grand river view

আভা

*

চুপ হয়ে থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হতো, তিনি খুঁজে পেয়েছেন অনঙ্গ কিছু।
তার ভ্রু শান্ত। চোখ স্থির। কালোত্তীর্ণ রচনার মতো সেঁটে আছেন জীবনের খাপে।

মওসুমের প্রথম বজ্রের মতে আচমকা কেশে উঠলেন তিনি।

খোসাটাই পড়ে রইল কেবল। ভেতরের সমস্ত আভা ছাই হয়ে গেল।
মনে হলো এক নৌযান তছনছ হয়ে পড়ে আছে ঝড়ের পরে।

তার দিকে তাকালাম। সেই চোখ আর নাই। কুঁচকানো ভ্রু। যেন কী খুঁজছে! কী খুঁজছে!

চিত্রলিপি

*

এই আলখাল্লার ভিতর রেখেছি যতœ করে একটা আদিম গোলাপ। তার রঙ মজে এলো। তাকে আমি আরেকটা আসন দিব, আমাদের দরবেশ মহলের পাশে। সে বসে রবে চির মোরাকাবায়।

বৃষ্টি পড়ার শব্দ টিপটিপ এই সুললিত বনে। সেই সুর থেকে খরিদ করি কান। কোনো ধ্রুপদের পাশে সামান্য খেয়ালের মতো—বাজে গহীন পাতারাও। ঘুমিয়ে কাটাই রাতের তারাটির মতো কোনো দীর্ঘ পার্বত্য পথে। যেন এলিয়ে পড়া নিখুঁত আরামে।

—শান্তির সময় একটা ধারণামাত্র। চিরদিনই ঝঞ্ঝার দিন। ভিতরে কয়লাপোড়ার আগুন! বাহিরে মিছা গুনগুন।

একদিন আকাশ লাল হল। বরফের চূড়া ভেঙে রোদ গড়িয়ে পড়ে জলে। আমরা তখন সমাবেত আরও বারুদ, আরও লাকড়ির খোঁজে অন্তর্গত গোপন আস্তানায়।—সেখানে থরথর ভোর।

আমাকে শামিল কর চূর্ণ কাচের সঙ্গীতে। চারপাশে রব ওঠাও। বাটিতে বৃষ্টি ফোঁটার নাচ। ফুটে ওঠা জলফুল, আমার-ই চিত্রলিপি।

মাপ

*

মাপতে বসেছি দুধঘন রাতে, এ দেহাতি জমিন। নীরব তট ধরে আমি বেঁকে চলা পথ।

জলজোছনার মাঝে সিঁধেল চোর। লোকের সন্দুক খুলে কুড়াই গন্ধ–জীবনের। ললিত বাসনায় ঘামি। যেন কোনো বুড়া নগরীকে ফুঁকে যায় গরবিনী সেবকেরা, সেভাবেই গড়ে তুলি আমার নগর! এ দেহভাণ্ডে তার চূড়া দেখা যায়। স্বর্ণ মুকুটের আভা স্মৃতিতে লুটায়। আমাদের সীমার রেখা পটচিত্রে আঁকা।

—নিজের জামার মাপে মানুষের শরীর!
—ততটুকু বস্ত্র তার যতটা হাড়ের আকার।

কেউ বলে একা একা রাতে, সাইকেল বাজাতে বাজাতে।

সেসব দরজিরা এখন সটকে গেছে হাটের কলরোল থেকে। ছোট ছোট ছাউনির নিচে রাত ফোটে শূন্যতার ডালে।

ঘাসের দেশে

*

আমাদের মহিষগুলা বিলে শিং উঁচায়ে থাকে, যেন কোনো আদিবাসী পাড়ার কোণে কাঞ্চন ডাল। বরষাকে ব্যাকুল করা ঘাসের ফাঁকে সে আয়েশ করে। তার যুদ্ধবিরতির ক্ষণ। ঘাসের দেশে সে এক তুমুল শাসক।

এই শরীরী বাস এখানেই দম ফেললো। প্যাঁত প্যাঁত করে টায়ার গেল বসে। একটা শান্ত বিল কিছু পদ্মকে লালন করে চলছে। থালের মতো পাতার নিচে মানুষের ভূমি। যেন ফ্যাসাদের গ্রন্থটি আপাত পাঠ চুকায়ে আছে।—এ এক দীর্ঘ রণপ্রস্তুতি।

—লোকে ঘুমানোর আগে একবার তার শত্রুর নাম নেয়।
—মূলত তূণ থেকে তীর শিকারে লাগার মুহূর্তকে ‘ঘুম’ বলে

শাদা

*

মাঝেমাঝেই চুপসে থাকি। ধোয়া জামার মতো জড়োসড়ো। বাতাস নেমে এলে দেখি, একটা কবুতর শান্তিতে শাদা হয়ে আছে। পতপত করে সে ওড়ে। ছোপ ছোপ শাদা সান্ত্বনার ভাষার মতো।

—মানুষকে আপাত শান্ত মনে হয়।

নিরীহ পাতাটিকেও সন্দেহে রাখি। এমনকি বাতাসকে ঘুরিয়ে দিতে পারে সামান্য পালক। যে কোনে জিহ্বায় লেগে থাকে বিষিয়ে তোলার ভাষা, ন্যূন ফুসরতেই খেল দেখায়।

উসকে দিতে পারে বিষাদ আসমানের মেঘ। যেমন রাস্তাকে করতে পারে কাদাময়।

সমস্ত শাদার ভিতর বহু লহু গোপন আছে—কেবল মনে হয়।

অলংকরণ রাজিব রায়