grand river view

।। জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

রাজশাহী নগরীর মহিষবাথান ডিঙ্গাডোবা এলাকার শিরিন আক্তার বিনা। মঙ্গলবার বেলা সাড়ে এগারোটায় আসেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে এসে সমস্ত প্রক্রিয়া শেষে যখন বুথে গেলেন ততক্ষণে টিকা শেষ। তিনি বলেন,“তারিখ অনুসারে নির্দিষ্ট মানুষকে টিকা দেয়ার জন্য ক্ষুদে বার্তা দিয়ে কেন্দ্রে আসতে বলা হয়েছে। অথচ নির্দিষ্ট সময় অর্থাৎ একটার আগেই টিকা শেষ।”

বেসরকারি চাকরিজীবী রহমত বলেন, “লম্বা লাইনে ঘন্টাখানেক দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরমধ্যে বার কয়েক স্বেচ্ছাসেবীরা ভিআইপি পরিচয় দিয়ে কয়েকজনকে সাথে নিয়ে গিয়ে টিকার ব্যবস্থা করালেন। এছাড়া আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে এসেও বেশ কয়েকজন লাইনে না দাঁড়িয়ে টিকা নিলেন। অথচ আমি টিকা পেলাম না। এই যে ভোগান্তি, এই যে দুর্ভোগ এটা কাকে জানাবো?”

মঙ্গলবার বেলা এগারটায় যখন প্রতিবেদক রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টিকাদান কেন্দ্রে পৌঁছান তখন মডার্নার টিকা নিতে আসা মানুষের ছিল উপচে পড়া ভীড়। স্বাস্থ্যবিধি মানার যে দূরত্ব সেটিও মানেননি লম্বা লাইনে থাকা ব্যক্তিরা। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে তখনও টিকা নিতে পারেননি আগ্রহী অনেকে। অধিকাংশের অভিযোগ, হাসপাতালে টিকা প্রদানে অব্যবস্থাপনা ছিল চরমে।

টিকা্ গ্রহীতাদের অনেকেই শংকা প্রকাশ করেন টিকা নিতে এসে কোভিড আক্রান্ত হন কি না!

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষিকা জানালেন, তিনি যে লাইনে ছিলেন সেখানে মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাদাগাদি করে অপেক্ষা করছিলেন। যেহেতু খুব কাছাকাছি অনেকে একসাথে ছিলেন সেহেতু তিনি কোনো না কোনোভাবে কোভিড পজিটিভ হতে পারেন।

তার অভিমত, একই ছাদের নিচে কোভিড-১৯ রোগীদের ওয়ার্ড ও টিকা প্রদানের বুথ। ফলে এখান থেকে করোনা আক্রান্ত হওয়া বিচিত্র নয়। তিনি বলেন,‘হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য মানুষ করোনা আক্রান্ত হচ্ছে সেটা গণমাধ্যমেই দেখতে পাচ্ছি, তাহলে সেখানেই কেন টিকা দিতে হবে। এটা বিবেচনা কে করবে?”

ক্ষুদে বার্তা বিড়ম্বনা

রাজশাহী নগরীর ৩ নং ওয়ার্ডের ৬০ বছর বয়সী মনোয়ারা বেগম। গত মাসের ৭ তারিখে টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন। টিকা গ্রহণের কেন্দ্রের নাম হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। গত এক মাস হয়ে গেলেও তিনি মোবাইলে কোনো ফিরতি মেসেজ বা ক্ষুদেবার্তা পাননি। আর তিনি সেটা দেখাতে না পারায় টিকাদান কেন্দ্র থেকে তাকে ফেরত যেতে হয়। ৭০ বছর বয়সী আফসার উদ্দিনেরও একই অবস্থা। বৃদ্ধ ব্যক্তিটি টিকা না পেয়ে অনুনয়-বিনয় করতে থাকেন। একপর্যায়ে একজন স্বাস্থ্যকর্মী তাকে পরামর্শ দেন সিটি কর্পোরেশনের ৫ তলায় স্বাস্থ্য বিভাগে যোগাযোগ করতে। সেখানে গেলে দ্রুতই মোবাইলে বার্তা আসবে।

