান নভেলিস্ট) সংজ্ঞা আছে: প্রথমত, সে কখনো তার প্রদেয় আয়কর নিয়ে কথা বলবে না; দ্বিতীয়ত, সে কখনো তার প্রাক্তন বান্ধবী বা স্ত্রীদের নিয়ে লিখবে না; এবং তৃতীয়ত, সে সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার নিয়ে কোনো চিন্তা করবে না। সুতরাং, দেবরাহ, আমাকে এই তিনটি বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করবেন না। আমি ঝামেলায় পড়ে যাব।

দেবরাহ ট্রেইসম্যান: আসলে আমি শুরু করতে চেয়েছিলাম আপনার সাম্প্রতিক প্রকাশিত বই, আপনার নতুন উপন্যাস, ‘কিলিং কমেনডেটরনিয়ে এই বইটা একজন ব্যক্তিকে নিয়ে যার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায় এরপর সে একজন বৃদ্ধ চিত্রশিল্পীর বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করে সে বাসায় ওঠার পর থেকে অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করে এবং সেসব ঘটনার কিছু কিছু যেন মাটির নিচের গভীর কোনো শূন্য কূপ থেকে উঠে আসা বলে মনে হয় আমি বিস্মিত, এই উপন্যাসের পরিবেশটা কীভাবে আপনার মাথায় এল?

আপনি জানেন, এটা অনেক বড় একটা বই এবং এটা লিখতে আমার দেড় বছরেরও বেশি সময় লেগেছে, তবে মাত্র এক বা দুই অনুচ্ছেদ দ্বারা এটি শুরু হয়েছিল। এই অনুচ্ছেদগুলো লিখে আমার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলাম এবং ভুলেই গিয়েছিলাম এগুলোর কথা। এরপর, সম্ভবত তিন কী ছয় মাস পর একটা আইডিয়া মাথায় আসে যে, এই অনুচ্ছেদগুলোকে উপন্যাসে রূপ দেয়া যেতে পারে এবং লিখতে শুরু করি। আমার কোনো পরিকল্পনা ছিল না, কোনো সূচিও ছিল না, এমনকি ছিল না কোনো স্টোরি লাইন: আমি কেবল সেই অনুচ্ছেদ দুটি থেকে লিখতে শুরু করি এবং লিখতে থাকি। এর গল্পই আমাকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছে। আপনার যদি কোনো পরিকল্পনা থাকে—আপনি শুরু করার সময় থেকেই যদি শেষটা জানেন—তবে এই ধরনের উপন্যাস লিখে মজা নেই। আপনি জানেন, একজন চিত্রশিল্পীও আঁকা শুরুর আগে স্কেচ এঁকে নেন তবে আমি তা করি না। আমার সামনে সাদা ক্যানভাস থাকে, আমি কেবল ছবি আঁকতে থাকি।

উপন্যাসটিতে একটি চরিত্রবা একটি ধারণাআছে যা মোজার্টের অপেরাডন জিওভান্নিথেকে কমেনডেটরের আকার নিয়েছে এই ধারণাটি বা এই চরিত্রটি বইয়ের মাঝে কেন?

সাধারণত একটি শিরোনাম দিয়ে আমি আমার বই শুরু করি। এই ক্ষেত্রে, ‘কিলিং কমেনডেটর’ শিরোনাম দিই। আমার হাতে বইটির প্রথম অনুচ্ছেদগুলো ছিল এবং আমি তাদের নিয়ে কী ধরনের গল্প লিখতে পারি তা ভাবছিলাম। জাপানে ‘কমেনডেটর’ বলে কোনো কিছু নেই, তবে আমি শিরোনামের অস্বাভাবিকতা অনুভব করেছি এবং সেই অস্বাভাবিকতা আমার খুব ভালো লেগেছে।

ডন জিওভান্নিঅপেরা কি আপনার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ?

গল্পের চরিত্র আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি সাধারণত মডেল ব্যবহার করি না। আমার ক্যারিয়ারে, আমি একবারই কোনো চরিত্রের জন্য মডেল ব্যবহার করেছি—সে ছিল এক খারাপ লোক, এমন ধরনের কাউকে আমি পছন্দ করি না, এবং আমি তাঁর সম্পর্কে লিখতে চেয়েছিলাম, তবে কেবল ওই একবারই। আমার বইগুলোর অন্য সকল চরিত্র আমি শূন্য থেকে তৈরি করেছি। আমি একবার কোনো চরিত্র তৈরি করার পরে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাফেরা করে এবং আমাকে যা করতে হয় তা হলো তাকে চারপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা, কথা বলা এবং তার সাথে কাজগুলো করা। আমি একজন লেখক, এবং আমি লিখছি, তবে একই সাথে আমি অনুভব করি যেন কিছু আকর্ষণীয়, মুগ্ধকর বই পড়ছি। তাই আমি লেখাটি উপভোগ করি।

লেখার টেবিলে মুরাকামি

বইয়ের মূল চরিত্রটি অপেরার পাশাপাশি অন্যান্য বিভিন্ন সংগীত শোনেন যা আপনি বইটিতে উল্লেখ করেছেন প্রায়শই আপনার চরিত্রগুলো নির্দিষ্ট ব্যান্ড বা ঘরানার সঙ্গীত শোনেন চরিত্রগুলোর ধরন নির্ধারণ করতে কি এটা আপনাকে সাহায্য করে?

