।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

ওজনে একেকটা এক থেকে দেড় কেজি। আকার ও আয়তনে দেখতে অনেকটা ছোটখাটো কুমড়া। তবে সেটি কুমড়া নয়, মূলত আম। কুমড়ার মতো দেখতে হওয়ায় এই আমের আঞ্চলিক নাম কুমড়ো জালি।

গেল সোমবার বানেশ্বর বাজারে এই আম দেখতে ছোটখাট জটলা। খুব বেশি প্রচলিত না হওয়ায় এই আমের বিশেষত্ব তুলে ধরছিলেন দুর্গাপুর উপজেলার সূর্যভাগ গ্রামের হানিফ আলী। ‍তিনি এই বিশেষ জাতের আম নিয়ে এসেছেন বিক্রির উদ্দেশ্যে। তবে এই আম দেখতে বাজারে উৎসুক মানুষের ভিড় থাকলেও, ছিল না ক্রেতা।

হানিফ আলী জানান, তিনি সকাল দশটায় বাজারে এসেছেন। অনেকেই আম দেখতে আসছেন। কিন্ত ক্রেতা চাহিদা নেই।

তিনি বলেন, ২০ কেজি ওজনের এক ক্যারেট আমের দাম বলছে মাত্র ২৫০ টাকা। এই দামে ‍যদি বিক্রি করি, দুর্গাপুর থেকে এতদূর নিয়ে আসার ভ্যান ভাড়া উঠবে না।

পাশেই ভ্যানে অন্তত ২০টি ক্যারেটে ১০ মণ আরাজাম আম বিক্রির অপেক্ষায় বানেশ্বরের আফাজ উদ্দিন।

জানালেন, তার নিজের ও ইজারা নেয়া আমবাগানে এখনও অন্তত এক হাজার মণ আম ঝুলছে। মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আম বিক্রি করে উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যয় তুলতে পারেননি। বাগান মালিকদের ইজারার টাকা শোধ করেছেন এনজিও থেকে লোন নিয়ে। সেই কিস্তি দিতেই আম বিক্রির টাকা শেষ।

আম বাগানীরা বলছেন, বাজারে ল্যাংড়া শেষের দিকে। আম্রপালি ও ফজলি আম উঠতে শুরু করেছে। আশ্বিনা ও বারি-৪ মাত্র পক্ক হচ্ছে।

ফল গবেষণা কেন্দ্রের হিসেবে, জুনের প্রথম সপ্তাহে বাজারে আসে ল্যাংড়া আম। শেষ সপ্তাহে আম্রপালি ও ফজলি। জুলাই মাসের ২য় সপ্তাহে বাজারে তোলার উপযুক্ত হয় আশ্বিনা ও বারি-৪ জাতের আম।

প্রতিষ্ঠানটির হিসেবে, রাজশাহী অঞ্চলে আম বাগানগুলোতে এখনও প্রচুর পরিমাণ ফজলি এবং আম্রপালি রয়েছে। বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে ল্যাংড়া, আম্র্পালি, ফজলি, আশ্বিনা, বারি-৪ সহ কয়েকটি জাতের আম। বিক্রির জন্য যে আম এখনও রয়েছে তার পরিমাণ মোট উৎপাদিত আমের ৪০ ভাগ।

আম বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একদিকে বাগানে বিক্রির জন্য যখন প্রচুর পরিমাণ আম রয়েছে। অন্যদিকে করোনা প্রকোপ কমাতে ঘোষণা দেয়া হয়েছে সারাদেশে কঠোর লকডাউন। সারাদেশে ঘোষিত লকডাউন আর ঈদের ছুটি, আম বিক্রির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে।

আমবাগানী ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, মৌসুমের শুরু থেকেই পড়তি বাজার। মাঝে ক্ষিরসাপাত ও ল্যাংড়া আমে কিছুটা দাম পেয়েছেন তারা। শেষ দিকে আম বিক্রি না হলে তাদের আর্থিক ক্ষতি যেমন হবে, তেমনি এ অঞ্চলের অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়বে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, লকডাউনে ঘরবন্দি থাকে বেশিরভাগ ভোক্তারা। সেকারণে বিশেষ ব্যবস্থায় বাজার কিংবা আম পরিবহন চালু থাকলেও তাতে খুব বেশি সুবিধে হয় না।

বেলপুকুর থানার জামিরা গ্রামের মোহাম্মদ রাসেল বলেন, মনে করেন যে, লকডাউনে বাজার চালু। কুরিয়ার চালু। গাড়িও চালু। কিন্তু মানুষ ঘরবন্দি। তাহলে আম কিনবে কে, আর খাবে কে?

রাজশাহী জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল জানান, পহেলা জুলাই থেকে ঘোষিত লকডাউনে আম ও বাজারের ক্ষেত্রে কি নির্দেশনা আসবে এখনও মন্ত্রী পরিষদ থেকে জানানো হয়নি।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দীন অবশ্য আশাবাদী এই সময়কালেও আম বিক্রি থেমে থাকবে না।

তিনি আরো বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বড় একটি অংশ স্থানীয় অনলাইন উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে আম কিনে থাকে। কুরিয়ার চালু থাকবে ফলে আম বিক্রি চলবে।

রাজশাহী কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, জেলায় ১৭ হাজার ৫৭৪ হেক্টর জমিতে চলতি মৌসুমে আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৯৩ হাজার ৭৮ টন। ফলন ভালো হওয়ায় সে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত, গেল কৃষি বছরে রাজশাহীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রায় ২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির আমের ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় ৭০ হাজার কৃষক।