grand river view

।। জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

‘এনিয়ে দুই দুইবার বিক্রি হলো না। ধার-দেনা আট লাখ টাকা। ২ লাখ টাকার জমি বন্ধক। এই গুরুর প্রতিদিনে ব্যয় ১ হাজার টাকার উপরে। এখন কী করবো কিছুই বুঝতে পারছি না। একমাত্র আল্লাহ এই বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলছিলেন পুঠিয়ার কান্দ্রা গ্রামের বাসিন্দা আলিমুদ্দিন। তার এই বিপদের কারণ ‘বিশালদেহী গরু শান্ত’। আলিমুদ্দিন জানান, ৩০ মণ ওজন হওয়া ষাড়কে নিয়ে তিনি রীতিমতে বিপাকে পড়েছেন।

শুধু নামডাক ছড়ানো শান্তবাবুই নয়, এবার বড় আকারের গরুর বেশিরভাগই অবিক্রিত। হাট ঘুরে ঘরে ফিরে আসা ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যাও কম নয়। বিভাগের মধ্যে অবিক্রিত পশুর সংখ্যা সব থেকে বেশি রাজশাহী জেলায়।

প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেবে, এ বছর ঈদুল আজহায় সার্বিকভাবে পশু কোরবানির সংখ্যা কমেছে রাজশাহী বিভাগে। ফলে বিভাগের ৮ জেলায় এবারের হাটে অবিক্রিত থেকেছে প্রায় সোয়া ২ লাখ পশু। এরমধ্যে গরু ও মহিষ ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৪৩ হাজার এবং ছাগল ও ভেড়া ১ লাখ ৯ হাজার ৫০১টি। রাজশাহী জেলায় অবিক্রিত গরু ও মহিষ এর সংখ্যা ৪০ হাজার ৮৪০টি এবং ছাগল ও ভেড়া ৩২ হাজার ২৮৯টি।

খামারিরা যখন আরো এক বছরের বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন ব্যাপারীরা অবিক্রিত পশু কী করবেন, তা নিয়ে গ্যাঁড়াকলে। 

ব্যাপারীরা জানিয়েছে, প্রচুর পশু অবিক্রিত থাকায় বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। গরু বিক্রি না হওয়ায় ধারদেনা শোধের তাগাদা, চড়া দামের গো-খাদ্য ও গরুর দৈনন্দিন ব্যয় মেটানোর দুর্ভাবনা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাদের।

সওদাগর অ্যাগ্রোর মালিক আরাফাত রুবেল মনে করেন, করোনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে এবার এই পরিস্থিতি।

তিনি অভিযোগ করেন, প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের কার্যক্রম অনুমানভিত্তিক। কোরবানির বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে তারা স্পষ্ট ধারণা দিতে পারলে এমন সংকটের মুখে পড়তো না খামারি ও ব্যাপারীরা।

প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বিভাগে গত বছরের তুলনায় ২ লাখ ৮ হাজার ১৮০টি গরু মহিষের কোরবানি কম হয়েছে। এবছর গরু মহিষের কোরবানি হয়েছে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৭৩৩টি। গতবছর গরু মহিষের কোরবানি হয়েছিল ৮ লাখ ২৪ হাজার ৯১৩টি।

রাজশাহী জেলায় এবছর কোরবানিকে সামনে রেখে ৩ লাখ ৮২ হাজার পশু লালনপালন করেছিলেন কৃষক ও সাধারণ খামারীরা। এরমধ্যে কোরবানি হয়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার ৮৮৯টি। এরমধ্যে গরু মহিষের কোরবানি হয়েছে ৬৩ হাজার ১৬৯টি। গত বছর হয়েছিল ৭৩ হাজার ৪৪৫টি। মহিষ কোরবানি হয়েছে ৩১৫টি। এবছর গত বছরের তুলনায় গরু মহিষের কোরবানি কমেছে ১০ হাজার ২৭৬টি।

এবার বড় আকারের বিপরীতে ভেড়া ও ছাগলের মতো ছোট আকারের পশু কোরবানির প্রবণতা এবার একটু বেশি ছিল। কোরবানিকে সামনে রেখে রাজশাহীতে জেলায় কৃষক ও খামারীরা সাড়ে ৩৪ হাজার ভেড়া ২ লাখ ৪৩ হাজার ছাগল পেলে-পুষে বড় করেছিলেন। এর মধ্যে ভেড়া কোরবানি হয়েছে ১৯ হাজার ৬৬৩টি এবং ছাগল কোরবানি হয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ১২৭টি।

রাজশাহী বিভাগীয় প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার দাস বলেন, করোনার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের কারণে পশু অবিক্রিত বেশি থেকেছে। এতে অনেকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

তিনি জানান, আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার সুযোগ নেই। তবে তাদের ভিন্নভাবে সহায়তা করার কথা ভাবছে সরকার।

প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তরের হিসেবে, এবার বিভাগের দেড় লাখ খামারে ২৪ লাখ গবাদিপশু কোরবানির হাটের জন্য প্রস্তুত করা হয়, যে সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৮ লাখ বেশি।