।। জেষ্ঠ্য প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

রাজশাহীতে গত বছরের তুলনায় কমেছে কোরবানির পশুর চামড়া। কারণ এবার কম হয়েছে কোরবানি। চামড়া ব্যবসায়ীদের হিসেবে, গেল বছর রাজশাহীতে কোরবানি হয়েছিল ৩ লাখ পশু। গরু ও মহিষ ছিল ১ লাখ ১০ হাজার। খাশি, বকরি, ভেড়া ও অন্যান্য পশু কোরবানি হয়েছিল ১ লাখ ৯০ হাজার। এবার সেটি কমে দাঁড়িয়েছে আড়াই লাখে। এবার গরু কোরবানি হয়েছে ৮০ হাজার। আর খাশি, বকরি, ভেড়া ও অন্যান্য পশু কোরবানি ১ লাখ ৭০ হাজার। 

রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকবরের ভাষ্যমতে, গত বছরের তুলনায় কোরবানির সংখ্যা কমায়, কমেছে পশুর চামড়ার সরবরাহ। বিপরীতে দরও কিছুটা বেড়েছে।

চামড়া ব্যবসায়ী দেলোয়ার বলছিলেন, গত ঈদে তিনি ১০ হাজার চামড়া কিনেছিলেন। এবার কোরবানি কম হওয়ায় এবার গত বছরের তুলনায় তার অর্ধেকও কিনতে পারেননি। একারণেই এবার কিছুটা দাম পেয়েছে বিক্রেতারা। গরুর চামড়ার দাম পিস প্রতি বেড়েছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা। ঈদের দিন সন্ধ্যায় নগরের চামড়াপট্টি এলাকায় বড় আকারের গরুর চামড়ার দাম ছিল ৮০০ টাকা। মাঝারি ও ছোট আকারের গরুর চামড়ার দাম বিক্রি হয়েছে ৭০০ থেকে ৫০০ টাকা। অবশ্য গত বছর গরুর চামড়ার দাম ছিল ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে।

চামড়ার দাম কিছুটা বাড়লেও গত ‍তিন বছর ক্ষতি হওয়ায় এবার মৌসুমি চামড়া ক্রেতা ছিল নগণ্য। আবার সেভাবে হয়নি অলিতে-গলিতে চামড়া কেনাকাটা। দাম না পাওয়ার অভিজ্ঞতায় কোরবানিদাতারা মাদ্রাসা ও এতিমখানায় বেশি পরিমাণ দান করেছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানে বেড়েছে দানের পরিমাণ। নগরীর ছোটবনগ্রাম এলাকার জামিয়া রহমানীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন,গরুর চামড়ার দাম গড়ে ৫০০ টাকা। মাঝারি আকারের একটি ছাগলের চামড়া বিশ থেকে ত্রিশ টাকা। বকরি দশ টাকা। ছোট আকারের ছাগলের চামড়া বিক্রিই করতে পারেননি তারা। যেহেতু চামড়ার দাম তলানিতে, সেকারণে মাদ্রাসা ও এতিমখানার লোকজন বিনা পয়সায় অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি চামড়া সংগ্রহ করেছেন।

তিনি জানান, চামড়া এই বাড়তি দাম শুরু হয়েছে গতকাল দুপুরের পর থেকে। সকাল থেকে গেল বছরের দরে চামড়া বিক্রি হয়েছে। এই যে দামের হেরফের, এতে লাভবান হয়েছে অসাধু সিন্ডিকেটের আড়তদাররা।

মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ বলছেন, গত তিন বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও বঞ্চিত তারা। বাড়তি দাম পেয়েছে যারা চামড়া ধরে রাখতে পেরেছিল।

রাজশাহীর দরগাপাড়ার জামিয়া ইসলামীয়া মাদ্রাসার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক জানান, যেসব প্রতিষ্ঠান চামড়া সহায়তা হিসেবে নেন তারা তো সংরক্ষণ করতে পারবে না। এটা জেনেশুনেই সকাল থেকে পানির দর। যখন এসব প্রতিষ্ঠানের চামড়া বিক্রি শেষ তখন বেড়ে গেল দাম। এটা মূলত অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে।

একই অভিযোগ করেন মৌসুমী ব্যবসায়ীরাও। কাঁকনহাট থেকে আসা আফজাল হোসেন জানান, সরকার দাম বাড়িয়েছে ভেবে চামড়া এনেছি। দুপুরে এখানে এসে দেখি আগের দাম। কোনরকম রিস্ক না নিয়ে বেচে ফেলার পরপরই দাম বাড়তি। এখন আপনার বুঝে নেন কী হচ্ছে চামড়া নিয়ে! এ বছর কোরবানির সময় প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার মূল্য সরকারিভাবে ঢাকার বাইলে নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৩ থেকে ৩৭ টাকা। খাশির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি বর্গফুট ১৫ থেকে ১৭ টাকা এবং বকরির চামড়ার ১২ থেকে ১৪ টাকা। কিন্তু সরকার নির্ধারিত দাম অনুসরণ না করে প্রতি পিচ গরুর চামড়া হাতবদল হয়েছে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। আর ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ২০ টাকা। ছোট আকারের ছাগলের চামড়া বিক্রিই করতে পারেননি অনেকে।

প্রান্তিক পর্যায়ের চামড়াব্যবসায় সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিগত বছরগুলোর মতো আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা পরষ্পরকে দোষারোপের একই ভানুমতির খেল দেখিয়ে পানির দরে কিনেছেন চামড়া।

তাদের দাবি, ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের মূলধন আটকে আছে এমন দাবির অন্তরালে চলে সিন্ডিকেটের কারসাজি। তারা মূলত মূলধন বকেয়ার অজুহাত দেখিয়ে অধিক মুনাফার আশায় সিন্ডিকেট করে বাজার নিম্নমুখি করেছে।

ছোট ছোট আড়তদাররা জানান, রাজশাহীতে চামড়া কেনার আড়ত রয়েছে অন্তত ৬০টি। এরমধ্যে সিংহভাগ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করেন ১০ জন চামড়া ব্যবসায়ী। রয়েছেন দুই ট্যানারি মালিক। প্রভাবশালীরা মূলত দাম নিয়ন্ত্রণ করেন।

মূলধন বকেয়ার সেই পুরোনো ধুয়ো তুলে একই কথা বলেছে বড় বড় আড়তদাররা। রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আকবর বলেন, তারা কোনো টাকা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে পাননি। সেকারণে বাজার সকালে আগের মতই ছিল। বিকালে সরবরাহ কমায় ধার দেনা করে টাকা এনে বাড়তি দামে চামড়া কিনছেন।