grand river view

।। তারেক হাসান ।।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘হতাশাজনক’ চার বছরের ক্ষমতা শেষে আবার আগের অবস্থায় ফেরার চেষ্টা করছে নর্থআটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা ন্যাটো। ট্রাম্পের যুগে ন্যাটোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল সেটি কারো অজানা নয়। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ন্যাটোকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই জোটকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র আধিপত্য ধরে রাখার চেষ্টা করছে। নিজেদের ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে কীভাবে ন্যাটোকে ব্যবহার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র? জোটের ইউরোপীয় মিত্ররাই বা কী ভাবছে ন্যাটো নিয়ে, এমনকি পৃথিবী আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হচ্ছে কি না সেটাই বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনা।

জো বাইডেন-যুগে এসে বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামরিক চুক্তি আবার আগের অবস্থানে ফেরা যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোর কৌশলগত ভিশন পাল্টে দিয়েছেন। এই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বারবার সন্দেহ পোষণ করার কারণে ন্যাটো ইমেজ হারিয়েছে। ন্যাটোপন্থি হিসেবে পরিচিত জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পর থেকেই ন্যাটো যেন নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছে ফের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট চেষ্টা করছেন পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধিতে তার প্রশাসনের আন্তরিকতার বিষয়টি ইউরোপীয় মিত্রদের সামনে তুলে ধরতে।

ন্যাটোর জন্য অবশ্য অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়া এবং তা থেকে উত্তরণ নতুন কোনো বিষয় নয়। গত কয়েক দশকে অনেকবারই সংকটে পড়েছে ন্যাটো। সমস্যা যেমনই হোক সামরিক জোটটি প্রতিবারই তা থেকে বের হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

এমনকি স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেও আরব-ইসরাইলযুদ্ধ, ভিয়েতনামযুদ্ধ, কিউবায় রুশ মিসাইল মোতায়েনের মত ঘটনাগুলোতে ন্যাটোর মাঝে বিভেদ ও বিভক্তি দেখা গেছে। তবে এসব সংকট সত্ত্বেও ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকে এক থাকতে বাধ্য করেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিক থেকে আসা হুমকি। এই হুমকি যত বেড়েছে ন্যাটো মিত্রদের ঐক্য ততো জোরালো হয়েছে। ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট ব্লকের পতন হওয়ার পর ন্যাটো তার প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে বলেই মনে করা হতো। এসময় পূর্ব ইউরোপের জোটের শক্তি বৃদ্ধি করা এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েন নিয়ে বিভক্তি চরম আকার ধারণ করে।

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে নাইন-ইলেভেন হামলার ২৪ঘণ্টা পরই ন্যাটো তার গঠনতন্ত্রের ৫ ধারা প্রয়োগের প্রস্তুতি নেয়। ইতিহাসে প্রথমবার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাঝে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আফগানিস্তানের মতো বহু দূরের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একপক্ষীয় যুদ্ধে সে পদক্ষেপ সুফল বয়ে আনেনি।

সবকিছুর পরও গত ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ন্যাটো তার সদস্যদের মাঝে সবগুলো বিভক্তি যেভাবেই হোক মেরামত করতে সক্ষম হয়েছে। এমনকি এই সময় জোটের সদস্য বেড়ে ১৬ থেকে ৩০ হয়েছে। বর্তমান যুগে এসে বড় দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এই সামরিক জোট। আর তা হলো পরাশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান ও রাশিয়ার আগের শক্তি ফিরে পাওয়া। এই দুটি শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে সাইবার স্পেস ও ভূ-রাজনৈতিকভাবে হুমকি দিচ্ছে। ক্রমশই প্রভাব বাড়ছে বেইজিং এবং সেই সাথে মস্কোর।

এই দুটি চ্যালেঞ্জের বাইরে জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মতো যে ইস্যুগুলো সামনে এসেছে অবশ্য এর কোনোটাই আসল ইস্যু নয়। এই ইস্যুগুলো যতটা না ন্যাটোর তার চেয়ে বেশি জি-৭ সংশ্লিষ্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোতে যে মনস্তাত্ত্বিক বিভেদ সৃষ্টি করেছেন তারপর ইউরোপীয়দের অনেকেই তাদের নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিনির্ভরতার বিষয়ে সাবধান হতে পরামর্শ দিয়েছেন। গত সাতদশক ধরেই ইউরোপীয়রা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে আসছিলেন।

ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের হতাশাজনক কথাবার্তার পর জোটের নতুন সদস্যদের অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। ফ্রান্স ও জার্মানির মতো পুরনো সদস্যরাও হতাশ হয়েছেন যদিও এসব দেশ প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় খুব সতর্ক ছিল। নতুন সদস্য দেশগুলো আমেরিকার কাছ থেকে বৃহত্তর ইউরোপের নিরাপত্তা বিষয়ক সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে সাড়া পায়নি। ইউরোপ ও আমেরিকান সমান অংশীদারিত্বের সম্পর্কের বিষয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের চেয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়া ও চীনবিষয়ক সংকটগুলোকে কম গুরুত্ব দিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের যুগের মতো চীন ও রাশিয়ার বিরোধী কথার ফুলঝুরিতে ইউরোপীয়রা অতটা আগ্রহী নয় বরং মস্কো ও বেইজিংয়ের সাথে বিরোধিতার চেয়ে সম্পর্ক স্থাপনের দিকেই মনোযোগ ইউরোপের সব দেশের।

