মুরাকামির গল্প পড়তে গেলে একটা ব্যাপার হয়। আমার ধারণা পাঠকের এই ‘একটা ব্যাপার হওয়ার’ ব্যাপারটা মুরাকামি জানেন এবং তিনি সচেতনভাবেই ব্যাপারটা হওয়ান। আমার এ-ও ধারণা যে চৌকস এই কথাশিল্পী একজন কল্পিত পাঠককে সঙ্গে রেখে তার গল্প এগিয়ে নেন। পাঠক-বিচ্ছিন্ন একটা নিজস্ব অবস্থান থেকে একটা পথ তৈরি করে একা একা সেই পথে হাঁটার কথাশিল্পী তিনি নন। অন্যভাবে বলা যায় যে তার ক্রাফটসম্যানশিপ অত্যন্ত সচেতন যা পাঠকের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া ও সংবেদনশীলতার সাথে যুক্ত থেকে আগাতে চায়। তো এই যে ‘একটা ব্যাপার হওয়া’ সেটা কী? সেটা হলো এই যে মুরাকামির প্রায় সবগুলা গল্পেই প্রথম প্যারাটা, বিশেষ করে প্রথম দুই-তিনটা বাক্য পাঠককে বেশ একটা ধাক্কা দেয়।

প্রথম বাক্যে ধাক্কার পর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বাক্যে সেই ধাক্কাটার বিস্তার ঘটান লেখক। পাঠক প্রথম বাক্যটা পড়ার পর দ্বিতীয় বা তৃতীয় বাক্যের বিস্তৃতি পর্যন্ত গিয়ে নিজের অজান্তেই গড়াতে গড়াতে লেখকের তৈরি গল্প-খাদে পড়ে যান, আটকা পড়েন একটা অনিন্দ্য ন্যারেটিভের জাদুর ভেতর; এরপর ধীরে ধীরে তারা পরিচিত হতে থাকেন গল্পের প্রেক্ষাপট, চরিত্র, নানাবিধ অনুষঙ্গ আর লেখকের ছোট ছোট দর্শনের সাথে। আর এই পুরো কাজটা লেখক করেন তার বহুদিন ধরে আস্তে আস্তে সময় নিয়ে তৈরি করা গল্প-ভাষা দিয়ে। আমি মনে করি মুরাকামির বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার একটা অন্যতম কারণ হলো আধুনিক সময়ের ব্যস্ত পাঠককে প্রথম কয়েকটা বাক্যেই গল্পে গেঁথে ফেলার এক আশ্চর্য ক্ষমতা যার চোরা-মুগ্ধ টানে পাঠক গল্পের ভেতরে না ঢুকেই পারেন না।

মুরাকামির ভাষায় একটা সরল সহজতা আছে, আছে কিঞ্চিৎ তরলতাও তবে একই সাথে আছে বিস্ময়কর জীবনদর্শন। ব্যাপারটা অনেকটা কাচ-স্বচ্ছ দীঘিতে সন্তরণের মতো। সেই দীঘির তলদেশটা আবার জাদু-কুয়াশায় ঘেরা গুল্মলতা-পূর্ণ। সেই কুয়াশাঘেরা অজানা গহীনের হাতছানি পাঠককে দেয় একটা মোহনীয় পাঠ-অভিজ্ঞতার প্রতিশ্রুতি। শুধু তাই না, দীঘির উপরের পানিতেও থাকে ঢেউয়ের নানা সূক্ষ্ম কারুকাজ আর আলোর নকশা। পাঠক সেই দীঘিতে সাঁতার কাটেন বেশ ঝরঝরে একটা আরাম নিয়ে; এরপর এর তলদেশে প্রবেশের জন্য অপেক্ষায় থাকেন একটা ভারহীন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, সাথে থাকে দীঘির তলদেশ আবিষ্কারের কৌতূহল। পাঠককে এই অবচেতন নির্ভারতায় দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে পারার ক্ষমতাটা মুরাকামির জনপ্রিয়তার দ্বিতীয় কারণ বলে মনে করি।

