grand river view

।। আদনান সৈয়দ ।।

কিলিং কমেনডেটর, প্রকাশক ভিনটেজ। একজন চিত্রশিল্পীর চোখ দিয়ে দেখা গোটা বিশ্বের চেহারা কেমন হতে পারে? সন্দেহ নেই উপন্যাসটি ইতিমধ্যেই সাহিত্য দুনিয়ায় বেশ নাম করেছে। ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন প্রখ্যাত অনুবাদক ফিলিপ গাবরিয়েল এবং টেড গুসেন। উপন্যাসটিতে মানুষের চলমান জীবন, অতীত স্মৃতি, পৌরাণিক বিশ্বাস এবং একই সঙ্গে জাদুবাস্তবতায় আঁকা দুনিয়াকে একই সুতায় গাঁথা হয়েছে। একজন নবীন চিত্রশিল্পীর জীবনের কল্পনা, অতীত এবং মিথ একাকার হয়ে ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসটিতে।

কথায় বলে, ‘ইমাজিনেশন ইজ দ্য ইমপর্ট্যান্ট দ্যান নলেজ’। কথাটি মুরাকামির ক্ষেত্রে শতভাগ সত্যি। যে জীবন থেকে মানুষ মুক্তি চায়, যে জীবন কল্পনার, যে জীবন ঐন্দ্রজালিক রঙ দিয়ে মোড়া সেই অনাগত জীবন মানুষকে নিত্যই হাতছানি দিয়ে ডাকে। মুরাকামির সাহিত্যে রয়েছে মানুষের আত্মার ছটফটানির নিগূঢ় সেই শব্দ। তিনি যেন সেই আর্তনাদকে দিব্যজ্ঞানে দেখতে পান আবার শুনতেও পান। তার পাঠককুল সবাই যখন রুষ্ঠ, অশান্ত, জীবনের কূটচালের বেড়ায় নিমজ্জিত এবং তারা যখন নতুন একটা পথ খোঁজার চেষ্টা করেন, নতুন কোনো নিশানায় তারা প্রবাহিত হতে চান তখন মুরাকামির গ্রন্থ যেন তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। জীবন ভীতি, অস্থিরতা, ভয় এবং কল্পনার বুননে নতুন এক জগৎ তখন মুরাকামির সাহিত্যের ভাষা হয়ে ওঠে। একবার মুরাকামি এক সাংবাদিককে বলেছিলেন, ‘আমি বেসবল খেলা পছন্দ করি কারণ খেলাটি খুব বোরিং।’ কথাটি সহজ কিন্তু ভাবনাটিও ততধিক সহজ। কিন্তু এই সহজ সরল প্রকাশ উপন্যাসে প্রকাশ খুব কম লেখকই করতে পারেন। ২০০৭ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মস্মৃতি What I Talk About When I Talk About Running: A memoir গ্রন্থে আমরা লেখকের সেই ভাবনারই একটি প্রতিফলন দেখতে পাই। তখন মনে হয় একজন লেখক যেমন করে ভাবেন তেমন করে লিখেনও! এ কথা তো সত্য যে মানুষের কল্পনা অনেক সময় জাগ্রত হয় কুয়াশাচ্ছন্ন হতাশা থেকেই। সে জন্যেই কি মুরাকামি মনে করেন একজন লেখককে খুব জ্ঞানিগুণী হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ ‘লেখক শুধু ঘটনাগুলোর গায়ে শিল্পের আঁচড় দেন মাত্র।’

২০০২ সালে প্রকাশিত মুরকামির আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এর কথাই ধরা যাক। সেখানে একটি দৃশ্যে দেখা যায় আকাশ ভেঙে মাছগুলো বৃষ্টির মতো মাটিতে ঝরে পড়ছে। কেন মাছ আকাশ থেকে বৃষ্টির পানির মতো ঝরে পড়ছে? মুরাকামিকে বহুবার পাঠকের এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। মুরাকামির ভাষায়, ‘সত্যি মাছ কেন? কেন এই মাছ আকাশ থেকে ঝরে পড়বে? কিন্তু সত্যি এর কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। আমি শুধু ভেবেছি যে আকাশ থেকে কিছু একটা পড়তে হবে। তখন আমি ভাবছিলাম আকাশ থেকে তাহলে কী পড়বে? তখন আমি নিজেই নিজেকে বললাম, কেন? মাছ! মাছ হতে পারে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ।’ মুরাকামি আরও বললেন, ‘এবং আপনি জানেন যে আমার মনে যে ভাবনটা আসে সেটিই সত্য কারণ সেটি আমার মনের গভীর চেতনা থেকেই উৎসারিত।’ তবে ভাবনা যাইহোক না কেন লেখককে সেই ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজন হয় শিল্প। শিল্পই শেষ পর্যন্ত একজন লেখককে বাঁচিয়ে রাখে। এখানেই একজন লেখকের নিয়তি সত্যিকার অর্থে নির্ভর করে। মুরাকামির ক্ষমতাটি এখানেই।

