।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

লিওনেল মেসি জেতালেন আর্জেন্টিনাকে। আর কিছুক্ষণ পরেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে রাখবেন তার সেই জাদুছোঁয়ানো বুটজোড়া। পুরো স্টেডিয়াম হাসছে সে আনন্দে আর কাঁদছে ফুটবল দেবদূতের বিদায় মুহূর্ত বলে। সার বেঁধে মাঠে দাঁড়িয়ে সবাই। গ্যালারিতে দর্শকরাও দাঁড়িয়েছেন। মেসি! মেসি! মেসি! চারিদিকে ধ্বনিত হচ্ছে খুদে জাদুকরের নাম। ট্রফি উঁচিয়ে ধরলেন, চুমো খেলেন। তারপর সেই ট্রফিকে তুচ্ছ করা ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সবুজ গালিচাকে বিদায় জানালেন। মনে করুন, এই দৃশ্য ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালের!

সবটাই কল্পনা। কিন্তু বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, ছয়বারের ব্যালন ডি’অর জেতা, ইউরোপীয় ফুটবলে ছয়বারের গোল্ডেন শু জয়, ১০ লা লিগা জয়, ৭ কোপা দেল রে জেতা, ৪ উইয়েফা জয়, লা লিগায় সব থেকে বেশি গোল পাওয়া, সব থেকে বেশি হ্যাটট্রিক করা, জাতীয় দলের হয়ে সব থেকে বেশি গোল করা কিংবা ক্লাব-দেশ মিলিয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা একজন ফুটবলারের জন্য কি এমন কল্পনা অন্যায়? যে ফুটবলে এক অনন্য মাত্রার শিল্প এঁকেছেন তিনি, ফুটবল দেবতা যদি তার সেই বরপুত্রকে তার সব চাওয়া পাওয়া করে দেয়ার অমোঘ এক পাণ্ডুলিপি লিখে থাকেন! দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি যা দিয়েছেন, ফুটবল ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সেভাবেই তাকে তার প্রাপ্য ফিরিয়ে দিতেই পারে!

সে যে দিতে পারেই তার একটা ড্রেস রিহার্সাল বোধহয় এই কোপা আমেরিকাতেই হয়ে গেলো। মেসি দলকে ২৮ বছর পর শিরোপা এনে দিলেন, নিজে সেরা খেলোয়াড় আর সর্বোচ্চ গোলদাতা হলেন। সব থেকে বড় কথা, জাতীয় দলের নিঃসঙ্গ শেরপা এই টুর্নামেন্টেই দারুন সব সঙ্গী পেলেন! আর পর্দার আড়ালে কী দারুনভাবে মধুর প্রতিশোধটাও হয়ে গেলো!

কী সেই প্রতিশোধ? একটু মনে করুন। এই মারাকানা স্টেডিয়াম। ২০১৪ সাল। এই জুলাই মাস। সাত বছর আগে বিশ্বকাপ ফাইনালে এই মারাকানাতেই কান্নার সাগরে ডুবেছিলেন মেসি। সেই রক্তক্ষরণের দিনে মনে হচ্ছিলো, ফুটবলের সেই দেবদূতের হয়তো আন্তর্জাতিক খেলা থেকে শিরোপাছাড়া বিনা আড়ম্বরে বিদায় নেয়ার মুখোমুখি হতে হবে! আজ সেই মারাকানাই। সেই জুলাই! দিনের হেরফের হয়তো দুয়েকদিনের। আন্তর্জাতিক আসরে প্রথমবারের মতো দেশকে ট্রফি জিতালেন লিও। দুনিয়াজোড়া ভক্তদের একটুকরো প্রশান্তি এনে দিলেন। আর সম্ভাব্য সব ব্যক্তিগত ট্রফিও নিজের করে নিয়ে গেলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের ঘর থেকেই। মারাকানায় এর আগের ফাইনালেও তো মেসি গোল্ডেন বল জিতেছিলেন! তবে সেবার ট্রফিবঞ্চনার বেদনা ম্লান করে দিয়েছিলো সেই অর্জন। আর এবার সেই মাঠেই যেন সব অর্জন ঝলমলে হয়ে উঠলো খুদে জাদুকরকে ঘিরে।

