‘চিহ্ন’—যেন একটুকরো রাজশাহী শহর। শহরটির মতোই সুন্দর সে। তার অজর শৈলীতে থাকে শীতলতা, ছড়িয়ে থাকে উন্মত্ত উচ্ছলতা। সাহিত্যচর্চার ছোটকাগজ, লেখকদের আঁতুড়ঘর। তার ‘শেষ পাতার আহ্বানে’লিখেছিও কয়েকবার। তো সেই লেখকতার সূত্রেই হোক কিংবা ব্যক্তি-সম্পর্কেই হোক ডাক পেয়েছিলাম ‘চিহ্নমেলা চিরায়তবাংলা’র। দেবেশ রায় এসেছিলেন। আমিও গিয়েছিলাম ভালোলাগার টানে। চেয়ারে বসে অনুষ্ঠান দেখছিলাম আমরা। আর আমাদের গায়ের ওপর ঝরে পড়ছিল আমের মুকুল। একবার মুকুলিত মঞ্চে উঠে তিনি গেয়ে উঠলেন, ‘তোমারে ডাকিনু যবে কুঞ্জবনে/ তখনও আমের বনে গন্ধ ছিল…।’

ছিল বলে আমারও মন উড়ে যাচ্ছিল রবিবাবুর বসন্তে। সেখানে কত রূপ যে অপরূপ হয়ে ফুটেছে, গীতমুখর কলকণ্ঠে গেয়ে উঠেছে কমলবরন মন, কে জানে সে কথা! কে জানে কোন অজানার অলকদোলায় তলিয়ে যায় ডানা মেলে দলে দলে আসা অলস ভ্রমর—ঘনপল্লবপুঞ্জে, বনমল্লিকাকুঞ্জে, বকুলবিছানো পথে? তবু ফাগুন যখন লেগেছে তখন মন এমনিই উন্মন হয়ে যায়, বয়ে যায় দখিনা হাওয়া। আমিও কখন কখন যেন গুনগুনাতে শুরু করি—’সহসা ডালপালা তোর উতলা যে ও চাঁপা, ও করবী!/কারে তুই দেখতে পেলি আকাশ-মাঝে জানি না যে…।’ এই যে আনমনা হয়ে যাওয়া, এ আর কতক্ষণের জন্য! ‘বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা রে/ দেখিস নে শুকনো-পাতা ঝরা-ফুলের খেলা রে…’।

তাই তো, যা জ্বলে তা তো নিভেও যায়। সকল ঘোরই কেটে যায় একসময়। সন্ধ্যা নেমে আসে। আমি উঠে পড়ি। প্যারিস রোড পাড়ি দিতে দিতে শুনি পাখিদের পাখা-ঝাপটানি, মিষ্টিমধুর গুঞ্জন। ঠিক তখন কোনো একজন স্বজন শোনান, ‘সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন…।’ মনে করিয়ে দেন জীবনানন্দের কথা। যাঁর টানে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই চেনা-অচেনা রূপসী বাংলায়। আকন্দ বাসকলতা ঘেরা এক নীল মাঠে গিয়ে বসি। শুনি, নদী শোনাচ্ছে ভাসানের গান। লক্ষ্মীপেঁচা গান গাইছে তার লক্ষ্মীটির তরে। সেই গানের সুরে দূরে-অদূরে চোখ মেলে চাই। দেখা যায়, সন্ধ্যায় হিম হয়ে এসেছে শালিখের ডানা। ডুমুরের গাছে, ছাতার মতন বড়ো পাতাটির নিচে বসে আছে সেই সাঁঝের শালিখ।

এদের নিয়ে কতকিছু বলে গেছেন জীবনানন্দ। লিখে গেছেন কত প্রিয় পঙক্তিমালা। সে শব্দমালায় হারিয়ে গিয়ে পূর্ণেন্দু দেখলেন—’রবীন্দ্রনাথের গানে যেমন ফুল, জীবনানন্দের কবিতায় তেমনই পাখি।’ নরেশ গুহ জানালেন, ‘…জীবনানন্দীয় অরণ্যপ্রকৃতি অসংখ্য প্রাণী পাখি কীটপতঙ্গের আসা-যাওয়ায় সতত চঞ্চল, প্রাণের নিছক উল্লাসে, অপচয়ে, আলস্যে স্পন্দিত হচ্ছে: থুরথুরে এক পেঁচা, একা পায়রা, অবিচল শালিখ, সোনালী চিল, কাকাতুয়া, মাছরাঙা, জলপিপি কিংবা দুরন্ত শকুন। সন্ধ্যার আঁধারে ঘুমের ঘ্রাণ-পাওয়া হাঁস—পুকুরপাড়ে; স্ফটিক পাখনা মেলা বোলতা—নীলিমায়; শাদা বক—নীল হাওয়ার সমুদ্রে। শিকারীর গুলির আঘাত এড়িয়ে জ্যোৎস্নায় বুনো হাঁস উড়ে যায়।’

উড়ে যায় নাকি উড়ে চলে যায়, হারিয়ে যায় আমাদের গান-গল্প-কবিতা থেকে? নাকি হারায় না, থেকে যায় স্ববিভায়, সমস্ত শিল্পীর কল্পনায় কারুকার্যে? জানতে মন চায় যতসব পাখি—শাদা পাখি, কালো পাখি, আলো আর আঁধারের পাখি—ডেকে উঠত সেই নির্জনতম কবির কবিতায়, তারা আজও ডাকে তো? যে হেমন্তকে জাগিয়ে তুলেছিলেন জীবনানন্দ—যাঁর কবিতায় কান পাতলেই অন্তহীন অরণ্যের মর্মর শোনা যায়, টের পাওয়া যায় ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে হেমন্তের ঝরা পাতা—তাঁর সে-হেমন্ত বেঁচে আছে তো আজও? আছে হয়তো; লুকিয়ে আছে অদেখায়। যে-কারণে এখন সৈকত হাবিবের হাতে লেখা হয়, ‘সে এক ঋতু ছিল আমাদের। নাম তার হেমন্ত!’

অলংকরণ রাজিব রায়