শাটিকাপ টিম
grand river view

।। শোবিজ প্রতিবেদক ।।

হালে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিশ্বের নানা প্রান্তের গল্প উঠে আসছে। ভাষা কিংবা রাষ্ট্র যেটাই হোক প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব গল্পগুলো এখন দর্শকদের নজর কাড়ছে সারা দুনিয়ার। এদেশেও ওটিটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে দেশিয় নির্মাণের ক্ষেত্রে ঢাকার বাইরের গল্প খুব কমই উঠে আসছে। এক্ষেত্রে একেবারে ব্যতিক্রম এক গল্প নিয়ে আসছে নতুন ওয়েব সিরিজ ‘শাটিকাপ’। রাজশাহী অঞ্চলের গল্প নিয়ে পুরোপুরি স্থানীয় পর্যায়ের অভিনয় শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিয়েই এক আন্তর্জাতিক মানের ওয়েব সিরিজ আসছে প্রথমবারের মতো। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে পুরস্কৃত নির্মাতা তাওকীর ইসলাম এর মধ্য দিয়েই এই প্রথম কোনো ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করছেন।

শাটিকাপের ক্যামেরার পেছনে: রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে

ফুটপ্রিন্ট ফিল্ম প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মানাধীন ওয়েবসিরিজটির প্রথম সিজনের শ্যুটিং পুরোপুরি শেষ হয়েছে এ মাসে। গত ৩ আগস্ট নির্মাতাপ্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রযোজক অমিত রুদ্র তার ফেসবুক পেজে এই তথ্য জানিয়েছেন। লিখেছেন-

“শাটিকাপ-এর শ্যুটিং অফিসিয়ালি শেষ হলো আজ। যারা এখনো জানেন না ‘শাটিকাপ’ কী, তাদের জন্য বলি, এটি আমাদের একটি ওয়েবসিরিজ যেটির শ্যুটিং শুরু হয়েছিল গত বছর অক্টোবর মাসের ২২ তারিখে। টানা ৪২দিন শ্যুটিং, ফার্স্ট ড্রাফট, মাঝে করোনার প্রাদুর্ভাব, বিভিন্ন কারণে মাঝে কিছুদিনের গ্যাপ, আবার প্যাচ শ্যুট প্লান, সব মিলিয়ে প্রায় ১ বছরের জার্নি শেষ হলো। শেষ বলতে জাস্ট শ্যুটিং শেষ হলো আর কি। এখনো মাইলস টু গো বিফোর উই স্লিপ।”

শাটিকাপের ক্যামেরার পেছনে: টানটান উত্তেজনায় ভরা ক্রাইম থ্রিলারে চোর পুলিশ খেলা রাতের রাজশাহীর রাস্তায়

এই দীর্ঘ যাত্রার পেছনের গল্পও কম বৈচিত্রপূর্ণ নয়- এমন ইঙ্গিত দিয়ে রুদ্র লিখেছেন, “অনেক অনেক অনেক গল্প এই এক বছরের, প্রায় ১৫০জন মানুষের প্রত্যেকের নিজেদের আলাদা ভার্সনের স্ট্রাগলের ও আনন্দের গল্প আছে। সবার গল্প শোনাবো আস্তে আস্তে। আর কাজটা তো দেখবেনই খুব জলদি।”

‘শাটিকাপ’ রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রচলিত আঞ্চলিক শব্দ। এর ভাবার্থ অনেকটা- কোনোকিছু নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকা। নির্মাতা এই শব্দটিকেই বেছে নিয়েছেন প্রথমবারের মতো রাজশাহীর সীমান্ত এলাকা নিয়ে নির্মিত কোনো ওয়েবসিরিজের নামকরণের জন্য। মাদক আর সীমান্ত অপরাধের এক টানটান গল্প নিয়ে ‘শাটিকাপ’ খুব শিগগির একটি সুপরিচিত ওটিটি প্লাটফর্মে আসছে বলে জানিয়েছে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান।

