grand river view

‘মা, তোমার এই শাড়িটা আমি পরব’- এই কথাটি প্রায় প্রত্যেক মেয়েই ছোটবেলায় বলে থাকেন। বাঙালি মায়ের পোশাক মানেই শাড়ি। আর আলনায় গোছানো মায়ের শাড়িটিই মেয়ের প্রধান আকর্ষণ। আলমারি থেকে মা যখন তুলে রাখা শাড়ি বের করে পরেন, নাকে জুড়ে বসে আশ্চর্য গন্ধ। মনে হয় কোমর জড়িয়ে মুখ ডুবিয়ে মায়ের শাড়ির সেই গন্ধ নিই। এই অনুভূতি সব মেয়ের হয়। এ গন্ধ আর ভালবাসা মায়ের অন্য কোনো পোশাকে নেই। মা’রা যখন পৃথিবীতে থাকেন না বা বয়স্ক হয়ে ওঠেন, তখন প্রত্যেকটি মেয়ের কাছে শাড়ি মানেই মায়ের আদর, আবেগের স্মৃতি। আর তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষক ও অ্যাঙ্কর নাজলা ফাতমী মায়ের শাড়ি ধরে রাখার পরিকল্পনা সাজিয়েছেন। লিখেছেন নুসরাত নুসিন

মায়ের শাড়ির উত্তরাধিকার

“শাড়ী ভাঁজ করা, নাড়াচাড়া করা তোমার প্রিয় কাজ

তোমার একেকটা শাড়ী যেন একেকটা ইতিহাস”

নাজলা ফাতমী বিদেশ থেকে ফিরে এসে মায়ের আলমারি খুলে দেখেন থরে থরে সাজানো শাড়ি। বয়স হয়ে যাওয়ায় মা আর আগের মত যত্ন নিতে পারেন না। অযত্নে অগোচরে পড়ে আছে। তখনই নাজলা সিদ্ধান্ত নেন, মায়ের শাড়িগুলো সংরক্ষণ করবেন।

তিনি বলেন, ভাইবোনরা শাড়িগুলো কাউকে দিয়ে দিতে বলেছিলেন। বাবাও বলেছিলেন, দিয়ে দাও মানুষকে। কিন্তু আমি জানি, যত্ন নেয়ার কেউ নেই বলে বাবা এ কথা বলছেন। কাউকে দিয়ে দিলে বাবা যে কষ্ট পাবেন তা আমি জানি।

এরপরে নাজলা সব শাড়ি যত্ন করে রেখে দেন। বিভিন্ন পার্টিতে-ফটোশুটে মায়ের শাড়িই পরেন। নাজলা বলেন, আমি এরপরে আর নতুন কোনো শাড়ি কিনিনি। কোথাও যাওয়ার আগে মায়ের শাড়ি পরে যখন বাবাকে দেখাই তখন কিন্তু সবচেয়ে বেশি খুশি হন তিনি। বাবা বলেন, এই শাড়িটা তো তোমার মাকে আমি কিনে দিয়েছি সেই আশির দশকে। কোন শাড়ি কোথায় থেকে কিনেছেন বাবা তখন সেসব স্মৃতিচারণ করেন।

মায়ের শাড়ি পুরোনো বলে অনেকে মানুষকে দিয়ে দেন। কিন্তু পুরোনো শাড়ি নতুন করে উপস্থাপন করলে তা ফ্যাশনে পরিণত হয়। নাজলা বলেন, যেহেতু মায়ের ব্লাউজ আমার হয় না তাই শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং করে নতুন ব্লাউজ বানাই। ব্লাউজটা মানানসই করতে পারলে একটা দারুণ লুক তৈরি হয়। শাড়ির সঙ্গে মায়ের গহনা, ব্যাগ, ঘড়ি মিলিয়ে পরি। মায়ের কোনো কিছুকেই বাতিল বলে ফেলে দিতে আমি রাজি নই। বরং কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে রাখা যায় সেই চেষ্টা করছি।

নাজলা ফাতমী ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। পাশাপাশি অ্যাঙ্করিংয়ের কাজ করেন। নাজলা সবসময় তার শিক্ষার্থী ও বন্ধুদের অনুপ্রাণিত করে আসছেন, বাবা-মায়ের স্মৃতি ধরে রাখার মাধ্যমে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে পারিবারিক মূল্যবোধ সৃষ্টিতে।

পার্টির থিম ‘মায়ের শাড়ি’

নাজলা বলেন, বন্ধুদের নিয়ে যখন পার্টি দেই তখন একটা থিম রাখি। একবার ছিল মায়ের শাড়ি। বান্ধবীদের এই আইডিয়া খুব ভালো লেগেছিল। তারা খুঁজে খুঁজে মায়ের শাড়ি পরে এসেছিলেন। তারা আমাকে কথা দিয়েছেন মায়ের শাড়ি যত্ন করে সংরক্ষণ করবেন। বাবা-মা যখন পৃথিবীতে থাকেন না তখন আমরা শুধু স্পিরিচ্যুয়্যালি তাদের জন্য প্রার্থনা করি। কিন্তু আমাদের বস্তুগতভাবেও তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার সুযোগ আছে।

পারিবারিক মূল্যবোধ ও পুরোনোকে ধরে রাখতে সবসময় চেষ্টা করে যাচ্ছেন নাজলা। তিনি ক্ষয়িষ্ণু পরিবার ও নতুন প্রজন্মের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বলেন, তারা পূর্বপূরুষদের ইতিহাস জানে না। ফলে কোনো বন্ধন তৈরি হচ্ছে না। হয়ত তারা ভবিষ্যতে নিজের ভাইবোনকেও চিনবে না।

নাজলা বলেন, পাঠ্যপুস্তকে পারিবারিক মূল্যবোধ ও পুরোনোকে সংরক্ষণের বিষয়ে পাঠদান করাতে হবে। সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। মায়ের শাড়ি নিয়ে অনেক পরিকল্পনা আছে বলেও উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক ফটোশুটের প্রস্তাব পাচ্ছি।

পুরোনোকে আমি নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চাই। সেটা সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই।