grand river view

‘রাইফেল, রোটি, আওরাত’ উপন্যাসটির রচনাকাল ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে জুন এর মধ্যে। এর লেখক শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশার জন্ম ১৫ এপ্রিল, ১৯২৮ এবং মৃত্যু ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। ১৯৪৭ সালের তথাকথিত স্বাধীনতা লাভের পর তৎকালীন পূর্ববাংলা পরে পূর্বপাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশ যে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শাসনের নামে শোষণের শিকার হয়েছিল, শিকার হয়েছিল ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের তার সাক্ষ্যপ্রমাণ এই লেখাটি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ক্ষমতালোলুপ হায়েনার দল নিরাপরাধ, নিরস্ত্র, ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে হত্যার ষড়যন্ত্রের নীলনকশা প্রণয়ন করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। সেই রাতে ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল মানবতা আর বুটের তলায় থেঁতলে গিয়েছিল শ্যামল বাংলা। নিজভূমে পরবাসী সাড়ে সাত কোটি বাঙালি। লেখক আনোয়ার পাশা সেই রুদ্ধশ্বাসে ভরা ভয়ংকর দিনগুলিতে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যোদ্ধার মতো কলম চালিয়ে লিখে রেখে গেছেন এই কালজয়ী উপন্যাস। এমন যুদ্ধোপন্যাস সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল। জীবন ও মৃত্যুর ব্যাখ্যাটাই ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয় এখানে:

“…অনেকেই যে বেঁচে আছেন সেটা সুদীপ্তর কাছে পরম বিস্ময় ব’লে মনে হয়েছিল। অনেকে যাঁরা মরেছিলেন তাঁরা যেন খুব স্বাভাবিক একটা কর্ম করেছেন। অতএব সকলেই তাঁদের সম্পর্কে একটা অদ্ভুত অসাড়তা অনুভব করেছিলেন। কিন্তু জীবিতদের নিয়ে বিস্ময়ের অন্ত ছিল না।… সেই পঁচিশের রাত থেকে মৃত্যুটা কি কোনো সংবাদ? মৃত্যু এখন তো অতি সাধারণ অতি স্বাভাবিক আটপৌরে একটি ঘটনা মাত্র।”

কীভাবে ঐ রাতে মৃত্যু একটা আটপৌরে ঘটনা হয়ে উঠেছিল সেটা বোঝার জন্য উপন্যাসের আখ্যানের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক সুদীপ্ত শাহিন থাকেন ক্যাম্পাসের  আবাসিক এলাকায়। পঁচিশ ও ছাব্বিশ মার্চ ‘৭১ পাকবাহিনী পুরো ঢাকা শহরে যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চালায় তার একটা বিশ্লেষণধর্মী বর্ণনা রয়েছে সুদীপ্ত শাহিনের দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে। আবাসিক এলাকাতে সশস্ত্র পাকসেনারা ঢুকে শিক্ষকদের ওপর গুলি চালায়, আবাসিক হলগুলোতে ঢুকে ছাত্রদের হত্যা করে, ছাত্রীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়, লুটপাট করে। বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা-ভাবনার কেন্দ্রস্থলকে গুঁড়িয়ে দিতে আরও ধ্বংস করে পত্রিকা অফিস। বেছে বেছে শিকারে পরিণত করে শিক্ষক, ছাত্র, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিককর্মীদের। রেহাই পায় না বস্তিবাসী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এমনকি মসজিদের মোয়াজ্জিন, ইমামও। সুদীপ্ত শাহিন অন্ধকূপ থেকে বের হয়ে বন্ধু ফিরোজের বাসায় সপরিবার আশ্রয় নেয় আর পথের এসব দৃশ্য দেখে। কী বিভীষিকাময় সময়…! লেখকের দৃঢ় উচ্চারণ “বিশ্বাসকে কখনো মারা যায় না।” ঠিক তাই…। এজন্য সেদিন নিরস্ত্র জনতা মরতে মরতে বাঁচার মন্ত্র শিখেছিল, হয়ে উঠেছিল এক একটা মৃত্যুঞ্জয়ী বীরপুরুষ। সংশপ্তকের দৃঢ়তায় পৃথিবীর অন্যতম সেরা সামরিক বাহিনীর সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল। ছিনিয়ে এনেছিল পরমপ্রিয়, পরম আরাধ্য স্বাধীনতা। সেই রাতে রাজারবাগ পুলিশলাইনের বাঙালি সদস্যরা সর্বস্ব দিয়ে লড়েছিল শত্রুর বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ যে নবপ্রাণের সঞ্চার করেছিল জনমনে তারই প্রভাবে হয়তো সর্বস্তরের মানুষ এই লড়াইটাকে নিজের বলে ভাবতে শুরু করে। সুদীপ্ত শাহিন এক বন্ধুর বাড়ি থেকে আশ্রয়ের সন্ধানে স্ত্রীর খালার বাড়ি পুরোনো ঢাকায় গিয়ে দেখে তারা বুড়িগঙ্গা পার হয়ে জিঞ্জিরায় চলে গেছে। ছোট ছোট তিন সন্তানকে নিয়ে কারফিউ এর মধ্যে বিপদগ্রস্ত স্বামী-স্ত্রী খালার পাশের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে। আশ্রয় পেয়েও যায়।  ঐ বাড়ির মেয়ে বুলা যে একটা গোপন বিপ্লবী দলের সদস্য। এখন কাজ করছে দেশের জন্য। এখানকার কর্মযজ্ঞ অর্থাৎ যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি সুদীপ্তকে আশাবাদী করে তুলে। উপন্যাসের শেষটুকু এমন:

