শূকরগুলো ওর কথা শোনে। নদীর পাশে কচুখেতে দলটি চলতে চলতে একটু ক্লান্তির ভাব নিয়ে গতি কমিয়ে দিলে, দূরে বটগাছের নিচে হাতের লাঠি, ছাতা, ব্যবহারের ঝোলা রেখে ওকে দেখা যায় শরীর এলিয়ে ঝিমিয়ে নিচ্ছে। বটের ডালে চড়ুই, ঘুঘু, দোয়েল, কোকিল রয়েছে। বটের ফল পেকে এসেছে। ও পাখিদের গান শোনে। দুপুর পড়ে গেলে ও উঠে দাঁড়ায়। শূকরগুলো ওকে লক্ষ্য করে, তারপর ওর পেছনে পেছনে চলতে থাকে। গোটা সন্ধ্যা ওরা হাঁটতে থাকে। মহাসড়কের পাশে কাঁচা নয়ানজুড়ি ওদের চলাচলের পথ। হেডলাইটের আলোতে ওদের দেখা যায়। প্রাচীন ছায়ার মত ওরা মুখ গুঁজে আছে মাটিতে। চলতে চলতে চাঁদ উঠে আসে। ভরা জ্যোৎস্নায় সমস্ত চরাচর জেগে ওঠে। অর্জুনগাছগুলোর পাশে একটা বাঁশের বন শূকরগুলো খাবারের সন্ধানে বনে ঢুকে যায়। ও দুটি অর্জুনের ডালে চটের বস্তাটা খাটিয়ার মতো টাঙিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

সেই স্বপ্নটা উঠে আসে। জঙ্গলের মাঝখানে একটা রাজবাড়ি। খা খা দুপুর। রাজবাড়ি শূন্য। শূন্য মাঠ, শূন্য আকাশ। চুরকা মহলের ভাণ্ডারে ঢুকে যায়। কোথাও কেউ নেই। ভাণ্ডারে থরে বিথরে সাজানো মণিমুক্তা, স্বর্ণ, অলংকার, মুদ্রা। দ্রুত স্বর্ণমুদ্রার কলস নিয়ে পালিয়ে আসে চুরকা। পালাতে পালাতে কোথা থেকে যেন মহাজন এসে দাঁড়ায়!

এ অবস্থায় এসে চুরকার ঘুম ভেঙে যায়।

২.

গতকাল‌ই মনে হয়েছিল মহাজনের কাছে যেতে হবে। কাগজে টিপছাপ নিয়ে যে কাগজটা নিয়েছিল মহাজন, ওটা নিতেই হবে। আর স্বপ্নে দেখা কলস-ভরা সোনা নাকি বাস্তবে পাওয়া সোনা, চুরকা ঠাওর করতে পারে না। ঐ বিষয়টাও মহাজনের সঙ্গে রফাদফা করতে হবে।

চুরকা নিজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মহাজনের বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ায়। খাটিয়া থেকে একটু উঠে মহাজন চুরকার দিকে তাকায়। চুরকা তীব্র উত্তেজনায়  থাকলে কথা এলোমেলো করে ফেলে।

মহাজন হে, মোর কাগজটা দিয়ে দে।

মহাজন হাসতে হাসতে বলে, তুই কাগজ দিয়া ফির কী করিবু! কাগজ কী তুই খাবু!

না রে মহাজন তুই একেলাই খা।

তাই কি মোর আপনজন নহে?

মুই তোর আপন হ‌ইলে ফের হামার শুকূরগুলানের কে দেখিবে! শুকূরের আপন কে আছে!

আরে পাগেলা, শুকূরগুলার কাথা থো। তুই মোর আপন, তোর থাকিবার জমি নাই, সেই ব্যবস্থা মুই করিছু।

মোর জমি লাগিবে না হয়। তুই মোর টিপছাপ ফিরাই দে। মোর ছাপ তোর টে থাকিলে, মোর স্বপ্নে তুই চলি আসিস। মোর বনে-জঙ্গলে ঘুরিবার তনে হামার মনে পড়ে সে সোনা-ভরা কলসির কথা। তোর ফম পরে ঐ যে হামি সোনার কলস পাইনু। জঙ্গলের ভেতর রাজার বাড়ি থাকি!

হে, তার পর কী হ‌ইল?

কী আর হ‌ইল!  তুই আমার ঠে কলসা লিয়া চলি গেলি!

হামি নিয়া চলে গেনু!

এখন তো কহিবু তুই লিসনি!

চুরকা, তোর মাথা গেইচে!

হে মহাজন হামি আজ কুনো নিশা খাই নি। তে, মোর কাগজঠা দিস না কেনে !

আরে, ঐটা তু তোর জমির কাগজ।

মোর জমি লাগিবে না। মোর কাগজ ফেরত দে।

এবার, মহাজন চুরকার দিকে তাকিয়ে ফিক ফিক করে হাসে। মনে মনে ভাবে, এ দিনের বেলা মেলাই মাল খাই লিসে চুরকা।

৩.

