grand river view

।। নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

প্রথম সংস্করণ প্রকাশের প্রায় দশ বছর পর একটি বইয়ের দুটি তথ্য উস্কে দিয়েছে দুই বিতর্ক। নেপথ্যে বইয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নাটোরের মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের পরিচয় ও অপকর্মের তালিকায় স্থান পাওয়া দুটি নাম। এদের একজন হাসান আলী, অন্যজন সোলায়মান আলী সরকার। প্রথম ব্যক্তির ছেলে এখন নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল। দ্বিতীয় জনের ছোটভাই অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপউপাচার্য (প্রোভিসি) নিযুক্ত হয়েছেন। উপাচার্য (ভিসি) না থাকায় তাকে সরকারের পক্ষ থেকে রাবি ভিসির রুটিন দায়িত্ব পালন করতেও বলা হয়েছে।

বইটির নাম ’নাটোর জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধ’। লিখেছেন রাবি বাংলা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. সুজিত সরকার। তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির স্থানীয় নেতা হিসেবেও কাজ করেন। ২০১০ সালে প্রথম প্রকাশের পর এ বছরই ঢাকার আফসার ব্রাদার্স থেকে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ সময় বইয়ের কোনো নাম নিয়ে তেমন আলোচনা না থাকলেও হঠাৎ দেড় সপ্তাহ আগে দুই তথ্য নিয়ে রাবি ক্যাম্পাস ও সপ্তাহখানেক আগে নাটোরে আলোচনা শুরু হয়। বিষয়টি আরও আলোচিত হয় রোববার রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানায় লেখক সুজিত সরকার একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়েরের পর। সেখানে তিনি এমপি শিমুল ও তার অনুগতদের বিরুদ্ধে তাকে হুমকির অভিযোগ এনেছেন এবং নিরাপত্তা চেয়েছেন।

এই জিডি ও বইয়ের তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য শিমুল দাবি করেছেন, লেখক মিথ্যা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তার বাবার নাম বইয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি লেখককে হুমকি দেয়ার বিষয়টিও পুরোপুরি অস্বীকার করে বলেন, “মিথ্যা তথ্যের কারণে তার বিরুদ্ধে আমি মামলা করতে যাচ্ছি জেনে আগেভাগেই তিনি এই মিথ্যা তথ্য দিয়ে জিডি করেছেন।” কেউ এই কাজগুলো বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে তার বিরুদ্ধে ড. সুজিতকে দিয়ে করাচ্ছেন কি না সে বিষয়টি নিয়েই তদন্তের দাবি জানান এই সংসদ সদস্য।

বইয়ের ৬০০ নম্বর পাতায় ২১ নম্বর রাজাকার তালিকায় নাটোর-২ এর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের বাবা ‘হাসান আলী সরদার’ এর নাম প্রকাশ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সুজিত সরকার উত্তরকালকে জানান, তিনি দীর্ঘ সময় ধরে মাঠ পর্যায়ে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়ে সেগুলো খুটিয়ে দেখেই তিনি বইয়ে যার যা ভূমিকা তা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “যখন আমি বই লিখি, তখন কি তিনি এমপি ছিলেন যে তার বিপক্ষে আমি উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার করবো? তখন তো আমি জানতামও না যে হাসান আলী সরদার তার বাবা।”

বইয়ে রাজাকার তালিকায় হাসান আলী সরদারের নাম রাখায় লেখকের নামে বিভিন্ন মাধ্যমে বাজে মন্তব্যসহ, প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার অভিযোগে দায়ের করা জিডিতে অধ্যাপক সুজিত সরকার উল্লেখ জানান, সম্প্রতি নাটোর স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটি গঠন করা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও ভিন্নমত সৃষ্টি হওয়ায়, সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের পিতা ‘হাসান আলী সরদার’ এর স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকাণ্ড আলোচনায় আসে। মূলত আমার গ্রন্থে উল্লেখিত রাজাকার তালিকার সূত্র ধরেই এই আলোচনা উঠে আসে। একারণে, সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আমার নামে কুৎসা রটনা করার পাশাপাশি নানা হুমকি দিয়ে আসছেন। এছাড়াও, তার পক্ষে অবস্থান নিয়ে অপরিচিত অনেকেই তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। জিডিতে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে তার কোনো ক্ষতি হলে এর জন্য “এমপি শিমুল ও তার পেটোয়া বাহিনী” দায়ী থাকবে।

এদিকে একই বইয়ের ৩৮০ থেকে ৩৮৭ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাবির ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর দর্শন বিভাগের অধ্যাপক সোলায়মান আলী সরকার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে। সাক্ষাৎকারদাতাদের বরাত দিয়ে সেখানে জানানো হয় যে, এই অধ্যাপক মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাজশাহী থেকে আবদুলপুর হয়ে ইশ্বরদী অবধি পাকিস্তানীদের ‘দালাল’ হিসেবে কাজ করে। সেখানে তার সঙ্গী হিসেবেও অনেকের দাম উল্লেখ করেছেন লেখক। এমনকি আবদুলপুর ও আড়ানি বাজার তারই প্ররোচনায় লুট হয় এবং হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে ড. সুজিত তার বইয়ে লিখেছেন।

বইয়ে আরও লেখা হয়েছে, রাজশাহীর ‘দালাল’ আয়েন উদ্দিনের সঙ্গে অধ্যাপক সোলায়মানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিলো। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের পরাজয়ের পর স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান বলে ড. সুজিত তার বইয়ে তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তিনি যথারীতি ফিরে এসে কাজে যোগ দেন। তিনি আরও লিখেছেন, অধ্যাপক সোলায়মানের ছোটভাই বালক বয়সী সুলতান-উল-ইসলাম মুক্তিযুদ্ধের পর তাকে খুঁজতে ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। তিনি বর্তমানে রাবি ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়। ড. সুজিতের বইয়ের এই তথ্য অনুসারে সেই অধ্যাপক সুলতান অতি সম্প্রতি রাবি প্রোভিসি হিসেবে নিযুক্ত হয়ে ভিসির রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন।

বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম ড. সুজিত সরকারের বইয়ে তার কোনো স্বজনের ব্যাপারে কিছু লেখা হয়েছে কি না তা জানেন না বলে উল্লেখ করেন। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “উনি (ড. সুজিত) বই নিয়ে যখন কাজ করেছেন, তখন তাকে আমি নিজেও নানা তথ্য দিয়ে হেল্প করেছি। কারণ মুক্তিযুদ্ধ আমারও আবেগের জায়গা। সেই রাজনীতিই আমি করি। তার বই নিয়ে এখন এসব আলোচনা কেন উঠছে আমি জানি না।” বিতর্কিত ভিসি অধ্যাপক আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষক সমাজের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করা এই অধ্যাপক আরও বলেন, “কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে কিছু করছে কি না, সেটাও জানি না।”

সুজিত সরকারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি প্রয়োজনীয় সাক্ষাৎকার-প্রমাণ নিয়ে সচেতনভাবেই বইয়ে তথ্য দিয়েছি। আমি যখন এই বইয়ের কাজ করি এবং লিখি তখন সুলতান-উল-ইসলাম কোনোদিন কোনো দায়িত্বে আসবেন এটা ভাবারও কোনো সুযোগ ছিলো না। তাই এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য থাকার সুযোগই নেই।” হঠাৎ এই বই এতদিন পর কেন আলোচনায়- এমন প্রশ্নের জবাবে এই লেখক বলেন, “এমন তো না যে আমি শুধু এই একটা কাজ করেছি। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার আরও অনেক কাজ আছে। কিন্তু ১০ বছর পর এসে হঠাৎ এই বই এখন আলোচনায় কেন এলো তা আমি নিজেও জানি না।”