।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

সন্তানের কোনো সাড়াশব্দ নেই। ফেলছে না চোখের পলক। বোঝা যাচ্ছে না হৃদস্পন্দন। এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবা রিকশায় করে সন্তানকে নিয়ে ছুটছেন হাসপাতালের দিকে। বাবা-মা সন্তানের মুখে মুখ লাগিয়ে ক্রমাগত চেষ্টা করছেন শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে। সম্প্রতি এমন ছবি ভাইরাল হয় নেট দুনিয়ায়।

খুশির খবর পরিবারের স্বজনরা জানিয়েছেন, সোমবার চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে শিশুটি। এখন পুরোপুরি ভালো আছে।

রাজশাহী নগরীর হাদির মোড় বউ বাজার এলাকার সজল মনি ওরফে সিজার ও রুম্পা খাতুন দম্পতির একমাস বয়সী এই ছেলে সন্তানের নাম হাফসা।

কী ঘটেছিল সেদিন?

গত ২৬ জুন শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে হাফসাকে গোসল করান তার দাদী স্বাধীনা বেগম। তিনি গোসলের পর শিশুটির শরীরের পানি মোছানোর সময় টের পান হাফসা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে না ঠিকমত শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে কি না। মুখ দিয়ে উঠতে শুরু করেছে ফেনা জাতীয় পদার্থ। চোখের পলক নেই। এমন পরিস্থিতিতে মুহূর্তেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

২৬ জুনের এই ছবিটি ভাইরাল হয়

মঙ্গলবার দুপুরে হাফসার সঙ্গে খেলতে খেলতে তার মা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন সেদিনের পরিস্থিতি।

তিনি জানান, শিশুটিকে প্রথমে নেয়া হয় বাড়ির পাশের এক হুজুরের কাছে। দোয়া কালাম পড়ে শরীরে ফুঁ দিলেও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছিল না। একপর্যায়ে তার মাথায় আসে হাসপাতালে নেয়ার কথা। ঠিক তখনই শিশুটি অচেতন হয়ে পড়ে। আর কোন কিছু না ভেবে সিজারিয়ান অপারেশন করা মা ছুটে বেরিয়ে পড়েন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে।

রুম্পা খাতুন জানান, লকডাউন-এর বিধি নিষেধের কারণে সেসময় বাড়ির সামনে কোনো যানবাহন না পেয়ে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দৌড়ানো শুরু করেন। খবর দেন বাচ্চার বাবাকে। রাস্তার মধ্যে দেখতে পান এক মোটরসাইকেল আরোহীকে। তাকে অনুরোধ করতে তিনি কিছুদূর এগিয়ে দেন।

এরইমধ্যে রিকশার সন্ধান পান বাবা। হাফসার বাবা-মা যখন রিকশায় উঠছিলেন তখন পরিস্থিতি দেখে পাশের এক ব্যক্তি বলেন, মুখ দিয়ে বাইরে থেকে বাতাস দিলে শিশুটির জীবিত থাকার সম্ভাবনা বাড়বে। এটি শোনার পর রিকশায় উঠে একবার বাবা একবার মা, সন্তানের মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা করেন। একদিকে চলে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা, অন্যদিকে রিকশা চলে হাসপাতালে গন্তব্যে।

দেহে যেন প্রাণ পান বাবা-মাও

রুম্পা বলেন, ‘যখন হাসপাতালের কাছে পৌঁছায় তখন আর মুখ দিয়ে বাতাস দিতে পারছিলাম না। আমি ওর বাবাকে মুখ দিয়ে বাতাস দিতে বলি। রিকশাটি যখন হাসপাতালের কাছাকাছি পৌঁছে তখন হঠাৎ করেই কেঁদে ওঠে হাফসা।

সুস্থ্য হয়ে মায়ের কোলে ফেরা হাফসাকে ঘিরে পরিবার

জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা শিশুটিকে প্রথমেই অক্সিজেন দেন। ভর্তি করেন হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানে চিকিৎসকরা হাফসার বাবা মাকে জানান, খিঁচুনিজনিত সম্যসায় এমনটি হয়েছিল। দুই দিনের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন হাফসা।

সোমবার চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে এসেছে শিশু হাফসা। তাকে নিয়ে এখন পরিবারে অন্তহীন আনন্দ। প্রতিবেশীরাও আসছে তাকে এক নজর দেখতে। হাফসার চেয়ে বছর চারেকের বড় বোন শ্রেয়ার আনন্দটা যেন আরও বেশি।

হাফসার দাদি স্বাধীনা বেগম বলছিলেন, হাসপাতালে নেয়ার সময় তারা ভেবেই নিয়েছিলেন হাফসা মারা গেছে। এ যেন হারিয়ে খুঁজে পাওয়া।  

তারা মনে করেন, মুখে মুখ লাগিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার কারণেই হাফসা এ যাত্রায় রক্ষা পেয়েছেন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মুখের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে (মাউথ টু মাউথ ব্রেদিং) শ্বাস দেয়া প্রাথমিক চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার অংশ। এ প্রক্রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসনালিতে জোরে হাওয়া (অক্সিজেন) দেয়া হয়। এটিকে বলা হয় আর্টিফিশিয়াল ভেন্টিলেশন বা কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস।