grand river view

 ।। মেজবা উদ্দিন পলাশ, কুষ্টিয়া ।।

করোনায় রোগী মারা গেলে শেষযাত্রায়ও স্বজনরা দূরে থাকছেন আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে। যদিও সবার ক্ষেত্রে এমনটি প্রযোজ্য হচ্ছে না। কুষ্টিয়ায় করোনায় মৃতব্যক্তিদের কবরস্থানে দেখা মিলছে না তার স্বজনদের। কবরের কাছে গেলে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে কবর দেখতে আসছেন না তারা এমনটাই জানিয়েছেন স্বজনরা। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার কারণে মৃত্যু হলে তাদের কবরের পাশে গিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করতে স্বজনদের দেখা গেলেও করোনায় আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের বেলায় ভিন্ন চিত্র। জেলার বিভিন্ন এলাকার কবরস্থানে দেখা মিলছে না স্বজনদের।

করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃতব্যক্তিদের লাশ সৎকার ও দাফন সম্পন্নকারী সেচ্ছাসেবী সংগঠন খেদমতে খলক ফাউন্ডেশনের কুষ্টিয়ার পরিচালক মওলানা আরিফুজ্জামান বলেন, আসলেই খুবই দুঃখজনক। আমরা যেন কেমন হয়ে গেছি। যার উপার্জন করা টাকা দিয়ে সংসার চলতো। পরিবারের ভালোমন্দ তিনিই দেখভাল করতেন। সেই মানুষটির কবরের পাশে গিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করার দূরের কথা অনেকেই জানেন না একসময়ের প্রিয় মানুষটির কবরটি কোথায়। কবরস্থানের কোন স্থানে। মৃত্যুর পরই স্বজনরা যখন এত অচেনা? করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃতব্যক্তির মরদেহ হাসপাতাল থেকে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার খবর শুনেই পুরো বাড়িটি ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। মৃতব্যক্তির ছেলে সন্তানরাও আসছেন না মরদেহটির কাছে।

তিনি আরো বলেন, এ জেলায় অনেকেই মৃতব্যক্তির খোঁজ খবরও নিচ্ছেন না। বিষয়টিকে অমানবিকই বলা যায়। মরদেহটি সৎকারে শ্মশান কমিটি বা কবরস্থান কমিটি এবং নিজ আত্মীয়-স্বজনের কেউও এগিয়ে আসছেন না এমন ঘটনাও রয়েছে এখানে। পরে আমরাই মরদেহটি সৎকার ও দাফন কাজ সম্পন্ন করছি। তবে সব মৃতব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমনটি কিন্তু নয়, অনেকেই তাদের কবরস্থানে যাচ্ছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলার বিভিন্ন কবরস্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এমন সময় এলো একসময়ের পরিবারের প্রিয় মানুষটির কবর দেখতে আসেন না তার স্বজনরা। করোনা আক্রান্ত হয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন তারা এমন হতভাগ্য তার কবরটি কোথায় সেটিও জানেন না মৃত ওই ব্যক্তির স্বজনরা। এতে কবরগুলো ঠিকমত পরিচর্যা করাও হচ্ছে না। কারো কারো ক্ষেত্রে এ চিত্র একটু আলাদা কেউ কেউ এসেছেন কবর দেখতে। তবে আগের তুলনায় কবরস্থানে আসা স্বজনদের চিত্র একেবারেই কম। আসেন না বললেই চলে।

সরেজমিনে গিয়েও দেখা গেছে কুষ্টিয়া শহরের কেন্দ্রীয় কবরস্থানসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার কবরস্থানের একই চিত্র । এদিকে এ জেলায় এখন পর্যন্ত শুধু করোনা আক্রান্ত ৪৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে শহরের পৌর কবরস্থানেই ৫৫ জনের দাফন কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

জেলার মিরপুর উপজেলার ধুবইল গ্রামের শামীম আহমেদ বলেন, আমার স্ত্রী শাপলা খাতুন করোনা আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে তার পাশে সবসময় আমিই ছিলাম। ওয়ার্ডে যারা চিকিৎসাধীন ছিলেন। তারা সকলেই করোনা আক্রান্ত রোগী। তিনদিন চিকিৎসাধীন থাকার পরই স্ত্রী শাপলা মারা যান। কিন্তু আমি করোনা আক্রান্ত হয়নি। এটা একেবারেই ভুল ধারণা যে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে থাকলেই সে করোনা আক্রান্ত হবে।

একই অবস্থা কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকার মেহেদীর। তিনি বলেন, মায়ের করোনা পজিটিভ আসার পর বাড়ির সবাই দূরে থাকতে শুরু করলো। তবে আমি দূরে সরে থাকতে পারিনি। কেননা আমার কোনো বোন নেই। মাকে দেখার লোক বলতে আমিই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মায়ের সেবা করেছি ৭ দিন ধরে। পরে তার অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানেই তিনি মারা যান। কিন্তু আমি করোনা আক্রান্ত হয়নি। করোনা আক্রান্ত রোগীর পাশে থাকলে সে  আক্রান্ত হবেন এট সঠিক নয়।

এ ব্যাপারে মৃত ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে মুঠোয়ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, করোনায় মারা গেলেও কবরের কাছে গেলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে তাই আসা হচ্ছে না। কারণ পরিবারের আরও লোকজনও তো আছে তাদের কথা মাথায় রাখতে হবে।

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের চিকিৎসক সুরেশ তুলসান বলেন, করোনা আক্রান্ত মৃতব্যক্তির থেকে করোনা ছড়ানোর সুযোগ নেই। করোনায় মারা গেলে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তার শরীরে থাকা করোনার জীবাণুও নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং করোনায় মৃত মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শেষ বারের মত দেখা অথবা শেষকৃত্য অংশ নেয়া বা তার কবর জিয়ারত করা নিরাপদ। এতে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ের কিছু নেই।

কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর মোহাম্মদ আলী ইসা বলেন, এমন কিছু ঘটনা আমিও দেখেছি। এটা খুবই দুঃখজনক। যতই আধুনিক হচ্ছি ততই যেন আমরা অসামাজিক হয়ে যাচ্ছি। কার জন্য আমরা কি করছি। বর্তমানে এই করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের সামাজিক বন্ধনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। করোনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে কে আপন আর কে পর।