লেখার সময় আমি সংগীত শুনি। সুতরাং, আমার লেখায় প্রকৃতিগতভাবেই সংগীতের বিষয় চলে আসে। সংগীতের ধরন নিয়ে আমি খুব একটা মাথা ঘামাই না, তবে সংগীত আমার কাছে এক ধরনের খাবারের মতো। এটা আমাকে লেখার জন্য শক্তি যোগায়। এ কারণে, প্রায়ই আমি সংগীত নিয়ে লিখি, এবং বেশিরভাগ সময় আমি আমার ভালো লাগা সংগীতগুলো নিয়েই লিখি। এটা আমার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

সংগীত আপনাকে সুস্থ রাখে?

হ্যাঁ, খুব। সংগীত এবং বিড়াল। তারা আমার অনেক উপকার করেছে।

কতগুলো বিড়াল আছে আপনার?

আসলে একটিও না। প্রতিদিন সকালে আমি আমার বাড়ির আশেপাশে জগিং করি এবং নিয়মিত তিন চারটি বিড়াল দেখি—তারা আমার বন্ধু। আমি থেমে তাদের হ্যালো বলি, তারা আমার কাছে আসে; আমরা একে অপরকে বেশ ভালোভাবে চিনি।

দ্য নিউ ইয়র্কারে যখন কিলিং কমেনডেটরের অংশবিশেষ প্রকাশিত হয় তখন আপনার লেখার অবাস্তব উপাদানগুলো সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম আপনি বলেছিলেন, ‘আমি যখন উপন্যাস লিখি তখন প্রকৃতিগতভাবেই বাস্তবতা অবাস্তবতা একে অপরের সাথে মিশে যায় এমন নয় যে আমি এগুলো পরিকল্পনা করে রাখি এবং লেখার সময় তা অনুসরণ করি, তবে যতই আমি বাস্তবতাকে বাস্তবসম্মত উপায়ে লিখতে চেষ্টা করি ততই অবাস্তব জগৎ আপনাআপনিই উঠে আসে আমার কাছে উপন্যাস একটি পার্টির মতো যে কেউ যোগ দিতে চাইলে এতে যোগ দিতে পারেন এবং যারা চলে যেতে চান তারা যখন খুশি চলে যেতে পারেনতো, আপনি কীভাবে এই পার্টিতে লোক এবং ঘটনাগুলোকে আমন্ত্রণ জানান? বা আপনি যখন লিখছেন, সেখানে বিনা নিমন্ত্রণে কেউ আসতে পারেন এমন জায়গায় কীভাবে পৌঁছান?

পাঠকেরা প্রায়ই আমাকে বলে যে, আমার লেখায় অবাস্তব জগৎ রয়েছে—প্রধান চরিত্রটি সেই জগতে চলে যায়, তারপর আবার সত্যিকার জগতে ফিরে আসে। তবে অবাস্তব জগৎ এবং বাস্তব জগতের মধ্যে যে সীমান্তরেখা আছে তা সচরাচর আমার নজরে পড়ে না। সুতরাং, অনেক ক্ষেত্রেই তারা একে অপরের সাথে মিশ্রিত। আমার মনে হয়, জাপানে এই অন্য জগতটি বাস্তব জগতের খুব কাছাকাছি এবং আমরা যদি সেই অন্য জগতে যাব বলে ঠিক করি তবে তা খুব একটা কঠিন কিছু নয়। আমার এমন অনুভব এসেছে যে, পশ্চিমা বিশ্বের ক্ষেত্রে অন্য জগতে যাওয়ার ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়। সেখানে অন্য জগতে যেতে হলে আপনাকে বেশ কিছু পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু জাপানে, আপনি যদি অন্য জগতে যেতে চান, সেখানে যেতে পারবেন। সুতরাং, আমার গল্পগুলোতে আপনি যদি কোনো কূপের নিচে তলিয়ে যান, সেটাই সে অন্য জগৎ। এবং অবধারিতভাবে আপনি এই জগৎ এবং অন্য জগতের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবেন না।

অন্য জগতটি সচরাচর অন্ধকারময় জায়গা?

