শিবলী নোমান

।। শিবলী নোমান ।।

সংবাদকর্মে আমার শুরুটা হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক হিসেবে। স্পষ্ট স্মরণ করতে পারি, রাজশাহীর স্থানীয় দৈনিক সোনালী সংবাদে তৎকালীন প্রধান প্রতিবেদক (বর্তমানে সোনার দেশের সম্পাদক ও প্রকাশক) আকবারুল হাসান মিল্লাতের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের সেই স্মৃতি। প্রথমদিনেই বলেছিলেন, “রাজনৈতিক চেতনা ধারণ করা দোষের নয়। কিন্তু সাংবাদিকতায় রাজনৈতিক পক্ষপাত দোষের নয়, অপরাধ!” 

তার চেয়েও বেশি জ্বলজ্বলে আরেক ঘটনা। ততোদিনে পুরোদস্তুর প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছি আমি। তখনও কম্পিউটার সবার ডেস্কে নেই, হাতেই লিখতে হতো নিউজপ্রিন্টের প্যাডে। আমি বসতাম তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক মরহুম মোলাজ্জেম হোসেন সাচ্চুর সামনের টেবিলে। মূল নিউজরুম থেকে সেটি ছিলো আলাদা। তো, সেই সময় গণযোগাযোগ (অধুনা গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা) বিভাগে পরীক্ষার ফলাফলে দীর্ঘসূত্রতার বিরুদ্ধে এক আন্দোলন চলছিলো শিক্ষার্থীদের। দিনভর সে আন্দোলন কাভার করে সন্ধ্যার পর সোনালী সংবাদ অফিসে বসে প্রতিবেদন লিখে জমা দিয়েছি মাত্র। হঠাৎ করেই মিল্লাত ভাই নাম ধরে ডাকলেন। তাঁর ডেস্কের সামনে দাঁড়াতেই দেখলাম আমার কপি তাঁর হাতে। সেখানকার এক তথ্যের সূত্র ধরে মুখ তুলে বললেন, “এই তথ্য কই পেলে তুমি?” জবাব দিলাম, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলেছে। মিল্লাত ভাই ভ্রুঁ কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভার্সিটি কর্তৃপক্ষের তথ্য দিয়েই সব নিউজ হলে তো তোমাকে রাখার দরকার নাই! ওদের জনসংযোগ দফতরের কাউকে তাহলে নিয়োগ দিলেই তো হয়!” লজ্জা পেলাম ভীষণ। সঙ্গে শিক্ষাও।

সেই শিক্ষার কল্যাণেই কি না কে জানে, এরপর থেকে আমার সংবাদকর্মী হিসেবে পুরো জীবনে খুব ঘনিষ্ঠ মানুষও ক্ষমতায় গেলে তাঁর সঙ্গে আমার যোগাযোগ কমেছে। বিশ্ববিদ্যালয়-সাংবাদিকতার ছোট্ট জীবনে এমন অনেক শিক্ষকের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিলো, পরবর্তীতে যাঁদের কেউ কেউ প্রশাসনের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পাবার পর তাঁদের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। আমার ছোট মাথায় এর একটাই কারণ, খবর। দায়িত্বে যিনিই থাক, শেষাবধি তাঁর বিরুদ্ধে যায়, এমন প্রতিবেদন করা কিংবা ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর কোনো সহকর্মী করলে তাকে পুরো সমর্থন যোগানোর কারণে সেই ঘনিষ্ঠতাগুলো ফিকে হয়েছে।

এতোসব কথা দিয়ে শুরু করার কারণ- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য। সম্প্রতি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তারকে। তাঁর ডাক নাম তাপু, এবং সে নামেই তিনি সম্যক পরিচিত। তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গাটা একাধিক ক্ষেত্রে যুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরুর আগে এই ক্যাম্পাসের দুজন শিক্ষকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো। একজনের সঙ্গে লেখালেখির আড্ডায়, অন্যজনের সঙ্গে রাজনৈতিক আড্ডায়। বর্তমান উপাচার্য শেষের অংশে। মজার ব্যাপার হলো, সেই সময় আমি জানতামও না যে, তিনি ভার্সিটির টিচার। তা, সে যাই হোক, দুই দশকের বেশি সময় ধরে সেই গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপুর সঙ্গে স্মৃতি খুব কম নয়। তা সে যে কারণেই হোক। হোক তা কোনো তথ্যের জন্য, কিংবা রাজনৈতিক আলাপের জন্য, অথবা টাকা লাগবে কোনো কাজে অথচ পকেট খালি সেজন্য! এখন ভয়টা এখানেই, প্রশাসনের পদে যাবার পরে তাঁর সঙ্গে শেষাবধি কি সেই মধুর সম্পর্কটা থাকবে আমার? আশা তো এর পক্ষেই কথা বলে। কিন্তু বাস্তবতা? সে বড় কঠিন। তারপরেও আশা ছাড়তে চাই না বলেই এই লেখার অবতারনা।