জঙ্গলের ভেতর ঢুকতেই ওর গা ছমছম করে ওঠে। শাল-সেগুনের শুকনো পাতার মচমচ ধ্বনি একটা নিস্তব্ধতার ভেতর ভয়াল মুহূর্তকে টানতে থাকে।

সমস্ত দুপুর বনের বাইরে শূকরগুলো কচুখেতে চড়তে চড়তে বিকেলে ঢুকে পড়ে ভেজামাটির নরম একটা ঢালু পথ ধরে। রোদ বনের শিমুলগাছের নিচে টুকরো কাচের মতো পড়ে আছে। শূকরগুলোর পেছনে পেছনে চুরকা এসে দাঁড়ায় শালসেগুনের শুকনো পাতার স্তূপের ওপর। ওর মানুষের সাথে চলাচল কম। তবে স্মৃতির পাতায় মানুষ‌ই জেগে আছে। জেগে আছে শৈশবের দিন। বেড়ে ওঠার যাতনা, অন্নসংস্থানের নানা কৌশল, বড়লোকদের অবহেলা, টাকার জন্য হন্নে হয়ে ঘোরাঘুরি, পূজা-উৎসব, মেলায় মেলায় ছোটা। ভাবতে ভাবতে কালিকেষ দাদুর কথা মনে পড়ে…! সেই গল্পটা মনে পড়ে… এক কৃষকের একটা ঘোড়া হারাই গেইছে। পড়শিরা সব এলো। সান্ত্বনা দিলো—আহা, বেচারার কপালটাই খারাপ হে।

বুড়া কহিলো—হ‌ইতে পারে গো।

পরদিন ঘোড়াটা দেখো যে, তিনটা বন্যঘোড়া লিয়ে ফিরে আসলো। পড়শিরাও আসলো। পানে চুনা লাগাতে লাগাতে মেলা হাসলো। তারপর কহিলো—বাপু হে, তোমার তো পুরা চানকপাল গো।

বুড়া কহিল—হ‌ইতে পারে গো।

দুইদিন পরেই বুড়ার ছেলেটা ঘোড়ায় চড়তে গিয়া খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঘরে ফিরা আইলো। মানুষগুলা পানের পিক ফেলতে ফেলতে আফসোস করি কহিল—বুঝলা গো, কপালে থাকতে হয়।

এবার, বুড়া ফের কহিল—হ‌ইতে পারে গো।

এর কয়দিন পরেই লাল বাহিনীর ফৌজগুলা এসে গ্রামের সব জোয়ান ছেলেপিলেরে যুদ্ধের জন্য নিয়া গেইলো। বুড়ার খোঁড়া ছেলেটাই পাড়ায় থাকি গেইলো। সবাই এসে দেখে গেলো। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কহিল—একিই কহে কপাল গো।

বড়া এবারো কহিল—হ‌ইতে পারে গো।

কালিকেষ দাদুর গল্প মনে করতে করতে চুরকা হেঁটে চলে। সামনের নরম মাটিতে শূকরগুলো মুখ চালায়।

মহাজনের হাত থেকে শূকরগুলো নিয়ে পালিয়ে যেতে চায় চুরকা। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কোনো জায়গা নেই, যে মহাজনের হাত থেকে বাঁচা যায়। মহাজনের গ্রাস ‌ও থাবা প্রসারিত করে আছে সমস্ত বিশ্বচরাচর। চুরকা শূকরের সাথে জীবন পার করলেও শূকরগুলো মহাজনের। চুরকার পেট বন্দি হয়ে আছে মহাজনের কাছে। চুরকার মানুষের সমাজ না থাকলেও মহাজনের জালে আবদ্ধ। শূকরগুলোও স্বাধীন নয়, ওদের জীবনচক্র মহাজন নিয়ন্ত্রণ করে, যদিও চুরকাকে নিয়ে ওরা ঘুরে বেড়ায়। মহাজনের লোকেরা এসে বাছাই করা শূকর নিয়ে যায়। টাকার বিনিময়ে মানুষের বাইরে থাকা শূকরগুলো চলে যায় মানুষের বাজারে বাজারে! চুরকা এমন‌ই ভাবতে ভাবতে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় পালিয়ে যাবে।

এই পালানোর পরিকল্পনা ওর বহুদিনের। সূর্যকে ঘড়ি বানিয়ে চুরকা সময়ের ভেতর পালাতে চায়। কিন্তু সময় মহাজনের হাতে ধরা। মহাজনের সময় গ্রাস করে নিচ্ছে দিনরাত। চুরকা দিনরাত নিঃসঙ্গ থেকেও বন্দি! চুরকার ঘর নেই; প্রেম নেই, নেই সংসার—তবুও বন্দি। সহসাই এই বনে এসে চুরকার মন বদলে যায়। —এতো বড় জঙ্গলে, বনের মধ্যে মহাজন আমায় খুঁজে পাবেক নাই। শুকুরগুলা গহীন জঙ্গলে ঢুকে যাইবে, হামিও যাইবেক।

হাঁটতে হাঁটতে গভীর জঙ্গলে চলে আসে চুরকা। মাঝে মাঝে পাখপাখালি, পশুদের ডাক ওঠে। সন্ধ্যার আগে একটা দুর্গ দেখতে পায়। তবে একটা নদী, দূর্গটাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। শূকরগুলো ওর পেছন থেকে বেরিয়ে এসে পাশের একটা খালে নেমে পড়ে। গাছ থেকে গাছে সতেজ বাতাস—ওর দীর্ঘ যাত্রা শেষে স্বস্তি দেয়। ও হঠাৎ  এমন এক প্রান্তরে এসে খালের এ প্রান্তে আটকে যায়! একটা আবিষ্কারের মতো রহস্যময় দুর্গের এক প্রান্তে এসে নিজেকে স্বাধীন মনে হয় চুরকার!

হঠাৎ এক ভিক্ষু ওপার দিয়ে ফিরছিলেন, পার হওয়ার উপায় খুঁজতে গিয়ে বলে, ওপারে কীভাবে যাইবো হে! ভিক্ষু নদীর দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, দরকার কী? তুমি তো ওইপারেই আছো হে! বলেই ভিক্ষু হারিয়ে যায়!

চুরকা ওর পায়ের নিচে পড়ে যাওয়া পাতাটি অনুভব করলো এবং দূর থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল দুর্গের দিকে।

অলংকরণ শিবলী নোমান