তেমন অপরিহার্য নয়। আমার মতে এটা কৌতূহলের একটা বিষয়। যদি কোনো দরজা সামনে পড়ে এবং তা খুলে ভেতরের সেই অন্য জগতে ঢুকতে পারেন, তবে তা করুন। এটা কেবল একটা কৌতূহল। ভেতরে কী আছে? কী হচ্ছে সেখানে? প্রতিদিন আমি এই কী-টাই সন্ধান করি। যখন আমি কোনো উপন্যাস লিখি, ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠে লেখার টেবিলে বসি এবং লিখতে শুরু করি। এই ব্যাপারটা বাস্তব জগতে ঘটে। আমি বাস্তব কফি পান করি। কিন্তু, লেখা শুরু করতেই আমি অন্য কোথাও চলে যাই। আমি দরজা খুলে সেই অন্য কোথাও প্রবেশ করি এবং দেখতে থাকি সেখানে কী ঘটছে? আমি ঠিক জানি না—বা আমি পাত্তা দিই না—সেটা বাস্তব জগৎ না অবাস্তব। লেখার মাঝে আমি যতই মনোনিবেশ করি, গভীর থেকে আরও গভীরে প্রবেশ করতে থাকি, যেন কোনো এক পাতালপুরে (আন্ডারগ্রাউন্ড) চলে যাই। সেখানে থাকাকালীন অদ্ভুত সব ঘটনার মুখোমুখি হই। তবে যখন আমি তাদের দেখি, আমার চোখে তা স্বাভাবিক লাগে। এবং সেখানে যদি কোনো অন্ধকার থাকে, তবে সেই অন্ধকার আমাকে টানে এবং সম্ভবত এর ভেতর কোনো না কোনো বার্তা থাকে, জানেন? আমি বার্তাগুলো উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। সুতরাং, আমি সেই জগতটা ঘুরে দেখি এবং যা দেখি তা বর্ণনা করি। তারপর ফিরে আসি। ফিরে আসা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যদি ফিরে আসতে না পারেন, তা ভীতিকর। তবে আমি যেহেতু পেশাদার, তাই ফিরে আসতে পারি।

এবং ফেরার সময় আপনি কি সেখান থেকে কিছু সঙ্গে করে আনেন?

না, সেটা বেশ ভয়ঙ্কর হবে। সেখানকার সবকিছু আমি সেখানেই ফেলে আসি। লেখালেখির বাইরে আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। আমি রুটিন মেনে চলি। আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। রাত নয়টার ভেতরেই ঘুমাতে যাই, যদি না কোনো বেসবল খেলা তখনও চলে। আমি দৌড়াই অথবা সাঁতরাই। আমি খুব সাধারণ মানুষ। এ কারণে, রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় যখন কেউ বলে, ‘মিস্টার মুরাকামি, আপনার সাথে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগল’, আপনি জানেন, আমি খুব আশ্চর্যবোধ করি। আমি বিশেষ কেউ নই। আমার সাথে দেখা হওয়া এমন কী খুশির ব্যাপার? কিন্তু যখন লিখি তখন আমি বিশেষ কেউ, অন্তত অদ্ভুত।

গল্পটা আপনি বহুবার বলেছেন, চল্লিশ বছর আগে একটি বেসবল খেলা দেখতে গিয়ে হঠাৎ করেই আপনার মনে হয়, আপনার পক্ষে উপন্যাস লেখা সম্ভব, যদিও পূর্বে কখনো আপনি কিছু লেখার চেষ্টা পর্যন্ত করেন নি এবং আপনার স্মৃতিকথায় আপনি লিখেছেন, ‘আমার অনুভবটা ছিল এমন, আকাশ থেকে যেন কিছু একটা নেমে এসেছিল এবং আমি তা আমার হাতে লুফে নিয়েছিলামসেই কিছু একটা হয়তো লেখার এই দক্ষতা ছিলঅথবা কেবল একটি আইডিয়া যা আপনি প্রয়োগ করে দেখতে পারেন কোথায় থেকে এটা আসতে পারে বলে আপনার মনে হয় এবং আপনি যদি এতই সাধারণ একজন হয়ে থাকেন তবে আপনার কাছেই কেন তা এসেছিল?

এক ধরনের এপিফ্যানি—ঠিক এরকমই ছিল তা। আমি বেসবল খেলা পছন্দ করি এবং প্রায়ই খেলা দেখতে মাঠে যাই। ১৯৭৮ সালে যখন আমার বয়স ২৯ বছর, টোকিওর একটি বেসবল মাঠে আমার প্রিয় দল ইয়াকুল্ট স্যালোর খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। দিনটা উদ্বোধনী দিন ছিল, বেশ রৌদ্রকরোজ্জ্বল একটা দিন। আমি খেলা দেখছিলাম এবং প্রথম ব্যাটার যে মুহূর্তে একটা ডাবল মেরেছিল ঠিক তখন আমার অনুভূতিটা হয় যে আমি লিখতে পারব। আমি একটু বেশিই বিয়ার পান করে ফেলেছিলাম সম্ভবত—ঠিক জানি না—তবে সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল আমার ভেতরে দৈব কিছু একটা আবির্ভূত হয়েছে। এর আগে কিছু লেখার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না আমার। আমি একটি জ্যাজ ক্লাবের মালিক এবং ককটেইল ও স্যান্ডউইচ বানাতেই ব্যস্ত ছিলাম। খুব ভালো স্যান্ডউইচ বানাতাম। তবে সেই খেলার শেষে আমি একটি স্টেশনারির দোকানে যাই এবং কিছু কাগজ-কলম কিনে লেখা শুরু করি এবং লেখক হয়ে যাই।

দৌড়বিদ মুরাকামি

সেটা চল্লিশ বছর আগের ঘটনা এই সময়ে আপনার লেখা কতটা বদলেছে?