ইউরোপীয়দের এমন অবস্থানের পেছনে যুক্তি আছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মতোই তারা রাশিয়াকে শুধুমাত্র একটি আঞ্চলিক শক্তি মনে করে। এসব দেশ মনে করে রাশিয়া নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতেই যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখাচ্ছে। কাজেই কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে রাশিয়াকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে আটকে রাখতে আগ্রহী এসব দেশ।

চীনকে অনেকে ইউরোপীয় দেশ রাশিয়ার সাথে এক পাল্লায় মাপতে রাজি নন। চীনের বিশাল অর্থনৈতিক শক্তি ও কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকলেও তারা বিশ্বকে নতুন করে ভিশন উপহার দিতে পারেনি। ২০০১ সালে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় যোগদানের পর থেকে বেইজিং বিশ্ববাণিজ্যের পশ্চিমা আধিপত্যে ভাগ বসিয়েছে। যে কারণে ইউরোপীয়রা চীনকে যতটা না শত্রু মনে করে তার চেয়ে বেশি মনে করে অর্থনৈতিক প্রতিযোগী।

অন্যদিকে ওয়াশিংটন চীনকে দেখে ভিন্নভাবে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে চীন এমন একটি দেশ যারা এশিয়ার নেতা হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এর পাশাপাশি সারাবিশ্বে নেতা হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে বেইজিং। কিন্তু নিজেদের নেতৃত্বের আসন কিছুতেই ছাড়তে রাজি নয় ওয়াশিংটন। আরো অনেক বছর অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুপার পাওয়ার হিসেবেই থাকতে চায় ওয়াশিংটন। যে কারণে বাইডেন প্রশাসন চাইবে চীনের এই বিরোধিতার বিষয়টি জিইয়ে রাখতে এবং ইউরোপীয় মিত্রদের এ বিষয়ে পাশে পেতে যার ফলস্বরূপ আসতে পারে আরেকটি স্নায়ুযুদ্ধ।

যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশল কিছু ক্ষেত্রে কাজে লাগতেও শুরু করেছে। ইউরোপীয়রা এখন চীনের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছে, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ খাতে। এছাড়া দক্ষিণ চীন সাগরে একটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করেছে ব্রিটেন। সদ্যসমাপ্ত ন্যাটো সম্মেলনেও চীনের বিরুদ্ধে কৌশল প্রণয়নের উপর বেশী গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জি-৭ সম্মেলনে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড পরিকল্পনার বিকল্পও হাজির করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চাইছে ইউরোপ তাদের সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য আরও বেশি আগ্রহী হোক। ন্যাটোতে জোরালো ভূমিকা রাখার জন্য এ জোটের পেছনে আরও অর্থ খচ করুক, এমনকি পূর্ব এশিয়ায় গণতন্ত্র রক্ষার মতো অজুহাতে তারা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশকেও টেনে আনতে পারে এই জোটে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য ন্যাটো জোটকে যেভাবে ব্যবহার করছে সেক্ষেত্রে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ন্যাটোর নতুন ভূমিকা ও মিশন নির্ধারণ করা। আর সেটা করতে গিয়ে বাইডেন প্রশাসন চীনের সাথে নতুন একটি স্নায়ুযুদ্ধের পথে হাঁটতে শুরু করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে বৈঠকের আগে জো বাইডেনের চেষ্টা ছিল ন্যাটো জোট যে যুক্তরাষ্ট্রের পেছনে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে সেটি দেখাতে চেষ্টা করা। ন্যাটোর বৈঠকটিকে যেভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছেন তিনি।

আর চীনও এবিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে সেটা সবারই জানা। ইতিমধ্যে চীনও প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছে। কয়েকটি দেশ মিলে বিশ্ব শাসনের দিন চলে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন চীন।

ন্যাটোকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের এই তৎপরতা অব্যাহত থাকলে এটি মোকাবেলায় বেইজিং ও মস্কো আরো কাছাকাছি আসবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ প্যারিসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক প্রফেসর ও আলজেরিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, শক্তি বাড়াতে ইউক্রেন ও জর্জিয়ার মতো দেশগুলোকে জোটে যুক্ত করতে পারে ওয়াশিংটন। আর ন্যাটোকে কাজে লাগানোর এই মার্কিন প্রক্রিয়া চীন ও রাশিয়াকে আরো ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করবে যার ফল হতে পারে আরেকটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধ। বিশ্ব আরেকটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হচ্ছে কি না সেটা অবশ্য সময় হলেই জানা যাবে তবে সেই সম্ভাবনাকেও যে কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা যাচ্ছে না!

তারেক হাসান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের একজন শিক্ষার্থী