মুরাকমির মতো ক’জন কথাসাহিত্যিক খুব জোড় দিয়ে এই সত্যকে কবুল করতে পারেন? একজন লেখকের আত্মায় যে কথাটি দোল খায় তাই সত্য, তাই বাস্তব। ক’জন নিজের উপর এত আস্থা রাখতে পারেন? আবার মনের ভেতর যে কোনো চিন্তা উদয় হলেই কি সেটি সাহিত্যের খোরাক জোগাতে পারে? অবশ্যই পারে। যদি সেই ভাবনাটিকে শিল্পের মোড়কে সাহিত্যে তুলে আনা যায়। মুরাকামির সঙ্গে সুর মেলালে বলা যায় যে ‘সেটি সম্ভব’। সাহিত্যে মেটাফোর আছে, চিত্রকল্প আছে, জাদুবাস্তবতাও আছে। সাহিত্যের ভাষায় সব মশলাগুলো মেশালে তা পাঠকের আত্মায় কীভাবে দোল খাবে সেটিই হলো আসল কথা। একজন প্রকৃত লেখক এই বিষয়গুলো নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবেন বৈকি! মুরাকামির উপন্যাস ‘কিলিং কমেনডেটর’ শুরুতেই উত্তম পুরুষে লেখা (যিনি ধারা ভাষ্যকারের ভূমিকায় রয়েছেন) চরিত্রটি ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর দেখতে পায় তার সামনে বসে আছেন এক মানুষ যার কোনো মুখ নেই। সেই মুখহীন মানুষটির দাবি তার একটি ছবি এঁকে দিতে হবে। আলোচনা শুরু হয় এখান থেকেই। গল্পটি তখন জমে ওঠে। তবে গল্পকার যখন জাদুবাস্তবতার সাহায্য নিয়ে পাঠককে একটি ঘটনা চিত্রে ঘুরপাক খাওয়ান তখন বুঝতে হবে এখানে লেখকের অন্য কোনো কারসাজি আছে! মুরাকামির ভাষায়, ‘পাঠক এবং লেখকের এটি হলো খুব একান্ত একটি জায়গা যেখানে তারা দুজনেই অবচেতন মনে একজন আরেকজনকে স্পর্শ করতে পারেন’। মুরাকামি মনে করেন ‘আমি গল্পলেখক নই বরং বলতে পারেন আমি গল্পকে আবিষ্কার করি।’ সত্যি তাই। তিনি মানুষের অবদমিত মনের স্বপ্নগুলোকে ফেরি করে বেড়ান। পাঠকের আত্মায় নতুন এক আলো তিনি রোপণ করে দেন। পাঠক তখন ভিন্ন এক জগতের বাসিন্দা হয়ে পড়েন। পাঠক স্বপ্ন দেখেন। লেখক স্বপ্ন দেখান। তবে এই স্বপ্ন ঘুমিয়ে দেখা স্বপ্ন নয়, এই স্বপ্ন দিনের বেলায় প্রতিদিনের গার্হস্থ্য জীবনের স্বপ্ন। মুরাকমি বলছেন, ‘আমি তখনই স্বপ্ন দেখি যখন আমি জেগে থাকি। ঘুমিয়ে আমি কখনো স্বপ্ন দেখি না।’

‘কিলিং কমেনডেটর’ মুরাকামির পাঠমুগ্ধ একটি উপন্যাস। অনেকের মতে ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এর পর এই গ্রন্থটিই মুরাকামির গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ। ৭০০ পৃষ্ঠার বইটিতে মুরাকামির সহজসুলভ ভঙ্গিতে লেখা জাদুবাস্তবতার ছাড়াছড়ি। গ্রন্থটি নৈতিকতার প্রশ্নে সম্প্রতি হংকং-এ নিষিদ্ধ হয়েছে। তাদের যুক্তি গ্রন্থটি তরুণদের বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তে ফেলবে।