এই লেখাটাতে মুরাকামির গল্প-ভাষা নিয়ে আমার উপরের পর্যবেক্ষণগুলোর উদাহরণ টানতে আমি বেছে নিয়েছি লেখকের অন্যতম জনপ্রিয় গল্প ‘শেহেরজাদি’-কে। তো তাহলে শুরু করা যাক—

‘শেহেরজাদি’ গল্পটার প্রথম লাইনটা (ইংরেজি অনুবাদে) দেখা যাক—

‘Each time they had sex, she told Habara a strange and gripping story afterward.’

বাংলা অনুবাদ: ‘প্রতিবার সেক্স করার পর মেয়েটা হাবারাকে একটা অদ্ভুত টানটান গল্প বলে।’

লক্ষ্য করুন যে এই একটা বাক্যেই পাঠক গেঁথে গেছেন গল্পটায়। তার অবচেতনে নানা প্রশ্ন ও ভাবনা তৈরি হয়, যেমন—

(ক) মেয়েটা কে?

(খ) কেন সে সেক্সের পরে গল্প বলে?

(গ) পুরুষটা কে? তাকে তো মেয়েটার স্বামী বা প্রেমিক মনে হচ্ছে না।

(ঘ) সেই অদ্ভুত আর টানটান গল্পগুলো কার গল্প?

এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় লাইনে লেখক প্রথম লাইনের ধাক্কাটাকে বিস্তৃত করেন—

‘Like Queen Scheherazade in A Thousand and One Nights. Though, of course, Habara, unlike the king, had no plan to chop off her head the next morning. (She never stayed with him till morning, anyway.)’

বাংলা অনুবাদ: ‘যেমনটা রাণী শেহেরজাদি বলতো ‘এক হাজার এক রাত্রি’র গল্পে। যদিও আরব্য রজনীর সেই রাজার মতো পরেরদিন সকালে রাণীর মাথা কেটে নেয়ার কোনো পরিকল্পনা হাবারার ছিল না (অবশ্য মেয়েটা হাবারার সাথে কখনো সকাল পর্যন্ত থাকে না)।’

পাঠকের আগ্রহ এবার তুঙ্গে। তারা এবার মোটামুটি নিশ্চিত যে মেয়েটা আর হাবারা স্বামী-স্ত্রী বা বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড নয় কেননা মেয়েটা কখনোই সকাল পর্যন্ত থাকে না। কিংবা সেরকম কোনো সম্পর্ক হলে সেক্সের পরে গল্প বলার ব্যাপারটা হয়তো লেখক এত আয়োজন করে বলতেন না।  অর্থাৎ পাঠক এদের দুইজনের সম্পর্কের একটা গোপন অ্যাঙ্গেল সন্দেহ করছে। আবার মেয়েটার  সাথে আরব্য রজনীর রাণীর প্রসঙ্গ টেনে লেখক পাঠকের কৌতূহলে আরেকটা আস্তরণ তৈরি করেছে; পাঠক জানতে চায় কেন এই তুলনা।

প্রথম প্যারার পরিশিষ্ট দুই লাইন—

She told Habara the stories because she wanted to, because, he guessed, she enjoyed curling up in bed and talking to a man during those languid, intimate moments after making love. And also, probably, because she wished to comfort Habara, who had to spend every day cooped up indoors.

বাংলা অনুবাদ: মেয়েটা হাবারাকে গল্প শোনায় কারণ সে গল্প শোনাতে চায়। হাবারার ধারণা সেক্সের পরের ভারহীন একান্ত মুহূর্তগুলোতে বিছানায় গুটিসুটি হয়ে শুয়ে একটা পুরুষকে গল্প শোনাতে মেয়েটা দারুণ পছন্দ করে। অথবা সে হাবারাকে কিছুটা স্বস্তি দিতে চায় যার প্রতিটা দিন কাটে নিজের বাসায় আত্ম-বন্দি থেকে।