রাইফেল, রোটি, আওরাত বইয়ের প্রচ্ছদ ও লেখক আনোয়ার পাশা

“বাঙালির অস্ত্রের শক্তি আজ সীমিত হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার সম্পদ তো অফুরন্ত। সেই প্রীতি ভালোবাসার সঙ্গে এবার অস্ত্রের সম্মেলন হয়েছে—এবার বাঙালি দুর্জয়।… পুরোনো জীবনটা সেই পঁচিশের রাতেই লয় পেয়েছে। আহা তাই সত্য হোক। নতুন মানুষ, নতুন পরিচয় এবং নতুন একটি প্রভাত। সে আর কতো দূরে। বেশি দূর হ’তে পারে না। মাত্র এই রাতটুকু তো! মা ভৈঃ। কেটে যাবে।”

লেখকের এই বিশ্বাসটা অবাক হওয়ার মতো। বাঙালি তখন একতরফা মার খেয়ে যাচ্ছে পাকবাহিনীর কাছে। সবুজ-শ্যামল বাংলা বুটের তলায় পিষে গেছে। পথনির্দেশক নেতা শত্রুর কারাগারে অন্তরীণ। অথচ লেখক বলছেন মা ভৈ মানে ভয় নেই, রাত কেটে যাবে। রাত সত্যি কেটে গিয়ে বাংলাদেশে স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল আরো মাস ছয়েক পরে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বিনিময়ে দিতে হয়েছিল ত্রিশ লক্ষ তাজা প্রাণ, দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম। কিন্তু লেখক আনোয়ার পাশার সেটা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। যখন পাকবাহিনীর দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার অপপ্রয়াসে তালিকা করে বুদ্ধিজীবী নিধন শুরু করে। ১৪ ডিসেম্বর এই জাতি তাঁর মেধাবী সন্তানদের হারায় যাঁদের মধ্যে লেখকও ছিলেন। সৃষ্টিশীল মানুষরা অলৌকিক আনন্দের ভারে বিশেষ দৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে ওঠেন বলেই হয়তো অনেক দূর অবধি দেখতে পান। তাই তো রক্তগঙ্গায় হাবুডুবু খেতে খেতে লেখক মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন কিংবা বিশ্বাস করেছিলেন যে জাতি মরতে শিখেছে তাঁদের জয় নিশ্চিত।

এছাড়া এই উপন্যাসে পাকশাসনের ২৩ বছরের ইতিহাসকে বিভিন্ন প্রতীকী উপস্থাপনায় তুলে ধরা হয়েছে। ভাষা-আন্দোলন, ‘৬৫’র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, পাক সরকারের ধর্মের নামে গোঁড়ামিপূর্ণ আচরণ, এদেশীয় তোষামোদকারীদের পদলেহন প্রবণতা—এমন বহুবিধ বিষয় এসেছে। প্রসঙ্গক্রমে এসেছে, “হাজার মাইলের ব্যবধানে দুটি দেশকে সর্বাংশে এক ক’রে তোলার জন্য একটা দেশের আর্থনীতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে মুছে ফেলার চক্রান্ত তখন সবে শুরু করেছে মুসলিম লীগ সরকার।” এভাবে বাম সংগঠনগুলোর কথাও এসেছে। আর এসেছে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক মতাদর্শ ও দলের কার্যক্রমের কথা। “শেখ মুজিবুর রহমান—শুধুই একটি নাম তো নয়, তা যে বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক। এবং আনন্দময় জীবনেরও।” এই ভাবনায় সেদিন সকলে আস্থা রেখেছিল। পাক সরকারে ধর্মান্ধতা নিয়ে বলেন, “পাকিস্তানী মুসলমানের ঈমানের পাঁচ স্তম্ভ হচ্ছে—আল্লাহ, আল্লাহর রসুল, কায়েদে আযম, পাকিস্তান আর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী।” লেখক সুতীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গীতে পাকসেনাদের মানসিকতার স্বরূপ তুলে ধরেন এভাবে:

“হাত দেওয়া যায় রোটি ও রাইফেলে। আর আওরাতের গায়ে। দুনিয়ার সেরা চিজ আওরাত, আওর রাইফেল। রোটি খেয়ে গায়ের তাকাত বাড়াও, রাইফেল ধরে প্রতিপক্ষকে খতম কর, তারপর আওরাত নিয়ে ফূর্তি কর। ব্যাহ্, এহি জিন্দেগী হ্যায়। এই তো জীবন।”

বোদ্ধারা বলে থাকেন ঘটনা যখন ঘটে তখন সাথে সাথে বড় শিল্প তৈরি হয় না। কিন্তু এখানে যুদ্ধের ডামাডোলে বসে লেখক শিল্প তৈরি করেছেন। আবেগের পরিমিতিবোধ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও দু’এক জায়গায় অতিকথন গোচরীভূত হয়। আর আশ্চর্য হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে ওরকম একটা পরিস্থিতিতে জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে লেখক প্রজ্ঞাবান দার্শনিকের মতো পাকিস্তানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুচারু বিশ্লেষণ করেছেন। এবং লেখক এই সিদ্ধান্তে আসেন বাঙালিদের ঔদার্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিই পশ্চিমাদের ক্ষোভের কারণ আর তার সাথে যুক্ত হয়েছে পাকরক্তে মিশে যাওয়া ভারতবিদ্বেষ। আর তাইতো আবুল ফজল বলেন,”ঘটনাকে ছাড়িয়ে পৌঁছতে পেরেছেন ঘটনার মর্মলোকে।” বাঙালির অস্তিত্ব আর মর্যাদা রক্ষার লড়াই এর রক্তমাখা দিনগুলোর উপস্থাপন শহীদ বুদ্ধিজীবী লেখক আনোয়ার পাশার অনবদ্য সৃষ্টি ‘রাইফেল, রোটি, আওরাত’।

অলংকরণ শিবলী নোমান