বেশ বদলেছে। যখন লেখা শুরু করি তখন আমি জানতাম না কীভাবে লিখতে হয়—বেশ অদ্ভুত পন্থায় লিখেছিলাম, তবে লোকে তা আসলেই পছন্দ করেছিল। এখন আমি আমার প্রথম বই ‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’-কে খুব একটা গোণায় ধরি না, এটা বেশ তাড়াতাড়িই প্রকাশ করা হয়ে গেছে আমার ক্ষেত্রে। কয়েক বছর আগে, টোকিওতে একটা ট্রেনে বসে আমি বই পড়ছিলাম এবং সুন্দর এক মেয়ে আমার কাছে এসে বলেছিল, ‘আপনি কি জনাব মুরাকামি?’ ‘হ্যাঁ, আমি মুরাকামি।’ ‘আমি আপনার বইয়ের খুব ভক্ত।’ ‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।’ ‘আমি আপনার সবগুলো বই-ই পড়েছি এবং সেগুলো খুব ভালো লেগেছে।’ ‘ধন্যবাদ আপনাকে, কৃতজ্ঞতা।’ এরপর সে বলল, ‘আপনার প্রথম বইটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে—এটাই সবচেয়ে সেরা, আমার মতে।’ ‘আচ্ছা, আপনার তাই মনে হয়?’ এবং সে বলল, ‘আপনার লেখা আগের চেয়ে খারাপের দিকে যাচ্ছে।’ আমি সমালোচনায় অভ্যস্থ ছিলাম। তবে আমি দ্বিমত পোষণ করছি। আমার মনে হয় আমি দিন দিন আরও ভালো লিখছি। চল্লিশ বছর ধরে প্রতিনিয়ত আমি ভালো লেখার চেষ্টা করে গিয়েছি এবং আমার মনে হয় আমি তা পেরেছি।

আপনি বলেছিলেন যে, প্রথম দুটি বই লেখা আপনার জন্য খুব সহজ ছিল, এবং তারপর কাজ কিছুটা কঠিন হতে থাকে আপনি ঠিক কী ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন?

আমি যখন প্রথম দুটি বই লিখি—‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ ও ‘পিনবল ১৯৭৩’—আমার কাছে লেখাটা অনেক সহজ মনে হয়েছিল, তবে সে বইগুলো নিয়ে আমি তেমন সন্তুষ্ট ছিলাম না। আমি এখনো সন্তুষ্ট নই। ওই বইগুলো লেখার পর, আমি আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়ে উঠি। আমার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য উপন্যাস ‘এ ওয়াইল্ড শীপ চেস’ লিখলাম। (অন্য বই দুটি আসলে অনেকটা উপন্যাসিকার মতো ছিল।) বেশ সময় লেগেছিল—তিন বা চার বছর—এবং আমাকে সত্যিই অনেক শ্রম দিতে হয়েছিল এটাকে আলোয় নিয়ে আসতে। সুতরাং, ‘এ ওয়াইল্ড শীপ চেস’ ঔপন্যাসিক হিসেবে আমার সত্যিকার শুরু। প্রথম তিন বছর, জ্যাজ ক্লাব চালানোর পাশাপাশি লিখেছিলাম। আমি সকাল সকাল আমার কাজ সেরে কিচেন টেবিলে লিখতে বসতাম। এটা আমার জন্য একটু অতিরিক্তই হয়ে যেত। প্রথম দুটি বইয়ের পরে সিদ্ধান্ত নিই, আমি ক্লাবটি বিক্রি করে দিয়ে পুরোদস্তুর লেখক হয়ে যাব। কিন্তু ক্লাবটা তখন বেশ ভালো চলছিল এবং সবাই আমাকে বারণ করছিল এটা বিক্রি না করতে।

আপনার কি এমন কোনো দিন গেছে যখন পরের অংশে কী ঘটতে পারে সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা নেই? আপনি বসে আছেন কিন্তু কিছু লিখতে পারছেন না?

আমার ক্ষেত্রে রাইটারস ব্লকের কোনো অনুভব আসে নি কখনো। আমি একবার লেখার টেবিলে বসলে স্বাভাবিকভাবেই আমার জানা থাকে এর পরে কী ঘটবে। যদি তা না থাকে বা যদি আমি কোনো কিছু লিখতে না চাই, আমি লিখি না। ম্যাগাজিনগুলো থেকে প্রায়ই আমাকে বলে কিছু একটা লিখতে, এবং সবসময় আমি না বলে দিই। আমি যখন লিখতে চাই তখন লিখি এবং আমি যা লিখতে চাই, আমার যেমন ইচ্ছে তেমন লিখি।

আপনার কি মনে হয় ঘুমের মধ্যেও আপনি গল্পের প্লটগুলো নিয়ে কাজ করেন?

না, আমার তেমন মনে হয় না। আমি ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখি না। গল্পগুলো যেমন গল্পই; স্বপ্নও তেমন স্বপ্নই। এবং লেখালেখিই আমার কাছে স্বপ্ন দেখার মতো। লেখার সময় আমি ইচ্ছেকৃতভাবেই স্বপ্ন দেখতে পারি। আমি শুরু করতে পারি আবার থামাতেও পারি এবং পরের দিন আমার মনমতো আবার শুরু করতে পারি। আপনি ঘুমের মধ্যে—একটা বড় স্টেক বা বিয়ার অথবা অপূর্ব তরুণী—এরকম যত ভালো কোনো স্বপ্নই দেখুন না কেন, ঠিক জেগে ওঠার পর দেখবেন কিছু নেই। কিন্তু লেখার ক্ষেত্রে স্বপ্নকে আমি পরের দিনে নিয়ে যেতে পারি।

আপনি যখন লিখতে শুরু করেছিলেন ঠিক একই সময়ে দৌড়ানোও শুরু করেছিলেন আমার জানামতে কেউ কেউ হাঁটতে হাঁটতে তাদের মনের ভেতর লিখতে পছন্দ করে; হাঁটার ছন্দ তাদের সহায়তা করে আপনি কি দৌড়ানোর সময় লেখালেখি নিয়ে কোনো চিন্তাভাবনা করেন?

না, একদমই না। দৌড়ানোর সময় আমি কেবল দৌড়াই। আমার মনকে আমি শূন্য রাখি। দৌড়ানোর সময় আমি কী নিয়ে ভাবি সে সম্পর্কে আমার আসলে কোনো ধারণা নেই। সম্ভবত কিছুই ভাবি না। তবে, আপনি জানেন, দীর্ঘসময় ধরে লিখতে হলে আপনাকে বলিষ্ঠ বা অদম্য হতে হবে। একটা বই লিখে ফেলা তেমন কঠিন কিছু নয়, তবে বছরের পর বছর ধরে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভবের কাছাকাছি। আপনাকে একাগ্রতা ও সহনশীলতার শক্তি অর্জন করতে হবে। মাঝে মাঝেই আমি বেশ মানহীন লেখা লিখে ফেলি। বিদঘুটে লেখা। প্যাঁচানো লেখা। আমার মতে, মানহীন লেখা লিখতেও আপনাকে সুশৃঙ্খল হতে হবে। এটা একটা প্যারাডক্স, তবে সত্য। কিছু লেখক বেশ বিশৃঙ্খল জীবনযাপন করতেন—যেমন বোদলেয়ার। তবে, আমার মতে, সেসব দিন পেরিয়ে গেছে। এই ভুবনটা এখন অনেক জটিল জায়গা, এবং নানা বিশৃঙ্খলা পেরিয়ে টিকে থাকতে হলে আপনাকে অবশ্যই সবল হতে হবে। আমি লেখক হয়েছি ত্রিশ বছর বয়সে এবং প্রতিদিন নিয়ম করে দৌড়ানো শুরু করেছি আমার বত্রিশ কী তেত্রিশ বছর বয়সে। প্রতিদিন দৌড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম কারণ, আমি দেখতে চেয়েছিলাম আসলে কী পরিবর্তন ঘটে। আমি মনে করি জীবনটা এক ধরনের পরীক্ষাগার যেখানে আপনি যেকোনো কিছু করার প্রয়াস নিতে পারেন। এবং আমার মনে হয় দৌড়ানোটা শেষ পর্যন্ত আমার জন্য ভালো সিদ্ধান্ত ছিল, কারণ আমি বলিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম।

দৌড়ানোর মতো লেখালেখিও এক প্রকার নিঃসঙ্গ সাধনা আপনি একটি জ্যাজ ক্লাবের মতো সামাজিক জীবন ছেড়ে এসেযেখানে আপনার চারপাশে সবসময় মানুষের উপস্থিতি ছিলএকাকী চর্চায় নিবিষ্ট হয়েছেন কোনটি আপনার কাছে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যময়?

আমি খুব একটা সামাজিকতা বজায় রেখে চলতে পারি না। সংগীতের একগাদা রেকর্ড ও সম্ভব হলে বিড়াল সঙ্গে নিয়ে আমি কোনো শান্ত পরিবেশে নিজের ভেতরে থাকতে পছন্দ করি। এবং বেসবল খেলা দেখার জন্য ক্যাবল টিভি, আমি কেবল এতটুকুই চাই।

কয়েক বছর আগে একবার প্যারিস রিভিউয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, আপনার গল্পের চালিকা শক্তি হলো, ‘মিসিং এন্ড সার্চিং এন্ড ফাইন্ডিং বিষয়টা কি এখনো এমনই মনে করেন?

হ্যাঁ। এটাই আমার কথাসাহিত্যের সবচেয়ে বড় থিম—কোনো কিছুর অনুপস্থিতি, এরপর তা তালাশ করা এবং খুঁজে পাওয়া। আমার গল্পের চরিত্রগুলো প্রায়ই হারিয়ে যাওয়া কিছু সন্ধান করে চলে। কখনো কোনো নারী, কখনো কোনো কারণ, কখনো কোনো উদ্দেশ্য। তবে তারা খুঁজে চলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কিংবা জটিল কিছু যা তারা হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু চরিত্রটি যখন তা খুঁজে পায়, এক ধরনের হতাশা থেকে যায়। আমি ঠিক জানি না, কেন? তবে এটিই আমার কথাসাহিত্যের এক ধরনের উপাদান—কোনো কিছু খুঁজে চলা এবং তার সন্ধান পাওয়া, অথচ সমাপ্তিটা মোটেও সুখকর নয়।

আপনার উপন্যাসগুলো সাধারণত একটি রহস্যের বৃত্তে আবর্তিত হয় এবং মাঝে মাঝে আপনি রহস্যটির সমাধান দিয়ে দেন আবার কখনো কখনো রহস্যগুলোকে অমীমাংসিত অবস্থায় রেখে দেন এটা কি কারণে যে আপনি ব্যাপারগুলো পাঠকের জন্য উন্মুক্ত রাখতে চান, নাকি সমাধান সম্পর্কে অনেক সময় আপনি নিজেই নিশ্চিত হতে পারেন না?