গল্পটার প্রথম প্যারাতেই এসব নানা সম্ভাব্য প্রশ্ন ও ধারণায় নিজেরই আগ্রহের ঘেরাটোপে বন্দি হন পাঠক। লেখক যে এই এক প্যারাতেই পাঠকের মনোযোগ বন্দি করে ফেলেছেন এটা সচেতনভাবে বুঝে ওঠার আগেই ঘোরগ্রস্ত পাঠক ঢুকে পড়েন একটা ক্র্যাফটেড ন্যারেটিভের ভেতর। ভীষণ শীতল আর নৈর্ব্যক্তিক এক ভাষায় লেখক বলে যান একাকীত্ব, পরকীয়া, বয়ঃসন্ধিকালের তীব্র মনোদৈহিক আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসাহীন সঙ্গম আর দৈনন্দিনতার এক গল্প। ধীরে ধীরে পাঠক জানতে পারেন যে হাবারা একজন অকৃতদার নিঃসঙ্গ পুরুষ আর শেহেরজাদি (হাবারার দেয়া নাম) দুই সন্তানের মা একজন বিবাহিত নারী যিনি পেশায় একজন লাইসেন্সড নার্স।

গল্পের শুরুতে আমরা দেখি যে হাবারার সাথে শেহেরজাদির সপ্তাহে দুইদিন নিয়ম করে দেখা হয়। শেহেরজাদি হাবারার জন্য গ্রোসারি করে নিয়ে আসে আর ঘরে ঢুকে সেগুলো সাজিয়ে রাখে কিচেন আর ফ্রিজে। এই মূল চরিত্রের নৈমিত্তিক জীবনের বর্ণনা ছাড়া আমরা এ পর্যায়ে আর তেমন কিছু পাই না। কিন্তু আমরা বিরক্ত হই না কারণ আমরা জানি একটা গল্প আসছে সামনে। বলা যায় দৈনন্দিন জীবনের এই আটকাহনের ছলে মূল গল্পটাকে পিছিয়ে দিয়ে পাঠকের অপেক্ষাকে আরও টান টান করে তোলেন লেখক। মূলত এই সময়টুকুতেই লেখক তৈরি করতে থাকেন মূল গল্পের মঞ্চটাকে।

আমরা যখন শেহেরজাদির গল্পে প্রবেশ করি তখন জানতে পারি যে শেহেরজাদি নিজের ফেলে আসা জীবনের ‘আমি’-কে তুলনা করে একটা সামুদ্রিক বানমাছের সাথে। সে বলে যে বানমাছের কোনো চোয়াল নেই আর তারা শিকারকে শুষে নেয় তাদের পায়ী দিয়ে, যেটা তাদের একমাত্র শিকারাস্ত্র। শেহেরজাদি এ-ও বলে যে রোমানরা তাদের পুকুরে বানমাছ পালতো গোঁয়ার দাসদেরকে বানমাছ দিয়ে জ্যান্ত খাওয়ানোর জন্য। শেহেরজাদির বানমাছের সাথে নিজেকে তুলনা করায় আমরা আগ্রহী হয়ে উঠি শেহেরজাদির আগের জীবন সম্পর্কে: কেন সে নিজেকে বানমাছ বলছে আর কাকেই বা সে খেয়ে ফেলেছে বা ফেলতে চেয়েছে? মুরাকামি পাঠকের এই কৌতূহল বুঝতে পেরে সেটাকে উসকে দিতেই যেন শেহেরজাদিকে দিয়ে বলান—

It was just like that. My suckers stuck to a rock underwater and my body waving back and forth overhead, like the weeds around me. Everything so quiet.

