grand river view

।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

বিকাশে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে গিয়েই ধরা পড়েন পরিচয় গোপন করে ২০ বছর রাজশাহীতে অবস্থান করা চরমপন্থি নেতা রওশন। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক জাসদ নেতা কাজী আরেফ হত্যামামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী তিনি। এই দীর্ঘ সময় নাম ভাঁড়িয়ে তিনি উদয় মণ্ডল ওরফে আলী নামে পরিচিত ছিলেন এলাকায়। সম্প্রতি রাজশাহী মহানগরীর ভাড়ালীপাড়া থেকে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ১৯৯৯ ও ২০০০ সালে পরপর ৫টি হত্যার ঘটনা ঘটান রওশন। এরপর ওই অঞ্চলে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা শুরু হলে রাজশাহী অঞ্চলে আনাগোনা শুরু হয় তার। বিশেষ করে আইনশৃংখলা রক্ষাকারীবাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে চরমপন্থিদের মৃত্যু বাড়লে তিনি রাজশাহীতে স্থায়ী হন।

যেভাবে ধরা

২০০০ সালের পর থেকেই আইনশৃংখলা রক্ষাকারীবাহিনী হন্যে হয়ে খুঁজে আসছে রওশনকে। বিশেষ করে ২০০৪ সালে র‌্যাব গঠনের পরপরই রওশনকে খুঁজতে নানা উদ্যোগ গ্রহন করে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাটি। কিন্তু কোনোভাবেই কূল কিনারা করে উঠতে পারছিলো না।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রচেষ্টায় গোয়েন্দাদের প্রথম সাফল্য আসে গত বছরের শেষ দিকে। রওশন এক আত্মীয়ের সাথে যোগাযোগ করলে গ্রামীণফোনের একটি নম্বর পান গোয়েন্দা সদস্যরা। কিন্তু সেই নম্বরটি ছিল বন্ধ। সিম ক্রয়ে দেয়া তথ্যও ছিল ভুয়া। এরপর গোয়েন্দা সদস্যরা ফোন নম্বরটি সচল হওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। দীর্ঘ আট মাস পর গত ২ আগস্ট ফোন নম্বরটি সচল হয়। র‌্যাব জানতে পারে, ওই নম্বর থেকে বিকাশের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এরপর ওই মিটার নম্বর-এর সূত্র ধরে গ্রাহক আর বাড়ির ঠিকানা বের হয়। অবশেষে গত বুধবার রাতে র‌্যাব-৫ এর সদস্যরা তাকে গ্রেফতার করে।

একটি সূত্র জানায়, গ্রেফতারের সময় ধন্দে পড়ে যায় র‌্যাব। কারণ তার জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম উদয় মণ্ডল। এলাকায় পরিচিতি আলী নামে। অবশ্য একটু জোরাজুরিতে রওশন স্বীকার করেন, যাকে বছরের পর বছর ধরে হন্যে হয়ে খুঁজছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, তিনি সেই রওশন।

র‌্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রওশন এতটাই ধুরন্ধর ছিলেন যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানাভাবে চেষ্টার পরও তার হদিসই পায়নি। রওশনের বিষয়গুলো তার স্ত্রী সবটাই জানতেন। তবে তার ছেলেমেয়েরা কিছুই জানত না।

দুর্ধর্ষ খুনি রওশন

কুষ্টিয়া জেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার পশ্চিমে এবং দৌলতপুর থানা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে কাঁচা রাস্তা ধরে এগুলে গ্রামের শেষ প্রান্তে কালীদাসপুর বাজার। বাজারের পাশেই প্রাইমারি স্কুল।

১৯৯৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টা ২৩ মিনিট। পাঁচজন বক্তার পর মাইক্রোফোনের সামনে উঠে দাঁড়ান জনসভার প্রধান অতিথি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কাজী আরেফ আহমেদ। বক্তৃতা শুরু করে বলেন, সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

ঠিক সেসময় সশস্ত্র ঘাতক দল অস্ত্র উঁচিয়ে আসে সভা মঞ্চের সামনে। মাথায় লাল গামছা বাধা নেতা চিৎকার করে বলে ‘কেউ নড়াচড়া করবি না।’ জনসভায় আগত হাজার দেড়েক মানুষ বন্দুক দেখে ভয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। সবার নড়াচড়া ও কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। আড়িয়া ইউপি সদস্য আজিবর রহমান দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে বন্দুকধারীরা প্রথমে তাকে গুলি ছুঁড়ে মাটিতে শুইয়ে দেয়। এরপর আরো কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে সভা মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। মঞ্চে উপবিষ্ট সবার নাম জানতে চায় দুর্বৃত্তরা। কৃষক শমসের মণ্ডল মঞ্চ থেকে চলে যেতে চাইলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে জাসদ নেতা লোকমান হোসেন, ইয়াকুব আলী ও ইসরাইল হোসেনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