শাটিকাপের ক্যামেরার পেছনে: সীমান্তঘেঁষা পদ্মা নদীতে চোরাকারবারীদের আনাগোনা

ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার এই সিরিজের প্রথম সিজন শুরু হয় রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাতের বেলা মাদকের হাতবদল আর মাদক নিরোধী দফতরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাদক কারবারীদের চোর-পুলিশ খেলা দিয়ে। কাহিনি যত গড়াতে থাকে ততোই জুড়েত থাকে নতুন নতুন চরিত্র আর খুলতে থাকে অপরাধ জগতের এক অজানা সাম্রাজ্যের দুয়ার। সীমান্তব্যবসার গডফাদার, মাদকব্যবসায়ী, চোরাকারবারী, দুর্ধর্ষ অপরাধী, সাদাকালোয় মেশানো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, খবরের সন্ধানে ছুটতে থাকা সংবাদকর্মী সবাই মিলে ছুটতে থাকেন এক অজানা কাহিনির পেছনে। সামনে থেকে যা দেখা যায়, সেটাই কি আদতে শেষ কথা? নাকি অপরাধের এই সাম্রাজ্যের পেছনে লুকিয়ে আছে একদম অজানা কোনো কুশীলব? প্রথম সিজনে আটটি এপিসোডে খোঁজা হবে এই গল্প- সীমান্তবর্তী নদী থেকে বিস্তৃত চরে, আধুনিক নগরের সড়ক থেকে বস্তির অলিগলিতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইন্টারোগেশন চেম্বার থেকে অপরাধীদের ডেরায়।

শাটিকাপের ক্যামেরার পেছনে: ইন্টারোগেশন

ভারতের এশিয়ান স্কুল অব মিডিয়া স্টাডিজ থেকে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা শেষে দেশে ফেরা নির্মাতা তাওকীর ইসলাম নিজেও রাজশাহীর সন্তান। এখানে জন্ম, বেড়ে ওঠাও। তিনি জানান, শুরু থেকেই তিনি নিজের এলাকার গল্প বলতে চেয়েছেন। শাটিকাপে তিনি সেটাই করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের ভালো একটা টিম আছে। তারা সবাই নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করেছেন।” শাটিকাপ দর্শকদের নতুন এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করবে বলে মনে করছেন এই নির্মাতা।

তাওকীর জানান, ওয়েব সিরিজটির গল্প বলার ক্ষেত্রে নানাজনের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। সেগুলো ফুটিয়ে তুলতে প্রতিটি চরিত্রই সেই অভিজ্ঞতাগুলো খুব ভালোভাবে অনুধাবন করেছেন। সেটাই হয়ে উঠেছে ‘শাটিকাপ’- এর মূল শক্তি।

শাটিকাপের ক্যামেরার পেছনে: নির্মাতার ক্যামেরা ধরছে গল্প

শাটিকাপ নিয়ে এরই মধ্যে বেশ আশাবাদী রাজশাহীর চলচ্চিত্র সংসদের কর্মী ও নির্মাতারা। ঢাকার বাইরে থেকে প্রথম নির্মিত কমিউনিটি চলচ্চিত্র ‘প্রত্যাবর্তন‘- এর নির্মাতা ও রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি আহসান কবির লিটন মনে করেন, রাজশাহী থেকে যে বিশ্বমানের কাজ করা সম্ভব, তা প্রমাণ করবে শাটিকাপ। তিনি বলেন, “এ থেকে এখানকার অন্য নির্মাতাদের জন্যও এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।” ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি ডা. এফএমএ জাহিদ বলেন, “চিলড্রেন ফিল্ম সোসাইটি থেকে আমাদের এখানে যে প্রতিভাগুলো উঠে এসেছে, তাওকীর তাদের মধ্যে অন্যতম। নতুন সময়ে দুনিয়াজুড়ে যে নতুন ধরনের গল্পের চাহিদা তৈরি হয়েছে, তা আসলে শুধু কেন্দ্রনির্ভর নয়। বরং প্রান্তিক এলাকার গল্পেই সেই বৈচিত্র বেশি। আমাদের এই নির্মাতারা সেই গল্পগুলোকেই পৃথিবীর সামনে নেয়ার চেষ্টা করছে। ওদের সামর্থ্য আছে বিশ্বমানের নির্মাণের। আর ওরা সফল হলে রাজশাহীর চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন করে গতি আসবে।”