grand river view

।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

ঠিক যেন আরেক রওশন। রওশনকে মনে আছে তো? ওই যে কাজী আরেফ হত্যামামলার ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী, যে কি না দুই দশক রাজশাহীতে লুকিয়ে ছিলো নাম ভাঁড়িয়ে! হত্যার পর পলাতক। পরিচয় গোপন করতে পাল্টেছেন নাম। নতুন নামে করেছেন জাতীয় পরিচয়পত্র। এক যুগ ধরে অবস্থান করছেন রাজশাহী নগরীর উপকণ্ঠে। তার বিরুদ্ধে রয়েছে যাবজ্জীবন সাজার আদেশ। শেষ রক্ষা হয়নি তারও। দীর্ঘদিনের তৎপরতায় রওশনের মতই র‌্যাব তাকেও গ্রেফতার করেছে।

যার কথা বলছি তার আসল নাম মানিক। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার বানিয়াপাড়া মৃত খান শরিফ উদ্দিন এর পুত্র। ২০০৯ সালে কুমারখালী থানার কয়া ইউপি চেয়ারম্যান জামিল হোসেন বাচ্চু হত্যাকান্ডের পর থেকেই নিরুদ্দেশ।

যেভাবে গ্রেফতার

র‌্যাব জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজশাহী নগরীর উপকন্ঠে পারিলা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষ্টগঞ্জ এলাকায় র‌্যাব-৫ নাটোর ক্যাম্প এবং র‌্যাব-১২ কুষ্টিয়া ক্যাম্পের সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে মানিককে গ্রেফতার করে। মানিক কয়া ইউপি চেয়ারম্যান জামিল হোসেন বাচ্চু হত্যা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী।

র‌্যাব-৫ এর নাটোর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো.সানরিয়া চৌধুরী জানান, র‌্যাব হেডকোয়ার্টার এর গোয়েন্দা বিভাগ থেকে তথ্য পেয়ে অভিযান চালানো হয়। তাকে কৃষ্টগঞ্জ এর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পরিচয় পাল্টে বসতি

রওশন এর মতই পরিচয় পাল্টে প্রায় ১২ বছর রাজশাহীতে বসবাস করছিলো মানিক। র‌্যাবের ভাষ্যমতে, চেয়ারম্যান বাচ্চু হত্যার পরপরই নিরুদ্দেশ হয় মানিক। এরপর অনেকটাই ভবঘুরে হয়ে ঘুরে বেড়ান। পরে স্থায়ী হন রাজশাহীতে। পাল্টে ফেলেন নাম। মানিক থেকে হয়ে যান রকিব উদ্দিন। জাতীয় পরিচয় তৈরী করেনও রকিব উদ্দিন নামে। জমি কিনে করেন বাড়ি। রাজশাহীতে বসবাস করতেন স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েকে নিয়ে।

র‌্যাব জানান, যখন গ্রেফতার করা হয় তখন তার বাড়িতে স্ত্রী ও মেয়ে ছিল। মানিক জানিয়েছেন তার ছেলে রয়েছে, সে ঢাকায় চাকুরী করেন।

‌র‌্যাব-৫ এর নাটোর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. সানরিয়া চৌধুরী জানান, তার নাম নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। রকিব না কবীর এ নিয়ে ধ্বন্দে পড়েছিল আভিযানিক সদস্যরা। তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্রে ছবি থাকায় চিনতে সমস্যা হয়নি।

চেয়ারম্যান জামিল হোসেন বাচ্চু হত্যাকাণ্ড

২০০৯ সালের ২৫ জুলাই বিকেলে ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে কুমারখালির মনোহরপুর গ্রামের হাতির সাঁকো রেললাইন এলাকায় সশস্ত্র ব্যক্তিরা জামিল হোসেনের মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। পরে হত্যাকারীরা মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরদিন জামিলের ভাই জিয়াউল ইসলাম ওরফে স্বপন বাদী হয়ে কুমারখালী থানায় মামলা করেন। পুলিশ তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৭ সেপ্টেস্বর ৩৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় ।মামলাটি চাঞ্চল্যকর হওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে ২০১৩ সালে ১৬ জুলাই কুষ্টিয়া আদালত থেকে খুলনা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হয়।মামলার বিচার শেষে বিজ্ঞ খুলনা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আদালত মানিকসহ ১২জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রত্যেককে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে আরো ৬ মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেন। এই মামলার শুরু থেকেই মানিক পলাতক ছিলেন।

রওশন ও মানিকের পর আরও কেউ?

