grand river view

“টানা ২৮দিন লকডাউন চলছে। তার আগে ছিল বিধিনিষেধ। ব্যবসা-বাণিজ্য সব বন্ধ। সামনে কোরবানি ঈদ। এখন আমরা কী করবো?”

রাজশাহী ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফরিদ মামুদ হাসানের যখন এমন প্রশ্ন, তখন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নগরীর আরডিএ মার্কেটের সামনে ব্যবসায়ী-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের দোকান-পাট খোলার দাবিতে কর্মসূচি চলছে। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা ওয়ানটাইম থালা হাতে নিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন,‘ভাত দে,ভাত দে; নইলে লকডাউন তুলে নে”।

এর মধ্যেই আলোচনা, রাজশাহীতে করোনার প্রকোপ কমেছে কি না তা নিয়ে। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে করোনা শনাক্তের হার গেলো কদিনে কিছুটা কম থাকায় অনেকেই একে করোনার প্রকোপ কমেছে বলে মনে করছেন। কিন্তু এক ক্ষেত্রের এই পরিসংখ্যান দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি আদৌ বোঝা সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মাস খানেকের লকডাউনেও করোনা ভয়ংকর  

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর পরিসংখ্যান বলছে, গত এক মাসে করোনার প্রকোপ কমা দূরে থাক, বরং দুর্বার গতিতে বেড়েই চলেছে। জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে মৃত্যুর হার বেড়েছে দ্বিগুন। আগের তুলনায় দ্বিগুন বেড়েছে উপসর্গে মৃত্যু। রাজশাহী জেলার চিত্র আরো ভয়ংকর। অবশ্য নমুনা পরীক্ষায় আক্রান্তের হার নিম্নগামী।

মৃত্যুর হিসাব-নিকাশ

চলতি জুলাই মাসের প্রথম ৯ দিনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছে ১৫৭ জন। এরমধ্যে করোনা প্রমাণিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ৪৫ জন। কোভিড লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে ১১২ জন।

এ মাসে করোনায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাজশাহী জেলার বাসিন্দা মারা গেছেন ৮১ জন। এদের মধ্যে করোনার লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে ৫৬ জন। করোনা প্রমাণিত হয়ে মারা গেছেন ২৫ জন।

আগের মাসের অর্থাৎ গেল জুন মাসের প্রথম ৯ দিনে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গিয়েছিলো ৭৯ জন। এরমধ্যে করোনা পজিটিভ ছিল ৪৯ জন। আর উপসর্গে মারা গিয়েছিলেন ৩০ জন। জুনের একই সময়কালে রাজশাহী জেলার বাসিন্দা মৃত্যুবরণ করেছিল ২৮ জন।

জুনের শুরুর ৯ দিনে ৭৯ জন মৃত্যুবরণ করেছে। একই সময়কালে জুলাই মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৫৭ জনের। অর্থাৎ তুলনা করলে চলতি মাসে একই ৭৮ জন বেশি মৃত্যুবরণ করেছে। অর্থ্যাৎ মৃত্যু বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুন।

জুনের প্রথম ৯ দিনে করোনা উপসর্গে মারা যায় ৩০ জন। জুলাই-এ মারা গেছে ১১২ জন। এমন মৃত্যুর ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ জন। অর্থ্যাৎ উপসর্গে মত্যুর হার এই সময়ে বেড়েছে প্রায় চারগুন।

৯ জুলাই পর্যন্ত রাজশাহীতে মৃত্যুবরণ করেছে ৮১জন। একই দিন পর্যন্ত জুন মাসে মারা গিয়েছিল ২৮জন। এ জেলায় এই সময় মৃত্যুর সংখ্যায় ব্যাবধান ৫৩ জন, অর্থ্যাৎ বেড়েছে ৩ গুন।