পরে আফসার উদ্দিন মোবাইলে এই প্রতিবেদকে জানান, সেখানে গিয়েও লাভ হয়নি। সিটি কর্পোরেশন থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে এখানে মেসেজ সংক্রান্ত কোন কিছু দেখা হয় না, মেসেজ অটোমেটিক চলে যাবে মোবাইলে।

নিবন্ধনের পরও মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা না আসায় টিকা না নিয়েই ফেরত যাওয়ার সংখ্যা একেবারেই কম না। এ প্রতিবেদক টিকা কেন্দ্রে একঘণ্টা অপেক্ষা করে অন্তত দশজন মানুষকে ফেরত যেতে দেখেছেন। অবশ্য হাসপাতালের প্রবেশ পথেই পোস্টার সাটানো রয়েছে মোবাইলে মেসেজ না আসলে টিকা দেয়া হয় না।

তদবিরে মেলে বার্তা!

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক গত ২০ এপ্রিল নিবন্ধন সম্পন্ন করেন। এরপর ৮৩ দিন পার হলেও ফিরতি মেসেজ না আসায় তিনি সিভিল সার্জন অফিসে যোগাযোগ করেন। সেখানে কোনো সদুত্তর না পেয়ে যান সিটি কর্পোরেশনে। সেখানে পরিচিতজনকে জানাতেই মোবাইলে মেসেজ আসে।

এ প্রতিবেদকের কাছে অন্তত এমন তিনজনের তথ্য উপাত্ত আছে যারা তদবির করার পর টিকা নেয়ার বার্তা পেয়েছেন। অথচ আফসার উদ্দিন যোগাযোগ করেও বার্তা পাননি।

আফসার উদ্দিনের ছেলে মনোয়ার হোসেন দাবি করেন, ‘চট্টগ্রাম, ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্রে মেসেজ না আসলেও টিকা দিয়েছে। অথচ রাজশাহীতে দেয়া হচ্ছে না। আবার পদে পদে ভোগান্তি।’

এনিয়ে সিভিল সার্জন ডা.কাইয়ুম তালুকদার বলেন, “আমাদের কঠোর সিদ্ধান্ত মেসেজ না এলে, টিকা দেয়া হবে না। দীর্ঘ অপেক্ষায় কেন মেসেজ আসছে না সেটি জানা নেই।”

সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা . এফ.এ.এম. আঞ্জুমান আরা বেগম এর সাথে যোগাযোগ করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তদবিরে মেসেজ দ্রুত আসবে বা সিটি কর্পোরেশন থেকে মেসেজ পাওয়া যাবে এমনটি তার জানা নেই।

দ্রুত টিকা শেষ হওয়ার ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগের বক্তব্য, টিকাগুলো মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সিলিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষিত রয়েছে।এর থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক ডোজ টিকা প্রদানের জন্য আগেই গলিয়ে ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সিলিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়।সেকারণে টিকা নির্দিষ্ট সময়ের আগে ফুরিয়ে গেলেও পরদিনের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

সিভিল সার্জন ডা. কাইয়ুম তালুকদার বলছেন,“স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মানুষের উপস্থিতির কারণে প্রথম দিনে কিছুটা বিশৃঙ্খলা হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই হাসপাতালের বাইরে কেন্দ্র সরিয়ে নেয়ার সুযোগ নেই।”

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিসের হিসেবে, প্রথম দিনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক হাজার জনের মডার্নার টিকা প্রদান করা হয়েছে। এরমধ্যে নারী ৪৯২ জন ও পুরুষ ৫০৮ জন। উপজেলা পর্যায়ে সিনোভ্যাক্স-এর টিকা প্রদান করা হয়েছে ১ হাজার ৬’শ ৩৩ জনের। এরমধ্যে পুরুষ ৯৩২ ও নারী ৭০১ জন।

উল্লেখ্য, প্রথম ডোজের জন্য রাজশাহীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া মডার্না ইঙ্কের কোভিড-১৯ টিকা এসেছে ১ হাজার ৮০০ ভায়াল।একেকটি ভায়ালে ১০ জন অর্থাৎ ১৮ হাজার ব্যক্তি এ টিকা পাবেন। প্রথম দিন শেষে অবশিষ্ট রয়েছে ১৭ হাজার টিকা।