‘কিলিং কমেনডেটর’ উপন্যাসটি শুরু হয় ছোট বোনকে উদ্দেশ্য করে বলা গল্প দিয়ে। সেই বোন ১২ বছর বয়সেই মারা যায়। যিনি গল্পটি বলছেন তিনি অদৃশ্য এক চিত্রকর। ৩৬ বছর বয়সি এই চিত্রকর ধনী আর পয়সাওলাদের জন্যে তাদের প্রতিকৃতি আঁকেন। এই ছবি আঁকতে আঁকতেই নানা রকম ভাবনা তাকে পেয়ে বসে। কারণ তিনি নিজেও খুব একাকী এবং ভবঘুরে। স্ত্রীর সঙ্গে তার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তি তাকে ভর করে, তিনি নতুন করে জীবন নিয়ে ভাবতে চান। টোকিও শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম ওডওয়্যার শহরের কাছাকাছি একটি পাহাড়ের উপর বাড়িতে তিনি আশ্রয় নেন। সেখানে শুরু করেন চিত্রশিল্পের নতুন যাত্রা। তার মনে একটাই আশা তিনি বড় একজন চিত্রকর হবেন। I…wanted to try painting whatever I wanted; তার স্কুলজীবনের এক বন্ধু পাহাড়ের ওপর একটি বাড়ি বন্ধুর জন্য ছেড়ে দেয়। সেই বাড়িতে তিনি নতুন করে একটি জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন এই শিল্পী।

গ্রন্থটির অনেক বিষয়, চরিত্র পড়লে মনে হবে আমাদের খুব চেনা। বিশেষ করে তার ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’-এর অনেক বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করা যায়। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই গ্রন্থটির কথা! ‘কিলিং কমেনডেটর’ গ্রন্থটিতেও রয়েছে সেই একই দীর্ঘশ্বাস! উপন্যাসের গতি, চরিত্র, ঘটনা, সব কিছুই আপনাকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। ভুলে যাবেন না উপন্যাস দুটোর বয়সের ব্যবধান প্রায় কুড়ি বছর কিন্তু বিষয় এবং ভাবনায় বৈচিত্র্য এক কথায় অনবদ্য! তবে একটা বিষয় চোখ বুজেই বলে দেয়া যেতে পারে যে মুরাকামি অতীত এবং ভবিষ্যতকে চোখের পলকেই এক করে নিতে পারেন।

অনেক গ্রন্থ সমালোচকের দৃষ্টিতে এই গ্রন্থটিতেও সমানভাবে মুরাকামি তার পাঠকদের মধ্যে একটি মানসিক স্নায়ু চাপে রেখেছেন। অবশ্য এ কাজটি মুরাকামির সহজাত। তার গ্রন্থ পাঠ করলে স্নায়ুর ওপর একটি বাড়তি চাপ পরবে এই স্বাভাবিক। আগেই উল্লেখ করেছি ‘কিলিং কমেনডেটর’ জাদুবাস্তবাকে ধারণ করে লেখা একটি উপন্যাস। যে উপন্যাসে দেখা যায় খুব সাধারণ একজন মানুষ সাধারণ একটি কাজ আঁকড়ে ধরে এই সাধারণ ধরণীতে বেঁচে থাকেন। কিন্তু ঘটনা এখানেই মোড় খায়। সাধারণ মানুষটির সত্তায় অস্বাভাবিক কিছু ঘটনা ঘটতে শুরু করে। মনে হয় অন্য এক বিশ্বের অদৃশ্য সুতায় বন্দি হয়ে নানা রকম ঘটনা ঘটতে শুরু করে।