(বাংলা অনুবাদ: ব্যাপারটা এরকম ছিল। আমার পায়ীগুলো পানির নিচের একটা পাথরের সাথে লেপ্টে থাকতো আর তার ওপরে আমার শরীরটা সামনে পেছনে আসা-যাওয়া করতো। চারপাশ থাকতো নিস্তব্ধ।)

পানির নিচের বানমাছের এই বর্ণনার ভেতর দিয়ে আমরা স্রেফ বর্ণনাই পাই না। বরং বানমাছের মতো শাহজাদির এই লেপ্টে থাকার ভেতরে আমরা অবচেতনেই একটা যৌনভঙ্গি আবিষ্কার করি। নিজেকে এভাবে তুলে ধরে শাহজাদি আসলে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে? কেনই বা দিচ্ছে? তার সাথে হাবারার সম্পর্কটা কি একেবারেই কেজো আর ভালোবাসাহীন?

লেখক আমাদের জানান যে শেহেরজাদি তার গল্পগুলো একদিনে শেষ করতো না এবং হাবারাকে অপেক্ষায় রাখতো তাদের পরবর্তী দিনের জন্য। ঠিক যেভাবে আরব্য রজনীর শেহেরজাদি এক রাতের গল্পের পরের অংশ রেখে দিত পরের রাতের জন্য। কিন্তু আরব্য রজনীর শেহেরজাদির জন্য গল্প বলে যাওয়াটা ছিল জীবনের নামান্তর, গল্প থেমে গেলেই রাজা তাকে মেরে ফেলবে। কিন্তু মুরাকামির গল্পের শেহেরজাদি কেন গল্প শেষ করতো না? হাবারা তো বলছেই যে শেহেরজাদি গল্প থামিয়ে দিলে তাকে হত্যার কোনো পরিকল্পনা তার নেই। সে নিতান্তই নিরীহ এক একাকী অন্তর্মুখী মানুষ।

তাহলে কি শেহেরজাদি ভাবতো যে গল্প শেষ করে দিলে হাবারা আর তার পরবর্তী আসার দিনের জন্য অপেক্ষা করবে না। যৌন আকর্ষণের চেয়েও কি গল্পের আকর্ষণ তাহলে বেশি? না-কি গল্পগুলোই যৌন আবেদনকে জিইয়ে রাখে বা বাড়িয়ে তোলে? এই প্রসঙ্গে লেখক বলছেন­—

The other thing that puzzled him was the fact that their lovemaking and her storytelling were so closely linked, making it hard, if not impossible, to tell where one ended and the other began.

(বাংলা অনুবাদ: ওদের সেক্স আর গল্প-বলা ব্যাপার দুইটা একে অন্যের খুব কাছাকাছি। কোথায় একটার শেষ আর আরেকটার শুরু সেটার সীমানা নির্ধারণ করা হাবারার জন্য কঠিন ব্যাপার।)

এটা ঠিক যে পাঠক এরই মধ্যে লেখকের চরিত্রদের সাথে পরিচিত হয়ে তাদের কাজকর্ম বোঝার চেষ্টা করছেন। তবে একটা গল্পের কাছে লেখক গল্পই চায়—স্রেফ বর্ণনা নয়। অর্থাৎ বর্ণনা, পর্যবেক্ষণ, সংলাপ তার যতোই ভালো লাগুক বেশিরভাগ ফিকশনের পাঠক শেষমেশ গল্পের জন্যই মুখিয়ে থাকে। তাই আপাত গল্পহীনতায় গল্পের ঠিক যে জায়গায় পাঠকের কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় ঠিক সেখানেই লেখক বর্ষার ফলার মতো একটা বাক্য শেহেরজাদিকে দিয়ে বলান আর সেটা হলোটিনএজ বয়সে শেহেরজাদির একটা অভ্যাস ছিল মানুষের খালি বাড়িতে ঢুকে পড়ার।

এই বাক্যে ঝিমিয়ে পড়া পাঠক আবার সোজা হয়ে বসেন। একটা ধীর, সৌম্য বয়ানের ভেতর আমরা পিছলে ঢুকে যাই শেহেরজাদির জীবনের সেই সময়টায় যখন সে তারই সহপাঠী এক সুদর্শন কিশোরের প্রেমে পড়েছিল। এক অদ্ভুত, দুর্দমনীয় শারীরিক-হার্দিক আকর্ষণে শেহেরজাদি বারবার ফিরে যেত সেই কিশোরের খালি বাড়িতে যার বাসিন্দা সেই কিশোর ও তার মা। সেই সময়টায় কিশোরের মা থাকতো কাজে আর কিশোর নিজেও বাড়িতে থাকতো না।