আমরা আসলে কী চাই? ভেবে ভেবে ঠিক করলাম, সেই কথাগুলোই না হয় নয়া ভিসিকে জানিয়ে দিই। যাতে অন্তত তাঁকে আগে থেকেই বলে রাখা যায়, শেষ পর্যন্ত কোন সীমারেখায় আমাদের সম্পর্কটা আটকে থাকতে পারে! ভিসি নিয়োগের দাফতরিক কাগজ আসার আগেই যেভাবে তাঁর জন্য ফেসবুকে অভিনন্দনের জোয়ার শুরু হয়েছিলো, সেই অভিনন্দনের ঘনকালো ধোঁয়া সরিয়ে প্রকৃত বাস্তবটাকে যদি তিনি দেখতে পান, তাহলেই সেই অটুট সম্পর্ক নিয়ে এ যাত্রা শেষ করা যাবে।

অতীতে দেখেছি, কোনো কোনো শিক্ষক ভিসি হয়ে এক চোখে তেল বেচেছেন, আরেক চোখে নুন! বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশের অপব্যাখ্যা দিয়ে ক্যাম্পাসটাকে এক বিশৃঙ্খলতার কেন্দ্র বানাতেও দেখেছি নিকট অভিজ্ঞতায়। অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার সে পথে হাঁটবেন না বলেই আশা করি। কারণ, তলানীতে ঠেকা এই ক্যাম্পাসকে ঘুরে দাঁড় করানোর জন্য প্রশাসনিক ন্যায়বিচার জরুরি। সেটা করলে ভালো, না করলে সম্পর্কটা কি আর থাকবে?

অভিনন্দনের জোয়ারের মধ্যে তাঁর জন্য শুভকামনা জানাতে গিয়ে খচ খচ করেছে একটা বিষয়। এর মূল কারণ বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে প্রণীত সেই অধ্যাদেশ! বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসনের হাজার ফুলের মাঝে সেই গণতান্ত্রিক চর্চার আকাঙ্ক্ষা। জাতির ভবিষ্যত নেতৃত্বের বিকাশের সেই বিশ্বজনীন বিদ্যায়তনকে দেখবার অধীর অপেক্ষা। কোনো সন্দেহ নেই, যে প্রক্রিয়ায় ড. তাপু ভিসি হলেন, তা সেই অধ্যাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চার সমান্তরাল কোনোমতেই নয়। কাজেই নয়া ভিসির কাছে সেই পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জোর প্রচেষ্টা চালানো ভিন্ন অন্য কিছু প্রথম সারিতে চাইবার নেই। যে ক্যাম্পাস পরিবারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ থাকার কথা, তা আজ পরিচালিত হয় কোন অদৃশ্য সুতোর টানে। শিক্ষক সমিতি সমেত যাবতীয় নির্বাচন আছে। নেই শুধু রাকসু, যেখানে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক পাঠের বিকাশ শুরু হয়। ড. তাপুর কাছে সেই গণতান্ত্রিক আবহ তৈরির চাওয়াটা থাকবে সবার আগে।

আমরা জানি, আজকাল ভিসি পদটা নিয়ে রাজনৈতিক ছুটোছুটি বড়ই বেশি! এ নেতারা আশীর্বাদ, ও নেতার দোয়া- কত কী! কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বিশ্ববিদ্যালয় ভাবনার সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার ন্যূনতম সাদৃশ্যও তো দেখি না! এটা ভাবা কি অন্যায্য হবে যে, ক্যাম্পাসে ভর্তি হবার যোগ্যতাও যাদের নেই, সেই তারাই যখন রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটে ক্যাম্পাসকে কুক্ষিগত করার অপচেষ্টা চালান, তখন তাদেরকে শক্ত মেরুদণ্ড নিয়ে স্মরণ করিয়ে দেয়া যাবে তাদের প্রকৃত স্থান? কাজটা কঠিন। তবে শুরুটা আজ না করলে আর কবে? আর কত অঘটন ঘটলে বিশ্ববিদ্যালয় বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে যে, এই ক্যাম্পাস আপনাদের কর্মসংস্থান তৈরির তথাকথিত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে থোড়াই কেয়ার করে? আজ না হলে আর কবে বলা যাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজটা আসলে বিশ্বজনীন শিক্ষাদানের, যার মূলে পঠন পাঠন আর গবেষণা? কবে বলা যাবে যে, বড় বড় বিনিয়োগ এখানে আসবে, আর তার বুদ্ধিবৃত্তিক কাজগুলো হবে এই ক্যাম্পাস থেকে? কবে বোঝানো যাবে যে, দলীয় বিবেচনায় বিতর্কিত নিয়োগ নয়, শিল্পায়ন আর শিক্ষা-গবেষণার এই মেলবন্ধনের মাধ্যমেই রাজশাহীকে প্রকৃত অর্থে এগিয়ে নেয়া যাবে?

বোঝাই যায়, রাতারাতি তা কোনোমতেই সম্ভব নয়। কিন্তু নয়া ভিসি তো সেই পথে যাত্রাটা শুরু করতে পারেন! তাহলে তো সেই ড. তাপুর পূর্বাপর একই সুতোয় গাঁথা থাকবে আমাদের কাছে। তা না হলে যে কী হয়, তার দৃষ্টান্ত তো কম নেই। আর সে পথে যাওয়াটাও আমাদের সবার জন্য শেষ বিচারে কষ্টকরই হয়ে থাকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়া ভিসি ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার তাপুর ব্যাপারে আমরা সে কষ্টে পুড়তে চাই না।

শিবলী নোমান রাজশাহীতে বসবাসরত একজন সংবাদকর্মী