যখন আমার কোনো উপন্যাস প্রকাশিত হয়, মাঝে মাঝেই বন্ধুরা আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে, ‘এরপরে কী হবে?’ আমি বলি, ‘এটা এখানেই শেষ।’ তবে পাঠকেরা সিক্যুয়াল আশা করে। ‘১কিউ৮৪’ প্রকাশের পর আমি ভালোমতোই বুঝতে পেরেছিলাম যে এর পরে আর কী ঘটবে বা ঘটতে পারে। চাইলে সিক্যুয়াল হিসেবে আরও পর্ব লিখতে পারতাম, কিন্তু আমি তা করি নি। আমি ভেবেছিলাম এটা ‘জুরাসিক পার্ক ৪’ বা ‘ডাই হার্ড ৮’-এর মতো মনে হতে পারে। তাই গল্পটা আমার মনের ভেতরেই রেখে দিয়েছি এবং আমি তা বেশ উপভোগ করেছি।

আপনি কি আবার কখনো এটি লিখবেন?

আমার তা মনে হয় না। এটা আমার মনের ভেতরেই থেকে যাবে। সিক্যুয়ালের মূল চরিত্রটি টেঙ্গোর ষোলো বছর বয়সি মেয়ে। বেশ ইন্টারেস্টিং একটি গল্প।

কেবল আপনার মনের ভেতরেই থেকে যাবে?

হ্যাঁ।

কিছু কিছু লেখক তাদের প্রতিটি বইয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের কিছু করতে চেষ্টা করেন, এবং কিছু লেখক তাদের জনপ্রিয় ধারাটি ধরে রাখায় জোর দেন আপনার ক্ষেত্রে কোনটি অনুভব করেন?

কাজুও ইশিগুরোর লেখা আমার ভালো লাগে। সে আমার বন্ধু। তার নতুন প্রকাশিত বইগুলো সব সময় আগের গুলোর চেয়ে ভিন্নরকম হয়। এটা বেশ ইন্টারেস্টিং। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে মোটিভ এবং থিমে তেমন একটা ভিন্নতা থাকে না। আমি সিক্যুয়াল লিখতে আগ্রহী নই। তবে আমার একটি বই থেকে অন্য বইতে গল্পের পরিবেশ অনেকটা একইরকম থাকে। আমি কেবল একজন ব্যক্তি এবং আমার নিজস্ব গতিতে চিন্তা করি; এটা আমি পরিবর্তন করতে পারি না। তবে আমি বারবার একই বিষয় নিয়ে লিখতে চাই না।

আপনি নিজেই একজন অনুবাদক আপনি এফ. স্কট ফিটজগারাল্ড, ট্রুম্যান ক্যাপোট, রেমন্ড কার্ভার এবং আরও অনেকের লেখা জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছেন এখন অনুবাদ করছেন জন শেভারের লেখা আপনি যাদের লেখা অনুবাদ করেছেন তাদের কোন বিষয়টা আপনাকে টেনেছে?

সহজ ব্যাপার। যেগুলো পড়ে আমার ভালো লাগে সেগুলোই অনুবাদ করি। রেমন্ড চ্যান্ডলারের সবগুলো উপন্যাস আমি অনুবাদ করেছি। তার লেখার ধরন আমার খুবই পছন্দ। তার লেখা ‘দ্য লঙ গুডবাই’ আমি পাঁচ কী ছয়বার পড়েছি।

আপনি যখন অনুবাদ করেন, তখন আপনাকে অন্য লেখকের স্বর ধারণ করতে হয় আপনাকে, সে অর্থে, ফিটজগারাল্ড অথবা চ্যান্ডলার কিংবা শেভার বনে যেতে হয় এটা কি একটা চ্যালেঞ্জ নয়, যেখানে আপনার নিজেরই স্বতন্ত্র সাহিত্যস্বর স্পষ্টরূপে প্রতীয়মাণ?

হ্যাঁ। এফ. স্কট ফিটজগারাল্ড আমার ভালো লাগে—আমি তার বেশ কিছু বই অনুবাদ করেছি—তবে তার লেখার ধরন আমার চেয়ে বেশ আলাদা, বেশ মুগ্ধকর ও জটিল। তবু, তার লেখা থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি—বিশেষত দৃষ্টিভঙ্গি, তার চোখে সে যেভাবে জগতটাকে দেখে। রেমন্ড কারভারের লেখার ধরন ও দেখার জগৎ আমার চেয়ে যথেষ্ট ভিন্ন, তবু আমি তার কাছেও অনেক কিছু শিখেছি।

অন্য লেখকদের কাছ থেকে আপনি যে বিষয়গুলো শিখেছেন তা আপনার অলক্ষ্যেই নিজের লেখায় প্রবেশ করেছে, এমনটা পেয়েছেন কখনো?