নিরালা দুপুরে খালি পড়ে থাকা বাড়িটার হুটহাট চলে যাওয়া শেহেরজাদির অভ্যাসে দাঁড়িয়ে যায়। একবার সে কিশোরের যত্নে ব্যবহৃত পেন্সিল বক্স আর ইস্ত্রি করা কাপড়ের ঘ্রাণ নিত, যার মধ্যে কিশোরটির শার্ট, প্যান্ট এমনকি অন্তর্বাসও ছিল। শেহেরজাদি এক পর্যায়ে কিশোরের মায়ের প্রতি এক অদ্ভুত অনুসূয়া অনুভব করে ওঠে যখন তার মনে হয় তিনি কিশোরের ব্যবহৃত জিনিসগুলো হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখতে পারেন।

এই ডিটেইলিং এর মধ্য দিয়ে মুরাকামি এমন এক যৌন-গন্ধী আবহ তৈরি করেছেন যাতে পাঠকের গল্পের শেষটা জানার জন্য ছটফট না করে উপায় থাকে না। তাই একেকটা বাক্য শুঁকে শুঁকে গল্পের সাথে সাথে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় থাকে না। আরব্য রজনীর রূপকথার শেহেরজাদি মুরাকামির কলমে হয়ে ওঠে বয়ঃসন্ধিকালের প্রেম-ঘন যৌনতার সম্মোহনে আটকে পড়া এক অসহায় কিশোরী।

গল্পের শেষটা ঠিক চমকপ্রদ নয়, বরং বিষণ্ণ। হাবারার ঘরটায় যখন অন্ধকার নেমে আসে পাঠক তখন একটা দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে অভূতপূর্ব এক শীতল হাহাকারে নিক্ষিপ্ত হন। লেখকের সার্থকতা এখানে যে পাঠককে এতটা সময় ধরে রেখেও যখন তিনি শেষে কোনো চমক রাখেন না, কিন্তু তবুও পাঠক আশাহত হন না। পুরো গল্পে পাঠককে এভাবে আঠা দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব হয়েছে লেখকের অসম্ভব শক্তিশালী নিজস্ব বয়ান-শক্তির কারণে, চমকপ্রদ কিছুর অলীক প্রতিশ্রুতির কারণে নয়।

গল্পের শেষের এই বিষণ্ণতার বোধটুকু যেন পাঠকের প্রাপ্যই ছিল। কারণ তারা জানেন যে তারা পড়ছেন দুইজন নিঃসঙ্গ ভালোবাসা-বঞ্চিত মানুষের গল্প। এদের কেউই কখনো নিজেদের জীবনের সামাজিক বা ব্যক্তিগত গণ্ডী ছেড়ে একে অপরের হয়ে উঠতে পারবেন না। সেটা যে শুধু পারিপার্শ্বিকতার কারণে সম্ভব নয়, হয়তো তারা একে অন্যের হতে চানও না।

এই সুবাদে শেষে এসে হারুকির মুরাকামির তৃতীয় যে সার্থকতার কথা বলতে চাই সেটা হলো পাঠক সাথে রেখে গল্প লিখলেও তিনি শেষমেশ পাঠক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন না। কথাটা কিছুটা পরস্পর-বিপরীত শোনালেও আদতে তা নয়। এই দুয়ের মাঝে একটা সরু সরলরেখা আছে। ব্যাপারটা হয়তো এভাবে বলা যায় যে মুরাকামির গল্পের একটা স্বনির্মিত কক্ষপথ আছে যা থেকে তিনি বিচ্যুত হন না, পাঠক চাইলেও না। এখানেই তার নিজস্বতা ও লেখক হিসেবে পূর্ণতা।

অলংকরণ শিবলী নোমান