হত্যার মত অপরাধ করে একইভাবে নাম পরিচয় পাল্টে দীর্ঘ দিন রাজশাহীতে অবস্থান করলেও রওশন ও মানিকের মধ্যে কোন যোগসুত্র ছিল না বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাবের ভাষ্যমতে, রওশন ও মানিক দু’জনই হত্যার মত ঘটনায় অভিযুক্ত। তাদের বাড়ি একই অঞ্চলে অর্থাৎ মানিকের বাড়ি কুষ্টিয়া এবং রওশনের বাড়ি মেহেরপুর। তারা দীর্ঘদিন রাজশাহীতে বসতি গড়েছেন। এসব কারণে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাটি দু’জনের সকল তথ্য উপাত্ত খতিয়ে দেখেছে।  

‌র‌্যাব-৫ এর নাটোর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. সানরিয়া চৌধুরী বলেন, এরকম আরও কোন অপরাধী লুকিয়ে আছে কি না সেটিও তারা পর্যবেক্ষন করছেন।

আশ্রয়স্থল কেন রাজশাহী?

র‌্যাব-৫ রাজশাহীর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. জিয়াউর রহমান তালুকদার বলেন, যে সময় তারা এ অঞ্চলে এসছিল তখন রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ছিল দেশের অন্যান্য এলাকার তুলনায় অপেক্ষাকৃত অনুন্নত। ফলে এদিকে সামাজিক সুবিধা বঞ্চিত জনগণের বসবাস অপেক্ষাকৃত বেশী ছিল। এতে খুব সহজেই তারা শেল্টার পেয়েছে। অন্যদিকে সেময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে দক্ষ জনবল,উন্নত প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক সরঞ্জামাদি ছিল না যাতে খুব সহজেই পরিচয় লুকিয়ে ফেলতে পেরেছে।

তিনি আরও জানান, ঢাকা কিম্বা গাজীপুর এর মত এলাকায় অনেক বেশী অপরাধের ঘটনা ঘটে। এতে যেটি হয়, সেখানকার সাধারণ মানুষ এবং প্রশাসন অনেক বেশী সচেতন থাকে ও খোঁজখবর রাখে।কিন্তু এখানকার পরিস্থিতি পুরোটাই ভিন্ন। এটি একটি বড় কারণ।

অপরাধবিজ্ঞান সমাজবিজ্ঞান পঠন-পাঠনের একটি অংশ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শফিকুজ্জামান জোয়ার্দ্দার বলেন, চরমপন্থী দলগুলোর মধ্যে পারষ্পারিক যোগাযোগ এবং ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি যোগসুত্র এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় বসতি বা শেল্টার গড়তে বড় ভুমিকা পালন করে। যেহেতু দক্ষিনপশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের অনেকগুলো চরমপন্থা দল ছিল সেকারণে কুষ্টিয়া কিম্বা মেহেরপুর থেকে এ অঞ্চলে এসে বসতি গড়ার প্রবণতা বা পারষ্পারিক সহযোগিতা থাকার সম্ভাবনা বেশী।

তিনি জানান, তৎকালীন সময় পলাতক ব্যক্তিদের ধরতে বা খুঁজে বের করতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বা নির্দেশনার মত প্রশাসনিক দূর্বলতা,গোয়েন্দা কার্যক্রমের বিস্তার ও আধুনিকায়নের অভাব এ অঞ্চলে আসতে অপরাধীদের উদ্ধুদ্ধ করেছিল।

শফিকুজ্জামান জোয়ার্দ্দার জানান, সঠিক যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার অভাবে পরিচয় গোপন করা এটি শুধু এ অঞ্চলের নয় সারা দেশের সম্যসা। অপরাধীরা দুর্বল প্রক্রিযার সুযোগ গ্রহন করেছে মাত্র।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি পরিচয় গোপন করে ২০ বছর রাজশাহীতে অবস্থান করা চরমপন্থী নেতা রওশন ওরফে উদয় মণ্ডল ওরফে আলীকে রাজশাহী মহানগরীর ডাঙ্গিপাড়া থেকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে পরপর ৫টি হত্যার ঘটনা ঘটান রওশন।এরপর থেকে পলাতক ছিলেন। দুটি মামলায় ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত রওশনের বিরুদ্ধে আরও তিনটি হত্যা মামলা চলমান।