।। মেজবা উদ্দিন পলাশ, কুষ্টিয়া ।।

‘যার কেউ নাই, তার আল্লাহ আছেন। তাই আমার মেয়ের খুনিদের বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম।’ এ আকুতি সম্প্রতি নির্মমভাবে খুন হওয়া কুষ্টিয়ার মিরপুর বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্রী উম্মে ফাতেমার পিতা সাইফুল ইসলামের।

তাঁর দাবি, একজন ছেলের একার পক্ষে এত নির্মম-নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত। এমন তথ্য তিনি ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বার বার পুলিশকে জানানো হলেও পুলিশ তাদের দেয়া তথ্য আমলে নেয়নি। ফাতেমার পরিবারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে। লিখিত ওই আবেদনপত্রে মামলাটি সিআইডির হাতে হস্তান্তর করার দাবি জানিয়ে বলা হয় ফাতেমাকে গলায় ফাঁস দিয়ে গলা, ঘাড়, মুখমণ্ডল, পেটসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে জখম করে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ এ ঘটনায় আপনকে একমাত্র আসামি দাবি করে ”সে একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে” এই মর্মে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করে। কিন্তু ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা ও নৃশংসতা দেথে মনে হয় এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ধর্ষণসহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এই মামলায় একজন মাত্র আসামিকে জড়িত দেখিয়ে জবানবন্দি রেকর্ড করার কারণে অন্য আসামিদের আড়াল করা হচ্ছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফাতেমার পিতা সাইফুল ইসলাম জানান, হত্যার ঘটনার প্রথম দিকেই পুলিশের দেয়া ঘটনার বিবরণেও তাদের আপত্তি ছিল। ঘটনাস্থল থেকে ফাতেমার স্যান্ডেল উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এটি ফাতেমার নয়, ফাতেমার স্যান্ডেল এখনও তাদের বাড়িতেই রয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে প্রেমঘটিত ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু খুনির পরিবারের সঙ্গে তাঁর মেয়ে এবং পরিবারের লোকজনের কোনো সম্পর্ক ছিল না এটিও পুলিশকে জানানো হয়। ফাতেমা হত্যার পর কয়েকজন যুবক এলাকা ছাড়া ছিল। এমন তথ্যও পুলিশকে দেয়া হয়। ওইদিন মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার সময় সকালে বাড়ির সামনে একটি হাতের ব্যাচলেট ছেঁড়া অবস্থায় পড়েছিল। সেটিও পুলিশকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে ফাতেমা হত্যার মূল ঘটনাকে পুলিশ আড়াল করা হচ্ছে বলে দাবি করেন সাইফুল ইসলাম।

গত ১৬ জুলাই কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ভাঙা বটতলা এলাকায় একটি ভুট্টা ক্ষেত থেকে নবম শ্রেণীর স্কুলছাত্রী উম্মে ফাতেমার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ওই দিন রাতে পুলিশ মিরপুর পৌরসভার কুরিপোল মধ্যপাড়া এলাকার রংমিস্ত্রি মিলনের ছেলে ও আমলা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আপনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পরের দিন কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার খাইরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে জানান, আপনের সাথে স্কুলছাত্রী ফাতেমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এরই মধ্যে আপন আরেকজনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। ফাতেমা বিয়ের জন্য চাপ দেয়ায় আপন পরিকল্পিতভাবে একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

সাইফুল ইসলাম বলেন, খুনিদের যেন বিচার দেখে মরতে পারি। একজন আসামি গ্রেফতার করেই যেন পুলিশ থমকে গেছে এমনটাই দাবি করেন নিহত ফাতেমার পিতা সাইফুল ইসলাম।

ফাতেমার মা হালিমা খাতুন বলেন, এই জীবনে আর কিছুই চাই না, শুধু মেয়ে হত্যার বিচার চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার একটাই চাওয়া আমার সন্তান হত্যার বিচার পেতে তিনি যেন আমাকে সহযোগিতা করেন।

এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এএস আই শেখ আবু সাইদ বলেন, এ হত্যা মামলায় আপন নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আসামি এখন কারাগারে। মামলাটি পুলিশ এখনও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম জানান, মামলাটি তদন্তধীন। বাদী পক্ষের অন্য সমীকরণ থাকতেই পারে। তিনি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বলে জানিয়ে দাবি করেন সঠিকভাবেই মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে।