ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সি ‘র’, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আই এস আই– এই দুয়ের মধ্যে স্পাই লড়াইয়ের কথা সবারই জানা। সেই র-এর সাবেক প্রধান অমরজিত সিং দুলাত বা এ এস দুলাত আর আইএসআই-এর সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ আসাদ দুররানি মুখোমুখি আড্ডায় তুলে এনেছেন দুই দেশের নানা নীতি–কৌশল আর দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইস্যু। আড্ডায় সূত্রধর ছিলেন সাংবাদিক আদিত্য সিনহা। ২০১৮ সালে এসব আলাপ নিয়েই প্রকাশিত হয় সাড়া জাগানো বই ‘দ্যা স্পাই ক্রনিকলস: র আইএসআই অ্যান্ড দ্য ইলিউশন অব পিচ’। আফগানিস্তান নিয়ে সাবেক দুই স্পাই মাস্টারের দুর্দান্ত সব কথা আছে এতে। মূল অধ্যায়টির শিরোনাম ‘আফগানিস্তানে স্বার্থপর স্বার্থ’। উত্তরকালের পাঠকদের জন্য সমসাময়িক বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব বিবেচনায় অধ্যায়টি তিন পর্বে পৃথক শিরোনাম দিয়ে অনুবাদ করা হলো।

আদিত্য সিনহা: আফগানিস্তান কি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধির ক্ষেত্র হতে পারতো?

আসাদ দুররানি: একসময় আমি বিশ্বাস করতাম যে, যদি এমন কোনো এলাকা থাকে যেখানে উভয় দেশ অর্থবহভাবে সহযোগিতা করতে পারে, তাহলে তা আফগানিস্তান। এটা কেন হচ্ছে না? এর অন্যতম কারণ মানসিক।

এ.এস. দুলাত:আহমেদ রশিদ বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তান যদি আফগানিস্তানের সমস্যার সমাধান করতে পারে, তাহলে কাশ্মীর সহজ হবে।

আফগানিস্তান নিয়ে আমাদের নীতি আমাকে কৌতূহলী করে তোলে। আমি যখন চাকরিতে ছিলাম তখন মনে হয়েছিল যে আমরা আমাদের বেশিরভাগ ডিম নর্দার্ন অ্যালায়েন্সের ঝুড়িতে রেখেছি। নর্দার্ন অ্যালায়েন্স, রাশিয়া, ইরান, আমরা যা কিছু করছিলাম তাতে তারা সহযোগিতা করছিল। এখন নর্দার্ন অ্যালায়েন্স আর অবশিষ্ট নেই। রুশ এবং ইরানীরা এখনও আশেপাশে রয়েছে, কিন্তু তাদের সাথেও আমাদের সঠিক সংযোগ নেই।

প্রধান দল তালিবানরা আলোচনায় জড়িত না হলে আফগানিস্তানে অবিরাম গৃহযুদ্ধ চলতে থাকবে। আলোচনা অপরিহার্য। এমনকি মাকির্নরাও এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এসেছে।

এই প্রক্রিয়ার প্রভাবক হিসেবে আমরা বাদ পড়েছিলাম কারণ যখন তালিবানরা ক্ষমতায় ছিল, তখন আমরা তাদের স্বীকৃতি দিইনি এবং তারপরে আবার ২০০১ বা ২০০২ সালে একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছি। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের যে প্রভাব আছে তা আমাদের কখনোই থাকবে না, কারণ পাকিস্তান সে কাজটি করেছে। যদি আফগানিস্তানের তালিবান এবং অন্যান্য নেতাদের সাথে আমাদের যোগাযোগ থাকত, তাহলে এটি সাহায্য করত।

এমনকি আমেরিকানরাও একমত যে পাকিস্তান এই আলোচনার মূল চাবিকাঠি। পাকিস্তান ছাড়া এটা ঘটবে না বা অগ্রগতি হবে না। কারণ মূল খেলোয়াড়রা আপনার সাথে রয়েছে এবং তাই বাজির তাসগুলো আপনি নিয়ে বসে আছেন।

আমরা কেন আফগানিস্তানে পরস্পরের মুখোমুখি হচ্ছি? আমরা কেন সহযোগিতা করছি না?

আমি পরিষ্কার যে আমরা যতটা করেছি বা বিনিয়োগ করেছি, তারপরেও আমরা অনেকটা ঠুঁটো জগন্নাথ এবং সেজন্য আমাদের একসাথে কাজ করা অর্থবহ। ছোট ভাই যদি খেলায় অধিক সক্রিয় থাকে, তাহলে আমি কেন আমার ছোট ভাইয়ের কাছে তা স্বীকার করব না? চলুন, এগিয়ে যাওয়া যাক।

দুররানি: আমাদের ঘরের উঠোনকে ভারতীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে চাওয়ার জন্য যা কিছু করি তা নিয়ে আমাদের বারবার দায়ী করা হয়। আমি জানি যে ভারতীয়দের প্রভাব রয়েছে, তাদের সাংস্কৃতিক প্রভাব দুর্দান্ত। ভারতীয়দের বাইরে রাখার জন্য যে আমরা খেলাটি খেলছি তা ভাবা বুদ্ধিমানের নয়। যদিও যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ এতে বিশ্বাস করে।

মূল বিষয়টি হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র- তার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে চায় যে আমরা তালিবান এবং হাক্কানি নেটওয়ার্কের পিছনে লেগে থাকি, যারা মার্কিনদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে— তাদের মতে—’বিদেশি দখল’ হটাতে। সমস্যা হচ্ছে, আমরা যদি পারতামও, যদি বিদ্রোহীরা পাকিস্তানি ভূখণ্ডে থাকত- ২০০৪ সালে যখন আমরা প্রথম আমাদের উপজাতীয় এলাকায় সামরিক বাহিনীকে নিযুক্ত করেছিলাম, যার ফলে টিটিপি গঠন করা হয়েছিল, তার চেয়ে এটি আরও বড় বিপর্যয় হতো। আমাদের উপজাতিদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মধ্যে আমেরিকান দখলপ্রতিরোধকারীদের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে।তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে, আমরা কেবল আমাদের নিজেদের আরও কিছু লোককে আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারি না, যাদের বেশিরভাগ কখনও আমাদের ক্ষতি করেনি।

২০০১ সালে যখন আমরা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছিলাম তখন তারা ক্ষুব্ধ ছিলো, কিন্তু তারা আমাদের অসহায় বাধ্যবাধকতা বুঝতে পেরে সেই ঘটনা ভুলে যেতে প্রস্তুত। এই চাপের পরেও কয়েক বছর পাকিস্তান যথাসাধ্য সহায়তার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এটা সেই মূলধন, যা হারালে আপনি আর পুনরুদ্ধার করতে পারবেন না। আমরা এখনও সেই ২০০৪ সালের চাপ উৎরাতে পারিনি।

এমন চলতে থাকলে ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র যা করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতি আমরা নিজেরাই নিজেদের করবো।

আফগানিস্তানে বলিউডের প্রভাব অসাধারণ। বলিউডের কারণে কেউ কেউ আমার ভাষায় কথা বলেন। আজিজ খান এবং আমি ২০১৫ সালে যখন হেরাত ছিলাম, তখন দশ বছরের একটি মেয়ে আমাদের উর্দুতে কথা বলতে শুনেছিল, তাই সে ঘুরে দাঁড়াল এবং দুই হাতের তালু একসাথে করে সম্ভাষণের ভঙ্গি করলো। আমি বললাম, কিঁউ ভাই, কাঁহা সে শিখা (কী রে ভাই, কোত্থেকে শিখলে)? সে জবাব দিলো, টিভি পার দেখতি হে না (টিভিতে দেখ না বুঝি)?

আপনি ঠিকই বলেছেন, আমাদের দাপট আছে। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান খোদাপ্রদত্ত। পাকিস্তান হলো আফগানদের কৌশলগত গভীরতা, এমনকি যারা আমাদের পছন্দ করে না তাদের কাছেও।

এখানেই আফগানরা এসে কাজ খুঁজে পায়। করাচি বহু বছর ধরে বিশ্বের বৃহত্তম পশতুন শহর ছিল এবং এখন সম্ভবত ২.৫ মিলিয়ন পশতুন নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম ‘আফগান’ শহর। তারা আসে এবং যায়। যারা সকালে পাকিদের ধোলাই করেন, সন্ধ্যায় তারাই পেশোয়ারে দাঁতের ডাক্তার বা ব্যবসা বা পরিবারের জন্য থাকেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আমাদের বলেছে যে তাদের ট্যাঙ্কিভরা জ্বালানিসহ গোছগাছ করা গাড়ি আছে আর মাঝেমধ্যে ব্যাটারিটাকে জীবিত রাখতে ইঞ্জিন চালু করে। তারা বলে, ‘এখানে যদি কিছু ঘটে তাহলে যাতে পেশোয়ারে যেতে পারি এটা সে জন্য’। উত্তরে এমন একটি হাসপাতাল আছে যেগুলোতে আফগানদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। যারা সামর্থ্য রাখে তারা পেশোয়ারে আসে কারণ তারা সেখানকার হাসপাতালগুলোকে বেশি বিশ্বাস করে।

আসলাম বেগ যখন বলেছিলেন যে পাকিস্তান কৌশলগত গভীরতা দেয়, তখন তিনি সামরিকভাবে এটি বোঝাতে চেয়েছিলেন। যেমন আমরা ইরানকে একটি মুক্ত অঞ্চল হিসেবে বলতাম, যেভাবে আমরা ভারতীয় হামলার ক্ষেত্রে আমাদের বিমান বাহিনীকে ইরানে সরিয়ে নেব ভাবতাম, যেমনটি ইরাকীরা ১৯৯১ সালের যুদ্ধে করেছিল। মানুষ ভেবেছিল সে আফগানিস্তান দখল করতে চায়। দেখুন যে শক্তিশালী বাহিনী চেষ্টা করেছিল তাদের কী হয়েছিল পাকিস্তান এমনটা ভাবলেও বোকামি করবে।