কিন্তু প্রতিশোধের পরতে এতো এতো কাকতাল কীভাবে হলো? যেমন ধরুন, করোনার কারণে সহআয়োজকের ব্যাপারটা বাতিল না হলে তো এই মারাকানা স্টেডিয়ামে ফাইনাল হবারই কথা ছিলো না! কিন্তু সেটা হলো এবং মেসি জিতলেন। ফুটবল দেবতা কি তার দূতের পাণ্ডুলিপিটাকে এভাবেই সাজিয়েছেন? দুমুঠো ভরে যিনি ফুটবলকে দিয়েছেন, পাণ্ডুলিপির শেষটায় কি তার সব চাওয়া পূরণের কথাটুকুই লেখা আছে।

অনিশ্চয়তার পৃথিবীতে অনিশ্চয়তার খেলা। সব স্বপ্ন এখানে পূরণ হয় না, এটাই সত্য। কিন্তু তারপরেও কিছু কিছু নিশ্চয়তাকে মানুষ খুঁজতে ভালোবাসে। নইলে সংগ্রাম তো আর কম হলো না! এই কোপার কথাই ধরা যাক, ২০০৭ থেকে ৬ আসর খেলেছেন মেসি। তিনবার রানারআপ, একবার সেমিফাইনালিস্ট, আরেকবার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায়। বারবার পরাজিত হয়েও ফের বুক চিতিয়েই দাঁড়িয়েছেন লিও। ১৫টি কোপা জেতা দেশ হিসেবে উরুগুয়ের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছে আর্জেন্টিনা। আর ২০০৬ থেকে খেলা ৪টি বিশ্বকাপে একবার রানারআপ, দুবার কোয়ার্টারফাইনালিস্ট, আর একবার শেষ ষোলোতে বিদায়। কে জানে, ফুটবল দেবতা পঞ্চম আসরেই মেসিকে সব উজাড় করে দেয়ার পাণ্ডুলিপি তৈরি করে রেখেছেন কি না! নইলে যে রক্ষণ নিয়ে এতো দুশ্চিন্তা ছিলো, সেখানেই মার্টিনেজের মতো একজন সেভিয়ারকে হুট করেই বা কীভাবে পেলো আকাশী-নীলরা? যে কারণে কোচ স্কালোনিও বলছেন, মেসি যেমন আছে, তেমনই মার্টিনেজও আছে!

ফুটবলের বরপুত্রের বিশ্বকাপ যাত্রা ঘিরে এখন থেকেই তাই ফিসফাস শুরু। ২০২২ সালের নভেম্বরে যখন কাতার বিশ্বকাপ শুরু হবে, তখন মেসির ৩৫ বছর। মানে, বয়সের সঙ্গেও লড়াই করতে হবে তাকে! কোয়ালিফাইং রাউন্ডে আহামরি কোনো খেলা না দেখাতে পারলেও এখন পর্যন্ত ল্যাতিন আমেরিকার অঞ্চলে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মেসিরা। প্রথম চারটে দল সরাসরি খেলার সুযোগ পায় এখান থেকে। কাজেই বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইং নিয়ে খুব একটা দ্বিধা নেই। সে কারণেই ফিফা তাদের সামাজিক মাধ্যমের অফিসিয়াল পেজে কোপার শিরোপা জেতার পরপরই লিখেছে-‘এবার চোখ বড় ট্রফির দিকে’! বিশ্বকাপের সামনে সেখানে দেয়া মেসির ছবি! ফিফার অফিসিয়াল টুইট থেকে প্রশ্ন ছোঁড়া হয়েছে, ২০২২ বিশ্বকাপ কি মেসির?

তবে কল্পনা-স্বপ্ন যা কিছুই থাক। শেষ বিচারে মাঠের খেলাই বলে দেয়, ফল কী হবে। সামনের দিনগুলোতে এখন আর্জেন্টিনার নব উদ্যমে প্রস্তুতির সময়। কারণ ইউরোতে যে খেলা চলছে, তার সঙ্গে কোপার তুলনায় গেলে মেসিদের কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প নেই তা নিশ্চিত। তা, দেখাই যাক, শেষবেলায় আর কতটা অনন্য হয়ে উঠতে পারেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ পেলে তার সব চাওয়া পূরণ হবে। আর না পেলে? ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকারের ভাষায় বললে, ‘কোপা শিরোপা জেতা মেসির মতো অনন্য ক্যারিয়ারের একজন খেলোয়াড়ের জন্য একটা বাড়তি পাওয়া (আইস ওন কেক)!’ তা বটেই! কারণ এরই মধ্যে ফিফার সর্বকালের স্বপ্নের একাদশে ঠাঁই করে নিয়েছেন ম্যারাডোনার এই উত্তরসূরি।