মুরাকামির আগের উপন্যাস ‘কাফকা অন দ্য শোর’-এ-ও কিন্তু ঠিক এ ধরনের খেলাটি খেলেছেন। কমেনডেটর এর চিত্রটি আমাদের নিজেদের মতো করে মানসপটে চিত্রিত করে নিতে হয়। অনেকেই অবশ্য মুরাকামির এই কাল্পনিক সত্তাটিকে পছন্দ করেন না। কারণ অনেক সময় সেই সত্তার বাস্তবায়ন সেভাবে ঘটেও না। যে কারণে উপন্যাসের প্লটের সঙ্গে একজন লেখকের আত্মিক সম্মিলন অনেক দেরিতে ঘটে। যদিও উপন্যাসটির মূল নির্যাস শিল্পের ক্ষমতা বা শক্তি প্রদর্শন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পৃথিবীর তাবৎ নানা জায়গায় শিল্প শুধু সুন্দরের প্রকাশই নয় বরং শিল্পকে ব্যবহার করা হয় আমাদের চেতনার যোগসূত্র হিসেবে। জীবনের বাস্তব আর অবাস্তব রেখাটিকে শিল্প দিয়ে একটি সেতুবন্ধন রচনা করা হয়। শিল্পের এই শক্তি স্বর্গীয় এবং হারুকি মুরাকামি এই শিল্পের এই শক্তিকে তাঁর উপন্যাসে কাজে লাগান তাঁর দক্ষ হাত দিয়ে।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র চিত্রকর আমাদা ‘কিলিং কমেনডেটর’ ছবি আঁকতে গিয়ে নিজের জীবনের মানসিক অভিজ্ঞতার আশ্রয় নিয়েছেন। শেষ দিকে দেখা যায় আমাদা শুধু একটি ছবিই আঁকেননি। এখানে আরও অনেক কিছু তিনি এঁকেছেন। তিনি তাঁর মগ্ন চৈতন্যে অন্য এক নতুন শিল্পের জন্ম দিয়েছেন। মুরাকামির শিল্পের খেলা ঠিক এখানেই। তিনি পাঠককে ভিন্ন এক জগতে টেনে নিয়ে নতুন এক গ্রহের সন্ধান দেন। ‘কিলিং কমেনডেটর’ উপন্যাসেও কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে তিনি প্রাচীন গ্রিক দেবতা ইলিউসিনিয়ান এবং ওরফিক-এর দ্বারস্থ হয়েছেন। মৃত্যুকে কীভাবে আলিঙ্গন করা যায় তার শৈল্পিক একটি উপায় তখন আমরা পাঠকুল খুঁজে পাই। কথা হলো মৃত্যুর ছায়ায় কি উল্লাসের রেখাচিত্র ধরা পরে? মৃত্যু কি কখনো শৈল্পিক হতে পারে? হয়? কমেনডেটরের মৃত্যু হয়েছে তবে নায়কের মৃত্যু হয়েছে কি? তিনি মুখোমুখি হয়েছেন একটি নদীর সঙ্গে তারপর একটি মুখবিহীন মানুষের সঙ্গে। তিনি তখন তৃষ্ণার্ত। নদীর পানি পান করা তার জন্য জরুরি। তারপর দেখা হলো ডেন্না আন্নার সঙ্গে। সেই তাকে বললো, ‘নদী বয়ে চলে বর্তমান এবং অনুপস্থিত অনুষঙ্গকে সঙ্গে নিয়ে। শুধু গোপন কিছু সম্ভাবনা দিয়ে এর পূর্ণতা পায়।’ ডেন্না আন্না কমেনডেটরের পেইন্টিংকে হত্যা নিয়ে আরও বলে, ‘পেইন্টিং হলো একটি মেটাফোর, একটি কবিতার মতো।’

উপন্যাসে পুরো ভ্রমণটিই হলো একজন শিল্পীর জীবনকে নতুন করে আবিষ্কার করা। এই আবিষ্কারের পথ কণ্টকমুক্ত নয় নিশ্চয়ই! সেখানে নানারকম বাধা চলে আসে। উপন্যাসের ধারা বর্ণনাকারী শিল্পীর নতুন বাসস্থান একজন বিখ্যাত চিত্রকরের যার শখ ছিল তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করা। ‘কিলিং কমেনডেটর’ পেইন্টিংটির সন্ধান পাওয়া যায় বাড়িটির এটিকে (ছোট কুঠুরিতে)। পেইন্টিংটির সন্ধান পাওয়ার পর বাড়ির নতুন অতিথি প্রায় সময় নানারকম অনুষঙ্গ টের পান। যেমন তিনি প্রায় সময় শুনতেন নিচ থেকে কে যেন কলিংবেল চেপে ধরেছে। এটি ছিল বাড়ির নতুন আগন্তুকের জন্য বিরক্তিকর। ছবি আঁকতে তার মন তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। সে তখন মানুষের মুখ আর শরীর না একে বিমূর্ত ছবি আঁকায় মন দেয়। ‘কিলিং কমেনডেটর’ ছবিটিতে দেখা যায় একজন মেনশিকি নামের রহস্যময় ধনকুবেরের ছবি যিনি আশেপাশেই কোথাও থাকেন। তার চুল উজ্জ্বল সাদা এবং খুব সুন্দর হাসি তার মুখে লেগে থাকে। শিল্পী মনে করেন, ‘বাক্সে লুকিয়ে রাখা একটি রহস্যময় অথাব মাটিতে পুঁতে রাখা কোনো গোপন বস্তুর মতো সে লোকটি।’