জাসদ নেতা কাজী আরেফ আহেমদ তখনও মঞ্চের মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানো। তিনি হাত জোড় করে বলছেন, আমার লোকদের এভাবে হত্যা করো না।

ঘাতক দলের লিডার এবার কাজী আরেফ আহমেদের দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে, ‘তোর নাম কী?’ কাজী আরেফ তখন নিজের নাম বললে কিলিং স্কোয়াডের নেতা বলে, ‘তোকেই তো খুঁজছি।’ সঙ্গে সঙ্গে দুজন ঘাতক কাজী আরেফ আহমেদকে লক্ষ্য করে গুলি বর্ষণ করে। মঞ্চের উপরেই তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন। কাজী আরেফ আহমেদসহ পাঁচজনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ঘাতক দল সমাবেশস্থল থেকে তিনটি মোটর সাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে তাতে চড়ে চলে যায়। পেছনে ফেলে যায় ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল।

হত্যাকাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড ও ঘাতকদের অন্যতম ছিল লাল্টু বাহিনীর নুরুজ্জামান লাল্টু, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মান্নান বাহিনী হিসেবে পরিচিত পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির মান্নান মোল্লা এবং মেহেরপুরের রওশন।

হত্যাকাণ্ডের পর দৌলতপুর থানায় মামলা হয়। ওই মামলায় বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের ৯ আসামির ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের রিভিউ আবেদনও খারিজ হয়। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইলেও তা নাকচ হয়। ২০১৬ সালের ৮ জানুয়ারি তিন আসামির ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়। একজন আসামি কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অপর পাঁচ আসামি দীর্ঘদিন ধরে পলাতক। সেই পলাতকদের একজন রওশন। পলাতক বাকি ৪ জন মান্নান মোল্লা, জালাল উদ্দিন ওরফে বাশার, বাকের ও জীবন।

আরো চার হত্যা

১৯৯৯ সালের ১৩ এপ্রিল চেয়ারম্যান আব্দুল বাকীকে মেহেরপুর-কুষ্টিয়া মহাসড়কের তেরাইল কলেজ সংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে রওশন। ঘটনাস্থলে চেয়ারম্যান বাকী নিহত হন এবং তার ছেলে আবদুল্লাহ গুরুতর আহত হন। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষে রওশন আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

২০০০ সালে ২১ জুন স্কুল শিক্ষক আমজাদ হত্যা মামলার ১ নম্বর চার্জশিটভুক্ত পলাতক আসামি রওশন।

২০০০ সালে মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার নিজ গ্রাম ভবানীপুরের রওশন নিজ গ্রামের আলমগীর হুজুর ওরফে আলমগীরকে হত্যা করে। ওই হত্যা মামলার ১ নম্বর আসামী। মামলাটি বিচারাধীন।

একই বছর নিজ গ্রাম ভবানীপুরের নবীর হত্যা মামলার মুল অভিযুক্ত রওশন। মামলাটি আজও নিষ্পত্তি হয়নি। ২০০৫ সালে গাংনী থানায় দায়েরকৃত একটি ডাকাতি মামলাও রয়েছে রওশনের বিরুদ্ধে।

আসল রওশন

রওশনের বাড়ি মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে। ছোট বেলা থেকেই ধুরন্ধর ও ডানপিটে। রাজবাড়ীর একটি কলেজ থেকে বিএ পাস করে। ১৯৯২ সাল থেকে সীমান্তে চোরাচালান, হাট ইজারাসহ বিভিন্ন ঠিকাদরি নিয়ন্ত্রণের কাজে জড়িয়ে পড়ে। এর সুত্র ধরেই যোগাযোগ হয় চরমপন্থি দলের সাথে। পরে ঘনিষ্ট হন চরমপন্থী নেতা মান্নান মোল্লার। তৈরি হয় সখ্য। জড়িয়ে পড়েন হত্যা ও ডাকাতির সাথে।