আমরা মজা করে বলি, আমরা এখন জানি ভারতের সাথে কী করতে হবে। যদি ভারতীয় সেনাবাহিনী আক্রমণ করে, আমরা পথ থেকে সরে যাব এবং তাদের আফগানিস্তানের দিকে অগ্রসর হতে দেব, কারণ এখানেই সমস্ত বড় সেনাবাহিনীকে কবর দেওয়া হয়।

চিরায়ত কৌশলগত গভীরতা হল যে যখনই আফগানরা বিদেশি সেনা দ্বারা আক্রান্ত হয়, তারা পাকিস্তানে আসে। তারা থাকতে থাকে, কাজ করে, শোষিত হয়। এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঘটেছে; এমনকি আমার নিজের গোষ্ঠী দেড়শ বছর আগে সেখান থেকে এসেছিল, একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে কাশ্মীরে গিয়েছিল এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত চলে যায়।

কাজেই এটা সত্য নয় যে, পাকিস্তানের আফগান নীতি স্রেফ ভারতকেন্দ্রিক। আফগান পরিস্থিতির জটিলতা এমন যে আমি প্রতি ছয় মাসে আমার জ্ঞান এবং মূল্যায়ন পুনর্বিবেচনা করতে থাকি।

দুলাত: কেন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি হঠাৎ পাকিস্তানের প্রতি বৈরী হয়ে উঠলেন?

দুররানি: তিনি সবসময় বৈরী ছিলেন। তার সমস্যা, তিনি একজন আমদানিকৃত ও চাপিয়ে দেওয়া প্রেসিডেন্ট যিনি ঝানু পোলাপানদের দ্বারা বেষ্টিত যারা পশ্চিমা শিক্ষিত এবং উচ্চাভিলাষী, যারা আফগানিস্তানেই নেই আবার তাদের কোনো জনভিত্তি বা শক্ত ভিতও নেই।

এই সরকার মার্কিন সামরিক, আর্থিক এবং রাজনৈতিক সহায়তা ছাড়া নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে না। অন্যদিকে, তালিবান ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জোটকে প্রতিরোধ করেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং আন্ত-আফগান বন্দোবস্ত তাদের নিয়েই হবে। কেউ তালিবানদের সাথে কথা বলতে পারে, যেমন দোহায় এবং গত বছর মুরিতে দুই দফায় হয়েছে। আশ্চর্যের কিছু নেই যে আমেরিকানরা এবং কাবুল শাসকরা দ্বিতীয় দফা মুরি বৈঠককে বাতিল করে দিয়েছে।

দুলাত: যেমনটা আপনি বলেছিলেন, আশরাফ গনি নিজে পাকিস্তানি সেনা সদরে (জিএইচকিউ) ক্র্যাশল্যান্ড করেছেন?

দুররানি: এটি ছিল একটি অচল চালাকি। আমি ভেবেছিলাম, হা খোদা, এই মানুষটি দরিদ্র রাহিল শরীফের জন্য একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, একজন সাধারণ সৈনিক, যা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। কিছু পাকিস্তানি এতই বোকা যে তারা আশরাফ গনিকে সাহসী মনে করত কারণ সে জিএইচকিউ-এর গেটে নক করেছিল।

সর্বোপরি, আশরাফ গনির আগে অন্যরা আফগানিস্তান শাসন করেছে, এমনকি সোভিয়েত যাদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, তারা দাউদ হোক, হাফিজুল্লাহ আমিন হোক বা তারাকিরা হোক, যখনই মস্কো তাদের পাকিস্তানকে টাইট দিতে বলেছে, তারা অনিচ্ছা দেখিয়েছে, এবং তাদের কেউ কেউ পদ হারিয়েছেন, কেউবা মুণ্ডুটাই। আশরাফ গনি তেমন না। তিনি অমৃতসরে আমাদের নিয়ে কী বাজেভাবেই না কথা বলেছেন।

কারজাইয়ের& চেয়ে আশরাফ গনি পাকিস্তানের জন্য বেশি ক্ষতিকর। অন্তত কারজাই, যার প্রতি আমার সহানুভূতি এবং প্রশংসা আছে, তার পা মাটিতে ছিল এবং এসব খেলা খেলতে জানতেন। এমনকি তিনি আমেরিকানদের বলার সাহসও পেয়েছিলেন যে তিনি তাদের সম্পর্কে কী ভাবেন। যদিও তিনি ১৩ বছর রাষ্ট্রপতি থাকাকালে মার্কিন অর্থ এবং নিরাপত্তার উপর নির্ভরশীল ছিলেন। আজকাল তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আইএস জন্ম দেয়া ও সমর্থন করার অভিযোগও করেন।

পরের পর্বে: আফগানিস্তান নিয়ে স্বার্থপর স্বার্থ