এই রহস্যের খেলা মুরাকামি খেলতে ভালোবাসেন। তাঁর প্রতিটা উপন্যাসেই রয়েছে সেই একই ধারা। পুরাতন হারিয়ে যাওয়া দুষ্প্রাপ্য কোনো বিষয়কে নিয়ে তিনি সহজেই পাঠকের আত্মায় তুলে আনতে পারেন। এই জাদুময় ভ্রমণ আমরা দেখতে পাই তার প্রথম দিকের উপন্যাস ‘দ্য উইন্ড-আপ বার্ড ক্রনিকল’-এও। কিছু অবাস্তব এবং অদেখা সৃষ্টি তার উপন্যাসে আসবেই। মানুষের মতো উচ্চতায় একটি বড় ব্যাঙের কথা মনে আছে নিশ্চয়ই! ছোটগল্প ‘সুপার-ফ্রগ সেভস টোকিও’। ব্যাঙটি চা বানাতে পারতো। সবদিক বিবেচনায় ‘কিলিং কমেনডেটর’ বর্তমান জাগতিক জীবন এবং কল্পনার জগতকে ব্যালান্স করা জাদুবাস্তবতায় ভরপুর একটি উপন্যাস। উপন্যাসটি পাঠককে অন্য এক জগতে নিয়ে যেতে বাধ্য করে যখন মুরাকামি তার উপন্যাসে চিত্র সম্পর্কে বলেন, ÔAn image of a color I should add came to me… the color was like that of a tree with its green leaves dully dyed by rain. I mixed several colors together and created what I wanted… even if it doesn’t turn out as a portrait, I told myself, that was okay… I could think about the next step later on… like a child, not watching his step, chasing some unusual butterfly… I don’t remember how much time passed. By the time I looked around, the room had gotten dim.Õ

এই নিয়ে পাঠকের মনে যে একটা সংঘাত বাধতে পারে তাও কিন্তু উড়িয়ে দেয়া যায় না! বাস্তবত জগৎ বনাম জাদুবাস্তবতার জগৎ। দুই জগতে পা ফেলে পাঠকের হজম করার শক্তি কতটুকু থাকা উচিত সে নিয়েও প্রশ্ন আসতে পারে। আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি। তারপর আবিষ্কার করলেন আকাশ থেকে বৃষ্টির পানির সাথে পড়ছে মাছ। মাছে ভরে যাচ্ছে গ্রাম, প্রান্ত শহর। তবে মুরাকামির পক্ষেই সেটি সম্ভব কারণ সেখানে তিনি শিল্পকে অসাধারণ নিখুঁত বুননে তুলে নিয়ে আসেন। তার উপন্যাসের অদৃশ্য অন্তরালে বয়ে চলে যৌনতা, বৃষ্টি, সাঁতার, পাস্তা, জাজ সংগীতের মূর্ছনা। তিনি পাঠককে বাস্তব দুনিয়ায় খানিক ঘুরিয়ে এনে অবাস্তব আরেক দুনিয়ায় গোলক ধাঁধায় ফেলে দেন। তখন পাঠককে সাহসের উপর ভর করতে হয়, অজানা জগতকে আবিষ্কারের জন্য পাঠক তখন তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। ‘কিলিং কমেনডেটর’-এ মুরাকামি নিজেই সে কথা বলেছেন।

the courage not to fear a change in one’s lifestyle, the importance of having time on your side.

প্রচ্ছদ রাজিব রায়