আক্রান্তের হারে ব্যবধান

জুন মাসের প্রথম ৯ দিনে করোনা নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ৯দিনের গড় হিসেবে নমুনা পরীক্ষার অনুপাতে আক্রান্তের হার ৩৩ শতাংশ।

জুলাই মাসের প্রথম ৯ দিনে করোনা নমুনা পরীক্ষায় সনাক্তের হার ক্রমেই নিম্নমুখী। গড় হিসেবে নমুনা পরীক্ষার অনুপাতে আক্রান্তের হার ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ পরিসংখ্যান অনুযায়ী এই সময়ে, আক্রান্তের হার কমেছে প্রায় আট ভাগ।

প্রতিবেদনের শুরুতে রাজশাহী ব্যবসায়ী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফরিদ মামুদ হাসানের সেই প্রশ্নের উত্তরে আক্রান্তের হার কমার পরিসংখ্যানটি ইতিবাচক বলে বিবেচিত হয়। কিন্তু আক্রান্ত যখন কমছে তখন মৃত্যুর হার কেন দ্বিগুন থেকে তিনগুন বেড়েছে সেই প্রশ্ন তুলছেন খোদ জনস্বাস্থ্যবিদরা। নিজেদের প্রশ্নের উত্তরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্বিকভাবে আক্রান্তের হার কম মনে হলেও এটা বাস্তব চিত্র নয়।

বাস্তব চিত্র তাহলে কী?

রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিসের দেয়া তথ্যের পর্যালোচনায়, জুনে রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে জনসংখ্যার তুলনায় নমুনা পরীক্ষার হার মাত্র দশমিক তিন শূন্য শতাংশ। গড় হিসাব বলছে, পুরো মাসে একেকটি উপজেলায় প্রতিদিন মাত্র ২৬ জন করে মানুষের র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হয়েছে। একই চিত্র জুলাই মাসেও। ফলে করোনা সংক্রমিত গ্রামের রোগীদের সিংহভাগ জানতেও পারছেন না সংক্রমণের কথা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিংহভাগ মানুষ করোনা পরীক্ষার বাইরে থাকলেও আক্রান্ত হওয়া থেমে নেই। যেহেতু আক্রান্ত হচ্ছে, সেহেতু মৃত্যুবরণ করছে। বিষয়টা হচ্ছে পরীক্ষা না হওয়ায় তারা আক্রান্তের হিসেবে উঠছে না। আর এতেই আক্রান্তের হার কম মনে হচ্ছে।

এদিকে হাসপাতালে এসে মৃত্যুবরণ করায় মৃত্যুর হিসেব ঠিকই লিপিবদ্ধ হচ্ছে। সেকারনে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। অন্যদিকে পরীক্ষা না হওয়ায় মৃত্যুবরণ করলেও চূড়ান্ত সরকারি হিসাবে বেশিরভাগ আক্রান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না। এতে করোনা লক্ষণধারীদের বা উপসর্গে মৃত্যুবরণকারীদের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. চিন্ময় কান্তি দাস বলেন, বর্তমানে যে পরিস্থিতি সেটি খুবই গুরুতর। এই পরিস্থিতিতে লকডাউনের চেয়ে স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে মানা খুবই প্রয়োজন। তার মতে, করোনা সংক্রমণের পর তার উপসর্গ প্রকাশ পেতে যে সময়টুকু লাগে সংক্রমণ কমেছে, নাকি ভবিষ্যতে কমার ইঙ্গিত আছে, তা বুঝতে সেই সময়টুকু মাথায় রাখতে হবে।

রাজশাহী সিভিল সার্জন ডা. কাইয়ুম তালুকদার বলেন, “গ্রামঞ্চলে করোনা পরীক্ষা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একইসাথে গ্রামের মানুষদের সচেতন করতে উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে। সেখানে পালস অক্সিমিটার পাঠানো হচ্ছে। খুব দ্রুত সকলকে টিকা দেয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ চেষ্টা করছে পরিস্থিতি আয়ত্বে আনার।”