আমার মনে হয় কিছু প্রভাব আছে। আমি যখন লেখালেখি শুরু করি, তখন আমার কোনো পরামর্শদাতা, শিক্ষক, সহকর্মী কিংবা সাহিত্যিক কোনো বন্ধুও ছিল না। আমার কেবল আমিই ছিলাম। তো, অধিকাংশ বিষয় আমি বই থেকেই শিখেছি। যখন ছোট ছিলাম, পড়তে খুব ভালোবাসতাম আমি, কারণ আমিই আমার বাবা-মার একমাত্র সন্তান ছিলাম। আমার কোনো ভাই-বোন ছিল না। আমার সঙ্গী ছিল বই এবং বিড়াল—সংগীতও অবশ্য। আমি খেলাধুলায় মোটেও আগ্রহী ছিলাম না। বইপাগল ধরনের এক বালক ছিলাম আমি। কৈশোরে রাশিয়ান সাহিত্যের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলাম: তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি। এই বইগুলো থেকে আমি যা শিখেছিলাম তা অনেক কার্যকরী ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অসংখ্য সহপাঠী ছিল যারা লেখক হতে চাইত, কিন্তু লেখক হওয়ার মতো কোনো প্রতিভা আমার ভেতরে ছিল এমনটা কখনো বিশ্বাস হয় নি। এ কারণে আমি জ্যাজ ক্লাব খুলে বসি এবং আমার পছন্দের সংগীতের সাথেই জীবিকানির্বাহ শুরু করি।

আপনার বাবামা দুজনেই সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন তারা কি আপনার লেখালেখির সিদ্ধান্তে খুশি ছিলেন? তারা কি চান নি আপনি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হন?

আমার তা মনে হয় না। আমি আসলে জানি না আমাকে নিয়ে তাদের প্রত্যাশা কী ছিল।

কাফকা অন দ্য শোরউপন্যাসটি প্রকাশের পর, আপনার যে ওয়েবসাইটটি আছে সেখানে পাঠকেরা আপনাকে বইটিকে ঘিরে বিভিন্ন প্রশ্ন বা বইটি সম্পর্কে তাদের মতপ্রকাশ করার সুযোগ পায়এবং আপনি বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন কেন আপনি তা করেছিলেন? বইটি নিয়েই কেন?

আমি কৌতূহলী ছিলাম। সীমিত সময়ের জন্য ছিল এটা, তবে আমি অনেক ই-মেইল পেয়েছিলাম। ঠিক কতগুলো আমার তা মনে নেই—সম্ভবত ত্রিশ হাজার হবে। অথচ আমি সবগুলোই পড়েছিলাম—আমার চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছিল পড়তে পড়তে! এবং এর মধ্যে থেকে তিন হাজারের মতো ই-মেইলের উত্তর দিয়েছিলাম। বেশ কঠিন ব্যাপার ছিল সেটা, তবে ঠিক কী ধরনের পাঠক আমার লেখা পড়ছেন এবং আমার লেখা সম্পর্কে তাদের ভাবনা কী, সে বিষয়ে আমি মোটামুটি একটা ধারণা পেয়েছিলাম। কেউ কেউ আবার নির্বোধের মতো প্রশ্ন করেছিল। একটা ছেলে স্কুইডের কর্ষিকা (টেনট্যাকলস) সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল; একটি স্কুইডের দশটি কর্ষিকা বা শুড়ের মতো অঙ্গ থাকে, এখন আমার কাছে ছেলেটির জানার ছিল যে, সেগুলো হাত না পা। সে কেন আমার কাছেই তা জানতে চেয়েছিল? আমার উত্তর ছিল এমন: তুমি কোনো স্কুইডের বিছানার পাশে দশটি গ্লাভস এবং দশটি মোজা রেখে দিও। ঘুম থেকে ওঠার পর সে মোজা অথবা গ্লাভস যে কোনো একটা বেছে নিবে এবং তুমিও তোমার উত্তর পেয়ে যাবে। যদিও আমার জানা নেই স্কুইড বিছানায় ঘুমায় কিনা…অবশ্য অধিকাংশ প্রশ্নই আমি উপভোগ করেছিলাম।

পাঠকদের সাথে আপনার সংস্পর্শে থাকার একটা মাধ্যম ছিল এটা আমি জানি যে, জাপানে আপনি কোনো পাবলিক ইভেন্টে অংশ নেয়া বা কথা বলা পছন্দ করেন না সেটা কেন?

আমি একজন লেখক এবং লেখাই আমার কাছে সর্বাগ্রে। একটা সময় আমি মনস্থ করেছিলাম, লেখা ছাড়া আমি আর কিছুই করব না—এটাই ছিল আমার সিদ্ধান্ত।

আপনার কাছেদেশ এবং জনগণ দুটির মধ্যে পার্থক্য কী?

জনগণ আমার বই কিনে। দেশ কিনে না।

আপনার কি মনে হয়, একজন জাপানি হয়েও আপনার লেখায় পশ্চিমা ধাঁচের সাহিত্যের সামঞ্জস্য আছে?

আমি ওভাবে ভাবি না। আমার গল্পগুলো আমারই। এগুলো কোনো ক্যাটাগরিতে খাপে মিলবে না। তবে আমি জাপানি ভাষায় লিখি। আমার গল্পের চরিত্রগুলোর অধিকাংশই জাপানি। সুতরাং, আমি মনে করি আমি একজন জাপানি লেখক। আমার ধারণা, আমার লেখা বইগুলোর ধরন কারও সাথে মিলবে না।

মুরাকামির বেড়াল

জাপানে, আমার মনে হয়, লেখালেখির শুরুর দিকে আপনার পাঠকের অধিকাংশই ছিলেন তরুণ তরুণদের মধ্যে আপনার বিপুল ভক্তকুল তৈরি হয়েছিল

হ্যাঁ, ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। লেখালেখির শুরুর দিকে আমার পাঠকসংখ্যা বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সিদের মধ্যেই বেশি ছিল। এবং এই চল্লিশ বছর পরেও, আমার অধিকাংশ পাঠক বিশ থেকে ত্রিশ বছর বয়সি। তবে এর ভালো দিকটা হচ্ছে, আমার শুরুর দিকের ভক্তদের অনেকেই এখনো আমার বই পড়ে, এমনকি তাদের ছেলেমেয়েরাও পড়ে। একটি পরিবারের তিন-চারজন লোক যখন একই বই পড়ে, শুনে আমার তা বেশ লাগে। আমার এক বন্ধুর কিশোর ও তরুণ বয়সি ছেলেমেয়ে আছে। সে বলেছিল যে, বাবা-মা এবং ছেলেমেয়েদের মধ্যে এখন আর কোনো কথাই হয় না। কেবল একটা বিষয়ে তারা একসাথে আলোচনা করে, আর তা হলো আমার বই।

কিলিং কমেনডেটরথেকে যে দৃশ্য আমি উদ্ধৃত করতে চাই:

কমেনডেটর হাতের তালু দিয়ে তার দাড়ি ঘষতে থাকে যেন সে কিছু মনে করার চেষ্টা করছে। ‘ফ্রানৎস কাফকা পাহাড়ি ঢালের প্রতি চরম আসক্ত ছিলেন,’ সে বলল, ‘তিনি সব ধরনের ঢালের প্রতিই আকৃষ্ট হতেন। ঢালের মাঝখানে নির্মিত বাড়িগুলোর দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। রাস্তার পাশে বসে তিনি এইভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কখনোই এতে ক্লান্ত হতেন না এবং সেখানে বসে তিনি মাথা একপাশে কাত করে আবার তা সোজা তুলে তাকিয়ে থাকতেন। অদ্ভুত এক লোক। এটা কি জানতে তুমি?’ ফ্রানৎস কাফকা এবং ঢাল? ‘না, জানতাম না,’ আমি বললাম। আমি কখনো তা শুনিও নি। ‘তবে এটা জানার পর কি কেউ তার লেখার মর্ম আরও বেশি উপলব্ধি করবে?’

আমরা যদি আপনার দুর্বলতাগুলো জানিযেমন ধরেন, আপনি ঢালের দিকে তাকিয়ে থাকতে পছন্দ করেনতবে কি তা আপনার লেখার মর্ম উপলব্ধি করতে আমাদের সহায়তা করবে?

ফ্রানৎস কাফকা পাহাড়ি ঢাল ভালোবাসেন—এটা একটা মিথ্যা কথা; এটা আমি বানিয়েছি। তবে এটা কি ভালো? খুব সম্ভবত ফ্রানৎস কাফকা পাহাড়ি ঢাল পছন্দ করতেন।

এটা সম্ভব

আপনি জানেন, কিছু লোক এমন উদ্ধৃতি দেয়। তবে এটা আমি বানিয়েছি। এরকম অনেক কিছুই বানিয়েছি আমি।

এটা কথাসাহিত্য এখানে আপনি বানিয়ে লিখতে পারেন কিন্তু যদি এটা সত্য হয়? ধরুন, আপনি বিড়াল ভালোবাসেন, এটা যদি আমরা জানি, তবে তা কি আপনার লেখাকে আমাদের কাছে আরও বোধগম্য করে?

আমার বউকে জিজ্ঞেস করুন।

তিনি আপনাকে ভালোভাবে জানেন বলে কি আপনার লেখা সম্পর্কে তার ধারণা অনেক ভালো?

আমি জানি না। সে বলে যে আমি তার প্রিয় লেখক নই। তবে সে সবসময় খুব গুরুত্বের সাথে আমার লেখার সমালোচনা করে। সে-ই আমার প্রথম পাঠক, আমি লেখা শেষ করেই পাণ্ডুলিপিটি তার কাছে দিই এবং সে তা পড়ার পর দুইশত টীকাসহ (স্টিকি নোটস) আমাকে ফেরত দেয়। আমি এগুলো পছন্দ করি না। সে বলে, ‘এই অংশগুলো তোমার পুনরায় লেখা উচিত!’

যদি তিনি পুনরায় লিখতে বলেন, আপনি কি আবার তা লিখেন?

হ্যাঁ। পুনরায় লেখার পর আমি আবার তার কাছে দিই এবং এবার সে একশটি টীকাসহ তা ফেরত দেয়। আগের চেয়ে কম টীকা—তাও ভালো।

(সাক্ষাৎকারটি ঈষৎ সংক্ষেপিত)

প্রচ্ছদ রাজিব রায়